মহিলা সমাজ

কালজয়ী চিত্রশিল্পি লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১০-২০১৮ ইং ০০:৫০:৫২ | সংবাদটি ৭৭৮ বার পঠিত

জিনিয়াস বলতে আমরা বুঝি অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। কিন্তু লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চিকে যদি শুধু জিনিয়াস বলা হয় তাহলে কিছুই বলা হবে না।
কেননা তার অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় শুধুমাত্র শিল্পের ক্ষেত্রে নয় আরো নানা ক্ষেত্রে। গণিত শাস্ত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং, রসায়ন শাস্ত্র ইত্যাদি প্রত্যেকটি বিষয়েই তার কীর্তি স্মরণীয়। জীবনে তিনি যদি তুলি, বুরুশ নাও ধরতেন তাহলেও আজো আমরা তাকে একজন শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য বলে ঘোষণা করতাম।
তিনি তুলি ধরেছেন ছেনিও ধরেছেন, বিজ্ঞানের চর্চাও করেছেন তবুও যার জন্য সবচেয়ে বেশি সম্মান তা হলো তার ছবি আঁকা।
তাঁর ধারণা মানুষের ছবি আঁকতে গেলে মানুষের শরীরের রহস্য জানতে হবে। লিওনার্দো স্থির করলেন মানুষের শরীরের গঠন জানতে তিনি মানুষের মৃতদেহ কাটবেন। ডাক্তারি শেখবার সময়েও ছাত্ররা মৃতদেহ ছুঁতো না। লিওনার্দো মোটেই দমবার পাত্র নন। তিনি নিজ হাতে অনেকগুলি শব কাটলেন। মানুষের শরীরের গঠন সম্বন্ধে এই ভাবে নতুন জ্ঞান পাবার পথ খুলে দিয়ে লিওনার্দো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকেও সত্যিকারের বিজ্ঞান হয়ে ওঠতে সাহায্য করলেন। এ হলো তার জীবনের টুকরো ঘটনা।
ইতালিতে ফ্লোরেন্স শহরের কাছে ভিঞ্চি বলে এক গ্রাম। সেই গ্রামে ১৪৫২ খ্রিস্টাব্দে লিওনার্দোর জন্ম হয়। তার নামের সঙ্গে ঐ ছোট্ট গ্রামটির নাম ও জগৎ বিখ্যাত হয়ে রয়েছে।
এতোটুকু বয়স থেকেই নানা দিকে তাঁর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যেতে লাগলো। কিন্তু কি রকম যেনো ছোটখাটো বয়সের ছেলে কোনো একটা বিষয় নিয়ে পড়লে তিনি কিছুদিনের মধ্যেই তাতে রীতিমতো পারদর্শী হয়ে ওঠতেন। কেবল সারাজীবন তিনি একনিষ্ঠ উৎসাহের পরিচয় দিয়ে গেছেন। সেটা হলো চিত্রকলা।
ইতালিতে ভেরোচ্ছি বলে একজন চিত্রকরের কাছে লিওনার্দো শিক্ষানবিশি করেছিলেন। এহেন ভেরোচ্ছির ওপর ও ভার পড়লো এক গির্জায় একটা মস্ত বড় ছবি আঁকবার। গুরুদেব ভাবলেন লিওনার্দোকে সুযোগ দেয়া যাক।
তিনি লিওনার্দোকে বললেন ওই বড় ছবির এক জায়গায় একটি পরীব ছবি আঁকতে। তিনি সম্মতি জানালেন ছবি আঁকবেন। তিনি পরীর ছবি আঁকতে শুরু করলেন। পরীটি যেদিন আঁকা শেষ হলো সেদিন সকলে একেবারে স্তম্ভিত। ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কারোরই যেনো নিঃশ্বাস পড়ে না, এমন অপরূপ। ভেরোচ্ছিও দেখলেন এতটুকু ছেলে যে রকম ছবি এঁকেছে তা তিনি নিজেও কোনো দিন আঁকতে পারবেন না। তখন থেকে তিনি আর তুলি, বুরুশ হাতে নেননি।
হৈ চৈ পড়ে গেলো সারা ইতালিতে। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি নামে আর্বিভাব হয়েছে এক আশ্চর্য শিল্পীর। মিলান শহর থেকেও আমন্ত্রণ এলো দ্যা ভিঞ্চির কাছে। সেখানে তিনি তার ‘লাস্ট সাপার’ বলে বিখ্যাত ছবি একেঁছিলেন। কিন্তু তড়িৎগতিতে ছবি আঁকা তার ধাতে ছিলো না। মিলান গিয়ে তিনি আপন মনে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
একদিন ডিউক তাকে বললেন ব্যাপার কি? জবাবে লিওনার্দো শান্ত গলায় বললেন, ছবিটি শুরু করার আগে ছবির প্রত্যেকটি মুখ স্পষ্ট ভাবে নেওয়া দরকার। কিন্তু তিনি ভাবলেন জুডাস এর মতো একটা মুখ ভেবে এটা টিক করা বড় কঠিন। প্রভু যিশুর কাছ থেকে এতো সাহায্য পাওয়া সত্ত্বেও যে লোক শেষ পর্যন্ত যিশুর বিরুদ্ধে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছিলো তার মুখটা ভাবতে পারা তো সহজ কথা নয়। তবে আপনার সময় বাঁচাবার জন্য ভাবছি স্থানীয় প্রধান পুরোহিতের মুখটিকেই জুডাসের মুখ হিসাবে ব্যবহার করে ছবিটা শুরু করে দেখি।
এই শান্ত বিদ্রুপের দরুণ ডিউকের মুখ একেবারে চুন। তিনি ভাবলেন কাজ নেই ঘাঁটিয়ে। যখন খুশি ছবি আঁকলেই হবে। লিওনার্দোর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিটির নাম কে- না জানো ‘মোনালিসা’ মাপ জোকের দিক থেকে ছবিটি খুব বড় নয়। তিন ফুট উঁচু আর দু’ফুট চার ইঞ্চি চওড়া একটি মহিলার ছবি, তার মুখে একটা অদ্ভুদ হাসি। এ হাসির মানে যে কি ছিলো, তা ভাবতে ভাবতেই সকলেই বিস্মিত হয়ে যায়। পটভূমিতে এক টুকরো প্রাকৃতিক দৃশ্য, কিন্তু তার পুরোটাই হলো ছবির মহিলার মনের ভাবটিকে ফুটিয়ে তুলবার জন্যে।
সমঝদাররা বলেন, এখানেই লিওনার্দোর আসল প্রতিভার পরিচয়। বাইরের পৃথিবীর চেয়ে মানবজগতের খবর দেওয়াই তার ছবির আসল উদ্দেশ্য। আর মানুষের মন যে কি অপরূপ, কি বিচিত্র। সে সম্বন্ধে আমরা চমকে সচেতন হই তা মোনালিসার ছবি দেখতে দেখতে।
তার বিখ্যাত শিল্পগুলির মধ্যে ‘মোনালিসা’ ‘দ্যা লাস্ট সাপার’ অন্যতম। তার শৈল্পিক মেধার বিকাশ ঘটে খুব অল্প বয়সেই। আনুমানিক ১৪৬৯ সালে। রেঁনেসার অপর বিশিষ্ট শিল্পী ও ভাস্কর আন্দ্রেয়া ভেরোচ্ছির কাছে ছবি আঁকায় ভিঞ্চির শিক্ষানবিশ জীবনের সূচনা।
এই শিক্ষাগুরুর অধীনেই তিনি ১৪৭৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষতঃ চিত্রাঙ্কনে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। ১৪২২ সালে তিনি চিত্র শিল্পীদের গিল্ডে ভর্তি হন এবং এই সময় থেকেই তার চিত্রকর জীবনের সূচনা হয়। ১৪৭৮ সাল থেকে ১৫১৬-১৫১৭ ও ১৫১৯ সাল অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রসারিত এবং বিভিন্ন পর্বে বিভক্ত এক দীর্ঘ ও অক্লান্ত কর্ম সাধনার জীবন তার।
গির্জা ও রাজ প্রসাদের দেয়ালে চিত্রাঙ্কণ এবং রাজকীয় ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি বেসামরিক এবং সামরিক প্রকৌশলী হিসাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান জ্ঞানের প্রয়োগ। অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ বিদ্যা, জীব বিদ্যা, গণিত ও পদার্থ বিদ্যার মতো বিচিত্র সব বিষয়ের ক্ষেত্রে তিনি গভীর অনুসন্ধিৎসা প্রদর্শন করেন এবং মৌখিক উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দেন। আনুমানিক ১৪৮২ সালে তিনি মিলান গমন করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে তার বিখ্যাত দেয়াল চিত্র ‘দ্যা লাস্ট সাপার’ অংকন করেন।
আনুমানিক ১৫০০ সালে তিনি ফ্লোরেন্স ফিরে আসেন এবং সামরিক বিভাগে প্রকৌশলী পদে নিয়োগ লাভ করেন। এই সময়েই তিনি তার বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম ‘মোনালিসা’ অংকন করেন। জীবনের শেষকালে তিনি ফ্রান্সে কাটান।
লিওনার্দো ১৪৮২ থেকে ১৪৯৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কাজ করেছেন। ১৪৯৩ থেকে ১৪৯৫ এর মধ্যে তার অধিনস্তদের মাঝে ক্যাটারিনা নামক এক মহিলার নাম পাওয়া যায়। ঐ মহিলাটি ১৪৯৫ সালেই মারা যান। সে সময় তার শেষ কৃত্যের খরচ দেখে ধারণা করা হয় তিনি ছিলেন লিওনার্দোর মা। লিওনার্দোর পূর্ণনাম লেওনার্দো দি সের পিয়েরো দ্যা ভিঞ্চি। তিনি ছিলেন ইতালির রেঁনেসার কালজয়ী চিত্র শিল্পি লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT