ধর্ম ও জীবন

নিন্দিত দুশমন থেকে নন্দিত দোস্ত

ডা. এম সোলায়মান খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৯-২০১৮ ইং ০১:৩১:০৩ | সংবাদটি ৩১৭ বার পঠিত

১. বদর যুদ্ধে পরাজয়ের পর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন- ‘প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত কোন সুগন্ধি ব্যবহার করবো না এবং স্ত্রীলোকের নিকটও যাবো না’। (মোস্তফা চরিত, পৃ.-৬৩০)
২. ওহুদ যুদ্ধের সময় তিনি শহীদ হামজা (রা.) এর মুখে বল্লমের ফলা দিয়ে খোঁচা মেরে বলেন- ‘ব্যাটা দেশদ্রোহী, উচিত সাজা পেয়েছে’। তার কান্ড দেখে উপস্থিত সেনাপতি আল হুলায়েস বলেন মৃতের সাথে এ কেমন ব্যবহার? তখন তিনি বলেন ‘কাজটি ভুল ছিল। এই ঘটনাটি গোপন রেখ, কাউকে বলো না’। (সীরাতে ইবনে হিসাম, ৩য় খন্ড, ইফা, পৃ.-৭৩)।
৩. ওহুদ যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি ওমর (রা.) কে বলেন- ‘তোমাদের কিছু মৃত সাথীদের মুসল করা হয়েছে অর্থাৎ নাক, কান কেটে দেয়া হয়েছে। যা আমাকে আনন্দিত বা রাগান্বিত করেনি। আমি এই কাজটি করার জন্যে হুকুম জারি বা বাঁধা প্রদান কোনটিই করিনি’। (আলফ্রেড গীয়োম, লাইফ অব মুহম্মদ, পৃ.-৩৮৫-৩৮৭)।
৪. উম্মে হাবিবা (রা.) এর সঙ্গে রাসুল (সা.) এর বিয়ের খবর শুনে তিনি পুলকিত হয়ে একটি আরবি প্রবচন উচ্চারণ করেন যার অর্থ- ‘কনে উপযুক্ত বর পেয়েছে’। (ইবনে আল আতির, আল কামিল ফি আল তারিক, পৃ.- ৩১৭)।
৫. রাসুল (সা.) এর অজুর পানির ছিটা গায়ে লাগাতে বা অবশিষ্ট পানি থেকে দুই এক ফোটার জন্যে সাহাবিদের হুড়োহুড়ি দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে বলেন- ‘হে আবু ফদল, আমি এরূপ মায়া মহব্বত, এরূপ ভালোবাসার অধিকারী কাউকে এই জীবনে দেখিনি। (মার্টিন লিংগস, পৃ.-৪৩৩)।
৬. রোম স¤্রাট হেরাক্লিয়াসের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- ‘মুহম্মদ উচ্চ বংশের লোক, নবুয়ত লাভের আগে মিথ্যা বলেননি, ওয়াদা ভঙ্গ করেননি, একত্ববাদ, চারিত্রিক পবিত্রতা, সহমর্মিতা শিক্ষা দেন’। (সহি বুখারী, বুক-৬৫, হাদিস- ৪৫৫৩)।
৭. উপরের মন্তব্যগুলি করেছেন রাসুল (সা.) এর এক ভয়ঙ্কর দুশমন। তিনি ২০ বছরের অধিককাল রাসুল (সা.) কে অস্বীকার করেছেন। ইসলামকে ধ্বংস করতে তার সমস্ত শক্তি, মেধা, ক্ষমতা, সম্পদ, লোকবল ব্যবহার করেছেন। রাসুল (সা.) কে হত্যা করার জন্যে দুইটি ভয়াবহ যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব দান করেছেন। মক্কার যে পাঁচ ঘৃণ্য দুরাচার রাসুল (সা.) কে সবচেয়ে বেশী অপমান, অত্যাচার, মশকরা করেছে তিনি তাদের একজন। অন্য চার নরাধম হলো আবু লাহাব, আবু জেহেল, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা।
আল্লাহপাকের কি অপূর্ব মহিমা। তিনি এই ভয়ঙ্কর জালিম দুশমনের নিকষ কালো অন্তরে ইসলামের আলো জ্বালিয়ে দিলেন। কুখ্যাত শত্রুকে সাহাবী হওয়ার তৌফিক দিলেন। তিনি শাখর ইবনে হার্ব ইবনে উমাইয়া। আবু সুফিয়ান নামে অধিক পরিচিত।
আবু সুফিয়ান (রা.) মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে ইবনে আব্বাস (রা.) এর মধ্যস্থতায় রাসুল (সা.) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসলাম কবুল করেন। (আল ওয়াকিদি, কিতাব আল মাগাযী, খন্ড-২, পৃ.-৮১৭-৮১৮)। রাসুল (সা.) তাকে ক্ষমা করে দেন। তাকে সম্মানীত করে ঘোষণা করেন মক্কা অভিযানের সময় যে আবু সুফিয়ান (রা.) এর গৃহে থাকবে সে নিরাপদ থাকবে। (সহি মুসলিম, হাদিস-৪৩৯৬, মার্টিন লিংগস, পৃ.-২৯৫-২৯৬)। ‘আবু সুফিয়ান (রা.) বাধ্য হয়ে, কোণঠাসা হয়ে ইসলাম কবুল করেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার প্যাগান ধর্ম অন্তঃসারশূন্য’। (কারেন আর্মস্ট্রং, ইসলাম এ সর্ট স্টোরী, পৃ-২০)। ইবনে ইসহাক বলেন ইসলাম গ্রহণের পর তিনি নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন। (সিরাতে রাসুলুল্লাহ, পৃ.-৫৭০)। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি রাসুল (সা.) এর সঙ্গে হুনায়েন যুদ্ধ ও তায়েফ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। (মার্টিন লিংগস, পৃ.-৪৪৪, ৪৫০)। তায়েফ অবরোধের সময় শত্রুর তীরের আঘাতে তার এক চক্ষু নষ্ট হয়ে যায়। (আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া আল বালাদুরী, আনসাব আল আশরাফ, খন্ড-৪ ,পৃ.-০৮)। হুনায়েনের যুদ্ধের পর তিনি রাসুল (সা.) কে বলেন- ‘যখন আপনার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলাম তখন আপনি ছিলেন চরম দুশমন। এখন আপনি প্রমাণ করেছেন যে আপনি প্রকৃত দয়ালু এবং আমাদের সবচেয়ে প্রিয়তম দোস্ত। (মুহম্মদ-ম্যান এন্ড প্রফেট, নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত। নিবন্ধকার-আদিল সালাহি, এ্যারাব নিউজ)। রাসুল (সা.) আবু সুফিয়ান (রা.) কে নাজরানের গভর্নর নিযুক্ত করেন। (ফিলিপ হিট্টি, পিপল অব ইসলাম, পৃ-১০৭)।
ওমর (রা.) এর খেলাফতের সময় তিনি ইয়ারমুখের যুদ্ধে রোমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। (নিকোলী ডেভিড, দি মুসলিম কনকোয়েস্ট অব সিরিয়া, পৃ.-১৪৮)। এই যুদ্ধে তার স্ত্রী হিন্দা (রা.) কবিতা আবৃতি করে মুসলিম সৈন্যদেরকে উৎসাহ দেন। ফলে পিছু হটতে থাকা মুসলিমদের মনোবল বৃদ্ধি পায় এবং পুনরায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে ফেরত আসে। (জিওফ্রে রীগ্যান, ফার্স্ট ক্রুসেডার বাইজেন্টাইন হলি ওয়ার, ২০০৩, পৃ.-১৬৪)। ৬ দিন ব্যাপি তুমুল যুদ্ধের ৪র্থ দিনে আবু সুফিয়ান (রা.) তার দ্বিতীয় চোখ হারান। (ইবনে আল আতির, আল কামিল ফি আল তারিক, পৃ.-৩৯৩, আল ওয়াকিদি, ফতেহ আল শাম, পৃ.-১৪৮)। ৬৫০ সালে তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করেন। জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত হন। তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.) তার জানাজার নামাজ পড়ান।
আবু সুফিয়ান (রা.) রাসুল (সা.) এর শ্বশুর। তিনি ইসলামের জন্য দুই চোখ হারানো সম্মানীত সাহাবী। ইবনে হাজার (রা.) তার আল ইসাবা ফি তাময়ীযিস সাহাবা কিতাবে বলেন ‘সাহাবী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ঈমান সহকারে রাসুল (সা.) এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপরই থেকে মৃত্যুবরণ করেছেন’।
সাহাবীদের মর্যাদা প্রসঙ্গে আল কুরআনে বলা হয়েছে- (ক) ‘আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তার প্রতি সন্তুষ্ট’। (সূরা : বায়্যিনা, আয়াত : ৮)
(খ) ‘তাদের সবাইকে আল্লাহ তায়ালা হুসনা তথা উত্তম পরিণতির ওয়াদা দিয়েছেন’। (সূরা : নিসা, আয়াত : ৯৫)
(গ) ‘যাদের জন্যে আমার পক্ষ হতে পূর্বেই হুসনার ওয়াদা হয়ে গেছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে’। (সূরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০১)
রাসুল (সা.) বলেছেনÑ (ক) ‘তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালমন্দ করো না। তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পর্বত পরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ এর সমপরিমাণ হবে না’। (সহি বুখারী হাদিস- ৩৩৯৭, সহি মুসলিম হাদিস- ৪৬১০)
নোট- এক মুদ=২৬০দিরহাম=৭৫০গ্রাম=১২ছটাক (ইসলাম ওয়েব-দি নিউ লুক)। বর্ণিত হাদিসটি মুত্তাফাকুন আলাইহে। যে হাদিসের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে ইমাম বুখারী (রা.) এবং ইমাম মুসলিম (রা.) একমত পোষণ করে নিজ নিজ কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন তাকে মুত্তাফাকুন আলাইহে বলে। ওহুদ পর্বত মদিনার ৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত, ৭ কিলোমিটার লম্বা এবং প্রস্থ তিন কিলোমিটার, উচ্চতা ৩৩০০ফুট)
(খ) যে আমার সাহাবীকে কষ্ট দিল সে যেন আমাকে কষ্ট দিল, যে আমাকে কষ্ট দিল সে যেন আল্লাহকে কষ্ট দিল, যে আল্লাহ কে কষ্ট দিল অচিরেই আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন। (তিরমিযি, ভলিউম-৬, বুক-৪৬, হাদিস- ৩৮৬২)
(গ) যাহারা আমার সাহাবীদেরকে গালি দেয় তাদের প্রতি আল্লাহর, ফেরেশতাদের এবং জগতবাসীর অভিশাপ বর্ষিত হোক। (আল মু’যাম আল কবীর আল তাবারানী, হাদিস- ১২৭০৯)
(একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাÑ হজ্বের সময় লক্ষ্য করেছি কিছু হজ্বযাত্রী ওহুদ পর্বতের পাদদেশে হামজা (রা.) এর কবর জিয়ারতের সময় আবু সুফিয়ান (রা.) এবং তার স্ত্রী হিন্দা (রা.) এর অশোভন সমালোচনা করেন)। চার মাযহাবের অন্যতম ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রা.) বলেনÑ ‘যদি কাউকে রাসুল (সা.) এর কোনো সাহাবীর সমালোচনা করতে দেখ তবে তার ইসলামের ব্যাপারে সংশয় পোষণ করবে’। (আল বিদায়া ওয়া আন নিহায়া, খন্ড-৮, পৃ.-১৪২)।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT