সাহিত্য

সৈয়দ শামসুল হক : গল্পের জাদুকর

ফায়যুর রাহমান প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৯-২০১৮ ইং ০০:৩৩:৫১ | সংবাদটি ৮৮ বার পঠিত

সৈয়দ শামসুল হককে বলা হয় সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক। রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেবের পরে খুব কম লেখকই দীর্ঘ জীবনের শেষাবধি সৃষ্টিশীল রাজত্বের নিদর্শন রাখতে পেরেছেন। এই জায়গায় ব্যতিক্রম সৈয়দ শামসুল হক। আমরা তাঁকে ডাকি সব্যসাচী লেখক। তিনি একাধারে কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, সমালোচক ও গীতিকার। আজ তাঁর ছোটগল্পের কথাই বলবো।
বাংলা ছোটগল্পে সগৌরবে জ্বলে ওঠা ধ্রুবতারা তিনি। গল্পের বয়ান ও বুননে তিনি স্বকীয় আধুনিক মননের সঞ্চার করেন। যুগপৎ গ্রাম ও নগরের অন্তস্থ চিত্ত ও চিত্তচাঞ্চল্য ধরে রাখেন। তিনি জীবনকে দেখেছেন বোধের মগ্নতায়, মননের শস্যক্ষেতে, প্রেমের কল্পনায়, ঔজ্জ্বল্যে, বিবর্ণতায়, ধ্বংসে, যুদ্ধে, প্রতিরোধে, ভালোবাসায়, সংকটে এবং সামগ্রিক সত্যে। পনের বছর বয়সে প্রবোধকুমার সান্যালের ‘ক্ষয়’ নামক গল্পের আদলে লেখা তাঁর প্রথম গল্প ‘উদয়াস্ত’ প্রকাশিত হয়। ১৯৫১ সালে। ফজলে লোহনী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায়। যা স্বভাবতই উপহাসিত হয় লেখকসমাজে। তাঁর দ্বিতীয় গল্প ‘শেষের কবিতার পরের কবিতা’ বিজ্ঞজনের নজর কাড়তে ব্যর্থ হলে অশ্রুসজল তরুণ লেখকের কাঁধে সমবেদনার হাত রেখেছিলেন ফজলে লোহানীই। তাঁর সান্ত¡নাবাক্যে স্থিত হয়ে, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সৈয়দ হক এগিয়েছিলেন। নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণ করলেন মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে, গল্পে বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে। সেই লেখকই আজ তুঙ্গস্পর্শী ঈর্ষা সঞ্চারিত করেছেন অজস্র কথাকারের মানসপটে।
তাঁর গল্পে উঠে এসেছে সকল শ্রেণীপেশার মানুষের জীবনচিত্র। বয়ানের ঢং, বিষয় ও প্রকরণের বৈচিত্র্যে গল্পগুলো যেমন পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, তেমনি আলোচনা-সমালোচনাও হয়েছে বিস্তর। ভুলভাবে সমালোচিতও হয়েছে বারবার। তবুও তাঁর ছন্দময় গদ্যের আলপথে হেঁটে পাঠক যখন গল্পে প্রবেশ করে, তখনই তাঁর গল্প বলার গতি ও ভঙ্গির মায়ায় পড়ে যায়। আর সে মায়াময় পথে তিনি বাক্য থেকে বাক্যে গড়িয়ে নেন পাঠককে। ক্রিয়াপদের নিপুণ স্থাপনে পাঠককে দোলা দেন কখনো এখানে কখনো ওখানে।
সৈয়দ হকই আমাদের শিখিয়েছেন গল্পে ক্রিয়াপদের বিবিধ ব্যবহার। ক্রিয়াপদের নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালরূপ, সাধারণ অতীত কাল রূপ ও পুরাঘটিত অতীত কাল রূপের ব্যবহার দেখিয়েছেন গল্প কথকের জনপদে দাঁড়িয়ে। পথপ্রদর্শকের ভূমিকায়।
শুধু কি ক্রিয়াপদের ব্যবহার? শব্দের সচেতন ব্যবহারে, গল্পের কাঠামোগত বৈচিত্র্যে, বিষয়ভাবনার দুঃসাহসিকতা ও অনন্য উপস্থাপনশৈলীর মাধ্যমে একনিষ্ঠ জীবনপাঠে এগিয়েছেন তিনি। নাগরিক জীবনযন্ত্রণার নানা অভিক্ষেপ, মধ্যবিত্তের অস্তিত্বের অভিনব সংকট, জাতিসত্তার ক্রম জাগরণ, মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনের ঘাত-প্রতিঘাতে সমকালীন জীবনচেতনা তাঁর গল্পকে করেছে বর্ণময়। তাঁর গল্প বলার ঢংয়ে সময়ের ক্যানভাসে সাধারণের জীবনকে আঁকতে গিয়ে, তাদের ভাষায় বলতে গিয়ে, আন্তরিক ও সাবলীল বর্ণনায় আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার করেছেন নিপুণভাবে। যে অঞ্চলের গল্প লিখেছেন, ঠিক সেই অঞ্চলের ভাষা বলেছেন, শুদ্ধতার সাথে। সবচেয়ে বড় বিষয়, তাঁর গল্পের ভাষাশৈলী পরবর্তী গল্পের সাথে মিল নেই; যার মাধ্যমে বোঝা যায় তিনি শব্দ প্রয়োগে সচেতন ছিলেন। যার ব্যাখ্যা তিনিই দিয়েছেন : ‘চিত্রকর কত মাধ্যমেই না ছবি আঁকেন। কোনো ছবি জল রঙে, কোনো ছবি তেল রঙে, কোনোটি বা শুধু কালি ও কলমে। লেখকেরাও অবিকল তাই। একেক গল্পের জন্য একেক ধরনের বাক্য গঠন শব্দচয়ন তাকে ভেবে নিতে হয়। গল্প আর ভাষা’।
গোটা জীবনের পরিধিতে সৈয়দ হক গল্প লিখেছেন চৌষট্টিটি। এই গল্পগুলোর ভেতর দিয়ে তিনি নশ্বর জগতে রেখে গেছেন অবিনশ্বর দাগ। গল্পে, গল্পের কলকব্জায় তিনি অঙ্কন করেছেন শব্দের কালিতে, অনুভবের তুলিতে বিচিত্র সব আখ্যান। মানুষের বিচিত্র স্বভাব, মন, ক্রোধ, তৃষ্ণা, ঘৃণা, হতাশা, প্রেম-প্রতিপ্রেম, দাবদাহ, প্রতিবাদ ও চুম্বন করেছেন দক্ষ, মেধাবী আর সৃজনশীল খুনির ধারাবাহিকতায়। খুনি! সৈয়দ শামসুল হক নিজেই বলেছেন, দু’এক জায়গায় লিখেছেনও, লেখকমাত্র খুনি। না, হাতে তীক্ষè তরবারি নিয়ে কারও গলায় চালিয়ে দেন না গল্পকার, ফিনকি দিয়ে বের হয় না টাটকা রক্ত। কিন্তু গল্পকার তবুও খুনি। গল্পকার কেন খুনি? পাঠকের মনের আস্তিনে লুকিয়ে রাখা রিরংসাকে গল্পকার বের করে আনেন চাতুর্যের ঘোড়ায় চড়ে, চরম দক্ষতায়, নিমিষে পাঠককে নিয়ে যান রক্তমাখা তেপান্তরের মাঠে। দাঁড় করিয়ে দেন উন্মুক্ত কৃপাণের সামনে, যে কৃপাণ একদিন নিজেই ধার দিয়েছিলেন, অন্যকে বধ করবার জন্যে! ঘটনার পারম্পর্যে, সেই ধারঅলা নিজেই খা খা তরবারির নিচে পেতে দিতে বাধ্য হচ্ছেন নিজের নির্ভীক গর্দান। এ তো গল্পকারের হাতেই নির্মিত গল্পের আখ্যানে সম্ভব। গল্পকার যখন পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন, নিজের আয়নায়, নিজের সম্মুখে, তখন খুুুুনি না হয়ে যায় কোথায় গল্পকার?
পাঠককে ভ্রান্তির জালে জড়িয়ে গল্পকার মজা দেখেন, আয়েশ করে পান চিবান। নয়তো জুত্ করে সিগারেটে টান মেরে বাতাসে ধোঁয়ার রিং বানান। অন্য দিকে পাঠক নিজের বুকের গহিনে লুকিয়ে রাখা নিজেকে, নিজের কদাকার কিম্ভূত মুখ দেখে আঁতকে ওঠেন। চিৎকার করে বলেন, আমার এই গোপন মুখ গোপনে রাখতে চাই। দাঁতাল মুখে লেগে থাকা রক্ত কাউকে দেখাতে চাই না।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT