ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন

আতিকুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১০-২০১৮ ইং ০০:৪১:৫৮ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
দফা নং ক/৪। এই চুক্তি উভয়পক্ষের তরফ হইতে সম্পাদিত ও সহি করার তারিখ হইতে বলবৎ হইবে। বলবৎ হইবার তারিখ হইতে, এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত, এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে। চুক্তি বলবৎ করণের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকাল থাকা উচিত ছিলো। যার অভাবে কেবল মত পার্থক্য জনিত বাদানুবাদ ও আশ্বাসের ভিতর বেশির ভাগ সময়ের অপচয় হচ্ছে। চুক্তির প্রধান গ্রহণীয় পদক্ষেপ ছিলোÑ আইন প্রণয়ন পার্বত্য মন্ত্রণালয় স্থাপন ও অন্তর্বর্তী আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, যা সম্পাদিত হয়েছে। তবে সম্পন্ন অনেক কিছুই ফেকড়া বাঁধিয়ে রেখেছে।
মুখবন্ধের ব্যাখ্যায় আলোচিত ক, খ, গ, ঘ, ঙ তে চিহ্নিত অঙ্গিকারগুলো ক-খন্ডের প্রথমেই লঙ্ঘিত হয়েছে। এখানে বক্তব্য হওয়া উচিত ছিলো ঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙালি অবাঙালিদের মিশ্র অধ্যুষিত অঞ্চল। এই সার্বজনীনতা না থাকায় উপরোক্ত অঙ্গিকারগুলো গালভরা বুলির পর্যায়ে নেমে গেছে। চুক্তির মূলনীতিগত বিচারে ক খন্ডে বর্ণিত এক পাক্ষিক বক্তব্যগুলো, বলবৎ যোগ্য ও মান্য হয়। মুখবন্ধে সার্বজনিন বক্তব্য থাকায়, এটা ধরে নেয়া স্বাভাবিক যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম মিশ্র জন অধ্যুষিত অঞ্চল, অথবা এই বাক্যাংশ জুড়ে দেয়া যেতো যে, এতদাঞ্চল উপজাতিদের প্রধান বসতি এলাকা। ‘খন্ড/খ: পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ (জেলা পরিষদ)।
উভয় পক্ষ এই চুক্তি বলবৎ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ১৯৮৯ (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ১৯৮৯, বান্দরবন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ১৯৮৯) এবং এর বিভিন্ন ধারা সমূহের নি¤েœ বর্ণিত পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন ও অবলোকন করার বিষয়ে ও লক্ষ্যে একমত হইয়াছেন।
দফা নং খ/১। পরিষদের আইনে বিভিন্ন ধারায় ব্যবহৃত উপজাতি ‘শব্দটি বলবৎ থাকিবে।’
এই খ/১ ধারায় ব্যক্ত সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঐক্যমত অনুযায়ী এখানে কোনো পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন ও অবলোপন করা হয়নি। বরং ঐক্যমতের ভিত্তিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা হয়েছে। বিষয়টি বিতর্কিত ও তাত্বিক। স্থানীয় অবাঙালি সুধীমহল, উপজাতি, আদিবাসী ও পাহাড়ি এই সংজ্ঞাত্রয়ের কোনটিতে পরিচিত হবেন, তা নিয়ে ঐক্যমত পোষণ করেন না। কেউ নিজেদের উপজাতি ভাবেন, কেউ ভাবেন আদিবাসী, আর আরেক দল নিজেদের পাহাড়ি দাবী করেন। নৃতাত্ত্বিক ও সমাজ বিজ্ঞান ভিত্তিক তত্ত্ব মতে ও সংজ্ঞাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও পরিচয় আছে। তবে তিনটি সজ্ঞায়ই আদিম লোক জ্ঞাপক অর্থে বিচার করা হলে, স্থানীয় কোনো অবাঙালি জনগোষ্ঠিকেই বাস্তবে আদিম অসভ্য রূপে গণ্য করা যায় না এবং তারা একসাথে উপজাতি আদিবাসী ও পাহাড়ি এই তিন সংজ্ঞায় পরিচিত হতে পারেন না। এই লোকেরা বাঙালি নন, এই অর্থে অবাঙালি সংখ্যালঘু বলে আখ্যায়িত হতে পারেন, আর এটাই যথার্থ। সভ্য জগতের সভ্য মানুষদের আদিম অসভ্য অর্থবোধক সংজ্ঞায় আবদ্ধ করে পরিচিত করা অন্যায়। এই অনুপযোগী সংজ্ঞা ব্রিটিশ আমলের উত্তরাধিকারী সূত্রে প্রাপ্ত, এবং সরকারি উদ্যোগে ব্যবহৃত। জনসংহতি সমিতি নেতৃবৃন্দের কেবল উপজাতি সংজ্ঞার সাথে একমত হওয়া বিষ্ময়কর অধুনা চুক্তিকারী উপজাতী প্রধান সন্তু লারমা আধিবাসী নেতা ঘোষিত। পশ্চাদপদ ধ্যান ধারণাকে পোষণ করা, আধুনিক মনষ্কতা নয়। উপজাতি আদিবাসি, পাহাড়ি, জুম্ম জাতি ইত্যাদি পরিচয়গুলোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী বলা যায় না। বিকল্প যুগোপযোগী ও যথার্থ স্বকীয়তা পরিচায়ক নাম চয়নই বাঞ্চিত। এমনিতে পৃথক পৃথক সাম্প্রদায়িক নাম পরিচয় তো আছেই। সমষ্টিগত নাম পরিচয়েরও প্রয়োজন হলে তা হেলা ফেলাও তুচ্ছার্থক হওয়া ঠিক নয়। সম্মানজনক রুচিকর নাম পরিচয় না হলে, তা হবে অগ্রহণীয়। সুতরাং যে পর্যন্ত না রুচিকর সম্মানজনক ও শ্রুতিমধুর একটি সামগ্রিক নাম নির্বাচিত হবে, ততোদিন পর্যন্ত এই পার্বত্য অঞ্চলের জাতীয় সংখ্যালঘুদের পরিচয় হোক অবাঙালি। তাতে অপ্রাঞ্জল, অরুচিকর, ব্যাকরণগত ভাবে ভুল, বিপরীতে অউপজাতি সংজ্ঞা থেকে বাঙালিরাও রেহাই পাবে। কী লজ্জাজনক অন্যায় কথা যে, মাত্র ৫/৬ লাখ অবাঙালির বিপরীত কোটি কোটি বাঙালি তুচ্ছার্থক ‘অউপজাতি সজ্ঞায় আখ্যায়িত।’ এ সংজ্ঞাটি কোনো স্থানীয় অবাঙালির দ্বারাও আরোপিত নয়। তাদের কাছে বাঙালিরা সাধারণতঃ বাঙাল, কখনো অউপজাতি নয়। পার্বত্য বাঙালিরা ও পৃথক কোন সমাজ নয়।
জ্ঞান বিজ্ঞান ও তাত্বিক ব্যাপার, আপনা আপনি গুরু সাজা অনুচিত। এসব ব্যাপারে চাপিয়ে দেয়া মীমাংসা অবশ্যই আপত্তিকর। রাজনৈতিক দাবী দাওয়া অন্যায় কিছু নয়। এসব ব্যাপারে শৈথিল্য মান্য। তবে জ্ঞান বিজ্ঞান ও তাত্বিক বিষয়াবলীকে হস্তক্ষেপ মুক্ত রাখাই উচিত। এ বিষয়টি সংশোধন যোগ্য।
সংজ্ঞাগত ব্যাপারটা রাজনৈতিক নয়। তবে এতদাঞ্চলে এগুলো রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এটি এখন দীর্ঘ আচরিত ঐতিহ্য। মি. আর্থার ফেইর ও মি. টি এইচ লুইনই প্রধান ব্যক্তি, যারা নিজেদের অনুসন্ধানী বিবরণে, পূর্ব ভারতীয় পাহাড়ি ও বনবাসী, অপ্রধান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৌম জনগোষ্ঠিকে, যারা সভ্য জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব মুক্ত জীবন যাপনে অভ্যস্ত, তাদের কখনো উপজাতি, কখনো আদিবাসী আর কখনো পাহাড়ি জনগোষ্ঠি নামীয়, বিভিন্ন সমষ্টিগত নামে, আখ্যায়িত করেছেন। পরে সরকারি আইনী ও প্রশাসনিক ভাষায় তা স্থান লাভ করে নিয়েছে। নৃতাত্বিক ও সমাজ তাত্বিক চর্চায় পন্ডিত মহল একটি সীমারেখা টেনে বলেন, অপ্রধান অনুন্নত জাতিগোষ্ঠি যারা বিচ্ছিন্ন দুর্গম পাহাড় ও বনের বসবাসে অভ্যস্ত, তারা অবাধে বা সাধারণভাবে উপজাতি, আদিবাসী ও পাহাড়ি আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্য নয়। এ সংজ্ঞাগুলো তাদের উপরই প্রযোজ্য যারা অনুন্নত বিচ্ছিন্ন জীবন জীবিকা সহ নিজস্ব আবাস ক্ষেত্রের আদি ও আদিম বাসিন্দা এবং তাদের আচরণে টাবু মান্যতা ও টুটেম বিশ্বাস পালিত হয়। টুটেম হলো প্রাণী ফলমূল ও বস্তু জাত পূর্ব পুরুষের ধারণা, আর টাবু হলো : পূর্ব পুরুষ জাত খাদ্য পানীয় ও স্বগোত্রীয় স্বামী স্ত্রী গ্রহণ করা না করা বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ম নীতি।
ইতিহাস ও স্থানীয় অবাঙালি ঐতিহ্য আলোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ তাদের কারো আদিম পিতৃভূমি নয় এবং তাদের আচার-আচরণেও টাবু ও টুটেম ধারা পালিত হয় না। খাটি অর্থে তাদের আদি বলা ও যায় না। সুতরাং তাত্বিক অর্থে এরা উপজাতি আদিবাসী ও পাহাড়ি তথা আদিম নয়। তবে ব্যবহারিক অর্থে, এরা বাংলাদেশী জাতি বা বৃহৎ বাঙালি জাতিসত্তার বিপরীতে ক্ষুদ্র অবাঙালি জনগোষ্ঠি ও শাখা জ্ঞাতার্থে উপজাতি আখ্যায়িত হতে পারে। যদিও এই অর্থে উপজাতি পরিচয় এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট নয়। আর যদি শাখা জাতি ধরে নেয়াই হয়, তখন এর বিকল্পে আদিবাসী আখ্যা প্রযোজ্য হয় না। পাহাড়ি সংজ্ঞাটিও প্রকৃতিগত বলা সঙ্গত। উপজাতি সংজ্ঞাটি বহুল ব্যবহৃত। চুক্তিতেও তা গৃহিত। এর ভিন্নতা করা জনসংহতি সমিতির পক্ষে চুক্তি ভাঙ্গার পর্যায়ে পড়ে। আসলে আদিবাসী হওয়ার ধারণা সঠিক নয়।
সংশ্লিষ্ট জনগণের কারো কারো মাঝে বর্ণিত সংজ্ঞাত্রয়ের ব্যবহারিক প্রবণতা বিদ্যমান। তাদের কাছে এগুলো একার্থবোধক। রেগুলেশন নং ১/১৯০০ বা পার্বত্য অঞ্চল শাসন বিধিতে, স্থানীয় লোকজনকে কখনো উপজাতি, কখনো আদিবাসী, আর কখনো পাহাড়ি আখ্যায়িত করা হয়েছে। ধারা নং- ৫২ তে এই তিন সংজ্ঞার ব্যবহারে ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠির উল্লেখ আছে। চাকমা ও মগ সম্প্রদায় নিজস্ব নামে উল্লেখিত হয়েছে তবে সংজ্ঞা নামে উল্লেখিত লোকদের কোন সাম্প্রদায়িক নাম নেই। তাই পরিষ্কার নয় যে, কারা উপজাতি, কারা আদিবাসী আর কারা পাহাড়ি জনগোষ্ঠিভুক্ত লোক। তবে এটাই খিচুড়ি ধারণা যে, এই সংজ্ঞাত্রয়ের অবাঙালিদের সবাই অন্তর্ভুক্ত।
[চলবে]

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • Developed by: Sparkle IT