সাহিত্য

জোনাকির আলোয় আঁধারের মুখ

লতিফ জোয়াদার্র প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৯-২০১৮ ইং ০০:২৯:৩০ | সংবাদটি ১৬৮ বার পঠিত

বাংলা সাহিত্যের সেরা উপন্যাসের তালিকা কত দীঘর্, তার মধ্যে এপার বাংলার কোন কোন উপন্যাস আছে আমি সে দিকে যেতে না চাইলেও সৈয়দ শামসুল হক তার “খেলারাম খেলে যা” আমাকে বিমহিত করে নিয়ে যায়, নির্ধারিত সে তালিকার ভেতর। উপন্যাসটি শুরু বারর আলীর ময়মনসিংহ শহরে কাজী সাহেবের বাড়িতে বেড়াতে আসাকে কেন্দ্র করে। ধীরে ধীরে উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র বারর তার মানসিক বিকারগ্রস্ত এক পরিণত যুবক কীভাবে অধপতনের চরম শিখায় পৌঁছে তার চিত্র আঁকতে গিয়ে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে রাজনৈতিক উপন্যাসে রূপ লাভ করে, তার এক দুর্দান্ত দলিল তৈরি করেছেন এ লেখনীর মাধ্যমে সৈয়দ শামসুল হক। আমি কেন আমাদের পাঠক সমাজ “খেলারাম খেলে যা” উপন্যাসকে পর্নোগ্রাফি মনে করে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, পুরো উপন্যাসটির পাঠ প্রক্রিয়া শেষে সে ভ্রান্ত ধারণা দূরে সরিয়ে বাবরের জন্য চোখ ভিজিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে সেই তারাই একদিন।
কৈশোর পেরিয়ে যাওয়া লতিফার যৌবনের সূচনা লগ্নে, সর্বনাশ দিয়ে যে কামক্রিয়ার শুরু হয় বাবরের। একে একে চোখের পর্দায় আরও অসংখ্য মেয়ের ছবি ভাসতে থাকে, কখনো কখনো নিশ্চুপ বসে থাকা বাবরের মনে। এরপর বাবলীকে শয্যাগত করতে যাওয়া। মূলত এক লম্পটের অসংখ্য নারীর কাছে যাওয়া নিয়ে লেখক যেভাবে এগিয়ে যেতে যেতে তার ভেতরের মানুষের নড়ে ওঠার আলেখ্য এই “খেলা রাম খেলে যা” সৃষ্টি করেছেন তা আমার ভেতর বাহির ছাড়িয়ে আমাকে মোহগ্রস্ত করে রাখে।
কীভাবে এ পথের পথিক তার কথা বলতে গেলে প্রথমেই কয়েকটি বাক্য মনে পড়ে যায়। এভাবে যার শুরু
এয়ারপোর্টের বাথরুমে একদিন দেখে কে যেন রঙ পেনসিল দিয়ে লিখে রেখেছে বড় হরফে “খেলা রাম খেলে যা”। ...বাক্যটি আজ পর্যন্ত ভুলতে পারেনি বাবর। যে লিখেছে সে জগৎ জেনে। যে লিখেছে সে নিজে প্রতারিত। পৃথিবী সম্পর্কে তার একটি মাত্র মন্তব্য বাথরুমের দেওয়ালে সে উৎকীর্ণ করে রেখেছে “খেলারাম খেলে যা”
বাবরের জীবন দর্শনজুড়ে কী কেবলি লাম্পট্য! নাকি কোনো জোনাকির আলোয় আঁধারের মুখ। আমার পুড়ো উপন্যাস পড়ে যা মনে হয়েছে, লেখক আমাদের প্রত্যেকের ভেততের পশু মানুষটার কথা বলতে গিয়ে বাবর আলীকে সামনে নিয়ে এসেছেন। কিন্ত আমাদের সেই চেনাজানা পরিবেশের ভেতরও যে কষ্টের কালিমা লেপন করা থাকে তার কতটাই জানি আমরা। কখনো কখনো বাবর আলীকে বড় অচেনা মনে হতে পারে। মনে হতে পারে কোন দূর সুদূরে পরবাসী এই বাবর। যখন তার ভেতর এসে শৈশব বাসা বাঁধে। তার সামনে প্রতীক হয়ে আসে “জোনাক জ্বলা বন আর কাজলা দিদি” এ যেন আমাদের প্রতিটি মানুষের বিমূতর্ ছবি। এই উপন্যাসের একটা বড় অংশজুড়ে আছে জাহেদা। একটা সজল স্নিগ্ধ মেয়ে। যার কথা এখানে এভাবে এসেছে...
দরজা ঠেলে দেখলো জাহেদা আরাম করে চেয়ারে বসে আছে পিঠ সোজা করে। একদিকে একটু পাশ ফিরে। গোলাপি আর গাঢ় সবুজে আঁকা একটা ছবির মতো। গোলাপি পাজামা পড়েছে। পায়ে সবুজ ফিতের চটি। গাঢ় সবুজ কামিজ, পিঠে বোতাম বসান। ঠোঁটে গোলাপি রঙের আবস বার্নিসের মতো উজ্জ্বল। কপালের মাঝখানে গোলাপি টিপ।
জাহেদার বর্ণনায় আমাদের সমাজের আধুনিকতার বিন্যাস চোখে পড়ার মতো। সবমিলে এই লতিফা বাবলি জাহেদাসহ আরও অনেকেই, যারা বাবর আলীর খেলে যাওয়া মাঠ নাকি অন্য কিছু, যা আমাদের সবচোখ ফাঁকি দিয়ে বিকৃত এক লালসার চিত্র একে যায়।
কিন্তু আমরা যদি ধীরে ধীরে উপন্যাসের পাতার পর পাতা ধরে এগিয়ে যেতে থাকি এক সময় আমাদের থমকে দাঁড় করিয়ে দেয় বাবরের সেই কৈশোর বয়সের স্মৃতির পৃষ্ঠায় যার নাম লেখা আছে, সে হলো বাবরের ছোটবোন হাসনু। সবকিছু ছাপিয়ে যে একটা দগদগে ঘা হয়ে আছে বাবরের বুকে, সেই ঘায়ের নাম হাসনু। ‘ পোকায় খাওয়া দাঁত ’ নিয়ে যে সরল কিশোরী সেজে হাজির হয় বাবরের কাছে। আর সে সময় সব এলোমেলো হয়ে যায়। নিজেই ভেঙে ফেলে নিজেকে।
বাস্তবিক এ উপন্যাসজুড়ে যে বাক বদলের খেলা বিদ্যমান। তার ধারে কাছে যেতে আমাদের কিছুটা সময় লাগে বৈকি। নিত্যদিন যে চেনাজানা পরিবেশের ভেতর দিয়ে বড় হতে হতে একদিন কী করে সে পরিবেশে ছেড়ে আকাশ বাতাস মাটি ছেড়ে শুধু রাজনৈতিক কারণে মায়ের বুক দিখ-িত করে, দূরে পালাতে গিয়ে শেকড় ছাড়া গাছ হয়ে যায় বাবর। রাজনীতি আমাদের দু-বাংলার দিখ-ন করে শুধু খান্ত হয়নি। একটা জাতিকে ভেঙে পুরোমাত্রায় বিভক্ত করেছে। বাবর চেয়ে দেখে তার মা বাবার কবর সেই শৈশবে পড়ে আছে। সা¤প্রদায়িক বিষবাষ্প শুধু আমাদের এমন ভাবে ভেঙে টুকরো করেছে যে আমরা কাঁটাতারের বেড়ার জালে বন্দি হয়ে আছি। একদিকে বাবর যেমন এ দেশ এ মাটিকে আপন করে নিতে পারেনি। তার ভাবনায় এখনো উ›মাদের মতো পড়ে আছে ছেলেবেলা। যে জন্মভূমির শিশির সিক্ত ঘাসের ডগায় কত কথা পড়ে আছে। কত স্মৃতি দুলে ওঠে। আর যে হাসনুকে ছেড়ে, যে হাসনুকে পশুদের হাতে তুলে দিয়ে পলাতক বাবর একবিন্দু শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেনি। সে স্মৃতি এখনো অপরাধীর মতো বুকের মধ্যে লালন করে নিত্যদিন। সবকিছু ছাপিয়ে হাসনু হয়ে যায় এক নক্ষত্র। সেই হাসনু এখনো পিছু ডাকে...চিৎকার ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে ডাকতে থাকেÑ দাদা আমাকে বাঁচাও। এখনো হাসনুর চিৎকার আকাশে বাতাসে, এখনো হাসনু কড়ানাড়ে বিবেকের কাছে।
বাবরের চারদিকে যে গুমোট অন্ধকার সে অন্ধকারে এক মুঠো আলো হাসনু। যতই লম্পট বিকৃত কামুক হয়ে উঠুক না বাবর। তার প্রতি পাঠক শেষ পযর্ন্ত একটুও নির্দয় হতে পারে না এ উপন্যাসের শেষ প্রান্তে এসে। পাঠক ভাবনার মধ্যে আলো ছড়াতে বাবরের শৈশব কেঁদে ওঠে। মনের অজান্তে সে বলে ওঠে Ñ
এখন আরো একা লাগল বাবরের। রক্তের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক তাদের কথা মনে পড়তেই এই বোধ বিরাট হয়ে উঠেছেÑ এখন তার চারপাশে এদেশে কেউ নেই। আপন কাকে বলে সে ভুলে গেছে বলেই যারা আপন তারা তাকে এমন একা করে যাচ্ছে। আমার কেউ নেই। কেউ নেই। কোনো কিছু আমার নয়। না মাটি, না মন, না মানুষ।
বাস্তবিক যতই শরীরী প্রেম মোহগ্রস্ত করুক না কেন! ভলোবাসাহীন প্রেম কখনো মানুষকে, মানুষ করে তোলে না। আসলে আমরা মুখে যতই বলি না কেন। প্রেম ভালোবাসার জন্য আমাদের সবার অন্তর কাঁদে না। কিন্তু একবার বুকে হাতদিয়ে ভেবে দেখুন ভালোবাসা ছাড়া আমরা কতটা সময় বেঁচে থাকতে পারবো। আর এ উপন্যাসে বাবরের ভালোবাসা তার শৈশব তার ছোট বোন হাসনু। যাকে পশুদের হাতে তুলে দেওয়ার ভুলে সে বিকারগ্রস্ত। সে নিজের অজান্তে নিজেকে নিঃশেষ করে চলেছে।
ছাহেদার শরীরী প্রেম কী করে বাবরের কাছে অদ্ভুত এক মানবী করে তুলে তা আমরা টের পাই, উত্তরবঙ্গ থেকে ফেরার পথে, যখন কয়েকজন লোক এসে তাদের গাড়িকে সন্ধ্যার অন্ধকারে ঘিরে ফেলে। চোখের পলকে জাহেদাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। প্রথমত বাবর শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কারণ সে জানে, জাহেদাকে কোন ভাবেই বিয়ে করা সম্ভব না।
জাহেদাকে ওরা নিয়ে যায় কোলের মধ্যে ছাগলের বাচ্ছার মতো। সমস্ত ঘটনা ঘটে মাত্র আধ মিনিট কিংবা তার কম সময়ে। চোখের পলক মাত্র। এর জন্যে তৈরি ছিল না বাবর। কিন্তু আশ্চর্য, তার কোনো দুঃখ হচ্ছে না, বরং মনে হচ্ছে এই দরকার ছিলো। মনে হচ্ছে, জাহেদার হাত থেকে সে এবার অতি সহজে বাঁচতে পারবে।
কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যে সব ওলোট পালোট হয়ে যায়। জাহেদার আর্তচিৎকার হাসনুর আর্তচিৎকার হয়ে বেঁজে ওঠে বাবরের হৃদয়ে। হঠাৎ করে জাহেদা বাবরের কাছে হাসনু বনে যায়। কোনকিছু না ভেবেই ঐ লোকদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে বাবর। ওদের চাকুর আঘাত খেয়েও উদ্ধার করে জাহেদাকে। জাহেদাকে উদ্ধার করে বাবর অবিকল জাহেদাকে হাসনু রূপে পেয়ে যায়। জাহেদাকে বলতে থাকেÑ
“সরে যা হাসু। পালিয়ে যা, পালা পালা! তোকে আমি বাঁচাব। ভয় নেই হাসু। তোকে আমি বাঁচব। অথবা বাবর স্বপ্নাবিষ্টের মতো বলে, হাসু তোকে আমি ফিরিয়ে এনেছি। আর ভয় নেই। বাড়ি এসে গেছি।
সবকিছু ছাপিয়ে এ উপন্যাসের শেষে যে চূড়ান্ত সত্য আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, তা হলো বাবরের মৃত্যু। যা কোনো পাঠকের কাছেই কাম্য ছিল না। কিন্তু মন না চাইলেও আমাদের সে সত্য মেনে না নিয়ে কোনো উপায় থাকে না। আর চূড়ান্ত বাঁক বদলের মধ্য দিয়ে পাঠক মাত্রই ভেজামন নিয়ে পেছনের সেই শরীর-তাড়িত পুরুষ বাবরকে ভুলে, নতুন এক বাবরকে সামনে নিয়ে এসে দাঁড় করায়। যার বুকের যন্ত্রণায় আমাদের দগ্ধ করে। না ফেরার এই যে কষ্ট আমাদের ভাবিয়ে তোলে, আমাদের দীঘর্ সময় আচ্ছন্ন করে রাখে। এই দুর্দান্ত সৃষ্টি ‘খেলারাম খেলে যা’।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT