পাঁচ মিশালী

শিউলি

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১০-২০১৮ ইং ০১:১২:০৬ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

বাঙালির মানসলোকে শরৎ এক বিশিষ্ট মহিমায় প্রতিষ্ঠিত। গভীর নীলা আকাশ, রজত শুভ্র মেঘপুঞ্জ, উজ্জ্বল দিনের হিরণ হলুদ আলো, আন্দোলিত কাশবনের মঞ্জুরি এই ঋতুর বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এসব ছাপিয়ে প্রস্ফুটিত শিউলির মধুগন্ধে কোন সন্ধ্যায়ই কেবল শরতের আগমনীকে অনুভব করা যায়। শিউলির রঙ অনুজ্জ্বল হলেও কমলার সঙ্গে সাদার মিশ্রণ মধুর সুন্দর শরতের রোদ ও মেঘের মতো শিউলি আমাদের মনে আবেশ জাগায়। শরতের চাঁদের আলোয় শিউলি হয়ে ওঠে অপরূপ। বাঙালির মর্মের সাথে শিউলি অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা পড়ে গেছে। শিউলি নামটিও ¯িœগ্ধতার প্রতীক। শরৎ ঋতুর চাঁদের সঙ্গে শিউলির কি সম্পর্ক?
মহাকবি কালিদাস ‘ঋতু সংহার’ কাব্যে শরতের চাঁদ ও শিউলির মধ্যে সেই সম্পর্ক দেখেছেন। শিউলি বড় দুর্ভাগা, কবি নজরুল তার গানে সন্ধ্যায় ফোটা ভোরে ঝরা শিউলির দুখের কথা গেয়েছেন। শিউলির বৈজ্ঞানিক নামের দ্বিতীয় অংশ, ‘আববর ট্রেসটিস’ তার অর্থ বিষাদিনী তরু, আর প্রথম অংশ ‘নিকটেনথাস’ গ্রীক শব্দ। মানে রাতের ফুল। এর নামকরণের সাথে জড়িয়ে আছে একটি প্রাচীণ উপকথা। এক রাজকন্যা, অসাধারণ তার রূপ লাবণ্য, সে ভালোবাসলো উজ্জ্বল দীপ্তিময় সূর্যকে। সূর্যের প্রেমে মাতোয়ারা রাজকন্যা। এমন মাতোয়ারা প্রণয়ীকে ত্যাগ করলো সূর্য। বঞ্চিত লাঞ্ছিত রাজকন্যা অপমানে আত্মহত্যা করলো। রাজকন্যার চিতার ছাই থেকে জন্ম নিলো একটি গাছ। সেই গাছের শাখায় শাখায় হতভাগিনী রাজকন্যার সব দুঃখ ফুটলো ফুলে ফুলে। তার আশ্চর্য হৃদয়ের সব সৌন্দর্য উদ্ভাসিত হলো বর্ণে গন্ধে লাবণ্যে। কিন্তু ফুটলো রাতের আঁধারে, সবার অগোচরে, কারণ- সূর্যের প্রতি তার প্রবল ঘৃণা, প্রচন্ড বিতৃষ্ণা। তাই সূর্যের আলো দেখা দিতে না দিতে সে ঝরে ঘৃণা ও লজ্জায় ঢাকে মা ধরণীর কোলে। এই আমাদের শরতের শিউলি।
শিউলির ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব ও জীবনের স্বল্পায়ু নশ্বরতা হয়ে গেছে। এই জন্য শিউলি বিষাদিনী নাম হয়ে মনে গেঁথে গেছে। শিউলি আমাদের পালিত তরুর অন্যতম।
শিউলির আদি আবাস মধ্য ও উত্তর ভারত। যারা বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ পড়েছেন নবটুলিয়ার জঙ্গলের বিশাল অরণ্য এবং তীব্র সৌরভ প্লাবিত এক সন্ধ্যায় নায়কের সম্মোহিত অবস্থার কথা তারা সবাই জানেন। মহাকবি কালি দাস শিউলিকে নিয়ে কাব্য করেছেন। প্রেমিক কবি নজরুল শিউলির হাসিকে বিধবার হাসির সাথে তুলনা করেছেন। শিউলি মাঝারি আকারের গাছ। ১০ বা ১৫ ফুট পর্যন্ত বড় হতে দেখা যায়। মোটামুটি অনেক দিন বাঁচে। তবে গোড়ায় পানি জমলে মরে যায়। বাংলাদেশের সবখানে এই গাছ জন্মে। উঁচু ঝোপ-জঙ্গলে এর বার একটু বেশি। বাগানের শোভার জন্য শিউলি আদর্শ গাছ। অল্প জায়গায় দেয়ালের পাশে এক চিলতে জায়গায় অনায়াসে বেড়ে ওঠে। খুব ঘন ঝাকড়া পাতার গাছ না হলেও মোটামুটি ছায়া দেয়। পাতার পিঠটা গাঢ় সবুজ আর নিচটা সাদাটে। পত্র বিন্যাস নিবিড়। কিন্তু গাছ বড় হয় না বলে খুব ঘন হয় না। গাছের বাকল সাদাটে, ধূসর-প্রায় মসৃণ। শীত ও বসন্তে পাতা প্রায় ঝরে যায়। শরত হলো শিউলি ফোটার ঋতু। এই ফুল কলিরা মুখ তুলে সন্ধ্যায়, তাই শরৎ রাত্রি শিউলি গন্ধে ভরপুর। অজ¯্র ফুল সকালে গাছতলায় ঝরে পড়ে থাকে। কমলা রঙের বোঁটা উপর দিকে থাকে, সাদা পাঁচটি যুক্ত পাপড়ি থাকে নিচের দিকে। তখনো তার মধু মিষ্টি গন্ধ লেগে থাকে। শরতের শিউলি তলা শিশু-কিশোর-কিশোরীদের খুবই প্রিয়। শিউলি ফুল কুড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও এই ফুল শেষ হতে চায় না। ভোর থেকে আস্তে আস্তে ফুল বাসি হতে থাকে। ধীরে ধীরে মজে যায়, দুধ সাদা পাপড়ি হারিয়ে ফেলে সৌন্দর্য।
ভেষজ জগতে শিউলির স্থান উঁচুতে। বাত ব্যথায় শিউলির রস প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শিউলি পাতার রস বলকারক। জ্বর ও আমবাতেও ব্যবহৃত হয়। টাটকা পাতার রস মধুর সঙ্গে খেলে পুরনো জ্বরে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়। শিউলির ছাল-পাতার রস মেদ কমায়। তাই সকাল-বিকাল খাওয়ার পরামর্শ দেন কবিরাজরা। আর সব শেষে বলতে হয় শিউলি ছাড়া কোন বাগান পূর্ণতা পায় না। শিউলি হিন্দুদের পূজার প্রিয় অর্ঘ। শিউলির মালা খোঁপার সৌন্দর্য বাড়ায়। ফুল শয্যায় শিউলি ফুল মাদকতা আনে।
প্রাচীনকালে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ বস্ত্রে শিউলির বোঁটার রঙ ব্যবহার করতো। পায়েশ বা মিষ্টান্নেও এই রস ব্যবহার হতো। শেষ করছি রবি ঠাকুরের কবিতার দু’টি লাইন দিয়ে।
যখন শরৎ কাঁপে শিউলি ফুলের হরষে/ নয়ন ভরে যে সেই গোপন গানের পরশে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT