ধর্ম ও জীবন

ইসলামে সংখ্যালঘুর অধিকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১০-২০১৮ ইং ০১:০৯:২৭ | সংবাদটি ৫৩ বার পঠিত

মুসলিম সমাজে বসবাসরত সংখ্যালঘুদেরকে ইসলাম কতিপয় বিষয়ের অধিকারী ও নিশ্চয়তা প্রদান করে। মহান আল্লাহ্ কুরআন মাজীদে এ অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য মুসলিমদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নবী মুহাম্মদ (স.) ও সংখ্যালঘুদের কতিপয় অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করছেন। প্রকৃতপক্ষে এ নিশ্চয়তার লক্ষ-উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা এবং তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তাদের অধিকারগুলো হচ্ছে :
ইসলামের মূল বিষয় হলো তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতে বিশ্বাস। এ তিনটি বিষয় মেনে নেয়ার পর অন্য যে কোন শরীয়ত (যেহেতু রহিত হয়ে গেছে) মেনে নেয়ার সুযোগ নেই। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রসূলের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন শরীয়ত প্রদান আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় করুণা। তাই পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে, “আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য শরীয়ত ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন কিন্তু তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তা দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করতে চান” এ আয়াতটিতে আসমানী কিতাবের অনুসারী অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্মের বিধান পালনের ধারণা ব্যক্ত করা হয়েছে এবং একত্ববাদের অধীনে আল্লাহ যে বিভিন্ন শরীয়ত বা পথ পাঠিয়েছেন তার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। শরীয়তের এই ভিন্নতা মহান আল্লাহর অলৌকিক বিষয়।
মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ মানুষের মধ্যে এমন সব গুণ দান করেছেন যার মাধ্যমে সে সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। আর এ কারণে আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা ও পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতা দিয়েছেন। এ গুণের কারণেই সে স্বেচ্ছায় ইসলামে দীক্ষিত হবে, তাকে জোর করে ইসলামে দীক্ষিত করার প্রয়োজন নেই। আর এ কারণেই মহান আল্লাহ বলেছেন “দীনের ব্যাপারে কোনো জোর জবরদস্তি নেই” কাউকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য বাধ্য করা যাবে না। স্বাধীনভাবে ধর্ম বা বিশ্বাস ধারণের অধিকার ইসলামে স্বীকৃত। ইসলাম মূলত পরধর্ম সহিষ্ণু। মুসলিম সমাজে বসবাসরত সংখ্যালঘু নাগরিক যদি ইসলাম গ্রহণ না করে, তাকে জোর করে মুসলিম বানানোর অধিকার কোনো ব্যক্তি বা সরকারের নেই। তবে ইসলামের সৌন্দর্য তাদের সামনে তুলে ধরা যাবে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে-‘তুমি কি মানুষদেরকে মুমিন হওয়ার জন্য জবরদস্তি করবে’? তিনি আরো বলেন : ‘আল্লাহকে ছেড়ে তারা যাদের ডাকে, তোমরা তাদেরকে গালি দিও না। তাহলে তারা সীমালঙ্গন করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকেও দিবে। উমর (রা.) জনৈক খ্রিস্টান বৃদ্ধা মহিলাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলে সে মহিলা উত্তরে বলেছিল ‘আমি মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধা। শেষ জীবনে নিজের ধর্ম কেন ত্যাগ করবো? উমর (রা.) এ কথা শুনেও তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেননি বরং ‘ধর্মের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। এ আয়াতটি পাঠ করে তার বিশ্বাসের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেন। কারণ ঈমান বা বিশ্বাসের সম্পর্ক বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে নয়। জিহাদ বা কিতাল কিংবা শক্তি প্রয়োগ দ্বারা বাহ্যিক অঙ্গ-পত্যঙ্গ প্রভাহিত হয়। সুতরাং মুসলিম সমাজে বসবাসরত সংখ্যালঘুরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনে স্বাধীন। এতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই।
উপাসনালয়ের নিরাপত্তা বিধান : উপাসনা অর্থ প্রার্থনা, আরাধনা, পূজা, ভগবৎ চিন্তা, উপকার প্রত্যাশায় অপরের সেবা বা মনোতুষ্টি সাধনা-চেষ্টা। উপাসনালয় অর্থ আরাধনা-পূজা-প্রার্থনার স্থান। বিশ্বে যেমন বিভিন্ন ধর্ম রয়েছে তেমনি বিভিন্ন উপাসনালয়ও রয়েছে। যেমন, মুসলিমদের মসজিদ, হিন্দুদের মন্দির, খিস্টালদের গির্জা, বৌদ্ধদের প্যাগোডা ও ইহুদীদের সিনাগগ্।
ইসলাম যেভাবে অন্য ধর্মের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়, তেমনি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের অবস্থিতিও স্বীকার করে। মুসলিম অধ্যুষিত দেশে বিভিন্ন অনুসারীদের বসবাস যেমন ইসলামে স্বীকৃতি তেমনি নিজস্ব উপাসনালয়ে উপাসনা করার নিরংকুশ অধিকারও স্বীকৃত। ইসলাম তাদের উপাসনালয়ের নিরাপত্তা বিধানেও বদ্ধপরিকর। তাই কুরআনে বলা হয়েছে “আল্লাহ যদি মানব জাতির এক দলকে অন্যদল দ্বারা প্রতিহত না করতেন তাহলে বিধ্বস্থ হয়ে যেত খ্রিস্টান সংসারবিরাগীদের উপাসনাস্থান, গির্জা, ইহুদীদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ-যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। সুতরাং মুসলিম দেশে বসবাসরত ভিন্ন ধর্মের অনুসারী তাদের ধর্ম পালনের জন্য ধর্মীয় উপাসনালয় তৈরী ও তা সংরক্ষণ করার অধিকার লাভ করে। এ ক্ষেত্রে মুসলিমদের বা সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় সংরক্ষণের যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
উপাসনা করার সুযোগ প্রদান : মুসলিম সমাজের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের ধর্ম অনুযায়ী উপাসনা করার পূর্ণ অধিকার লাভ করে। তাদের ধর্মে যে সব বিধি-বিধান স্বীকৃত সে সব পালন করার নিশ্চয়তা ইসলাম তাদের প্রদান করে। সায়্যিদ আমীর আলী বলেন : “ইু ঃযব ষধংি ড়ভ ওংষধস ষরনবৎঃু ড়ভ পড়হংপরবহপব ধহফ ভৎববফড়স ড়ভ ড়িৎংযরঢ় বিৎব ধষষড়বিফ ধহফ মঁধৎধহঃববফ ঃড় ঃযব ভড়ষষড়বিৎং ড়ভ বাবৎু ড়ঃযবৎ পৎববফ ঁহফবৎ গড়ংষবস ফড়সরহরড়হ.” একদল মুসলিম দার্শনিক দেশে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতার সীমা-পরিসীমা নির্ধারণ করতে গিয়ে অভিমত দিয়েছেন যে, তারা শুকরের মাংস, মদ এবং তাদের ধর্মে এ ধরনের যা কিছু বৈধ তা পান ও ভক্ষণ করতে পারবে। মুসলিম সরকার তাদেরকে এগুলো ভক্ষণ ও পান করতে বাধা দান করার অধিকারী নয়। মুসলিম দার্শনিকগণ সংখ্যালঘুদের এ ধর্মীয় স্বাধীনতা তখন দিয়েছিলেন যখন বিশ্বের অর্ধেক জুড়ে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল, মুসলিম শাসক ও গভর্নরগণ তাদের ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের জন্য এ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের পূর্ণ ধর্মীয় অধিকার লাভ করেছিল। ইসলামের এ অসাম্প্রদায়িক চেতনার দ্বারা বিশ্বের অনেক জাতিই প্রভাবিত হয়ে আরবদেরকে স্বাগত জানায়। যেমন নিকট প্রাচ্য তুরস্ক ও তার আশেপাশের ইহুদীগণ তৎকালীন মুসলমানদেরকে তাদের দেশে স্বাগত জানিয়েছিল, মুসলমানরা তাদেরকে পূর্ববর্তী শাসকদের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তাই চিন্তাবিদ উঁৎধহ বলেন : “ঔবংি রহ ঃযব হবধৎবংঃ ঊধংঃ ডবষপড়সবফ ঃযব অৎধনং ডযড় ষরনবৎধঃবফ ঃযবস ভৎড়স ঃযব ড়ঢ়ঢ়ৎবংংরড়হ ড়ভ ঃযবরৎ ঢ়ৎবারড়ঁং ৎঁষবৎং. টহফবৎ ঃযব ধঁঃযড়ৎরঃু ড়ভ ঃযব অৎধনং, ঃযবু নবপড়সব বহলড়ু পড়সঢ়ষবঃব ভৎববফড়স রহ ঃযবরৎ ষরাবং ধহফ ঢ়ৎধপঃরপরহম ঃযবরৎ ৎবষরমরড়ঁং ৎরঃঁধষং. ঋঁৎঃযবৎসড়ৎং, ঈযৎরংঃরধহং বিৎব ভৎবব রহ পবষবনৎধঃরহম ঃযবরৎ ভবংঃরাধষং ড়ঢ়বহষু ধহফ ঃযব পযৎরংঃরধহং ঢ়রষমৎরসং ঁংবফ ঃড় পড়সব রহ সঁষঃরঃঁফবং ঃড় ারংরঃ ঈযৎরংঃরধহ ংযৎরহবং রহ চধষবংঃরহব. জধঃযবৎ, ঃযব ঈযৎরংঃরধহং যিড় ফড় হড়ঃ নবষড়হম ঃড় ঃযব পযঁৎপয ড়ভ ঃযব ইুুধহঃরহব ংঃধঃব যিড় ঁংবফ ঃড় ংঁভভবৎ ভৎড়স সধহু ভড়ৎসং ড়ভ ড়ঢ়ঢ়ৎবংংরড়হ ড়হ ঃযব যধহফং ড়ভ ঢ়ধঃৎরধৎপযং ড়ভ ঈড়হংঃধহঃরহব, ঔবৎঁংধষবস, অষবীধহফৎরধ ধহফ অহঃধশুধ, নবপড়সব হড়ি ভৎবব ধহফ ংধভব ঁহফবৎ ধঁঃযড়ৎরঃু ড়ভ গঁংষরসং. মোটকথা তৎকালীন বিভিন্ন জাতি তাদের ধর্ম-কর্ম পালনে মুসলিমদের থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছিল।
সুসম্পর্ক ও সহানুভূতি ব্যবহারের নিশ্চয়তা : মহান আল্লাহ সংখ্যালঘুদের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি ও তা বজায় রাখার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। সংখ্যালঘুদের নারী-পুরুষ, শিশু, শ্রমিক, বৃদ্ধ, রুগ্ন ও প্রতিবন্ধী মানুষ যারা মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকারক নয়, ইসলাম তাদের প্রতি মানবিক ও ন্যায় আচরণের অনুপ্রেরণা যোগায়। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি, তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিস্কার করেনি, তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন, এ নির্দেশনা রসূলুল্লাহ স. ও তাঁর অনুসারীগণ বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।
ভিন্নধর্মের মানুষের সাথে মুহাম্মদ স. সহানুভূতিশীল ব্যবহার করতেন এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। ভিন্নধর্মের কোন প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তিনি তাকে দেখতে যেতেন এবং তার মাথার কাছে যেয়ে বসতেন। কোনো ইহুদী আমন্ত্রণ জানালেও তিনি তার আমন্ত্রণে সাড়া দিতেন। তিনি ভিন্নধর্মের অনুসারীকে উপহার দিতেন এবং তাদের কাছ থেকে উপহার গ্রহণ করতেন। আলেকজান্দ্রিয়ার গভর্নর এবং মিসরে বায়জান্টাইন সম্রাটের ভাইসরয় মুকাওকিস কর্তৃক প্রেরিত দু’জন তরুণী, কিছু কাপড় ও সওয়ারীর জন্য একটি খচ্চর উপহার হিসেবে গ্রহণ তাঁর আন্তঃধর্মীয় সুসম্পর্ক সৃষ্টির উজ্জ্বল প্রমাণ। তুরুণীদের একজন হলেন মারিয়ায়ে কিবতীয়া এবং অপরজন হলেন শিরিন। খচ্চরটির নাম দুলদুল। হুনায়েনের যুদ্ধে রসূলুল্লাহ স. এটির উপর আসীন ছিলেন।
সুবিচার লাভের অধিকার ও অত্যাচার-নিপীড়ন থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার : মুসলিম দেশে সংখ্যালঘু নাগরিকরা ন্যায়বিচার লাভের অধিকারী। এ অধিকার তাদেরকে মহান আল্লাহ প্রদান করেছেন। মুসলিম রাষ্ট্রে তারা ন্যায়বিচার লাভ করতে পারে দুটি উপায়ে। তারা বিচার পেতে পারে মুসলিম দেশে প্রচলিত ইসলামী আইনের আওতায়, যদি ইসলামী আইন চালু থেকে অথবা তাদের স্ব স্ব ধর্মের আইন অনুযায়ী। বর্তমানে মুসলিম দেশে যদি সংখ্যালঘুদের ব্যাক্তিগত বিষয়ে মোকাদ্দমা উপস্থিত হয় তবে মুসলিম সরকার তাদের ধর্ম অনুযায়ী তা ফায়সালা করার ব্যবস্থা করবেন। যেমন মহানবী স. মদ্য পান ও শুকরের মাংস ভক্ষণ মুসলমাদের জন্য হারাম করে শাস্তি নির্ধারণ করেছিলেন, কিন্তু সংখ্যালঘুদেরকে এ ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তিনি বিয়ের মত অন্যান্য ব্যাক্তিগত ব্যাপারে কখনও হস্তক্ষেপ করেননি। তাদের ধর্ম অনুযায়ী যে বিয়ে বৈধ ছিল তা তিনি বহাল রেখেছিলেন।
সামাজিক সংহতি বজায় রাখার নিশ্চয়তা : কোনো জাতি বা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সামাজিক সংহতি অপরিহার্য মহানবী স. মদীনায় হিজরতের পর সেখানে সামাজিক সংহতি স্থাপন ও তা সংরক্ষণে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি মদীনার বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষদেরকে নিয়ে এক সাধারণ জাতি গঠন করেন। সেখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণ মাত্রায় ভোগ করেছিল। তিনি তৎকালীন সমাজের মানুষদের মাঝে আর্থ সামাজিক বৈষম্য দূর করার জন্য যাকাত ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন (সম্পদশালীদের) ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক আল্লাহ অন্যত্র বলেন ‘যাকাত কেবল ফকীর, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন (মুআল্লাফাতুল কুলূব) তাদের হক এবং তা দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য এ আয়াতে ‘ফকীর’ বলতে দরিদ্র ও ‘মিসকীন’ বলতে অভাবী শ্রেণীকে বুঝানো হয়েছে। আর ‘মুআল্লাফাতুল কুলূব’ বা যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন দ্বারা কিছু মুসলমান আর কিছু ভিন্নধর্মের মানুষকে বুঝানো হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে কিছু ছিল চরম অভাবী ও নও মুসলিম। এদের চিত্তাকর্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয় ইসলামী বিশ্বাস পাকাপোক্ত হওয়ার জন্য। আর ভিন্নধর্মের মানুষকে দেওয়া হতো তাদেরকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য। মোটকথা ‘মুআল্লাফাতুল কুলূব’ পরিভাষায় মুসলিম ও ভিন্নধর্মের মানুষ উভয় শ্রেণীই অন্তর্ভুক্ত। মহানবী স. চরম অভাবী মুসলিম ও নও মুসলিমকে এবং ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য অন্যান্য ধর্মের মানুষকে ‘মুআল্লাফাতুল কুলূব’ খাতের মাধ্যমে যাকাত দিতেন। কিন্তু তাঁর ইনতিকালের পর ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার এ খাতটির প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়। তাই উমর রা,. হাসান বসরী ইমাম আবু হানাফী ও ইমাম মালিক র.-এর মতে, উল্লিখিত প্রেক্ষাপটে ‘মুআল্লাফাতুল কুলূব’ এর মাধ্যমে যাকাত পাওয়ার খাতটি রহিত হয়ে যায়। কিন্তু ইমাম আয-যুহরী, কাযী আব্দুল ওহাব ইব্ন আরাবী, ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতে হুকুমটি রহিত নয়, বরং আবু বকর ও উমর রা.-এর শাসনামলে এ খাতটির প্রয়োজন ছিল না বলে বন্ধ করে দেয়া হয়। ভবিষ্যতে যখনই প্রয়োজন হবে তখনই উল্লিখিত খাতের যাকাত দেয়া যাবে। ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির জীবন বিধান হিসেবে সামাজিক সংহতির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য নিজের মতো অন্যকে ভালোবাসতে এবং অপরের কল্যাণে ত্যাগ স্বীকার প্রেরণা। ইসলাম সংখ্যালঘুদের সাথেও সদাচরণ ও শিষ্টাচারের নির্দেশনা দেয়। রসূলুল্লাহ্ স. বলেছেন “যে ব্যাক্তি কোনো যিম্মী (অমুসলিম)কে কষ্ট দিবে আমি কিয়ামতের দিন তার প্রতিপক্ষ হবো” রসূলুল্লাহ্ স. এর চরিত্রে কুরআনের দিক-নির্দেশনার প্রভাব এমনভাবে পড়েছে যে, তিনি কেবল মানুষ কেন, বরং সকল প্রাণীর সাথেও সদ্ব্যবহার করেছেন এবং সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। রসূলুল্লাহ্ স. বলেন, “সকল সৃষ্টি আল্লাহ্র পরিবার। সেই আল্লাহ্র অধিক প্রিয় যে আল্লাহ্র পরিবারকে ভালোবাসে”। তিনি আরো বলেন, ‘মানুষের জন্য তা-ই ভালবাসবে যা নিজের জন্য ভালোবাস, তবেই মুসলিম হবে। তিনি অন্যত্র বলেন, ‘পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া কর, তবে আসমানে যিনি আছেন তিনি (আল্লাহ) তোমাদের উপর দয়া করবেন। ইসলাম দয়া-মায়া, ভালোবাসা, ¯েœহ-শ্রদ্ধা, কল্যাণ কামনা, সহমর্মিতা, পরোপকার, জনসেবা, দানশীলতাসহ মানবকল্যাণমুখী সব ইতিবাচক কর্মকান্ডের মাধ্যমে সামাজিক সংহতির অনুপ্রেরণা জোগায়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT