পাঁচ মিশালী আবদুল মুকিদ:

অসময়ে চলে গেলে কোন অভিমানে...

আবদুল মুমিন মামুন প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১০-২০১৮ ইং ০১:১৩:৩৭ | সংবাদটি ৭১৮ বার পঠিত

‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভূবনে/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায় যেমন মানুষের মনজয়ী রচনা সৃজনের মাধ্যমে সবার কাছে আদৃত হওয়ার অভিলাষ ব্যক্ত করেছেন, ঠিক তেমনি সমাজে এমন কিছু ব্যক্তি যুগে যুগে সৎ ও শুভকর্ম করে জগতে মানুষের মাঝে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকার জন্য দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আলোকিত সমাজ সৃষ্টিতে যুগান্তকারী অবদান রাখেন, যা সত্যিই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাযোগ্য।
পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আসে আর যায়। মহাকাল কাউকে ধরে রাখে না। তবে ক্ষুদ্র জীবনে কেউ যদি এমন কাজ করতে পারেন যা মানবতার পক্ষে এবং তুলনামূলক সুন্দর ও সার্থক, তবে মহাকাল অবশ্যই তাকে মনে রাখে। বাঁচিয়ে রাখে তার সৃষ্টিকর্ম ও মহত্ত্বের ইতিহাস। জীবনের ব্যাপ্তিকাল খুব সামান্য হলেও মানুষ এই সুন্দর পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করেন। তার মহৎ কার্যাবলিই তাকে অমর করে রাখে। কীর্তিমানরা তাঁদের মহৎ কর্মদ্বারা যে গৌরবের তাজমহল তৈরি করেন তা তাঁদেরকে বাঁচিয়ে রাখে। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁরা পান অজ¯্র সম্মান। লাভ করেন মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা।
মরহুম আবদুল মুকিদ; এইতো সেদিনও যে কোলাহলময় পৃথিবীতে পরিবার-পরিজন,সমাজ-সংসারের এক হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে জীবিত ছিলেন। সবার সম্মান ও ভালোবাসায় সিক্ত সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউই বলতে পারেননি আজ তিনি অতীত হয়ে যাবেন। আজ তার নামের পাশে মরহুম বা প্রয়াত লিখতে বার বার কেঁেপ ওঠছে হাত। লেখার গতি তাই মন্থর;কম্পিত হৃদয় কেবল স্তব্দতায় কাতরাচ্ছে। তবুও কিছু লিখার দায়বদ্ধতা থেকে লিখতে হচ্ছে স্বজন হারানোর বেদনালিপি।
পূর্ণ নাম মো. আবদুল মুকিদ সেবুল। জন্ম ২৭ মার্চ ১৯৭০। জন্মস্থান; বিশ্বনাথ উপজেলার ৭নং দেওকলস ইউনিয়নের কান্দিগ্রাম। শৈশবের পড়ালেখা-কান্দিগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেওকলস দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়, এম সি কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসাবে জীবনের সকল পরীক্ষার ফলাফলেই ছিল তার মেধার জ্বলন্ত প্রমাণ। যা পরবর্তী কর্মজীবনের দীর্ঘ ২২ বছর অসাধারণ মেধাশক্তি কাজে লাগিয়েই সফলতার চূড়ায় পৌঁছানো তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। ব্যক্তিজীবনে অর্জিত জ্ঞান,সুশিক্ষার সফলতম মেধা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে একজন আদর্শ, সৎ, মহৎপ্রাণ, শিক্ষক সমাজের আদর্শ হিসেবে মরহুম আবদুল মুকিদ আজ সবার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
একজন স্পষ্টভাষী ব্যক্তি হিসেবে তিনি সর্বজন স্বীকৃত ছিলেন। আমার কর্মজীবনে দীর্ঘ ১৭ বছর একজন সহকর্মী হিসেবে তাকে দেখা ও বাল্যবন্ধু স্বরূপ একান্ত কাছে থাকার যে সুযোগ ছিল তাতে একজন সৃজনশীল মানসিকতার মানুষকেই পেয়েছিলাম। প্রতিটি কাজেই ছিল তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনা,সৃজনশীলতার স্বাক্ষর। যার ফলশ্রুতিতে আজ দেওকলস দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজটি এক আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যৌবনে কোন সুকেশী’র প্রেমান্ধে মুগ্ধ না হয়ে যে ব্যক্তি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রেমে অন্ধ হয়েছিলেন, সেখানে যোগদানের দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি আদাায় করা তার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। ১৯৯৮এ জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান দেওকলস দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়।
শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য মানুষকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে জ্ঞানে-গুণে পরিপূর্ণ করে তোলা। আর তা সম্ভব হলেই একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর এই প্রকৃত একজন মানুষ হিসেবেই মরহুম আবদুল মুকিদ তার জীবদ্দশায় মানুষ গড়ার সুমহান পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে শিক্ষার মহতি শক্তির উন্মেষ ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের উদ্দ্যেশ্যেই দিন-রাত কাজ করে গেছেন। পরিবার-পরিজন থেকে নিজের কর্মস্থলকেই বেশি আপন করে নিয়েছিলেন। যার বাস্তব প্রমাণ আজ তার স্মৃতিতে মূহ্যমান মফস্বল এলাকার সেই স্বনামে-সুনামে ভাস্বর প্রতিষ্ঠান দেওকলস দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।
একজন কর্মবীর ও গবেষক হিসেবে আবদুল মুকিদকে আমি কাছে থেকে দেখেছি। তার চিন্তা ও গবেষণায় ছিল কর্মস্থল ও কর্ম এলাকার উন্নয়ন। বিশ্বনাথের শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আজন্ম লালিত স্বপ্নে বিভূর ছিল তার মন। তাকে হারিয়ে আজ দিশেহারা সমগ্র বিশ্বনাথের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ। সীমাহীন শোকে কাতর এ জনপদের প্রতিটি প্রাণ।
মুকিদ সাহেব যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এস.সি (রসায়ন) সম্পন্ন করে নিজ এলাকায় আসেন,তখন তারই সহপাঠীরা দেশের উচ্চ পদস্থ সরকারি-আধা সরকারি কর্মে আত্মনিয়োগ করার জন্য হন্যে হয়ে ছুটলেও তিনি তার ব্যতিক্রম ছিলেন। এলাকাবাসীর অনুরোধে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরেন। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান/কোম্পানি থেকে লোভনীয় প্রস্তাব পাওয়ার পরও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আজ তারই বাল্যবন্ধুরা দেশে-বিদেশে উচ্চ পদে চাকুরিতে অধিষ্ঠিত। অর্থে-বিত্তে পরিপূর্ণ আজ জীবন তাদের। অথচ মফস্বলের এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় নিয়োজিত থেকে তিনি স্বনামে-সুনামে নিজেকে অজস্র প্রাণের প্রিয়জনে পরিণত করেছিলেন। যা অন্য কোনো পেশায় এতটা থাকতো না বলেই তিনি হয়তো এই মহান পেশায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন শিকড় সন্ধানী পুরুষ। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার এক লালনক্ষেত্র হিসেবে কর্মক্ষেত্রকে নিজের মতো করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তার যে একনিষ্ঠতা ছিল তা সর্বদাই স্বীকৃত। শুধু তাই নয়;একজন কৃতি ফুটবলার হিসেবেও ছাত্র জীবনে নিজেকে ফুটবল প্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। কর্ম জীবনেও ক্রীড়া-শরীরচর্চার ক্ষেত্রে তার কর্মব্যস্ততা ও উৎসাহ ছিল নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। তাছাড়া একজন দক্ষ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছিলেন দীর্ঘদিন। বিশ্বনাথের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করে গেছেন। তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে-জয়কলস অগ্রণী সমাজ কল্যাণ যুব সংঘ, বিশ্বনাথ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি সহ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর বিশ্বনাথ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রভৃতি।
একজন রুচিশীল ব্যক্তি হিসেবে মো. আবদুল মুকিদের কর্মে-চাল চলনে সুরুচির বহিঃপ্রকাশ ছিল সর্বাগ্রে। নিজের কর্মস্থলের পরিবেশকে তাই তিনি নিজের মতো করেই তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন। যা ছিল অনেকটাই শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণাযোগ্য। পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে যে কোন সময় নিজেকে মানিয়ে নেয়ার যে অসীম দক্ষতার পরিচয় তিনি দিয়েছেন তা অন্য যে কারো পক্ষেই সহজ নয়। এমন বহুমুখী গুণের অধিকারী মানুষটি আজ সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। তার শূণ্যতা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই তার এ চলে যাওয়ায় বেদনা ও শোক প্রকাশের ভাষা আজ পলাতক। হৃদয় নিংড়ানো উচ্চারণে তাই বলতে চাই-‘বড় অসময়ে চলে গেলে বন্ধু/এ কোন অভিমানে...!’
মহান আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে জায়গা করে দেন; এই কামনা করি মনে-প্রাণে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT