ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বিলুপ্তির পথে সার্কাস

মো. বেলাল আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১০-২০১৮ ইং ০০:৩৬:১৭ | সংবাদটি ৪৪৭ বার পঠিত

শীতের প্রারম্ভে নানারকম উৎসব বিনোদন আয়োজনের জোয়ার ওঠে এই রূপসী দেশে। এর মধ্যে বিনোদনের অন্যতম খোরাক সার্কাস। এই আয়োজন দেখতে এক সময় গ্রাম বাংলার সব বয়সের মানুষ বিভিন্ন উৎসবে ভিড় করত। নানা রকম শারীরিক কসরত, পশু-পাখির খেলা আর হাস্যকৌতুকের খোঁজে সার্কাস দেখতে দলবেঁধে যেতো। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা, বিনিয়োগ আর নানা রকম জটিলতায় এই অফুরন্ত আনন্দের মাধ্যম সার্কাসশিল্প আজ অনেকটাই বিপন্নের পথে।
এই বাংলায় ‘দি লায়ন সার্কাস’ নামে প্রথম সার্কাস দল গঠিত হয় ১৯০৫ সালে। পরে নাম পরিবর্তন করে হয় ‘দি সাধনা লায়ন সার্কাস’। দলটির বর্তমান স্বত্ত্বাধিকারী নিরঞ্জন দাস। দলটি এখনো ‘দি লায়ন সার্কাস’ নামে তাদের প্রদর্শনী করছে বিভিন্ন স্থানে। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে এদেশে বেশ কিছু দল প্রায় নিয়মিতভাবে সার্কাস প্রদর্শনী করত। আর স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে এদেশে যেসব সার্কাস দল গঠিত হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দি বুলবুল সার্কাস, দি রয়েল সার্কাস, দি সবুজ বাংলা সার্কাস, দি সুন্দরবন সার্কাস, দি কাঞ্চন সার্কাস, দি কোহিনুর সার্কাস, দি রওশন সার্কাস, দি নিউ স্টার সার্কাস, দি ন্যাশনাল সার্কাস, দি লায়ন সার্কাস, দি লক্ষ্মীনারায়ন সার্কাস, দি রাজমহল সার্কাস, শৈলেন বাবুর নিউ সবুজ বাংলা সার্কাস এবং ঢাকা কেরানীগঞ্জের বসন্তকুমার মোদকের দি সোনার বাংলা সার্কাস। এই সার্কাস শিল্পের সঙ্গে আমাদের শোবিজ অঙ্গনের অনেকেই আগে যুক্ত ছিলেন।
জানা যায়, মুনমুন, ময়ূরী, সুব্রত এমনকি চিত্রনায়ক ওমর সানীও ক্যারিয়ার পড়তির পর সার্কাস বা যাত্রাদলে কাজ করেছেন। পরে চলচ্চিত্রের অবস্থা আশাব্যঞ্জক হওয়ার পর আবারও নিজ নিজ লক্ষ্যে এগিয়েছেন। তারপরও কেউ কেউ এখনো সার্কাস বা যাত্রাদলের কাজ করে যাচ্ছেন। এক সময় টেলিভিশনের পর্দায় বিদেশি সার্কাস দেখার আগ্রহও কোনো অংশে কম ছিলো না।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সার্কাস প্রদর্শনীর চল অনেকটাই কমে গেছে। মূলত সার্কাস দলে যাবতীয় অবকাঠামো বানানোর কাজগুলো করে থাকেন দলের সদস্যরাই। এই শিল্পীরা আবার বেশির ভাগই শো এর দিন মঞ্চে খেলা দেখান। তাদের থাকার ঘরগুলোর ঝুপড়ির মতো উৎসবের মাঠে নিজেরাই বানিয়ে থাকেন। আর সার্কাস প্যান্ডেলের পাশেই ছোট ছোট খাঁচায় রাখা থাকে বিভিন্ন রকমের প্রাণী।
সার্কাস দলের দুর্দিন শুরু হয় ৯০ দশকের পরবর্তী সময় থেকে। সার্কাসের আয় রোজগার বন্ধ হয়। চর্চার অভাবে শারীরিক কসরত দেখানোর দক্ষতাও হারিয়ে ফেলতে বসেছে কর্মীরা। অন্য পেশায় চলে যেতে শুরু করেন তারা। এভাবে ক্রমেই শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষের জন্য নির্ভেজাল বিনোদনের মাধ্যম সার্কাস হারিয়ে যেতে শুরু করে এবং বর্তমানে তাদের সংখ্যা হাতেগোনা। তবে, সার্কাস একসময় এতোটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, কোনো কোনো সার্কাস দল সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আগে অনুদান পেয়েছে। পেয়েছে প্রেসিডেন্ট পদকও। কিন্তু দলগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিতে যে দু’একটি দল এখন পর্যন্ত টিকে আছে তাদের পক্ষে অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সার্কাসে এখন উপার্জন অনেক কম জেনেও অনেকেই এখনো সার্কাসে নাম লেখাতে আসেন। নাম লেখাতে আসার অধিকাংশই জাত সার্কাস শিল্পী।
অন্যান্য পেশার মতো এই পেশায় শুধু অর্থের জন্য কাজ করার মানুষ খুব কম। তবে, একটা সময় ছিলো যখন সার্কাস শিল্পীদের অনেক উপার্জন হতো। এদেশের সার্কাস শিল্পের উন্নয়ন ও তার সংকট সমস্যা হতে উত্তরণের সাংগঠনিক চিন্তায় ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সার্কাস মালিক সমিতি গঠিত হয়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সার্কাস দল রয়েছে ছোট-বড় মিলে প্রায় দশ থেকে পনেরটির মতো। তবে, তাদের সবার অবস্থা খুবই করুণ বলা যায়। তাই সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্টপোষকতা ছাড়া এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা খুবই দূরূহ ব্যাপার বটে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT