পাঁচ মিশালী

বজ্রপাতের রহস্য ও পরিত্রাণের খোঁজে

সৈয়দ সামসির হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৯-২০১৮ ইং ০০:১৭:৩১ | সংবাদটি ১১৫ বার পঠিত

বজ্রপাত কেন ঘটে এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে বিশ্বব্যাপী অনেক গবেষণা হচ্ছে। অনেকেই তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল কিংবা সতর্কীকরণবার্তা তুলে ধরেছেন। এ বছরের ৩১ মে ভারতের ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই বিষয়ে সমীক্ষাটির মূল প্রতিবেদক ছিলেন উপল সেন। তার প্রতিবেদন থেকে সংকলিত :
গত সপ্তাহে ভারতের পাঁচটি প্রদেশে বজ্রপাত ও বিজলির প্রভাবে কমপক্ষে সত্তর জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেশ, উত্তরখ- এবং দিল্লিতে এসব ঘটনা ঘটে। গত মাসে অন্ধ্র প্রদেশের একটি বহুল প্রকাশিত পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল যে, মাত্র ১৩ ঘণ্টার মধ্যে ছোট-বড় রকমের ৩৬,৭৪৯টি বজ্রপাত আঘাত হানে, যা সর্বকালের ভয়াবহ রেকর্ড। যা কিনা সারা মাসের মধ্যে অতিরিক্ত পরিমাণে ছিল। এ সম্পর্কেও এখানে তুলে ধরা হলো।
এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা পুরো মে মাস জুড়ে হয়ে থাকে। এপ্রিল ও জুনে যে পরিমাণ বজ্রপাত হয় সেগুলোর যোগফলের সমান বজ্রপাত শুধু মে মাসেই ঘটে থাকে। সম্প্রতি স্থানীয় বিশেষজ্ঞগণ বজ্রপাত সনাক্ত ও কারণ আবিস্কারের লক্ষ্যে দেশের বাইরেও নাসায় গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাতের স্বরূপ উদ্ঘাটন নিরূপণের লক্ষ্যে উপগ্রহের সাহায্য নিয়ে গবেষণা এগিয়ে নিচ্ছেন। গবেষণায় অনেকটা প্রমাণিত হয়ে আসছে যে, বজ্রপাত পৃথিবীতে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০১৫ সালে শ্রী ওমবীড় সিং এবং জগদ্বীপ সিং ক্রুকি সিটরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতের সংবাদপত্রে প্রকাশিত ‘সারা ভারতে প্রজ্বলিত মৃত্যুর উপাখ্যান ১৯৭৮ থেকে ২০১১ পর্যন্ত’ প্রতিবেদনে সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার ক্রমাগত ও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন। যা কিনা সময় ও বৈচিত্র্যময় আন্তঃবাৎসরিক জলবায়ুর কারণেই ঘটছে। এক বছরের মধ্যেই ১৫৯ জনের মৃত্যু সত্যিই উদ্বেগজনক ।
বজ্রপাত নিয়ে পৌরাণিক কিছু ব্যাখ্যা বা মত পাওয়া যায়:
ভারতের পুরোনো শাস্ত্রবিদদের মতে এই বজ্রপাত দেবতাদের একটি অস্ত্র বজ্র। গ্রিক পুরোনো শাস্ত্রবিদদের মতে, এটি দেবতাদের রাজা সাইকলপসের একটি অস্ত্র যা দেবতাদের দ্বারা যিশুকে প্রদান করা হয় যেটির সম্মুখে একটি চোখ রয়েছে। চীনের পুরোনো শাস্ত্রবিদ ও ধর্মমতে, এটি দেবতা লি গংয়ের একটি বিদ্যুৎচমক অস্ত্র এবং তার স্ত্রী টাইন মোর সৃষ্টিকরা প্রজ্জ্বলিত ঝলক তার আয়নার সঙ্গী।
বাস্তবিক অর্থে বজ্রপাত আসলে কি?
এমআইটি গবেষক ও বৈজ্ঞানিক ইয়ার্ণ আর উইলিয়াম যিনি কিনা দীর্ঘসময় বিশ্বব্যাপী বজ্রপাতের ভয়াবহ কর্মকা-ের বিষয়ে গভীর গবেষণায় অধ্যয়নরত ছিলেন। তার মতে, বিজলি থেকে এমন বিদ্যুৎ নির্গমন হয় যে, অতি দ্রুত মুহূর্তের মধ্যেই বজ্র ও ঝড় বৃষ্টির আবির্ভাব হয়। এগুলো দৃশ্যত, চাক্ষুষ উদ্ভাসিত অবস্থার মধ্যে আকাশে জোরালো শব্দ সৃষ্টি করে থাকে। বজ্রপাত তখনই সংগঠিত হয় যখন আকাশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন হয়ে থাকে। স্থির ও পুঞ্জীভূত শীতল ও গভীর জমানো মেঘ থেকে বৃষ্টির ফোটা বরফ স্ফটিকের সাথে প্রচ-ভাবে ধাক্কা খায়। এভাবে বড় রকমের ধাক্কা সংগঠিত হলে তখনই ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ সঞ্চালিত হয়ে থাকে এবং বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুম-ল বিজ্ঞানী শ্রী সৃপ্তা চৌধুরী তার অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, যে দিক থেকে মেঘ তীব্র বিদ্যুৎগতি আক্রমণ স্ফীত হয় তখনই তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খ-কণা পৃথিবীর পৃষ্ঠতলে চাপ প্রয়োগ করে। ভূপৃষ্ঠের একই কেন্দ্রবিন্দুতে বায়ুম-লে ক্ষুদ্রকণা তীব্রতায় সঞ্চালিত হয়। সংগতভাবেই তা ভীষণ গতিসম্পন্ন হয়ে থাকে। ঠিক তখনই উভয়ই বিপরীত মুখে একত্রিত হয়। এইভাবে বিদ্যুৎ বর্তনী ভূপৃষ্ঠে থেকে উপরে উঠতে থাকে যা আলোর গতির ৩ তিনগুন বেশি। এইভাবে মুহূর্তক্ষণে বজ্রপাত আকাশ পথে বর্শা আকারে দেখা যায়।

যেমনটি দুই যুদ্ধক্ষেত্রে দল সেনা প্রচন্ড গতিতে একে অপরের সাথে মুখোমুখি হওয়ার পর ঘাত-প্রতিঘাতে তাদের অস্ত্র ঝনঝন করে উঠে এবং পরে ঘন ধুলোর কারণে তারা নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। একইভাবে হুড়মুড় শব্দে বজ্রধ্বনি উৎসারিত এবং বজ্রপাত হয়ে থাকে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা ক্রমাগত বজ্রঝড় ও প্রজ্জ্বলিত ঝলক এ বিষয়ে কলকাতার উপর গবেষণা করেন। বিভিন্ন জার্নাল ও দৈনিকে বায়ুদূষণ ও বজ্রপাতের সংশ্লিষ্টতা চিহ্নিত করে পর্যালোচনা ও গবেষণা করেন। গবেষণা থেকে তারা উপস্থাপন করেন যে, স্থির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা এবং স্থিরকৃত গভীর বরফের মাঝে কোনো না কোনোভাবে দৃঢ় সম্পর্ক আছে। যাতে বজ্রপাতের মাত্রা নির্ভর করে ও বিজলি বিচ্ছুরিত হয়ে থাকে।
বজ্রপাত সংগঠিত হওয়ার পর ক্ষুদ্র কঠিন টুকরো যেগুলি বায়ুমন্ডলে বিচ্ছরিত হয়ে যায়, যা ধুলিকণা এবং কালো মেঘের মত দেখায়। সেগুলি মূলত যানবাহনের ধোয়া, রাসায়নিক প্রক্রিয়া, শিল্প কারখানার নির্যাস বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সূত্র থেকে পর্যবসিত হয়ে থাকে। স্থগিত ও সংকুচিত বরফের গ্যাস মসৃণ ও ঘন আকারে যুক্ত ক্ষুদ্রকণিকা যা বায়ুমন্ডলে তরল আকারে থাকে এবং অন্যান্য পদার্থ স্থির অবস্থায় থাকে। কলকাতা শহরের ধারণ ক্ষমতার বাইরেও বাতাসে ক্ষুদ্রকণিকা বস্তু রয়েছে যার ফলে মানুষ অধিকহারে শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গবেষকদের মতে, বায়ুদূষণের প্রভাব জলবায়ু ও বায়ুমন্ডলে বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বজ্রপাত পরিবেশের প্রতিকূলে প্রভাব সৃষ্টি হয়ে থাকে। নাইট্রোজেন অক্সাইড সৃষ্টির ফলে বায়ুমন্ডলে বজ্র প্রজ্বলিত হয়। যার আলোতে প্রতিক্রিয়া ঘণীভূত হয়ে পৃষ্ঠতলে সূর্যালোকের অস্তিত্ব প্রমাণ করে এবং তখনই বায়ুমন্ডলে অত্যন্ত আকাক্সিক্ষতভাবে জমা হয়ে থাকে ।
আমরা বরাবরই বজ্রপাতের জন্য মেঘের কথা বলে থাকি, কিন্তু মেঘ ছাড়াও বজ্রপাতের আশংকা কমানো যাবে না। বায়ুমন্ডলের স্তর আমাদের সবচেয়ে কাছে। আমাদের আবাসিক এলাকায় ধোয়া ও কুয়াশার মিশ্রণই এর প্রধান উপাদান। ফলে শ্বসনতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হওয়াটা মেনে নেয়া আর বজ্রপাতের প্রভাব শুধুই সহ্য করা ছাড়া কিছু করার নেই।
এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণের আলোকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পরিবেশ বৈজ্ঞানিক অধ্যাপক ড. এম. এ ফারুক গত ১৯ জুলাই ২০১৮ সিলেটের একটি স্থানীয় দৈনিকে এই দুর্যোগের সম্ভাব্য বাস্তবিক কারণ, প্রতিকারের উপায় এবং দ্রুত বাস্তবায়নের আলোকপাত করেন যা স্যারের অনুমতি নিয়ে উল্লিখিত কিছু বিষয়ে গবেষণার উপাত্ত এখানে বিশেষ প্রয়োজনে সূত্রগুলো তুলে ধরতে চাই।
তিনি উল্লেখ করেছেন, গত ০৬ মে ২০১৮ একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ২০১৬ সালের বজ্রপাতে ২৫০ জনের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবৃতি দিয়েছে। বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানো ও প্রাণহানি রোধে বিশ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা হয়েছে বজ্রপাত সনাক্তকরণ সেন্সর যা চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, সিলেট, পটুয়াখালী, নওগাঁয় বসানো হয়েছে। এই সেন্সর দ্বারা কোথায় বজ্রপাত হচ্ছে বা হবে মেঘ থেকে মাটিতে আঘাত করা বজ্রপাতের সংখ্যা মেঘের স্ট্যাটিক চার্জ ইত্যাদি জানা সম্ভব।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত পহেলা মে প্রেস ব্রিফিংয়ে সারাদেশে ৩২ লক্ষ তাল বীজ রোপন করেন যা পরিণত সময় হতে ২০ থেকে ২২ বছর সময় নিবে। এই অবস্থায় গাছগুলো বেড়ে ওঠতে এবং বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাসের উপযোগী হতে একটি তালগাছের দীর্ঘসময় প্রয়োজন হবে। সেই সময়ে অর্থাৎ সেন্সর বা রাডার পূর্বাভাসে প্রশিক্ষিত দক্ষ ও কার্যকরী একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠার মধ্যবর্তী সময়ে বজ্রপাতে আরো অনেক মানুষের প্রাণঘাতের আশংকা বেড়ে যাবে।
তাই প্রয়োজনে সুলভ, স্বল্পসময় ও সহজে স্থাপন প্রতিস্থাপন কিংবা পুনস্থাপনযোগ্য প্রযুক্তি যা কৃষক ও সাধারণ মানুষ নিজেই ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আমাদের জন্য অনেক গবেষণার দুয়ার খুলে দেবে আশা করা যায়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT