ধর্ম ও জীবন

আহলে বাইত পরিচিতি ও তাদের মর্যাদা

মোঃ আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১০-২০১৮ ইং ০১:০৬:২০ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত

‘আহলে বাইত’ এখানে দু’টি শব্দে একটি প্রিয় নাম। দু’টি শব্দের প্রথমটি হলো আহল, যার অর্থ হলো, পরিবার-পরিজন, বংশধর, সদস্যবৃন্দ বা আপনজনেরা ইত্যাদি। দ্বিতীয় শব্দটি হলো ‘বাইত’ যার অর্থ হলো ঘর। অতএব আহলে বাইতের অর্থ হলো পরিবারের সদস্যবৃন্দ, ঘরের লোক বা বংশধর। পারিভাষিক অর্থে প্রিয় নবী (সা.) এর বংশধর বা পরিবার পরিজনকে ‘আহলে বাইত’ বলে।
পবিত্র কুরআন শরীফে একটি মাত্র স্থানে ‘আহলাল বাইত’ শব্দদ্বয় একত্রে এসেছে। এবং এ আহলাল বাইত দ্বারা আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এর পরিবার পরিজনই উদ্দেশ্য। ‘মাদারিজুল নুবুওয়াত’ নামক কিতাবে আব্দুল হক মুহাদ্দিছে দেহলভী (রহ.) লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যাদের জন্য যাকাত এবং সাদক্বা গ্রহণ করা বা খাওয়া হারাম ঘোষণা করেছেন, তারাই হচ্ছেন ‘আহলে বাইত’। উপরোক্ত গ্রন্থে আরও উল্লেখ করেছেন, ‘আহলে বাইত’ হচ্ছে তিন প্রকারের (ক) বংশগত দিক দিয়ে আহলে বাইত। (খ) অবস্থানগত দিক দিয়ে আহলে বাইত। (গ) জন্মগত দিক দিয়ে আহলে বাইত।
বংশগত আহলে বাইত হলেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এর চাচাগণ। যারা ইসলামের সুমহান বাণী কবুল করেছেন এবং তাদের আওলাদগণ। যেমনÑহযরত আলী (রা.), হযরত জাফর (রা.), হযরত আকীল (রা.), হযরত আব্বাস (রা.) এবং তাদের সন্তানগণ। অবস্থান গত আইলে বাইত হলেন, রাসুল (সা.) এর সম্মানিত জীবন সঙ্গীনিগণ। জন্মগত আহলে বাইত হলেন, রাসুল (সা.) এর ছাহেবজাদা ও ছাহেবজাদীগণ এবং তাদের আওলাদগণ। তবে এখানে আরেকটি অভিমত উল্লেখ করা যেতে পারে। কোনো কোনো তাফসির গ্রন্থের ভাষ্যমতে সাহাবায়ে কেরামগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। তার যৌক্তিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে, রাসুল (সা.) ছিলেন সাহাবায়ে কেরামগণের আত্মার আত্মীয় ও প্রাণাধিক প্রিয়। তাদের জান-মাল, মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততিসহ যাবতীয় সবকিছুর চাইতে রাসুল (সা.) কে অধিক ভালোবাসতেন। রাসুল (সা.) কে তারা ছায়ার মতো অনুসরণ করেছেন। অপর দিকে হযরত নবী করিম (সা.) ছিলেন সাহাবীগণের একজন সুযোগ্য অভিভাবক। তিনি প্রিয় সাহাবীগণ সম্পর্কে উম্মতের উদ্দেশ্যে বলেছেনÑআমার সাহাবীদের সম্পর্কে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো! আমার পরে তোমরা তাদেরকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে না। যারা তাদেরকে ভালোবাসবে, তারা আমাকে ভালোবাসার কারণেই ভালোবাসলো, আর যারা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে, তারা আমার কারণেই এরূপ করলো। যারা তাদেরকে কষ্ট দিলো, তারা আমাকে কষ্ট দিল। অত:পর যারা আমাকে কষ্ট দিল, তারা আল্লাহকে কষ্ট দিলো, যারা আল্লাহকে কষ্ট দিল তাদেরকে আল্লাহ অচিরেই পাকড়াও করবেন। (তিরমিযি)
সাহাবায়ে কেরামগণ যদিও প্রকৃত আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবুও ব্যাপকার্থে আহলে বাইত থেকে একেবারে খালি নয়। আহলে বাইত সম্পর্কে কুরআন শরীফের আয়াত হলো, ‘ইন্নামা ইউরিদুল্লাহু লিইউযহিবা আনকুমুর রিজছা আহলাল বাইতি ও ইউত্বাহহিরাকুম তাত্বহীরা’ (সূরা : আহযাব, আয়াত : ৩৩)
অর্থ : হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ আল্লাহ তা’আলা কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে। এ আয়াতে ‘আহলে বাইত’ বলতে নবী পত্মীগণকে সম্বোধন করা হয়েছে। অপর দিকে এ আয়াতের শব্দগুলিকে বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় নবী-পত্মীগণের সাথে তাদের সন্তান-সন্তনী ও পিতা-মাতা আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ মুসলিম শরীফে হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা রাসুল (সা.) বাড়ি থেকে বাহিরে তাশরিফ নিতে যাচ্ছিলেন। সে সময় তিনি একটি কালো রঙের রুমী চাদর জড়ানো ছিলেন। এমন সময় সেখানে হযরত হাসান (রা.), হযরত হোসাইন (রা.), হযরত ফাতেমা (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) এরা একের পর এক সবাই তাশরিফ আনেন। রাসুল (সা.) সবাইকে ঐ চাদরের ভিতরে প্রবেশ করালেন এবং বললেনÑ আল্লাহুম্মা হা উলাযী আহলে বাইতি। অর্থ, হে আল্লাহ এরাই আমার আহলে বাইত। কুরআন-হাদিস সব মিলিয়ে এটাই স্পষ্ট যে, রাসুল (সা.) এর বংশধর, পুণ্যবতী স্ত্রীগণ, তাদের সন্তান-সন্ততী, পিতা-মাতা, হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান, হোসাইন (রা.) তাদের আওলাদগণ সবই আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত।
আহলে বাইতের মর্যাদা সম্পর্কে কিছু আলোচনা, কুরআন শরীফের আয়াত হচ্ছেÑ‘কুল লা আছআলুকুম আলাইহি আজরান ইল্লাল মাওয়াদ্দাতা ফিল কুররা’ (সূরা : শুরা, আয়াত : ২৩)। অর্থ : হে নবী (সা.) আপনি বলুন, আমি এ ব্যাপারে তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাহি না, তবে নিকটস্থদের ভালোবাসা চাই। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর কোনো কোনো সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) আপনার নিকটস্থ কারা? জবাবে বললেন, হযরত আলী, ফাতেমা ও তাদের সন্তানগণ। এ আয়াতের মর্মার্থ থেকে প্রতীয়মান হয়, আহলে বাইতকে ভালোবাসতে হবে এটা মহান আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ। রাসুল (সা.) বলেছেন আমার পরিবারবর্গ হযরত নূহ (আ.) এর কিস্তির মতো। যারা তাতে আরোহণ করবে তারাই মুক্তি পাবে, আর যারা তাদের থেকে পিছনে রয়ে যাবে তারাই ডুবে যাবে। এ হাদিসের ভাবার্থ হচ্ছেÑযারা আহলে বাইতের সাথে সুসম্পর্ক রাখলো তাদেরকে মহব্বত করলো এরাই নাজাত প্রাপ্ত। অপর পক্ষে, যারা তাদের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করলো, লোভ-লালসা চরিতার্থ করার জন্য তাদেরকে কষ্ট দিলো। প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের জন্য জাহান্নাম খরিদ করলো।
প্রিয় নবী (সা.) নামাযে সিজদারত অবস্থায় হযরত হাসান ও হযরত হোসাইন (রা.) রাসুল (সা.) এর পিঠ মোবারকে চড়ে বসতেন। এরা পড়ে যাবে, কষ্ট পাবে একথা ভেবে হযরত (সা.) সিজদাকে দীর্ঘায়িত করতেন, যতক্ষণ না তারা পিঠ মোবারক থেকে নেমে যেতেন। রাগ-গোস্বার পরিবর্তে হাস্যজ্জ্বল চেহারায় নামাযের সালাম শেষে বলতেন, হাসান আর হোসাইন (রা.) কতইনা উত্তম সাওয়ারী পেয়েছে। আহলে বাইত সম্পর্কে প্রিয় রাসুল (সা.) এর ধারণা এতো নির্মল ও স্পষ্ট ছিলো যে, ওরা কোনো দিন কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য কারো সাথে যুদ্ধ করবেন না। এহেন উদ্দেশ্যে কারো সাথে কোনো দিন সন্ধিও স্থাপন করবেন না। যুদ্ধ বা সন্ধি যাহাই করুন না কেন সবই আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.) এর সন্তুষ্টির জন্যই করবেন।
যেমনÑহাদিস শরীফে এসেছে। রাসুল (সা.) একদিন হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন (রা.) কে ডেকে বললেন, তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে, আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করবো। আর তোমরা যাদের সাথে সন্ধি স্থাপন করবে আমি তাদের সাথে সন্ধি স্থাপন করবো (তিরমিযি)। মহান রাব্বুল আলামীন এ পৃথিবীতে যতো জিন ও ইনছান সৃষ্টি করেছেন এবং করবেন তাদের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন আটটি বেহেস্ত এবং সাতটি দোযখ। সে সকল বেহেস্তের নেতৃত্ব কাদের হাতে থাকবে? যাদের হাতে থাকবে তারাই হলেন সম্মানিত আহলে বাইতের সদস্যবৃন্দ। এ সম্পর্কে আমার প্রিয় নবী (সা.) বলেছেনÑহাসান, আর হোসাইন (রা.) হবেন বেহেস্তি যুবকদের সর্দার এবং তাদের মাতা হযরত ফাতেমা (রা.) হবেন জান্নাতি মহিলাগণের সর্দার। আহলে বাইতের মর্যাদার দৃষ্টান্ত এর চাইতে বড় আর কি হতে পারে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT