শিশু মেলা

ঢুঁড়া সাপ ও গেছো ব্যাঙ

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৯-২০১৮ ইং ০০:৪২:৪১ | সংবাদটি ১৬২ বার পঠিত

দূর পাহাড় হতে ছুটে আসা ছোট্ট ঝর্ণার বাঁকে বাস করে ঢুঁড়া সাপ। ঝর্ণাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানটা একটু চ্যাপ্টা। কম-বেশি বৃষ্টিপাত হলেই সেই বাঁকে তৈরি হয় জলাধার। ব্যাঙ্গাছি, ডানকানা, তিতপুঁটি ঘাই মারে। ওঁৎ পেতে থাকা ঢুঁড়া সতর্ক হয়। ফণা তুলার ব্যর্থ চেষ্টা করে শিকার ধরতে চায়। কিন্তু পারে না। সেই যে ঘাই দিয়ে ডুবল- আর একটাও দেখা যায় না। তবুও হাল ছাড়ে না ঢুঁড়া। নিজ গর্তের বাইরে একটু মাথা বের করে শুয়ে থাকে। একটা কিছু ধরতে হবে। পেট ক্ষিধায় ছু ছু করছে। মাঝখানটা সরু হয়ে এসেছে। অনেক চেষ্টার পর একটা ডানকানা ধরেছিল। খেয়ে কিছুই হয়নি। পেটের ক্ষিধা যেন আরও বেড়ে গেছে। তথাপি ক্ষুধা সইতেই হচ্ছে।
ঝর্ণার বাঁকে যেখানে উজান থেকে ছুটে আসা পানি আঘাত করে, সেখানে ছিল একটা ট্যাকাটুকির গাছ। বয়স বেশি হয়নি। নিচের মাটি সরে যাওয়ায় সে গাছটা কাত হয়ে ঝর্ণার উপর ছায়া ধরেছে। সে গাছটায় বাস করে একটা গেছো ব্যাঙ। বেশ লম্বাটে শক্ত চেহারা। চোখ দুটো বেরিয়ে আসছে যেন। ট্যাকাটুকির গাছটায় ফুল এসেছে। অচিরেই সেগুলো ফলে পরিণত হবে। এর ঘ্রাণে পোকামাকড় আসে। গেছো ব্যাঙ সেগুলো খপাখপ ধরে আর খায়। দেখতে দেখতে গেছো ব্যাঙের চেহারা হল নাদুস নুদুস। চোখ দুটো আর বেরিয়ে আসছে বলে বুঝা যায় না। অনেকটা বাচ্চা ভাওয়া ব্যাঙের চেহারা হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ বৃষ্টি হল না। ঝর্ণা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ঝর্ণার মাঝখানটা বরাবর পানির যে ধারা ছিল, সেটা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে। মাছ তো নেই-ই। একটা ব্যাঙাছির বাচ্চাও চোখে পড়ছে না। ঢুঁড়ার খাবারের আকাল দেখা দিল। চতুর্দিকে যেন দুর্ভিক্ষ। একটা ফড়িংও কোথাও ওড়তে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ট্যাকাটুকির গাছটা ফলে পরিপূর্ণ। ঢুঁড়া কী করবে ভেবে পেল না। ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠল সে। সারা রাত ঘুম হয়নি ঢুঁড়া সাপের।
ভোরে গেছো ব্যাঙ যখন শিকার ধরছিল তখন গাছে কম্পন লাগলে শিশির সমেত দু’একটি ট্যাকাটুকি নিচে পড়ে। ঢুঁড়া খাদ্য ভেবে মুখে দেয়। হ্যাঁ! বেশ স্বাদই তো মনে হয়। ঢুঁড়া উপরে তাকিয়ে এগুলোর উৎস দেখল। ছোট ছোট কালো ফলে ছেয়ে আছে গাছটি। ঢুঁড়া গাছে উঠার সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক চেষ্টার পর সে বেয়ে বেয়ে ট্যাকাটুকির গাছটায় উঠল। কিন্তু বাধ সাধল গেছো ব্যাঙ। ও বলল:
-দেখো ঢুঁড়া। তুমি জলাধারে থাকো। ওখানেই তোমার সা¤্রাজ্য। আমি তোমাকে কোন ডিস্টার্ব করিনি। কিন্তু তুমি এখন আমাকে এসে ডিস্টার্ব করছ।
-ঢুঁড়া রাগান্বিত হলেও সে রাগ সম্বরণ করে বলল: ব্যাঙ ভাই আমার সা¤্রাজ্যে আকাল পড়েছে। আজ এক মাস ধরে অনাহারে অর্ধাহারে আছি। এখন আমার খাবার খুবই দরকার। তোমার গাছ হতে আমাকে একটু খাবার দাও। আমি কথা দিচ্ছি বৃষ্টি হলেই নেমে যাব এখান থেকে।
গেছো ব্যাঙ ছিল দয়াদ্র প্রকৃতির। ঢুঁড়ার এমন কাকুতি মিনতিতে ওর মায়া হল। সে বলল: আচ্ছা ঢুঁড়া ভাই, যে ক’দিন বৃষ্টি না হয়, সে ক’টা দিন, আমার এখানেই থাকো। দু’ভাই মিলে ফল খাবো আর গল্প করবো।
ঢুঁড়া বলে- মেঘরাজা আমার উপর নাখোশ। গেল কয়েক বছর মেঘরাজা বৃষ্টি ঝরাতে কার্পণ্য করেনি। আামার সুদিন ছিল। সেই সুদিনে খেয়ে দেয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। আমোদ ফূর্তিতে মত্ত ছিলাম। ভবিষ্যতে যে এ রকম দুর্দিন আসবে সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। যদি জানতাম এ রকম দিন আসবে তাহলে- কিছু মাছ শুটকী করে রাখতাম। এ দুর্দিনে কাজে লাগতো। কিন্তু আমি সেটা করিনি। আনন্দ আর ফূর্তিতে মশগুল ছিলাম বলে খেয়াল করতে পারিনি। কিছু দিন আগে মেঘরাজা যায় পাল্টে। অন্য রাজা এসে সেখানটায় দায়িত্ব নিয়েছে। মনে হয় আমার মেঘ রাজা ছুটি নিয়েছে। তাইতো আমার সা¤্রাজ্যে মঙ্গা দেখা দিয়েছে। ঢুঁড়াকে থামিয়ে দিয়ে গেছো ব্যাঙ বলল:
আরে ঢুঁড়া ভাই- ‘সবুর কর। সবুরে মেওয়া ফলে। মাত্রতো আর ক’টা দিন। তোমার মেঘরাজা হয়ত ফিরে আসবে। আবার তোমার সুদিন আসবে। মাঠে ঘাটে সুবাতাস বইবে। তখনতো এই ভাইয়ের কথা ভুলে যাবে।
-আরে না না। তোমাকে ভুলবো না ভাই। তুমি আমার দুর্দিনে প্রাণ বাঁচালে। আর আমি তোমাকে ভুলে যাবো।
-তোমার কথা শুনে খুশি হলাম ভাই। সত্যিই তুমি ভাল বন্ধু।
ইশানে মেঘ করেছে। চারিদিক অন্ধকার। ঝড় বৃষ্টির সম্ভাবনা। ঢুঁড়া মনে মনে খুশিই হয়। বৃষ্টি হলেইতো ঝর্ণা ভরে উঠবে পানিতে। আবার, ব্যাঙাছি, ডানকানা, তিত পুটি আসবে? হয়ত অন্য জাতি মাছও আসতে পারে। চোখ বোজে অপেক্ষায় থাকলো ঢুঁড়া।
ওদিকে গেছো ব্যাঙের ঘুম নেই। চিন্তায় অস্থির সে। ঝড়েই ওর যত ক্ষতি। ট্যাকাটুকি সব পড়বে পানিতে। পোকা মাকড়ও আর আসবে না, যতক্ষণ না ফুল আসে। নিশ্চয় ঐ মেঘ আমার জন্য মঙ্গার পূর্বাভাস।
গভীর রাতে ঝড় বৃষ্টি শুরু হল। অল্পক্ষণের মধ্যেই দূর পাহাড় হলে ঝর্ণা পরিপূর্ণ হয়ে নবরূপে ছুটতে শুরু করল। উদ্দাম যৌবন নাচছে যেন ঝর্ণার শরীরে। নৃত্য করতে করতে ছুটে চলেছে নদীর পানে। ঢুঁড়ার আবাসেও আনন্দের ঢেউ। ওর জলাধার ভরে উঠেছে। নদী থেকে উজিয়ে মাছ-ব্যাঙ উজানে আসতে শুরু করল। সকাল হতে না হতেই ক’টা পুঁটি ধরে খেয়ে ফেলল ঢুঁড়া। আঃ কী স্বাদ। অনেকদিন পর আহারটা বেশ ভালই হল।
ঘুম থেকে ওঠে গেছো ব্যাঙ দেখল একটা ট্যাকাটুকিও নেই। খাবে কী? গাছ থেকে নেমে এলো সে। ঢুঁড়ার চেহারার দিকে তাকিয়ে অবাক হল সে। এক দিনের ব্যবধানে চিনতে পারছে না ওকে। চেহারার কেমন তেলতেলে ভাব। গেছো ব্যাঙ বলল: ঢুঁড়া ভাই- এলাম তোমার সা¤্রাজ্যে। আমাকে জায়গা দেবে?
নাক উঁচু করে ঢুঁড়া বলল: এসেই যখন পড়েছো তখন আর বলে লাভ কী? তবে সাবধান ব্যাঙাছি ছাড়া আর কিছুতে হাত দিও না, বলে রাখলাম।
ঢুঁড়ার এহেন ব্যবহারে মনক্ষুণœ হলো গেছো ব্যাঙ। মৃত্যুপথ যাত্রী সেই ঢুঁড়াকে খাবার না দিলে হয়ত এতদিনে ওর কবর রচিত হতো। আজ এই সুদিনে ওর চোখের দৃষ্টি কেমন বদলে গেল মনে হয়। গেছো ব্যাঙ কিছু বলল না। শুধু ভাগ্যকেই স্মরণ করল সে।
এ কয়দিন বৃষ্টি থাকায় অজ¯্র মাছ এলো ঝর্ণার বাঁকে। ঢুঁড়া চালাক হয়ে উঠল। সে মাছ ধরে ধরে খেতে লাগল। যখন খাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল তখন সে ওগুলো শুটকী করতে লাগল। এদিকে গেছো ব্যাঙ গভীর জলের মধ্যে ব্যাঙাছি বেছে বেছে ধরতে পারল না। ওরা ¯্রােতের টানে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এদিকে ক্ষুধার জ্বালাও সইতে পারছে না। তাই দু’একটা পুঁটি ধরে খাওয়া শুরু করল। দৃশ্যটি দেখল ঢুঁড়া। প্রথম প্রথম কিছু বলল না। তবে মনে মনে এক ফন্দি আটল সে। শালা আমার খাদ্যে ভাগ বসায়? খেয়ে দেয়ে একটু শক্তি সঞ্চয় করে নেই। তারপর...।
একদিন গভীর রাতে গেছো ব্যাঙ ওর আস্তানায় ঘুমিয়ে পড়েছে। ঢুঁড়া তখন উঁৎ পেতে ছিল সেখানে। ওর মনে একটাই জেদ। আমার খাদ্যে ভাগ বসায়? ওকে সাবাড় করে ফেললেইতো আর কেউ থাকবে না ডিস্টার্ব করার। গায়ে যা শক্তি হয়েছে এরকম দু-একটা ব্যাঙ সাবাড় করা কোন ব্যাপার নয়।
ব্যাঙের নাক ডাকছিল তখন। গভীর ঘুমেরই লক্ষণ সেটি। আর দেরী করা যায় না। খুব শক্ত করে ফণা উঠাতে চাইল সে। কিন্তু পারল না। যতটুকু সম্ভব রেগে মেগে খপ করে ধরে ফেলল ব্যাঙের মাথা। প্রথম দফাতেই চার ভাগের একভাগ মুখের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলল সে। ব্যাঙও কম যায় না। শক্ত সামর্থ গেছো ব্যাঙ নিজেকে মুক্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগল। এ যেন বাঘে মহিষে যুদ্ধ। যুদ্ধে ব্যাঙ পরাজয় মানল ঠিকই, তবে ঢুঁড়ার গলার ফাঁস হয়ে রইল সে। ব্যাঙটি আকারে অনেক বড় থাকায় নিচের দিকে নামছে না সেটি- অপর দিকে ওর সাথে লড়াই করতে করতে হাফিয়ে উঠেছিল ঢুঁড়া। এমন জায়গায় আটকা পড়ল ব্যাঙ- না নিচের দিকে নামছে, না ছেড়ে দিতে পারছে সে।
কালবার্টে দাাঁড়িয়ে ক’জন প্রাতঃভ্রমণকারী দেখছিল সে দৃশ্য। অনেকক্ষণ চেষ্টা করে ঢুঁড়া শেষ পর্যন্ত নিস্তেজ হয়ে এল। প্রাতঃভ্রমণকারীদের একজন মন্তব্য করলেন- ‘বেশি খেতে চাইলে কমও খাওয়া না।’
অন্যরা মাথা দুলিয়ে সায় দিলেন... ঠিক্ ঠিক্...।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT