ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জাতীয় স্মৃতিসৌধ

জ্যোতিষ মজুমদার প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১০-২০১৮ ইং ০০:৩৪:১১ | সংবাদটি ৪৮ বার পঠিত

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। একই বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধে প্রায় ত্রিশ (৩০) লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়। এই স্মৃতিসৌধ বাংলাদেশের জনসাধারণের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের স্মরণে নিবেদিত এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার উজ্জল নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
এর প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর (১লা পৌষ, ১৩৭৯ বঙ্গাব্দ)। বিজয় দিবসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে নবীনগরে এই স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই পর্যায়ে ২৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই স্মৃতিসৌধের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও রাস্তা তৈরী করা হয়। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এর আনুসাঙ্গিক অন্যান্য কার্যক্রম শেষ করা হয় এবং ব্যয় করা হয় প্রায় ৮ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং নকশা আহ্বান করা হয়। ১৯৭৮ এর জুন মাসে প্রাপ্ত ৫৭টি নকশার মধ্যে সৈয়দ মইনুল হোসেন প্রণীত নকশাটি গৃহিত হয়। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মূল স্মৃতি সৌধের নির্মাণ কাজ শুরু করা হয় এবং ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং এই পর্যায়ে ব্যয় হয় ৮৪,৮৬৫ লক্ষ টাকা।
স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গনের সর্বমোট আয়তন ৮৪ একর (৩৪ হেক্টর)। স্মৃতিস্তম্ভ পরিবেষ্টন করে রয়েছে ২৪ একর (১০ হেক্টর) এলাকাব্যাপী বৃক্ষরাজি শোভিত একটি সবুজ বলয়। স্মৃতিসৌধটির উচ্চতা ১৫০ ফুট। সৌধটি সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। দেয়ালগুলো ছোট থেকে বড় ক্রমে সাজানো হয়েছে। এই সাত জোড়া দেয়াল স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি ভিন্ন পর্যায়কে নির্দেশ করে। (১) ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, (২) ১৯৫৪ যুক্তফ্রন্ট, (৩) ১৯৫৬ শাসনতন্ত্র আন্দোলন, (৪) ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, (৫) ১৯৬৬ ছয় দফা, (৬) ১৯৬৯- এর গণঅভ্যূত্থান এবং (৭) ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা হিসেবে বিবেচনা করে সৌধ নির্মিত হয়েছে।
অসমান উচ্চতা ও স্বতন্ত্র ভিত্তির উপর সাতটি ত্রিভূজাকৃতির প্রাচীর নিয়ে মূল সৌধটি গঠিত। সর্বোচ্চ স্তম্ভটি সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্যরে ভিত্তির উপর, আর সবদীর্ঘ ভিত্তির উপর স্থাপিত স্তম্ভটি সবচেয়ে কম উচ্চতার। প্রাচীরগুলির মাঝখানে একটি ভাজ দ্বারা কোণাকৃতির এবং একটি পর একটি সারিবদ্ধভাবে বসানো। কাঠামোটির সর্বোচ্চ বিন্দু বা শীর্ষ ৪৫.৭২ মিটার উচু। কাঠামোটি এমনভাবে বিন্যস্ত যে, ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে একে ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোয় পরিদৃষ্ট হয়। স্থপতি মইনুল হোসেন মূল স্তম্ভটি নির্মাণে সিমেন্ট পাথরের কংক্রিট ব্যবহার করলেও এর সংলগ্ন অন্যান্য অবকাঠামো ও পেভমেন্ট নির্মাণে লাল ইট ব্যবহার করেছেন।
মিনার ঘিরে আছে কৃত্রিম হৃদ এবং বাগান। স্মৃতিসৌধ চত্বরে আছে মাতৃভূমির জন্য আত্মোৎসর্গকারী অজ্ঞাতনামা শহীদদের দশটি (১০টি) গণকবর। বিদেশী রাষ্ট্র নায়কগণ সরকারি সফরে বাংলাদেশ আগমণ করলে এই স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন রাষ্ট্রাচারের অন্তর্ভূক্ত। বাংলাদেশ সফরকারী বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধানগণ নিজ হাতে এখানে স্মারক বৃক্ষ রোপন করে থাকেন।
স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গনে আরোও রয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চ, অভ্যর্থনা কক্ষ, সমজিদ, হেলিপ্যাড, ক্যাফেটরিয়া। জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামোর সামনেই রয়েছে একটি জলাশয়। এখানে প্রতিফলিত হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামো এবং জাতীয় পতাকা। এই জলাশয়ে ফুটে আছে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা।
প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে প্রবেশ করলে স্তম্ভটিকে প্রবেশদ্বারের অক্ষর বরাবরই চোখে পড়ে। কিন্তু মূল বেদীতে পৌছাতে হলে বেশ কিছু উচু, নিচু এলাকা, পেভমেন্ট ও একটি কৃত্রিম লেকের উপর নির্মিত সেতু পার হতে হয়। এ সব কিছুই স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামকে চিহ্নিত করেছে।
এই স্মৃতিসৌধের উপকরণগুলো বিভিন্ন প্রতীকী ভাবনা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। যেমনঃ
১) বাংলাদেশের সাতটি জাতীয় আন্দোলনের সূত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। তাই এর প্রতীক হিসেবে সাতটি দেয়াল তৈরি করা হয়েছে।
২) চত্বরের লাল ইট, রক্তাক্ত সংগ্রামের প্রতীক।
৩) সামনের জলাশয়, অশ্রুর প্রতীক।
৪) ভেতরে গণকবর থাকায় প্রত্যক্ষভাবে শহীদদের উপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয়।
৫) এর সবুজ বেষ্টনী শ্যামল বাংলার প্রতীক এবং
৬) স্মৃতিস্তম্ভে পৌছার জন্য রাখা হয়েছে উচু নিচু পথ-স্বাধীনতার চড়াই উৎরাই পথকে নির্দেশ করেছে।
স্মৃতি সৌধের মিনার ব্যতীত প্রকল্পটির মহাপরিকল্পনা ও নৈসর্গিক পরিকল্পনা সহ অন্যান্য সকল নির্মাণ কাজের স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থাপত্য অধিদপ্তর।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • Developed by: Sparkle IT