পাঁচ মিশালী

আলী আমজাদের ঘড়ি চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি এবং...

মৃনাল কান্তি দে রায় প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৯-২০১৮ ইং ০০:১৫:২৩ | সংবাদটি ২৩৫ বার পঠিত

‘আলী আমজাদের ঘড়ি, চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি, বংকু বাবুর দাড়ি’। এই স্লোগানটির সঙ্গে পরিচিত নন, এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে এই শহরে। অনেকে এর সারমর্ম সম্বন্ধেও অবগত। অর্থাৎ এটা কেবল স্লোগান নয়, এর পেছনে রয়েছে একটা ঐতিহাসিক সত্য।
এখন থেকে প্রায় দেড়শ’ বছরের আগের কথা। ১৮ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সিলেট জেলা শহর একটি ছোট শহর। তখন জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ কোন কাজে বা বেড়াতে এলে শহরের তিনটি ঐতিহাসিক জিনিস তাদের নজর কাড়তো। এগুলো হলো সুরমা নদীর উত্তর পাড়ে ক্বীনব্রীজ নিকটবর্তী আলী আমজাদের ঘড়ি, তার কাছাকাছি সুরমা নদীতে নির্মিত চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি এবং বংকু বাবুর (সে সময়ের একজন জনপ্রিয় গায়ক) দাড়ি।
তখনকার সময়ে ঘড়ির প্রচলন হলেও সংখ্যায় ছিলো কম। হাতে গোনা মানুষের হাতে থাকতো ঘড়ি। বাসাবাড়িতেও খুব কম সংখ্যক মানুষের ছিলো দেয়াল ঘড়ি বা টেবিল ঘড়ি। অনেকে সূর্যের পরিক্রমা দেখে সময় নির্ধারণ করতেন। ১৮৭৪ সালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৃথ্বিম পাশার জমিদার আলী আমজাদ সুরমা নদীর উত্তর তীরে ক্বীন ব্রীজের নীচে তৈরি করেন ঘড়ি। এই ঘড়িটি তখন শহরবাসী পথচারীদের সময় বলে দিতো। দৃষ্টিনন্দন নির্মাণ শৈলীতে নির্মিত এই ঘড়ি পরিচিতি পায় ‘আলী আমজাদের ঘড়ি’ নামে। ঘড়িটি স্থাপনের পর পথচারী সাধারণ মানুষের জন্য সময় নির্ধারণ সহজ হয়ে ওঠে। প্রতি ঘন্টায় ঘড়িটির জোরে টং টং আওয়াজ শহরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। তখন শহর এতো কোলাহলময় না থাকায় অনেক দূর থেকেও শোনা যেতো ঘড়ির আওয়াজ। একাত্তরে মহান মুুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সৈন্যরা ভেঙ্গে ফেলে ঐতিহাসিক ঘড়িটি। পরবর্তীতে একাধিকবার সংস্কার করা হলেও ঘড়িটি স্থায়ীভাবে সচল হয়নি।
বর্তমানে যে সুরমা নদীতে এখানে ওখানে চর জেগে উঠছে, কমেছে এর গভীরতা, অতীতে তা এ রকম ছিলো না। তখন সুরমা নদী গভীর ও ¯্রােতস্বিনী ছিলো। নদীতে কোন সেতু ছিলো না। তখন মানুষ খেয়া নৌকায় নদী পারাপার হতো। খেয়া পারাপারের সুবিধার্থেই সুরমা নদীর উত্তর তীরে (বর্তমান ক্বীন ব্রিজের নীচে) ৩২টি সিঁড়ির একটি ঘাট নির্মিত হয়। এই ঘাটের মাধ্যমে দেশ বিদেশের ভ্রমণ পিপাসুরা নৌ ভ্রমণ করতেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট ভ্রমণকালে এই ঘাট দিয়েই সুরমা নদী পারাপার হন। তাছাড়া, এই ঘাট এর মাধ্যমে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দেব-দেবীর প্রতিমা বিসর্জন করে আসছেন। সুদূর অতীত থেকে এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। স্মরণ করা যেতে পারে, এই ঘাটের মাধ্যমেই তখন ফেরী নৌকা দিয়ে দূর দূরান্তের মানুষজন যাতায়াত করতেন। কারণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন উন্নত ছিলো না।
আলী আমজাদের ঘড়ি আর চাঁদনীঘাটের সিঁড়ির সঙ্গে যে নামটি উচ্চারিত হতো তখন সেটা হলো ‘বংকু বাবু’। মানে ‘বংকু বাবুর দাড়ি’। তখন শহরে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন গায়ক ছিলেন এই বংকু বাবু। তার মুখের গোঁফ দাড়ি ছিলো অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। যা যে কারও দৃষ্টি কাড়তো। তখনকার এক ব্রিটিশ প্রশাসক তার দাড়ি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন এবং এর প্রশংসা করেন। বিভিন্ন স্থান থেকে আগত পর্যটকেরা অন্যান্য দর্শনীয় বস্তুর মতো বংকু বাবুর দাড়িও একনজর দেখার ইচ্ছা পোষণ করতেন।
আমি দীর্ঘদিন ধরে কাঠ খোদাই করে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা, বস্তু ও ব্যক্তির প্রতিকৃতি তৈরি করে আসছি। আলী আমজাদের ঘড়ি, চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি এবং বংকু বাবুর দাড়ির ভাস্কর্যও তৈরি করেছি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT