ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১০-২০১৮ ইং ০১:০৭:৫৮ | সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
সূরা : বাক্বারাহ
ইসলাম ও হযরতের সবচাইতে বড় শত্রু আবু জাহল এবং আখনাস ইবনে শোরাইকও লোকচক্ষুর অগোচরে কুরআন শুনত। কুরআনের অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গি এবং অনন্য রচনারীতির প্রভাবে প্রভান্বিত হতো। কিন্তু গোত্রের লোকেরা যাখন তাদেরকে বলতো যে, তোমরা যখন এ কালামের গুণ সম্পর্কে এতোই অবগত এবং একে অদ্বিতীয় কালামরূপে বিশ্বাস কর, তখন কেন তা গ্রহণ করছ না? প্রত্যুত্তরে আবু জাহল বলতো, তোমরা জান যে, বনি আবদে মনাফ এবং আমাদের মধ্যে পূর্ব থেকেই বিরামহীন শত্রুতা চলে আসছে। তারা যখন কোনো কাজে অগ্রসর হতে চায়, তখন আমরা তার প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে বাধা দেই। উভয় গোত্রই সমপর্যায়ের। এমতাবস্থায় তারা যখন বলছে যে, আমাদের মধ্যে এমন এক নবীর আবির্ভাব হয়েছে, যাঁর নিকট আল্লাহর বাণী আসে, তখন আমরা কিভাবে তাদের মোকাবেলা করব, তাই আমার চিন্তা। আমি কখনও তাদের একথা মেনে নিতে পারি না।
মোটকথা কুরআনের এ দাবী ও চ্যালেঞ্জ সারা আরববাসী যে পরাজয় বরণ করেই ক্ষান্ত হয়েছে তাই নয়, বরং একে অদ্বিতীয় ও অনন্য বলে প্রকাশ্যভাবে স্বীকারও করেছে। যদি কুরআন মানব রচিত কালাম হতো, তবে সমগ্র আরববাসী তথা সমগ্র বিশ্ববাসী অনুরূপ কোনো না কোনো একটি ছোট সূরা রচনা করতে অপারগ হতো না এবং এ কিতাবের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা স্বীকারও করতো না। কুরআন ও কুরআনের বাহক পয়গাম্বরের বিরুদ্ধে জান-মাল, ধন-সম্পদ, মান-ইজ্জত সব কিছু ব্যয় করার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলো কিন্তু কুরআনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে দুটি শব্দও রচনা করতে কেউ সাহসী হয়নি।
এর কারণ এই যে, যে সমস্ত মানুষ তাদের মুর্খতাজনিত কার্যকলাপ ও আমল সত্ত্বেও কিছুটা বিবেকসম্পন্ন ছিলো মিথ্যার প্রতি তাদের একটা সহজাত ঘৃণাবোধ ছিলো। কুরআন শুনে তারা যখন বুঝতে পারলো যে, এমন কালাম রচনা আমাদের পক্ষ আদৌ সম্ভব নয়, তখন তারা কেবল একগুয়েমীর মাধ্যমে কোনো বাক্য রচনা করে তা জনসমক্ষে তুলে ধরা নিজেদের জন্য লজ্জার ব্যাপার বলে মনে করতো। তারা জানতো যে, আমরা যদি কোনো বাক্য পেশ করিও, তবে সমগ্র আরবের শুদ্ধভাষী লোকেরা তুলনামূলক পরীক্ষায় আমাদেরকে অকৃতকার্যই ঘোষণা করবে এবং এজন্য অনর্থক লজ্জিত হতে হবে। এজন্য সমগ্র জাতিই চুপ করে ছিলো। আর যারা কিছুটা ন্যায়পথে, চিন্তা করেছে, তারা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে নিতেও কুণ্ঠিত হয়নি যে, এটা আল্লাহর কালাম।
এসব ঘটনার মধ্যে একটি হচ্ছে যে, আরবের একজন সরদার আস’সাদ ইবনে যেরার হযরতের চাচা আব্বাস (রা.) এর নিকট স্বীকার করেছেন যে, তোমরা অনর্থক মুহাম্মদ (সা.) এর বিরুদ্ধাচারণ করে নিজেদের ক্ষতি করছ এবং পারস্পারিক সম্পর্কচ্ছেদ করছ। আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রাসুল এবং তিনি যে কালাম পেশ করেছেন তা আল্লাহর কালাম এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই।
তৃতীয় কারণ : তৃতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, কুরআন কিছু গায়েবী সংবাদ এবং ভবিষ্যতে ঘটবে এমন অনেক ঘটনার সংবাদ দিয়েছে, যা হুবহু সংঘটিত হয়েছে। যথাÑকুরআন ঘোষণা করেছে, রোম ও পারস্যের যুদ্ধে প্রথমতঃ পারস্যবাসী জয়লাভ করবে এবং দশ বছর যেতে না যেতেই পুনরায় রোম পারস্যকে পরাজিত করবে। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর মক্কার সরদারগণ হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর সাথে এ ভবিষ্যদ্বাণীর যথার্থতা সম্পর্কে বাজী ধরল। শেষ পর্যন্ত কুরআনের ভবিষ্যদ্বানী অনুযায়ী রোম জয়লাভ করলো এবং বাজীর শর্তানুযায়ী যে মাল দেয়ার কথা ছিলো, তা তাদের দিতে হলো। রসুলুল্লাহ (সা.) অবশ্য এ মাল গ্রহণ করেন নি। কেননা, এরূপ বাজী ধরা শরীয়ত অনুমোদন করে না। এমন আরো অনেক ঘটনা কুরআনে উল্লেখিত রয়েছে, যা গায়েবের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং নিকট অতীতে হুবহু ঘটেছেও।
চতুর্থ কারণ : চতুর্থ কারণ এই যে, কুরআন শরীফে পূর্ববর্তী উম্মত, শরীয়ত ও তাদের ইতিহাস এমন পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সে যুগের ইহুদী-খ্রিস্টানদের পন্ডিতগণ, যাদেরকে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের বিজ্ঞ লোক মনে করা হতো, তারাও এতোটা অবগত ছিলো না। রাসুল (সা.) এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলো না। কোনো শিক্ষিত লোকের সাহায্যও তিনি গ্রহণ করেন নি। কোনো কিতাব কোনো দিন স্পর্শও করেন নি। এতদসত্ত্বেও দুনিয়ার প্রথম থেকে তাঁর যুগ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ববাসীর ঐতিহাসিক অবস্থা এবং তাদের শরীয়ত সম্পর্কে অতি নিখুঁতভাবে বিস্তারিত আলোচনা করা আল্লাহর কালাম ব্যতিত কিছুতেই তাঁর পক্ষে সম্ভব হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা’আলাই যে তাঁকে এ সংবাদ দিয়েছেন এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
পঞ্চম কারণ : পঞ্চম কারণ হচ্ছে এই যে, কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মানুষের অন্তর্নির্হিত বিষয়াদি সম্পর্কিত যেসব সংবাদ দেয়া হয়েছে পরে সংশ্লিষ্ট লোকদের স্বীকারোক্তিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, এ সব কথাই সত্য। একাজও আল্লাহ তা’আলাইর কাজ, তা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিলো না।
ষষ্ঠ কারণ : ষষ্ঠ কারণ হচ্ছে যে, কুরআনে এমন সব আয়াত রয়েছে যাতে কোনো সম্প্রদায় বা কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, তাদের দ্বারা অমুক কাজ হবে না; তারা তা করতে পারবে না। ইহুদীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, যদি তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বলেই মনে করে, তবে তারা নিশ্চয়ই তাঁর নিকট যেতে পছন্দ করবে। সুতরাং এমতাবস্থায় তাদের পক্ষে মৃত্যু কামনা করা অপছন্দীয় হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে এরশাদ হচ্ছে ‘তারা কখনও তা চাইবে না’।
মৃত্যু কামনা করা তাদের পক্ষে কঠিন ছিলো না। বিশেষ করে ঐ সমস্ত লোকদের জন্য যারা কুরআনকে মিথ্যা বলে অভিহিত করতো। কুরআনের এরশাদ মোতাবেক তাদের মৃত্যু কামনা করার ব্যাপারে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ ছিলো না। ইহুদীদের পক্ষে মৃত্যু কামনায় (মোবাহালা)
এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে মুসলমানদেরকে পরাজিত করার অত্যন্ত সুবর্ণ সুযোগ ছিলো। কুরআনের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে সঙ্গে সঙ্গেই তাতে সম্মত হওয়া তাদের পক্ষে উচিত ছিলো। কিন্তু ইহুদি ও মুশরিকরা মুখে কোরআনকে যতই মিথ্যা বলুক না কেন, তাদের মন জানতো যে, কুরআন সত্য, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। সুতরাং মৃত্যু কামনার চ্যালেঞ্জে সাড়া দিলে সত্য-সত্যই তা ঘটবে। এজন্য তারা কুরআনের এ প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সাহস পায়নি এবং একটি বারের জন্যও মুখ দিয়ে মৃত্যুর কথা বলে নি। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT