ধর্ম ও জীবন

কওমি সনদের স্বীকৃতিতে কী লাভ

হুমায়ুন কবির প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১০-২০১৮ ইং ০১:১৩:১৯ | সংবাদটি ১৬৬ বার পঠিত

কওমি মাদরাসা মূলত ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ মাদরাসার আলোকে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা। এখানে কোরআন-হাদিসের মূল ধারার শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশে প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার কওমি মাদরাসা রয়েছে। কওমি মাদরাসায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ২০০৯ সাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী আলেমদের সঙ্গে যে আলোচনার সূত্রপাত করেন, সেটি ২০১০ সালে গ্রহণ করা শিক্ষানীতিতেও স্থান পায়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদরাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। সে সময় কওমি শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৩ সালে কওমি সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নে আল্লামা আহমদ শফী (দা.বা.)-এর নেতৃত্বে কমিশন গঠন করে সরকার।
বর্তমানে বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসা, কওমি মাদরাসা ও স্বতন্ত্র বা প্রাইভেট মাদরাসা এ তিন ধারার মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে মাদরাসা শিক্ষার সূচনা থেকে এ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো ধারা ছিল না। ১৭৮০ সালে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার ধারা এবং ১৯০১ সালে চট্টগ্রাম দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গে কওমি মাদরাসা ধারার প্রচলন হয়। আর ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৬৬ সালের ১৩ মে। এটি প্রতিষ্ঠা করেন কাসেম নানুতবি (রহ.)। সঙ্গে ছিলেন মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি, হাজি সায়িদ আবিদ হুসাইন (রহ.) প্রমুখ।
কওমি সনদের স্বীকৃতিতে কী লাভ :
১. আদমশুমারিতে তাদের শিক্ষিত গণনা করা হবে।
২. যারা বিদেশ থেকে অনার্স করে আসে, তারা দাওরায়ে হাদিস দিয়ে মাস্টার্স করার সুবিধা পাবে।
৩. বিদেশে লেখাপড়া ও চাকরির ক্ষেত্রে তাদের মূল্যায়ন হবে।
৪. আলিয়া মাদরাসায় ফাজিল শেষ করে দাওরায়ে হাদিস দিয়ে মাস্টার্স করতে পারবে।
৫. খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিবাহের কাজি নিয়োগের সরকারি পদে আবেদন করতে পারবে।
৬. ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন পদে আবেদন করতে পারবে।
৭. বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অফিসার পদে আবেদন করতে পারবে।
৮. বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংকে ‘মুরাকিব’ পদে আবেদন করতে পারবে।
৯. বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ধর্মীয় শিক্ষক হতে পারবে।
১০. বিভিন্ন উন্নত মানের হোটেলে আরবি থেকে অনুবাদের পদে আবেদন করতে পারবে।
১১. নিবন্ধনে অনুমতি প্রদানের শর্তে আলিয়া মাদরাসা ও কলেজে ইসলামী বিষয়ের প্রভাষক হতে পারবে। তেমনি ইবতেদায়ি ও প্রাইমারি এবং হাই স্কুলের শিক্ষক হতে পারবে।
১২. সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ধর্মীয় শিক্ষক হতে পারবে।
১৩. ডাবল মাস্টার্স, এমফিল ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ হবে, যদি স্পেশাল বিজ্ঞপ্তি বা বিবেচনা করা হয়। অন্যথায় নিম্নস্তরের মান প্রয়োজন হবে।
সনদের স্বীকৃতি নেওয়া কি আট মূলনীতি বিরোধী?
কওমি মাদরাসার আট মূলনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাতে চারটি মূলনীতিই (১, ৬, ৭, ৮) মাদরাসার আয়ের ব্যাপারে। তথা মাদরাসার আয় যেন মাদরাসার তাওয়াক্কুলের বিপরীত ও নিয়ন্ত্রণের কারণ না হয়। প্রাক-ব্রিটিশ আমলের ওয়াক্ফ সম্পত্তির বিপরীতে সাধারণ মানুষের অনুদানকে গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। আর দ্বিতীয় মূলনীতিতে ছাত্রদের আবাসিক হওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর তিন নম্বর মূলনীতি হলো, পরিচালক যেন আমানতদার ও ন্যায়পরায়ণ হয়। তাই শুরার মাধ্যমে মাদরাসা পরিচালনা করার জন্য বলা হয়েছে। চার ও পাঁচ নম্বর মূলনীতিতে শিক্ষক ও সিলেবাসের ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা যেন দ্বিনদার ও সমমনা হয় এবং পুরো সিলেবাস যথাসময়ে শেষ করে।
উল্লিখিত মূলনীতিতে সরকারের নির্দিষ্ট অনুদান গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আলিয়া মাদরাসায় যেভাবে পর পর ২৬ জন খ্রিস্টানকে অধ্যক্ষ বানানো হয়েছিল, এমনটি যেন কওমি মাদরাসার ক্ষেত্রে না হয়। এদিকে তাঁদের লক্ষ ছিল। তাই কোনো মূলনীতি সনদের সরকারি স্বীকৃতির বিরুদ্ধে নেই। কারণ এটা নাগরিক অধিকার। আরেকটি বিষয় হলো-সনদ নেওয়া-দেওয়া দেওবন্দেও চালু রয়েছে। কারণ যখন কাসেম নানুতবি (রহ.) মাদরাসা চালু করেছিলেন, তখন কাগজের কোনো সনদ দেওয়া হতো না। এখন তো প্রতিটি মাদরাসায় একাডেমিক সনদ দেওয়া হয়, তা জ্ঞানের স্বীকৃতি ও সম্মানের সার্টিফিকেট। তাই সনদ দেওয়া ও নেওয়া সেই আট মূলনীতির বিপরীত নয়। সনদ দিতে বা নিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি নয়। যেমন-বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের টাকাও গ্রহণ করে, আবার সনদও গ্রহণ করে। কিন্তু তা স্বায়ত্তশাসিত হওয়ার কারণে নিজেদের সিলেবাস নিজেরাই করে। তাতে সরকারের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে কওমি মাদরাসা যদি সরকার থেকে মাসিক বেতন নেয়, তখন তা আট মূলনীতির বিপরীত হবে। তখন কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণের কথা চলে আসবে।
কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা রাখতে করণীয়
১) কওমি মাদরাসার নেসাব ও নেজামে তালিমে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
২) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা সম্পূর্ণভাবে অক্ষুণœ রাখতে হবে।
৩) মাদরাসা পরিচালনা পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
৪) কওমি মাদরাসা কখনো এমপিওভুক্ত হবে না।
৫) কোনো মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এ বিষয়ে নীতিমালা প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট (কওমি মাদরাসা স্বাধীন) কর্তৃপক্ষ প্রণয়ন করবে।
৬) প্রচলিত কওমি মাদরাসা বোর্ডগুলো তাদের নিজ নিজ আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT