পাঁচ মিশালী

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১০-২০১৮ ইং ০১:১১:০০ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত

সঙ্গীতের সুর মুর্চ্ছনায় আলোড়িত হয় না এমন মানুষ আক্ষরিক অর্থেই বিরল। সাক্ষর নিরক্ষর সকলের কাছেই সঙ্গীত তাই সমাদৃত। সুরের আবেদন সর্বজনীন। তাই বিশ্বের সর্বত্রই সেই আদিকাল থেকে সুর ও সঙ্গীতের চর্চা ও সাধনা হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশেরও রয়েছে গৌরবজনক ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের সোনালী অধ্যায়ে সমগ্র উপমহাদেশে অমর সুরশিল্পি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মরণীয় হয়ে আছেন। কিংবদন্তী তুল্য এই সুর¯্রষ্টা শুধু ভারত ও বাংলাদেশে নয়-পাশ্চাত্যের সঙ্গীত ভুবনেও সুপরিচিত। ৬ সেপ্টেম্বর অমর এই সুর শিল্পির মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭২ সালের এই দিনে তিনি ভারতের মধ্য প্রদেশের মাইহারে মৃত্যুবরণ করেন।
সঙ্গীত জগতে নিজস্ব একটি ঘরানার উদ্ভাবক আলাউদ্দিন খাঁর জন্ম আনুমানিক ১৮৬২ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। সঙ্গীত সাধনার ক্ষেত্রে এই জেলার পৃথক সুনাম রয়েছে। অনেক গুণী সঙ্গীতজ্ঞের এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সাধকের জন্ম হয়েছে এই জেলায়। এই জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন আলাউদ্দিন খাঁ। তাঁর বাবা সবদর হোসেন খাঁ ওরফে সদু খাঁ-ও ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ। পারিবারিক ঐতিহ্য ধারণ করেই আলাউদ্দিন খাঁ সমগ্র উপমহাদেশে এবং পাশ্চাত্যেও সুখ্যাতি লাভ করেন।
আলাউদ্দিন খাঁ’র সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয় বাল্যকালে। প্রথম গুরু অগ্রজ ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ। সুরের সঙ্গে ছিল তাঁর নাড়ির বন্ধন। তাই মাত্র দশ বছর বয়সেই গানের টানে তিনি ঘর ছাড়েন। যোগ দেন এক যাত্রাদলের সঙ্গে। ঘুরে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামে। ঐ সময় তিনি জারি, সারি, ভাটিয়ালি, কীর্তন, পাঁচালি প্রভৃতি গানের সঙ্গে পরিচিত হন। এক সময় ছুটে যান কলকাতায়। ওখানে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন সঙ্গীত সাধক গোপাল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য্যরে। গুরু তাঁকে প্রথমেই একটি শর্ত দেন। কমপক্ষে বারো বছর সেখানে থেকে তাঁকে সঙ্গীত সাধনা করতে হবে। মেনে নিয়েই শুরু হলো শিষ্যের সাধনা। কিন্তু সাত বছরের মাথায় গোপাল কৃষ্ণ মারা যান। শোকাহত আলাউদ্দিন খাঁ তখন কণ্ঠ সঙ্গীত সাধনা ছেড়ে যন্ত্র সঙ্গীতে আকৃষ্ট হন। সঙ্গীত পরিচালক অমৃত লাল দত্ত ওরফে হাবু দত্তের কাছে বাঁশি, সেতার, পিকলু, ম্যা-োলিন, বেঞ্জু ইত্যাদি বাজানো শিখেন। এই সময়ে তিনি বিদেশী এক ব্যা- মাস্টারের নিকট পাশ্চাত্য রীতির সঙ্গীত কলা সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করেন। এ ছাড়া বেহালা, মৃদঙ্গ, তবলা সহ নানা বাদ্যযন্ত্র শিখে সর্ববাদ্য বিশারদ হয়ে উঠেন।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সমস্ত জীবনই সংগীত অঙ্গনে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একবার ময়মনসিংহের মুক্তগাছার জমিদার জগৎ কিশোর আচার্যের আমন্ত্রণে তাঁর দরবারে সঙ্গীত পরিবেশন করতে যান। সেখানে ভারতের বিখ্যাত সরোদীয়া ওস্তাদ আহমেদ আলী খাঁ’র সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁর কাছে পাঁচ বছর সরোদের তালিম নেন। এরপর একই বিষয়ে তালিম নেয়ার জন্য ছুটে যান ভারত বিখ্যাত ওয়াজির খাঁর কাছেÑ রামপুরে। এখানে দীর্ঘ ত্রিশ বছর অবস্থান করে সঙ্গীতের সুক্ষ্ম কলাকৌশল আয়ত্ত করেন। ১৯১৮ সালে হামেদ আলী নবাব তাকে মাইহার রাজ্যে প্রেরণ করেন। এখানেই তিনি বাকী জীবন সাধনায় কাটান। উল্লেখ্য উপমহাদেশের রাগ সঙ্গীতকে আলাউদ্দিন খাঁ ই প্রথমে পাশ্চাত্যে পরিচিত করে তুলেন।
আজীবন সুরের সাধনায় নিবেদিত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সমাজে এবং সঙ্গীত অঙ্গনে সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর উদ্ভাবিত সুর ও সঙ্গীত কলা ‘আলাউদ্দিন ঘরানা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। তিনি বেশ কয়েকটি রাগ রাগিনীরও ¯্রষ্টা। এ গুলো হচ্ছেÑ মেঘবাহার, দুর্গেশ্বরী, হেমন্ত, মদন মঞ্জরী, প্রভাতকেলি, ধবলশ্রী, শোভাবতী, রাজেশ্রী, ধনকোষ ইত্যাদি। তিনি যোগ্য শিষ্য বা উত্তরাধিকারী সৃষ্টিতেও সফল সঙ্গীতজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে পুত্র আলী আকবর খান, তিমির বরণ, খাদেম হোসেন খান, জামাতা রবি শংকর, পান্নালাল ঘোষ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি বেঁচে থাকতেই লাভ করেছেন। ১৯৫২ সালে ভারত সরকার দান করে সঙ্গীত একাডেমী পুরস্কার। এর আগে বৃটিশ সরকার খাঁ সাহেব উপাধিতে ভূষিত করে। আলাউদ্দিন খাঁ ভারতে ১৯৫৮ সালে পদ্মভূষণ, ১৯৭১ সালে পদ্মবিভূষণ উপাধি পান। ১৯৬১ সালে বিশ্বভারতীয় দেশিকোত্তম এবং দিল্লী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব ল’ ডিগ্রি প্রাপ্ত হন।
গুণী এই শিল্পি ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশের মাইহারে পরলোকগমন করেন। তিনি এখন নেই। কিন্তু সুর সৃষ্টি, রাগরাগিনী ও সঙ্গীত অঙ্গনে তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT