পাঁচ মিশালী

আমার দেখা আরব আমিরাত

চৌধুরী ইসফাক আহমদ কোরেশী প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৯-২০১৮ ইং ০০:১৬:২৬ | সংবাদটি ২৩২ বার পঠিত

হোটেল হতে রাত ৮ টায় বেরিয়ে রাতের জুমায়রা বিচের রূপসুধা পান করতে ছুটলাম। বিচটির দূরত্ব মাত্র চারপাঁচ মিনিটের হাঁটার রাস্তা। বিশ্বের সেরা স্থপতিরা হয়ত জুমায়রা বিচদুটি সৈকতের সুসজ্জিত উপশহরসহ ডিজাইন করেছেন। দুইটি জুমায়রা বিচের মধ্যখানে মানব সৃষ্ট একটি ছোট উপদ্বীপ, দুটি বিচের অন্য দু’দিকে পাথরের জমাটবদ্ধ বাঁধে পারস্য উপসাগরের ঢেউমালা আঁচড়ে পড়ে আর প্রবলশক্তি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। প্রতিটি খানিক বৃত্তাকার বিচের স্বচ্ছ বালির বেলাভূমির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার। বিচপারের উপশহর রাতে এক রঙ্গীন স্বর্গরাজ্যের রূপ ধারণ করে। এই দুই জুমায়রা সৈকত যেন অপূর্ব সুন্দর ঘুঙ্গুর হয়ে সেজে আছে পারশ্য উপসাগর নামক কোন এক অপরুপা রমণীর রাঙ্গা দুটি পায়। স্তরে স্তরে সাজানো রাস্তামালা, রাস্তার উপর জুড়ে মশারির মত বর্নিল লাইটের জাল রাতকে যেন দিনের মত উদ্ভাসিত করে তুলে। দুই রাস্তার মাঝঘিরে পরিপাটি ফুলবাগ ও বৃক্ষসজ্জায় সুসজ্জিত বার, সপিং মল, রেস্তরাঁ, ব্যায়ামাগার, গেইম স্পট, নানান দেশের খাবার হোটেল, এমুজমেন্ট পার্ক, পোষাক গহনাসহ নানা পণ্য বিক্রয়কেন্দ্র ও পাঁচ তারকা অজস্র আবাসিক হোটেলের মিলন মেলা। খেজুর গাছ পেছিয়ে টপ পর্যন্ত সাজানো লাইটিং বেশ মনমুগ্ধকর। মৃদুমধুর মূর্ছনায় বাজছে হিন্দি, আরবী ও পশ্চিমা সঙ্গীতের সুর লহরী। বিচের আবছা আলোয় মৃদুমন্দ হাওয়ায় আমার দৈনন্দিন চল্লিশ মিনিটের হাঁটার পর্বটা সেরে নিলাম। সৈকতে অনেকক্ষণ আমরা তিনজন হাঁটাহাঁটি করে রাত ১১টায় রিসোর্টে ফিরে এলাম।
২৪ জুন ২০১৮ সাল। পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙ্গল। ডাঃ নুরজাহান ও জেফার তখনও ঘুমে আচ্ছন্ন। জানালায় পর্দা সরিয়ে বাইরে চোখ রাখলাম। পাশে চারটি সমউচ্চ খেজুরগাছ জানালার সমতলে হলুদ ফলে ছেয়ে আছে। এক একটি গাছে অন্ততঃ দুই মন করে খেজুর ফল ঝুলে আছে। এই খেজুর বৃক্ষদের খুঁটি করে ত্রিপলের ছাদ তৈরি করে নিচে একটি আরবী খাবারের হোটেল। ছাদের উপরে ফল ফুল পাতা মেলিয়ে চার খেজুরবৃক্ষ যেন ফ্যাশন শোর মডেলদের মত নিজের সব রূপ সৌন্দর্য্য উজাড় করে তুলে ধরেছে। এই খেজুর গাছে অনেক পায়ুলাল বুলবুলি, চড়ই, ঘুঘু, ময়না ইত্যাদি পাখিরা ফল খেয়ে খেয়ে কিচির মিচির করছে। কিছু পাখি রস মুখে করে নিয়ে মাতৃস্নেহে বাচ্ছাদের মুখে ঢেলে দিচ্ছে। মনে পড়ল শৈশবের একটি ছড়া-“বুলবুলি গো বুলবুলি, তোমার পায়ু কেন লাল? আল্লায় বানিয়ে দিছেন, গুয়া খাওয়ার গাল।”
রিসোর্টের রিসিপশন হতে তিনদিনের ব্রেকফাস্টের টোকেন এবং তাদের ইন্টারনেট লাইন ব্যবহারের পাশওয়ার্ড পেলাম। টোকেন নিয়ে সকাল ৮টায় রিসোর্ট সংলগ্ন আলীবাবা রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করি। বুফে খাবার পদ্ধতি, আইটেমের পর আইটেম খাবার তাকে তাকে সাজানো। রান্না ব্লাঙ্কেটের নিচে বার্নার লেম্পে আগুন জ্বলছে। সব খাবারই গরম ও সুস্বাদু। মেশিনে টিপ দিলেই আঙ্গুর, আপেল, আনারস, কমলা ও আপেল জুসে গ্লাস ভরে যায়। পরের টেবিলে চা, কফি, গ্রীন টি, গরম জল, দুধ, কনপ্লেক্স, চিড়ে, কুকারিজ ও উইটাবিচ। পরের টেবিলে এক গামলা ভরা কুচি কুচি নানান ফলের মিশ্রন, একটি পাত্রে কালো ভারতীয় মিষ্টি যা প্লেটে নিয়ে দেখলাম আসলে মিষ্টি নয় একধরনের উন্নত বিচিবিহীন নরম সুস্বাদু খেজুর। পাশে লাল গম ও চালের লোফ। মেশিনে রাখলেই গরম হয়ে বেরিয়ে আসে। কাছে রাখা পনীর, মাখন, জেলি ও সিদ্ধ ডিম। সব শেষে চার ব্লাঙ্কেট ভরা গরম পোলাও, ঝালফ্রাই, চোউমিন, মাটন, পরটা, মাংসের সমুচা, চিংড়ি, বিফ, সবজি, ডাল ইত্যাদি। কিছু আইটেম খাওয়ার পর উদর পূর্ণ হয়ে যায়, বাকী সব আইটেম কেবল চোখে দেখে আসতে হয় মাত্র।
আজকের দিনটি আমরা দোবাই মহানগর ঘুরে দেখার জন্য বরাদ্দ রাখি। ব্রেকফাস্টের পর একটু সীবিচ ঘুরে শহর ভ্রমণে বের হলাম। কোন বাংলাদেশী ট্যাক্সিক্যাব খুঁজে না পেয়ে এবার পড়লাম আরেক পাকিস্তানী চালকের ঘাড়ে। এই ড্রাইভারের নাম সালমান, বাড়ি পাকিস্তানের পাঞ্জাব। তিনি ভাল উর্দু ও হিন্দি জানেন। বিদেশীদের সাথে কথা চালিয়ে যাবার মত তার যথেষ্ট ইংরেজী জ্ঞানও রয়েছে। ইন্টারনেট হতে দোবাইয়ের ভিজিট স্পটগুলোর তালিকা বের করে সালমানের হাতে দেই। একে একে স্পটগুলোতে নিয়ে গিয়ে ড্রাইভার সালমান এগোলার বিবরণ দেন। তিনি আমাদেরকে ছবি উঠাতেও সহায়তা করেন। তিনি প্রথমে ডাউন টাউনে আমিরাতের সেরা নির্মাণ কোম্পানী আমায়ার বিল্ডিং কন্সট্রাকশন এর অনেকগুলো বহুতল ভবনের অফিসরাজ্যে নিয়ে যান।
তারপর নিয়ে যান বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুরুজ আল খলিফায়, যার উচ্চতা ৮২৮ মিটার। এর চারপাশে বাগান ও কয়েকটি ফোয়ারায় জলের ছন্দময় উদ্দাম নৃত্য বইছে। মৃদু জলের শব্দের ঝংকারের সাথে জলকণা ভেসে যাচ্ছে। বুরুজ আল খলিফার অর্ধেকে উঠার আরোহন ফি ২৫০ দিরহাম ও চুড়ায় আরোহণ করতে হলে ৫০০ দিরহাম গুনতে হবে। লাইনে দাড়িয়ে টিকেট সংগ্রহ করে চূড়ায় উঠতে গেলে দিন শেষ হয়ে যাবে, আমাদের হাতে এত সময় নেই। তাছাড়া ইতিপূর্বে বিশ্বের অনেক সুউচ্চ ভবনে আমার উঠা হয়ে গেছে। তারপর বুরুজ আল আরব যাই।
দোবাই ওয়াটার পার্ক পার হয়ে অভিজাত এলাকা ডেরা দোবাই চলে আসি। দোবাইয়ের আমিরের বাড়ি দেখা হল। এখানে ধনী আরব শেখদের বড় বড় বাগান বাড়ি। প্রতিটি বাড়ি কয়েক একর জায়গা দখল করে আছে। বাড়িগুলোর সামনে বড় রাস্তা ও পিছনে পারশ্য উপসাগরের বায়ু ও ঢেউ। গেটে রয়েছে সশস্ত্র পুলিশ প্রহরা।
এবার গাড়ি আমাদেরকে নিয়ে ছুটল পাম আইল্যান্ড বা খেজুরগাছ দ্বীপে। খেজুরগাছ দ্বীপপুঞ্জ পারশ্য উপসাগরে আমিরাত সরকারের তৈরি একটি ছোট ছোট দ্বীপের কৃত্রিম সজ্জা যা সাগরে একটি খেজুরবৃক্ষ আকৃতির দ্বীপসমষ্টি তৈরী করেছে। কোটি কোটি পেট্রো ডলার ঢেলে হাজার হাজার কর্মি, নির্মাণ শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ারগণ বিশ্বের সেরা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বেশ কয়েক বৎসরে এই পাম আইল্যান্ড নির্মাণ করেন। রিকেইভিং মেশিনে সমুদ্র খনন করে পাহাড়ের পাথর কেটে ফেলে পানির নিচে বিশেষ প্রযুক্তিতে জমাট বাধান হয়। পাথরের বড় বড় খন্ড জমাট বাধিয়ে শক্ত ড্যাম তৈরি করে মরুভূমির বালু দিয়ে ভরাট করে দ্বীপগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। খেজুর পত্রাকার দ্বীপগুলোকে পরিবেষ্টন করে আর কিছু লম্বা বৃত্তাকারের দ্বীপের মালা চারপাশ পেছিয়ে আছে।
পাম আইল্যান্ড জুড়ে রয়েছে অসংখ্য নয়নাভিরাম অট্টালিকা। এসব অট্টালিকায় ফ্ল্যাট কিনে ধন্য হন বিশ্বের নামী দামী অভিনেতা, ব্যবসায়ী, কোম্পেনী সি ই ও, রাজনীতিবিদ ও বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। এখানে একটি ছোট্ট দ্বীপের মালিক বলিউড বাদশা শাহরুখ খান। এই দ্বীপে তিনি গড়ে তুলেছেন সুরম্য বাগান বাড়ি। এই পাম আইল্যান্ডে আছে উন্নত রিসোর্ট, বহুস্টার রেস্টিন হোটেল, বিখ্যাত আটলান্টাস হোটেল, মিডিয়া সিটি ও মেরিনা মল। এখানে পাথরের বাঁধে যে বিশাল কৃত্রিম পাম সী বিচ তৈরী করা হয়েছে তার কোন তুলনা হয়না। এই বিচে ঢেউয়ের কাছে আমরা ছবি তুলি। দূরের জাহাজে, গগনে বিমান ও হ্যালিকপ্টারে পর্যটকেরা ঘুরাফেরা করছেন। মেরিনা মলের কাছে একটি ওপেন বিচ ক্লাবে যাই। ক্লাবটির নাম বারাস্তি। এটি পশ্চিমা সংস্কৃতির আদলে পরিচালিত একটি অভিজাত ক্লাব। এই পাম সী বিচে একজন আমেরিকান কালো বিদঘুটে চেহারার নিগ্রো ভদ্রলোক তার অনিন্দ্য সুন্দরী অর্ধনগ্ন শ্বেতাঙ্গিনী পতœীকে নিয়ে ফটো তুলছেন, আর আমাদের পাকিস্তানী যুবক চালক সালমান কালো চশমার ফাঁক দিয়ে অবাক হয়ে দেখছেন। এযে দুধে আলকাতরায় মাখামাখি।
এবার ড্রাইভার সালমান দূরের আউটলেট ভিলেজে। শহর হতে অনের দূরে মরুর বুকে গাঢ় শ্যামল বৃক্ষ লতা পাতা ঘেরা এক অনন্য পর্যটন শহর এই আউটলেট ভিলেজ। কুসুম কানন, ফাঁকে ফাঁকে হোটেল, বার, রিসোর্টের মেলা। সুইমিংপুল এই গরম মরুদেশে পরম আদর ও বিলাসের বস্তু। এখানে মাটির নিচ দিয়ে নল বসিয়ে বৃক্ষের মূলে পানি সরবরাহ করা হয়। আউটলেট ভিলেজ আমাদের প্রাকৃতিক গ্রামের মত এক অপূর্ব গ্রাম, যা কোটি কোটি ডলার খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে স্থাপিত দুটি ঘোড়ার ভাস্কর্যের সামনে ফটো উঠাই।
পথে আল এলিসাইট বিল্ডিং দেখলাম। এখানে নিচে মল ও উপরে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র। ইবনে বতুতা মল বেশ বড় বাণিজ্য কেন্দ্র। দোবাইয়ের লুলু মার্কেটে সস্তায় ভাল পণ্য বিক্রি হয়, এ যেন আমাদের হাসান মার্কেট। উন্নত এই দেশে প্রায় নির্মাণকাজ এত শক্তভাবে করা হয় যে কয়েক যুগ আর সেখানে কাজের দরকার হয়না। খরচটা বড় হয় এবং একবারই হয়। কিন্তু আমাদের দেশে হয় উল্টো, এখানে অল্প বাজেটে দায়সাড়া গোছের নির্মাণ কাজ হয়, প্রতি বছর নষ্ট হয়ে যায়। বছর বছর টাকা ঢালতে হয়। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিচের কথা মনে হল, সেখানে প্রতি বছর পাথরের ব্লক বসান হয় ও প্রতি বছর ভেঙ্গে সাগরে তলিয়ে যায়। অথচ দোবাইয়ে কৃত্রিম দ্বীপ ও উপসাগরে যে শক্ত বাঁধ নির্মিত হয়েছে তা শতবর্ষেও কিছু হবেনা। এ যেন এক স্থায়ী বিনিয়োগ।
চালক সালমান বললেন ডিসেম্বর হতে ফেব্রুয়ারী এদেশে পর্যটনের উপযুক্ত সময়। তখন এখানে আবহাওয়া এত গরম থাকেনা। এই সময় ইউরোপের শীতপ্রধান ধনী দেশসমূহে বরফ পড়ে, তাই ঠান্ডা এড়াতে এসব দেশের লোকজন দোবাই এসে ভীড় জমান। দোবাইয়ের সাগরপারের বীচসমূহ বিদেশীদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠে। হোটেল রেস্তরাঁ ও শপিং মলে গিজগিজ করেন বিদেশী ক্রেতারা। সালমান বললেন বোম্বের মাফিয়া ডন ভারতের মোষ্ট ওয়ান্টেড আসামী দাউদ ইব্রাহীম ডোবাইয়ে সংগোপনে বসবাস করেন। তিনি এখানকার রাজপরিবারের বন্ধু ও ব্যবসা পার্টনার। তিনি এখানকার একজন টাকার খনি, এখানে কেঊ তাকে ধরার ক্ষমতা রাখেনা। সারাদিন দোবাই ঘুরে সালমানকে ৩০০ দিরহাম ভাড়া পরিশোধ করি। আমি লিখি জানতে পেরে যাবার বেলা ড্রাইভার সালমান বললেন- আমার কথা স্মরণ রাখবেন, আমার কথা লিখবেন। আমি কথা দিলাম আমার একদিনের পাকিস্তানী বন্ধুকে অবশ্যই মনে রাখব। রিজেন্ট বীচ রিসোর্টে কিছুক্ষণ ঘুম দিয়ে বিকেলে জুমাইরা বীচে চলে যাই। এখানে আবহাওয়া গরম কিন্তু অনাদ্র। চারপাশে এলোমেলো বাতাস, ঘামহীন শুষ্ক শরীরে গরম তেমন বিরক্তিকর নয়। বরং বাতাস ও ঢেউ মনে তৈরি করে আনন্দের বন্যা। রাতে হেঁটে হেঁটে চলে যাই ইন্ডিয়ান নওয়াব হোটেলে। চিকেন রাইস, ফিস রাইস, কোক, টক দই, সালাদ ও সস খেয়ে ৮৬ দিরহাম বিল পরিশোধ করে ফিরে আসি রাতের ঠিকানায়। (চলবে)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT