পাঁচ মিশালী

হৃদয়ের চোখে মক্কা মদিনা

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৯-২০১৮ ইং ০০:১৩:০০ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

পবিত্র মক্কা মোকাররমায় ওমরা পালন শেষে জিয়ারতের জন্য মদিনায় যাওয়ার কথা থাকলেও আমি আমাদের টিমের সাথে না গিয়ে দুই দিন পর মদিনায় যাই। উল্লিখিত দুই দিন আমাদের জামাতা আলমগীর হোসেনের জিদ্দার সমুদ্রবন্দর এলাকার বাসায় অবস্থান করি এবং ভূমধ্যসাগরের সমুদ্র সৈকত এলাকা ঘুরে সমুদ্র বন্দরের সৌন্দর্য্য প্রত্যক্ষ করি। মূল সমুদ্র থেকে অনেক ভিতরে সমুদ্রের পার ঘেসে যে বিশাল সমুদ্র সৈকত তা দেখে অভিভূত হয়েছি। রাস্তা সংলগ্ন পার ঘেষে, বিভিন্ন ধরনের জলযান রাখা আছে। ইচ্ছা করলে ছোট বড় ট্রলারগুলো ভাড়া নিয়ে দূর সমুদ্রে ঘুরে আসা সম্ভব। স্ত্রীকে নিয়ে আমি একদিন বিকালে একটি ট্রলারে করে সমুদ্রের অনেক এরিয়া ঘুরে শুধু পানির ঢেউ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। স্থানে স্থানে পিকনিক স্পটের মত বসার স্থান রয়েছে, ইচ্ছা থাকলে সাগর পারে বসে প্রকৃতি ও সৃষ্টিকর্তার নিয়ামত নয়ন ভরে উপভোগ করতে পারবেন।
একটি কথা অবশ্য বলা প্রয়োজন যে, উক্ত ছোট বড় ট্রলার বা নয়নাভিরাম সমুদ্রযানগুলির অনেক চালকই বাংলাদেশি। সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি চালকগণের সাথে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন সমুদ্রযানগুলি পর্যটকদেরকে সমুদ্র দেখানোর ব্যবসায় নিয়োজিত কিন্তু বর্তমানে কাতারের সাথে সৌদি আরবের শীতল যুদ্ধাবস্থা চলার কারণে তাদের ব্যবসা তেমন ভালো চলছে না ফলে বাংলাদেশীরা বেশ অসুবিধার মধ্যে দিন যাপন করছে।
মক্কায় ইসলাম প্রচার যখন অত্যধিক কঠিন হয়ে পড়ছিল এবং মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা যখন সীমা অতিক্রম করছিল, তখন দয়াময় মহান আল্লাহ প্রিয় নবীজি (সা:) কে সকল মুসলমানসহ মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা পালনেই রাসুল (সা:) আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। তখন মদিনা শহরের নাম ছিল ‘ইয়াসরিব’। হযরত মোহাম্মদ (সা:) যেদিন মদিনায় পৌঁছলেন, সেদিন থেকেই ইয়াসরিববাসী শহরের নাম পরিবর্তন করে ‘মদিনাতুর রাসুল বা রাসুলের মদিনা’ রেখেছিলেন। যার অর্থ হল, ‘রাসুলের শহর’ বা মদিনা।
মদিনা একটি পবিত্র নগরী বা শহর। মুসলমানদের প্রাণের ভূমি মদিনা। বিশ্ব নবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) ও অসংখ্য সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতি বিজড়িত ও বরকতময় পুণ্যভূমির পবিত্র শহর মদিনা। মদিনা নামটি শুনলেই মুমিনগণের অন্তর আনন্দে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। মদিনা শরীফের ৯৫টি নাম থাকলেও ইয়াসরিব বা মদিনাতুর রাসুল নাম দুইটিই বিখ্যাত। রাসুলের শহর মদিনাতেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব আমার প্রাণপ্রিয় নবীজি (সা:) এর পবিত্র রওজা শরীফ অবস্থিত। রওজা শব্দের অর্থ উদ্যান বা বাগান। এ বাগান দুনিয়ার বাগান নয়, এ বাগান হচ্ছে জান্নাতের বাগান। এই জান্নাতের বাগানেই শায়িত আছেন রাহমাতুল্লিল আল-আমিন আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা:)। তাঁর পবিত্র দেহ-মোবারক ধারণ করে মদিনা আজ চিরধন্য। পবিত্র মদিনা মনোয়ারার সঙ্গে ইসলামের পরিপূর্ণতায় রয়েছে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। যা অটুট থাকবে চিরকাল, থাকবে চির অম্লান।
একজন মুমিনের জীবনে আল্লাহর ঘর কাবা শরীফ তোয়াফ ও মদিনায় প্রিয় হাবিবের রওজা মোবারকের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম জানানোর চেয়ে বড় কোনো প্রাপ্তি কারো জীবনে হতে পারে বলে আমি মনে করি না। আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসুলের (সা:) অশেষ মেহেরবানীতে উমরা করার সময় সে সৌভাগ্য আমার জীবনে একবার হয়েছে। তাই আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করছি এবং বারবার যাওয়ার ও জিয়ারত করার তৌফিক দানের জন্য প্রত্যাশা করছি এবং দুনিয়াবাসীকে জীবনে একবার হলেও পবিত্র মক্কা-মদিনা জিয়ারতের তৌফিক দান করুন।
মদিনা শহরের রওজা সংলগ্ন মসজিদের রয়েছে অশেষ গুরুত্ব ও নিয়ামত। রাসুল (সা:) বলেছেন, ‘মদিনায় আমার এ মসজিদে নামাজ আদায় করলে, মক্কায় মসজিদুল হারাম ছাড়া অন্য সকল মসজিদের নামাজ অপেক্ষা এক হাজার গুণ বেশি সওয়াব হবে’। মদিনায় যাওয়া নিছক কোনো ভ্রমণ নয় বরং পরিষ্কার নিয়ত করলে তা হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসুল (সা:) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি খালিশ নিয়তে আমার কবর জিয়ারত করল, তার জন্য আল্লাহ’র নিকট আমার সুপারিশ থাকবে অবধারিত।’ অন্য আরও একটি হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার মৃত্যুর পর আমার কবর জিয়ারত করবে, সে ব্যক্তি যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমার সাথে সাক্ষাৎ করল’। তাই পবিত্র হজ বা ওমরা উদ্দেশ্যে যারা পবিত্র মদিনা মনোয়ারায় এসে প্রিয় নবীজি (সা:) রওজা মোবারকের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম জানানোর চেয়ে বড় কোনো অর্জন, এ পৃথিবীতে হতে পারে না বলেই আমার বিশ্বাস।
পবিত্র মদিনা নগরীতে প্রবেশের সাথে সাথেই সর্বপ্রথম নজরে পড়ে সারি সারি গম্বুজ ও সুউচ্চ কারুকার্য খচিত মিনারগুলোর দৃশ্য। গম্বুজগুলোর মধ্যে সবুজ রঙের গম্বুজটিই প্রিয় নবীজি (সা:) এর রওজা শরিফের উপরে। অন্য গম্বুজগুলোর সাথে রঙের ব্যবধান থাকায় রওজার ওপর স্থাপিত গম্বুজটি সবার নজরে পড়ে। মসজিদে নববীর মিম্বর হতে রাসুলে পাক (সা:) এর রওজা শরীফ পর্যন্ত স্থানটি নরম সবুজ কার্পেট বিছানো রয়েছে। এই স্থানটির নাম হচ্ছে ‘রিয়াজুল জান্নাত বা বেহেস্তের টুকরা’। এই স্থানে নামাজ আদায় করলে নেকি সবচাইতে বেশি এবং দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি তাই সবাই উক্ত জায়গাটিতে নামাজ আদায় করার জন্য প্রতিযোগিতা করে থাকেন। আমি অনেক চেষ্টার পর আল্লাহর মেহেরবানীতে উক্ত জায়গায় নামাজ আদায় করতে সক্ষম হয়েছি। নিজের ও আমার জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট স্বজন যেমন পিতা-মাতা, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, আত্মীয়-স্বজন ও সহকর্মীদের জন্য দোয়া ও মাগফিরাত কামনা করেছি। আল্লাহ মহান ও পবিত্র, সকল প্রশংসাই আল্লাহর জন্য। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নাই। তিনিই আমাকে উক্ত স্থানে নামাজ আদায় করা ও নবীজি (সা:) এর রওজা জিয়ারত করার তৌফিক দান করেছেন।
ইলেম ও হিকমতের গুণে গুণান্বিত হযরত আলী (রা:) সম্পর্কে হযরত মোহাম্মদ (সা:) বলেছিলেন, ‘আমি জ্ঞানের শহর হলে আলী উহার দরজা’। সেই বিশ্বজ্ঞানী ও মহাবীর হযরত আলী (রা:) এবং জান্নাতের সর্দারনী মা ফাতেমা (রা:) বাড়ি পরিদর্শন করেছি। কিছু আসবাবপত্র ব্যবহৃত জিনিসপত্র ছাড়া দেখার মত তেমন কিছুই নেই। তাই নিকটবর্তী নামাজের স্থানে দু’রাকাত নামাজ শেষে জিয়ারত করতঃ নিকটবর্তী মার্কেটে যাই। মার্কেট থেকে আজুবা ও মরিয়ম নামের উন্নত খেজুর ক্রয় করি। সেখান থেকে ইসলামের প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে কুবায়’ যাই সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করি এবং সেখান থেকে দুই কিবলার মসজিদ নামে বিখ্যাত মসজিদে গিয়ে আরও দু’রাকাত নামাজ আদায় করি এবং মসজিদটি ঘুরে ফিরে দেখি। এই মসজিদেই রাসুল (সা:) আল্লাহর নির্দেশে নামাজরত অবস্থায় কেবলা পরিবর্তন করেন। আল-আকসা মসজিদের দিক থেকে কেবলা পরিবর্তন করে কাবা শরীফের দিকে কেবলা পরিবর্তন করেছিলেন। যার ইতিহাস সম্পর্কে কুরআন হাদিসে বাংলা ও আরবিতে বিশদ বর্ণনা রয়েছে।
মদিনা থেকে ৪০/৪৫ মাইল দূরত্বে ‘ওয়াদী আলজ্বীন’ বা জ্বীনের পাহাড় অবস্থিত। একদিন স্ত্রীসহ আমি ও সৌদি প্রবাসী মেয়ের জামাই আলমগীর হোসেন তার নিজের গাড়িতে করে উক্ত জ্বিনের পাহাড় দেখার উদ্দেশ্যে হোটেল আস-সালাহিয়া থেকে রওনা দিয়ে মাত্র ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাই। যাত্রাপথে রাস্তায় উভয় পার্শে লক্ষ্য করেছি দূর দিগন্তে প্রসারিত ছোট বড় পাথরের পাহাড় আর মাঝে মধ্যে সারি সারি খেজুর গাছ ও বাগান। মোটামুটি শান্ত, নিরব ও শীতল পরিবেশেই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ চোখে পড়লো একটি বিশাল এরিয়া জুড়ে পানি আবদ্ধ হয়ে ঝিলের মত তৈরি হয়েছে। আরও কয়েকটি রাস্তায় গাড়িতে করে ঘুরেছি কিন্তু কোথাও পাহাড়, লাল মাটি ও বালু ছাড়া পানি চোখে পড়েনি। কিছু সময় পরই জ্বীনের পাহাড়ের কাছে এসে গাড়ী রেখে বিকেলের সামান্য রোদে পাহাড়গুলোর আকৃতি প্রকৃতি দেখছিলাম কিন্তু অতিরিক্ত বাতাসের কারণে রাস্তায় দাঁড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। আবার ভালোভাবে ব্রেক না করে রাস্তায় গাড়ী রাখাও সম্ভব হচ্ছিল না। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বলে এমনিতেই আমাদের গাড়ি উল্টো দিকে চলতে থাকে। আলমগীর নিজেই রাস্তায় শুয়ে আমাদেরকে দেখাচ্ছে যে, সে নিজে নয় বরং এমনিতেই গড়াগড়ি খাচ্ছে। পাহাড়গুলোতে গাছপালা তেমন নেই সুউচ্চ দিগন্ত জোড়া পাহাড় আর পাহাড়। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে হোটেলে ফিরে আসি।
মদিনা অতিশয় শান্তির শহর। যতদিন ছিলাম কোথাও কোনো ঝামেলা বা কোনো ধরণের অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। আমাদের হোটেলটি পবিত্র মসজিদে নববীর নিকটবর্তী হওয়ায় নামাজ আদায়ে যাওয়া আসার তেমন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়নি। আসা যাওয়ার পথে মাঝে মধ্যে বাংলাদেশী অনেক ব্যবসায়ী ও কর্মজীবীদের সাথে সাক্ষাৎ হতো। তাদের মধ্যে অধিকাংশই চট্টগ্রামবাসী। নিকটবর্তী একটি চট্টগ্রামবাসীর সাধারণ হোটেলে প্রায় প্রতিদিন খাওয়া দাওয়ার কাজটি সারতাম। কথাবার্তায় জানলাম মদিনাবাসীর স্থানীয়রা আগের মতো বিদেশীগণকে বিশেষ করে বাংলাদেশীগণকে ভালো চোখে দেখে না। চাকরীতে অধিক কাজ করলে বা ভালোভাবে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করলেও তারা উপযুক্ত বা প্রাপ্য বেতন দিতে রাজি নয়। তাছাড়া স্থানীয় ছাড়া বিদেশীদের ব্যবসা করারও সুযোগ দেওয়া হয় না। তারপরও পবিত্র মদিনা মনোয়ারার সাথে আত্মিক সম্পর্ক থাকায় এবং আল্লাহর নিয়ামত ও নবীজির অনুকম্পায় স্বল্প আয়েই বাংলাদেশীরা মদিনায় পড়ে আছে। পবিত্র মদিনা মনোয়ারার সাথে ইসলামের পরিপূর্ণতার যে বন্ধন চিরকাল অটুট ছিল এবং আছে, তার ওপর ভরসা করেই তারা মদিনায় পড়ে আছে। মহান আল্লাহপাকের নৈকট্য লাভের প্রধান ও একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নবী করীম (সা:)। অতএব মক্কা-মদিনায় যারা সফর করবেন তাদেরকে নবীজি (সা:) রওজা জিয়ারত করা অবশ্য কর্তব্য। তাই পবিত্র মদিনা মনোয়ারা হচ্ছে উম্মতে মোহাম্মদীগণের আত্মিক প্রশান্তির কেন্দ্রবিন্দু। তাই পবিত্র মদিনা হচ্ছে পৃথিবীর সর্বাধিক প্রিয় ও মর্যাদাবান নগরী ও শহর। প্রিয় নবীজি (সা:) এর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জানিয়ে শেষ করছি। আলহামদুলিল্লাহ।
লেখক : সাবেক কর্মকর্তা, সিলেট পাল্প এন্ড পেপার মিলস, ছাতক।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT