মহিলা সমাজ

চরিত্র মানুষের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য

সৈয়দা মানছুরা হাছান মিরা প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১০-২০১৮ ইং ০০:৪৯:৩৫ | সংবাদটি ৭৮৪ বার পঠিত

চরিত্র মানুষের এক অমূল্য সম্পদ। যিনি চরিত্রবান তিনি সমাজে যেকোনো বিরাট সম্পদশালীর চেয়ে বেশি সম্মান পেয়ে থাকেন। চরিত্র মানুষকে দান করে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
আরবি ‘আখলাক’ শব্দের অর্থ সদাচার, চরিত্র। মানুষের দৈনন্দিন কাজ কর্মের মধ্য দিয়ে যে আচার-আচরণ ও স্বভাব প্রকাশ পায় তাকে আখলাক বা চরিত্র বলে। ইসলামের দৃষ্টিতে আখলাকের গুরুত্ব সর্বাধিক। আখলাকই উন্নত জাতির জীবনীশক্তি। যে জাতির চরিত্র যতো ভালো থাকে, সে জাতি ততো শক্তিশালী। উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যাক্তি আখিরাতে তার উত্তম চরিত্রের বিনিময়ে অত্যধিক মর্যাদা লাভ করবে। মহানবি (সা.) বলেন, ‘বান্দা তার উত্তম চরিত্রের বলে আখিরাতে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানিত স্থানে উন্নীত হবে। যদিও সে ইবাদতের দিক থেকে দুর্বল থাকে’। (তাবরানী)
উত্তম চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ন¤্রতা। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর ছিদ্দিক (রা.) বলেছেন, ‘আমরা পরহেজগারির মধ্যে পেয়েছি সম্মান, মহান আল্লাহর দৃঢ় ঈমানের মধ্যে পেয়েছি সন্তোস এবং ন¤্রতার মধ্যে পেয়েছি কৌলিন্য।’
আদর্শ চরিত্র গঠনে উদারতা এবং বিনয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) বলেছেন, ‘ব্যক্তিত্ব গঠন এবং মর্যাদা প্রাপ্তির সর্বোত্তম পন্থা হলো উদারতা’। হযরত উসমান হারুনী (রা.) বলেছেন, ‘সম্মুখে যাকেই দেখ তাকেই তোমার চেয়ে উত্তম মনে করার নামই বিনয়।
মানব শিশুর জন্মের পর থেকে শৈশব ও কৈশোর অতিক্রমের সময় পর্যন্ত চরিত্র গঠনের কাল। মাতা-পিতার হাতে চরিত্রের প্রথম রূপায়ণ এবং শিক্ষক ও অন্যান্য অভিভাবক আর পরিবেশের প্রভাব পড়ে ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট্য চরিত্র কাঠামো দাঁড়ায়।
চরিত্রকে সুমহান করে গড়ে তুলতে হলে সাধনার প্রয়োজন হয়। সাধনার ফলে মহৎ গুণাবলি অর্জিত হয় এবং তা জীবনকে সুন্দর করে। সৎসঙ্গ, সংযমশীলতা, সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, গুরুজনের প্রতি ভক্তি, সুগ্রন্থ পাঠ, সঠিক নির্দেশনা প্রভৃতি গুণ সাধনার পথে সহায়ক হয়। চরিত্র গঠনের জন্য মানুষের এই সাধনা হয়তো বহু দুঃখ কষ্টের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
নবি করিম (সা.) বলেনÑ ‘উত্তম চরিত্রই হলো সকল নেক কাজের মূল কথা।’ (মুসলিম)
চরিত্র মানুষের ভূষণ। চরিত্র বলেই মানুষ সর্বত্র সমাদৃত হয়। চরিত্র বলতে যে ধারণা বোঝায় তাতে আছে কতকগুলো গুণের সমাবেশ। প্রেম, সৌজন্য, ক্ষমা, ত্যাগ, তিতিক্ষা, সাধুতা, সাহচর্য, শৌর্য, অনুগ্রহ, আত্মবিশ্বাস, তীক্ষ্ম দৃষ্টি, দয়া, সমদর্শন এসব গুণের সমন্বয়ে চরিত্র বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে। তাই মানুষের লক্ষ্য জীবনের সকল আচার-আচরণের মাধ্যমে এমন চমৎকার বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দেওয়া যাতে সুন্দর চরিত্র গড়ে ওঠতে পারে এবং পরিণামে শ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হয়। টাকা-পয়সা, ধন-দৌলতের বিনাশ আছে কিন্তু সচ্চরিত্রের বিনাশ নেই।
চরিত্র গঠনে পরিবেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৎ সঙ্গের প্রভাবে জীবন সুন্দর ও মধুময় হয়, উত্তম চরিত্র গঠিত হয়। তাই অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে।
চরিত্রহীন মানুষ পশুর চেয়ে অধম। তাকে দিয়ে পরিবারের কিংবা সমাজের কোনো উপকার হয় না। বরং তার মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তির সৃষ্টি হয়। এ ধরনের মানুষ নানা ভোগ লালসায় মত্ত হয়ে পড়ে এবং পাপ কাজে লিপ্ত হয়। সমাজের সকল মানুষ তাদের ঘৃণার চোখে দেখে।
আমি যদি একজন মুসলিমের কথা বলি, তাহলে বলতে হয়, মুসলিম চরিত্রে থাকবে আল্লাহ তা’আলার ভয়। সব কিছুর মালিক আল্লাহ এ ধারণা নিয়ে পৃথিবীতে সে বাস করবে। সত্য ও ন্যায়কে পৃথিবীর সব কিছুর চেয়ে বেশি প্রিয় মনে করবে। মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকবে। কুদৃষ্টি দেওয়া থেকে চোখকে হেফাজত করবে। অন্যের আমানত সে আত্মসাৎ করবে না। কথা দিয়ে কথা রাখবে। আর কেউ দেখুক না দেখুক আল্লাহ তো সব কিছুই দেখছেন এ ধারণা নিয়ে সে সব কিছু ঈমানদারির সাথে করবে।
ব্যক্তি চরিত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল দানশীলতা। ‘দান’ এর মধ্য দিয়ে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কিছুটা দূর হয়। দানশীল ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম হলেন হাজি মুহাম্মদ মহসিন। তিনি ছিলেন বাংলার একজন জনহিতৈষী, দানবীর। দানশীলতার জন্য তিনি দানবীর খেতাব পেয়েছিলেন। মুহাম্মদ মহসিনের জন্ম ১৭৩২ সারে হুগলি জেলায়। তাঁর বাবা হাজি ফয়জুল্লাহ ও মা জয়নাব খানম। ফয়জুল্লাহ একজন ধনী জায়গিরদার ছিলেন। তিনি ইরান থেকে বাংলায় এসেছিলেন।
দানশীলতার কারণে মুহাম্মদ মহসিন কিংবদন্তিতে পরিণত হন। বর্তমানেও দানের ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টান্ত ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হুগলির ‘হুগলি মহসিন কলেজ’ প্রতিষ্ঠার সময় মহসিনের ওয়াকফকৃত অর্থ ব্যবহৃত হয়। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে দৌলতপুর মহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এছাড়াও মহসিন ফান্ডের অর্থে অসংখ্য দরিদ্র ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়। আর এ সকল কাজের জন্যই তিনি দানবীর উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
তাঁর স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম মহসিন হল রাখা হয়েছে। ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ঘাঁটির নাম বিএনএস হাজি মহসিন।
যুগে যুগে বহু মানুষ চারিত্রিক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।
পরিশেষে বলতে হয়, ‘ভোগে নয়, ত্যাগেই মনুষ্যত্বের বিকাশ’। ত্যাগী মনোভাব এবং সহনশীলতা আমাদের সুন্দর ও প্রশংসনীয় চরিত্র গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT