ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বাংলাদেশের লোকশিল্প

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১০-২০১৮ ইং ০০:৩৩:০০ | সংবাদটি ২২০ বার পঠিত

লোকশিল্প সাধারণ লোকের জন্য সাধারণ লোকের সৃষ্টি। এর পরিধি এতই ব্যাপক ও প্রকৃতি এতই বিচিত্র যে, এক কথায় এর সংজ্ঞা নিরূপণ করা যায়না। অগাস্ট প্যানিয়েলা বলেন, লোকশিল্পের কেবল ‘শিল্প’ শব্দ বোঝা কঠিন নয়; লোক শব্দও সমান সমস্যাপূর্ণ। তাঁর ভাষায় ‘In the expression ‘Folk art’ it is not only the word ‘art’ that is difficult to understand, the word ‘Folk’ is equally problematic. Webster’s New Collegiate Dictionary ‘লোক’ এর ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছে-লোক হলো সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ যারা গোষ্ঠী চরিত্র নির্ধারণ করে এবং সভ্যতা, আচার, বিশ্বাস, ঐতিহ্য, পুরান, চারু ও কারুশিল্পের বিশিষ্ট রূপকে বংশ পরম্পরায় ধরে রাখে। নৃতাত্ত্বিক অভিধানে ‘লোক’ এর সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে-পুরাতন ঐতিহ্যের অংশীদার যেসব সাধারণ মানুষ, নৃতত্ত্বের পরিভাষায় তারাই Folk বা লোক নামে অভিহিত। আর ‘শিল্প’ হলো মানব মনের আনন্দ উপলব্ধি বহিঃপ্রকাশ। শিল্প মানুষের সত্তার গভীরতম প্রকাশ। সবচেয়ে সহজলভ্য উপাদান মাটি থেকে আরম্ভ করে কাঠ, বাঁশ, বেত, পাতা, সুতা, লোহা, তামা, সোনা, রূপা, ধাতব দ্রব্য, সোলা, পাট, পুঁতি, ঝিনুক, চামড়া পর্যন্ত নানা উপাদান লোকশিল্প নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। কামার-কুমার, ছুতার, তাঁতি, কামারু, সোনারু, শাঁখারি, পটুয়া প্রভৃতি পেশাদার এবং অন্য অনেক অপেশাদার নর-নারী লোকশিল্পের নির্মাতা। এরূপ বিভিন্ন ও শ্রেণি প্রকৃতির লোকশিল্পের সংজ্ঞায়ন সত্যিই দুঃসাধ্য ব্যাপার। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় এরই প্রতিফলন ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদিও লোকশিল্পের সংজ্ঞা এখনো নির্ণয় করা হয়নি, তবুও গোষ্ঠীবৃদ্ধ মানুষ যারা উন্নত সমাজের কাঠামোর মধ্যেই বিরাজ করে কিন্তু ভৌগলিক বা সংস্কৃতির কারণে শিল্পের উন্নত ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাদের নির্মিত এই শিল্পকে লোকশিল্পরূপে বিবেচনা করা যায়, অবশ্য স্থানীয় চাহিদা ও রুচির কারণে এই শিল্প স্থানীয় বৈশিষ্ট্যসূচক রীতিও বহুগুণ ধারণ করে। লোকশিল্পের অপর একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন হ্যারল্ড ওসবোর্ন। তিনি বলেছেন, আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পায়নি এমন কারুশিল্পী প্রথাগত যেসব বস্তু ও সরঞ্জাম প্রাত্যহিক জীবনের ব্যবহার, অলংকার, বিবাহ বা মৃত্যের সৎকারের কাজে তৈরি করে, সেসব শিল্প বস্তুকে লোক শিল্প বলে। সুতরাং লোকশিল্পী পূর্বপুরুষের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করে সমাজের মানুষের চাহিদা ও উপযোগিতার কথা বিবেচনায় রেখে মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রথাগতভাবে যে শিল্প গড়ে, তাকেই লোকশিল্প বলে। লোকজ চারু ও চারুশিল্প একত্রে ‘লোকশিল্প’ নামে অভিহিত।
বাংলাদেশে নানা ধরনের লোকশিল্প রয়েছে। নিচে কয়েকটি লোক শিল্পজাত বস্তুর নাম, আধার, উপকরণ ও শিল্পী নাম উপস্থাপন করা হল ঃ (ক) অংকন ঃ (১) আল্পনা ঃ বর্তমানে ধর্মীয় ও সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আল্পনা আঁকা সাধারণ রীতিতে পরিণত হয়েছে। লোকশিল্পের এ ধারাটি শিক্ষিত সমাজেও উঠে এসেছে। লোকশিল্পের এটি একটি জনপ্রিয় শাখা-এতে রঙ-তুলির ব্যবহার আছে। চালের পিটালি দিয়ে সাদা, গোবর জল দিয়ে মেটে, কাঠ-কয়লা দিয়ে কালো, পোড়া ইটের গুড়া দিয়ে লাল বা খয়েরি ইত্যাদি াদেশজ রঙ ও বাজারের কেমিক্যালজাত বিভিন্ন রঙ এ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত মেঝে, দেওয়াল, কুলা, পিঁড়ি, ঘরের খুঁটি, দুয়ার, পূজার বেদী, সরা, কলস, ঝাঁপি ইত্যাদি আধার বা পাত্রে আল্পনা আঁকা হয়। (২) পটচিত্র ঃ পটচিত্র আর একটি মাধ্যম, যা এদেশের লোক ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। আল্পনার রূপকার নারী সমাজ। পটচিত্রের রূপকার মূলত পুুরুষ তবে এর জটিল প্রক্রিয়ায় নারীরাও অংশগ্রহণ করে থাকে। এদিক থেকে পটচিত্র একটি যৌথ শিল্প। পটুয়া নামের এক শ্রেণির পেশাজীবী মানুষ পটচিত্রের নির্মাতা। পটুয়াদের আদি পুরুষ ‘মস্করী’ বৌদ্ধ ছিল। তারা বুদ্ধকাহিনী পট বা কাপড়ে এঁকে তার সাহায্যে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করত। মধ্যযুগে পটুয়ারা কৃষ্ণলীলা, রামলীলা, চৈতন্যলীলা কাপড়ে অথবা কাগজে চিত্রিত করে প্রচার করত। এটি তাদের জীবিকারও উপায় ছিল। এ যুগে গাজীর পট, মহরমের পট-এর সন্ধান পাওয়া যায়-যার পৃষ্ঠপোষক ছিল মুসলিম সমাজ। এভাবে পট হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান সব সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। (৩) উল্কি ঃ উল্কি লোক শিল্পের একটি স্থায়ী ধারা। বিশ্বের নানা জাতির মধ্যে শরীরের নানা অংশে উল্কি আঁকার ও ধারণ করার রীতি প্রচলিত আছে। আফ্রিকার কোনো কোনো উপজাতি প্রায় সারা অঙ্গেই বিচিত্র রূপের ও রঙের উল্কি পরে। উল্কি অংকনে ধর্ম, চিকিৎসা, সংবাদ আদান-প্রদান, সৌন্দর্যচর্চা ইত্যাদি মনোভাব কাজ করে। আমাদের দেশে বৈরাগী বোষ্টমীরা বাহুতে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি উল্কি ধারণ করে। উপজাতিদের মধ্যে সাঁওতাল, ওঁরাও, মুরিয়ারা উল্কি পরে। তারা গোত্র, ধর্ম, পবিত্রতা ও সৌন্দর্যজ্ঞানে উল্কি ধারণ করে থাকে। উল্কি আকার জন্য পেশাদার নারী-পুরুষ আছে। উল্কি দেহে আজীবন থেকে যায়। বর্তমানে শহরের অনেক শৌখিন ছেলেমেয়ে ফ্যাশন হিসেবে অঙ্গে উল্কি ধারণ করে থাকে। (৪) মুখোশচিত্র ঃ গ্রাম বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মুখোশ তৈরি হয়। হাল্কা কাঠ, শোলা, মাটি, রঙ ইত্যাদি মুখোশ তৈরির উপকরণ। গাজন-নৃত্যে শিবের, কালী-নৃত্যে কালীদেবীর মুখাশ পরার রীতি হিন্দু সমাজে প্রচলিত আছে। দেবতার মুখোশে দেবভাব, মানুষর মুখোশে মানবভাব, জীবজন্তুর মুখোশে পশুভাব, ভূতপ্রেতের মুখোশে বীভৎসভাব ফুটিয়ে তোলা হয়। এ ধরনের মুখোশে নৃত্যাভিয়নের চেতনা মিশ্রিত থাকায় লোকশিল্পীরা কিছুটা সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রয়াস পান। (৫) শখের হাঁড়ি ঃ লোকশিল্পীদের কাজ বিশদ এবং বহুল। তারা হাঁড়ি গড়েন, সরা তৈরি করেন। সেই হাঁড়ি ক্ষেত্র বিশেষে শখের হাঁড়ি, সেই সরা ক্ষেত্র বিশেষে লক্ষ্মীর সরা। কোনো কোনো গ্রামাঞ্চলে মাটির সরাতে লক্ষ্মী-রাধাকৃষ্ণ-গাজীর মূর্তি ও মহরমের ঘটনা চিত্রিত করা হয়। এতে পটের অনুরূপ রঙ-তুলির ব্যবহার আছে। শখের হাঁড়িতে ফল, ফুল, ফসল, বসতি, জনপদ ইত্যাদির চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। (৬) পুতুলচিত্র ঃ ছুতার, কুমার, মালাকার এবং গৃহস্থ বালিকারা রং এবং রঙিন সুতার সাহায্যে পুতুলচিত্র তৈরি করে। পুতুলচিত্র তৈরির উপকরণ হলো কাঠ, কাপড়, মাটি, শোলা ইত্যাদি। (৭) খেলনা চিত্র ঃ গ্রাম বাংলার গৃহস্থ নরনারীরা কাঠ বা মাটি নির্মিত খেলনার ওপর রঙের সাহায্যে বিভিন্ন চিত্র এঁকে খেলনাচিত্র তৈরি করেন।
খ. বয়নশিল্প-(১) নকশি পার্টি ঃ নকশি পাটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকশিল্পীরা রঙিন বেত দিয়ে অত্যন্ত সুন্দর ও চমৎকার নকশি পাটি তৈরি করে থাকেন। (২) নকশি শিকা ঃ বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের নারীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় আরেকটি বয়নশিল্প হলো নকশি শিকা। গৃহস্থ রমনীরা পাট বা সুতার জো-এর ওপর পাট, সুতা, পুতি, কড়ি ইত্যাদির সাহায্যে নকশি শিকা তৈরি করেন। এই নকশি শিকায় গ্রামবাংলার নারীরা বিভিন্ন জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখেন। (৩) নকশি পাখা ঃ গ্রাম বাংলার আরেকটি ঐতিহ্যবাহী বয়ন শিল্প নকশি পাখা। গৃহস্থ নারীরা অত্যন্ত শক করে পাতা বা সুতার টানার ওপর রঙে রঙিন সুতা এবং পাটের মাধ্যমে নকশি পাখা তৈরি করেন। (৪) ঝুড়ি, কুলা-ডালা, ফুলচাঙ্গা ঃ এদেশের ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পের অন্যতম হলো বেত ও বাঁশের জো-এর তৈরি ঝুড়ি, কুলা-ডালা ও ফুলচাঙ্গা। ঝুড়ি এবং কুলা-ডালা তৈরি করেন যে সকল লোকশিল্পী তাদেরকে ‘ডোম’ জাতি বলা হয়। আর সাধারণত গৃহস্থ রমণীরা ফুলচাঙ্গা তৈরি করে।
গ. সূচিকর্ম ঃ (১) নকশি কাঁথা ঃ নকশি কাঁথা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের লোকশিল্পের সবচেয়ে মনোরম নিদর্শন। নকশি কাঁথা সূচিকর্মের অন্তর্ভুক্ত। কয়েক ফালি কাপড় স্তর পরস্পরায় সাজিয়ে কাঁথার জমিন তৈরী করা হয়। সাধারণ ব্যবহার্য সূচে রঙ-বেরঙের সুতা পরিয়ে ‘ফোঁড়’ দ্বারা এই জমিনে ছবি আঁকা হয়। (২) নকশি কাঁথার ছবি ও নকশা ঃ নকশি কাঁথাতে সাধারণত মাছ, পাতা, ছড়া বা ধানের শীষ, চাঁদ, তারা, বৃক্ষ, ঘোড়া, হাতি, দেব-দেবীর ছবি অথবা কোনো গ্রামীণ ঘটনার ছবি বুনন করা হয়। পাহাড়-পর্বত, পশু-পাখি, প্রসাধনী দ্রব্য, রান্নাঘরের জিনিসপত্র, পালকী, মটর, ঘোড় সওয়ার, মসজিদ, মন্দির, গ্রাম্যমেলা, রাধা-কৃষ্ণ, লক্ষ্মী, জ্যামিতিক নকশা, ফুল ও নানা ধরনের আল্পনা এবং শ্লোক, নানা ফিগার মোটিফ এতে দেখতে পাওয়া যায়। (৩) নকশি কাঁথার প্রকার ঃ লোকশিল্প হিসেবে নকশি কাঁথা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রয়োজনের দিক থেকে নকশি কাঁথাকে চারভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-লেপ, ঢাকনা, ওশার ও থলে। এসবের মধ্যে লেপ এবং ঢাকনাই উল্লেখযোগ্য। লেপ কাঁথা আবার দুই প্রকার। যেমন-দোরখা এবং আঁচল বুননী।
ঘ. আদর্শায়ন ঃ- লোক শিল্পের অন্যতম প্রধান শাখা এই আদর্শায়ন। পুতুল, খেলনা, হাঁড়ি-পাতিল, দেবমূর্তি, মুখোশ, মুকুট, সন্দেশ পিঠা, আমসত্ত্বের ছাঁচ, নকশি পিঠা, মিষ্টি, অলংকার, নৌকা, তাজিয়া, রথ, শৌখিন দ্রব্য, খাট-পালং-সিন্দুক, বাক্স, পালকি, গাড়ি ইত্যাদি সবই আদর্শায়নের অন্তর্ভূক্ত লোক শিল্পজাত বস্তু। (১) পুতুল ঃ- কুমার,, ছুতার, গৃহস্থ রমণী ও বালিকারা মাটি, কাঠ, কাপড়, সুতা, পাট, ধাতু ইত্যাদির সাহায্যে মাটির পুতুল, কাঠের পুতুল, কাপড়ের পুতুল, ধাতুর পুতুল ইত্যাদি তৈরী করেন। (২) খেলনা ঃ- মাটি, কাঠ, শোলা ও ধাতুর সাহায্যে কুমার, ছুতার, গৃহস্থ ব্যক্তি ও মহিলারা শিশু কিশোরদের জন্য নানা রকমের খেলনা তৈরী করেন। এই ধরণের খেলনার মধ্যে রয়েছে-বিভিন্ন ধরণের পশু-পাখি, মানুষ, হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদির প্রতিকৃতি। (৩) দেবমূর্তি ঃ- হিন্দুদের দেবমূর্তি একটি উল্লেখযোগ্য লোকশিল্প, পেশাদার কুমার মাটি, বাঁশ, কাঠ, সুতা, শোলা, ধাতু, কাপড়, রং ইত্যাদি উপকরণের সাহায্যে হিন্দুদের নানা দেবদেবীর মূর্তি তৈরী করেন। (৪) নকশি পিঠা ঃ- বাংলার নারী মনের শিল্প সৌন্দর্যের প্রকাশ নকশি পিঠা। এতে আছে যুগ-যুগান্তরের বাংলার অন্তঃপুরিকাদের চিন্তা, চেতনা ও রসবোধ। পিঠা সুন্দর, স্বাদে ভরপুর ও বেশিদিন রাখার জন্য বিভিন্ন ডিজাইনে, মোটিফে, সাইজে বা নকশা দিয়ে যে পিঠা তৈরী করা হয় তাকে নকশি পিঠা বলে। অতিথি আপ্যায়ন, বিয়ে-শাদী, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, বিশেষ অনুষ্ঠান, ঈদ, খতনা, নবান্ন, শবে-বরাত, শবেকদর ও জামাই আদরে নকশি পিঠা দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়।
ঙ. ভাস্করণ ঃ- কাঠ খোদাই শিল্প (প্রধানত মূর্তি ও নকশা খোদাই), ধাতুর নকশা, পোড়ামাটির ফলকচিত্র ইত্যাদি হলো লোকশিল্পের অন্তর্ভূক্ত ভাস্করণের নিদর্শন। বাড়ি, দরজা, জানালা, বেড়া, খাট, পালংক, বাক্স, সিন্দুক, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি তৈরীর ক্ষেত্রে ছুতার কাঠ খোদাই করে বিভিন্ন রকমের দৃষ্টিনন্দন নকশা ও ডিজাইন তৈরী করেন। বাসন-কোসন এবং শৌখিন দ্রব্যের যাবতীয় কাজে কাঁসারু ও স্বর্ণকার তামা, পিতল, লোহা, সোনা, রুপা ইত্যাদির সাহায্যে ধাতুর নকশা তৈরী করেন। এছাড়া ঘরবাড়ি, মসজিদ, মন্দির ইত্যাদি অলংকরণের সময় কুমার পোড়ামাটির ফলকচিত্র তৈরী করেন।
চ. স্থাপত্যশিল্প ঃ- বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পে লোকশিল্পের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ঘর-বাড়ি, দালান-কোঠা, মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধরণের অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে ঘরামি, ছুতার ও রাজমিস্ত্রিরা বিশেষ ধরণের নকশা ও ডিজাইনে এগুলো গড়ে তোলেন, এসকল অবকাঠামো নির্মাণে মাটি, মাঠ, বাঁশ, খড়, দড়ি ইত্যাদি উপকরণ ব্যবহার করা হয়।
লোকশিল্প যে কোনো জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। তাই একটি জাতির আত্মপরিচয় সম্পূর্ণ রূপে জানার জন্য লোকশিল্প সংগ্রহের গুরুত্ব অপরিসীম। লোকশিল্পের সংগ্রহ দু’রকমের হতে পাবে। যথা-বাস্তব সংগ্রহ এবং দলিলায়ন। বাস্তব সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন সংগ্রহশালা বা জাদুঘর।
১৯৩৭ সালে স্থাপিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গ সংস্থা ‘আশুতোষ মিউজিয়াম অফ ইন্ডিয়ান আর্ট’ নামক জাদুঘর সম্ভবত বিভাগ-পূর্ব বাংলা লোকশিল্প সংগ্রহের প্রথম প্রতিষ্ঠানিক প্রয়াস। ১৯৬৯ সালে এ জাদুঘরের সংগ্রহ সংখ্যা ছিল ২৫,০০০। এর বিরাট অংশ হলো লোকশিল্প। এ জাদুঘরে বাংলাদেশের লোকশিল্পের বেশ কিছু নিদর্শন আছে। এর মধ্যে নকশি কাঁথা ও মাটির খেলনা পুতুল উল্লেখযোগ্য। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা জাদুঘর ১৯৮৩ সালে জাতীয় জাদুঘরে উন্নীত হয়। ২,১৫,০০০ বর্গ ফুটের এ বিশাল জাদুঘরে লোকশিল্পের নিদর্শনের মধ্যে আছে অনেকগুলো নকশিকাঁথা, কাঠখোদাই, টেরাকোটা বা পোড়া মাটির ফলক, পুতুল, পুঁথি, পটচিত্র, মৃৎপাত্র প্রভৃতি। বাংলা একাডেমীর লোক-ঐতিহ্য বিভাগের লোকশিল্প সংগ্রহশালার জন্য সংগ্রহ শুরু হয় ১৯৬৪ সাল থেকে। ১৯৬৯ সালে গৃহসংস্থানের পর সংগ্রহশালা বাস্তবরূপ গ্রহণ করে। সংগ্রহের মধ্যে আছে নকশিকাঁথা, মুখোশ, লোকবাদ্যযন্ত্র, শীতলপাটি, নকশি পাখা, লোক অলংকার, নকশি পিঠা, শিকা, মৃৎফলক, পুতুল প্রভৃতি। লোকশিল্পের পঠন-পাঠন ও সংগ্রহের জন্য ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। বাংলার এককালের রাজধানী সোনারগাঁয়ে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের সদর দপ্তর এবং লোকশিল্প জাদুঘরের স্থান নির্বাচন করা হয়। ১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে সর্দার বাড়ি নামক এক পুরানো জমিদার বাড়ি মেরামত করে তাতে লোকশিল্প জাদুঘর স্থাপিত হয়। লোকশিল্পের নানা নিদর্শন এ সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের জাতিতত্ত্ব জাদুঘর, রাঙামাটির ট্রাইবাল কালচারাল একাডেমি ও বিরিশিরি ট্রাইবাল একাডেমিতে উপজাতীয় শিল্পের সংগ্রহ আছে। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ময়নামতির প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘরের লোকশিল্পের নিদর্শনের মধ্যে মাটির ফলকচিত্র উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, ত্রিশাল প্রভৃতি আঞ্চলিক জাদুঘরে কিছু কিছু লোকশিল্পের নিদর্শন রক্ষিত আছে।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT