সাহিত্য [একটি রেড ইন্ডিয়ান উপাখ্যান]

উড়ন্ত মানবশৃঙ্খল

ভাষান্তর : অধ্যাপক মো. আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১০-২০১৮ ইং ০১:০৫:৫৪ | সংবাদটি ১৪ বার পঠিত

ব্রিটিশ কলম্বিয়ার দীর্ঘ উপকূলে ভূমি ও সাগর সুস্পষ্ট সরল রেখা বরাবর নয়। এখানে উপকূল রেখা উপসাগর, খাড়ি, অন্তরীপ, দ্বীপ ইত্যাদিতে নানা বক্র রেখায় বিন্যস্ত। এখানে রয়েছে শত শত নয়, হাজার হাজার দ্বীপ; মানুষের ধারণারও বেশি এবং তা যেভাবে হয়েছিল-
অনেক বছর আগের কথা। যখন পৃথিবী ছিল শান্ত, কোমল ও সবুজ। তখন নাস নদীর মুখে এক রেড ইন্ডিয়ান গ্রাম ছিল। তার পশ্চিমে ছিল বিশাল মহাসাগর, তা থেকে অলস সূর্য রশ্মির প্রভা ঝিকমিক করত। পূর্ব দিকে বিরাজমান পর্বতের বরফাচ্ছন্ন শীর্ষ থেকে নেমে এসে নদী শিলাময় পাহাড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মহাসাগরে মিশেছিল। শিলাময় পাহাড়ের গায়ে ঈগলের নিরাপদ বাসা ছিল।
তখন মানুষগুলো খুব সুখী ছিল। সাগর, নদী, বেলাভূমি ও পাহাড়ের ঢালু ভূমি থেকে প্রচুর খাবার আসত- সাগরের সীল, ক্ল্যাম নামক শামুক, পাহাড়ী ছাগল ইত্যাদি। তাদের জীবন ছিল নিরুদ্বেগ, শান্তি ও আনন্দের এবং শিশুদের খেলাধুলা।
এক সকালে ছোট্ট এক বালক তার ঘরের সামনে ধনুক নিয়ে মগ্ন ছিল। তার চাচা ধনুকটি বানিয়ে তাকে দিয়েছিল। তখন এক বিশাল ছায়া তার সম্মুখে ভূমির উপর দিয়ে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল। তখন সে উপর দিকে তাকিয়ে দেখল, একটি প্রকান্ড ঈগল গ্রামের উপর দিয়ে নিচু হয়ে উড়ে যাচ্ছিল, যেন শিকার খোঁজছিল।
-‘ওঃ! দেখ, বাবা! একটি প্রকান্ড ঈগল, এত নিচে কখনো আসেনি। দেখ, বাবা। আমার ধনুক দিয়ে তীর ছোড়তে যাচ্ছি! দেখ, বাবা! মনোযোগ দিয়ে দেখ!’
-‘এ জন্য আরো শক্ত বাহু এবং তোমার ধনুকের চেয়ে আরো বড় ধনুক দরকার, আমার পুত্র।’ বলে পিতা মৃদু হাসল!’
-‘না তা নয়। সত্যি। দেখ, বাব!’ বলে ছোট্ট বালকটি তীর ছোড়ল। প্রকৃতপক্ষে ঈগলটি নিচে ছিল, কিন্তু তীরটি পাখিটির কাছাকাছি না গিয়েই মাটিতে ফিরে এল। এদিকে ঈগলটি ক্রমশ নিচে নামতে নামতে গ্রামের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে চক্কর দিচ্ছিল।
-‘কেবল তাকাও এর দিকে। কখনো আমি এত নিচে কাউকে দেখিনি!’ বলল একজন।
-‘না’। সায় দিল আরেকজন, ‘আর দেখ, কত বড় এটি! এটি নিশ্চয় একটি বাজপাখী।’
-‘অবশ্যই নয়! এটি বাজপাখির ন্যায় বড় নয়। এটি কোন একটি বড় ঈগল, স্বাভাবিকের চেয়ে একটু নিচ দিয়ে উড়ছে। কেউ তীর ছোড়ে না কেন?’
-‘না না। তীর ছোড় না। তার ছোড়ার সাহস কর না।’ সাথে সাথে ধমকের স্বরে বলে উঠল বৃদ্ধ কবিরাজ লোকোমা। দুশ্চিন্তায় তার কন্ঠ কাঁপছিল।
-‘না কেন?’ তরুণদের মধ্যে একজন প্রশ্ন করল, ‘আমার তীরের জন্য ঈগলের কিছু পালক দরকার। যখনই পারি আমরা ঈগল শিকার করে থাকি। এটি নয় কেন?’
-‘এটি সাধারণ ঈগল নয়,’ গম্ভীর কন্ঠে লোকোমা ব্যাখ্যা করল, ‘এটি হয় একটি শক্তিশালী কবিরাজ অথবা সকল ঈগলের প্রধান, এবং কেবল একজন নির্বোধই এ দু’য়ের একটির প্রতি তীর ছোড়ে থাকবে। তা তোমরা জান।’
-‘ওঃ! কবিরাজ ও স্পিরিট নিয়ে তুমি পড়ে থাক,’ জবাবে বলল একজন তরুণ, ‘ঈগলের প্রতি তীর ছোড়লে কি এমন ক্ষতি সে করতে পারে?’
-‘যথেষ্ট ক্ষতি হতে পারে!’ দৃঢ়তার সাথে জবাব দিল বৃদ্ধ কবিরাজ, ‘অনেক বছর যাবৎ আমি একজন কবিরাজ, তোমাদের অধিকাংশের জন্মের পূর্ব থেকে। আমি তোমাদেরকে স্পষ্ট করে বলছি, তোমরা যদি পাখিটিকে বিদ্ধ কর, এজন্য সমগ্র গ্রামবাসী ক্লেশ ভোগ করবে।’
যারা শুনতে পেল, প্রত্যেকেই কবিরাজকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও উপহাস করল। এতে সমস্ত গ্রাম এক উত্তেজনায় আন্দোলিত হয়ে উঠল। তারা কখনো দেখেনি কোন ঈগলের এরূপ অদ্ভুত আচরণ। এ পাখিগুলি এখানে খুবই সাধারণ ছিল। সর্বদা একটি বা ক’টি ঈগল দেখা যেত, নদীর অনেক উপরে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ মনে করতে পারেনি ইতিপূর্বে এরূপ কোন পাখিকে উৎকন্ঠিত চিত্তে গভীরভাবে লক্ষ করতে হয়েছিল।
এ অঞ্চলের প্রত্যেক মানুষ, প্রত্যেক্ষ বালক ও বালিকা, প্রত্যেক মহিলা যাকে সম্ভবত রান্না বন্ধ করতে হয়েছিল, এবং সেখানে খুব কমই মানুষ ছিল যাদেরকে এ উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা আন্দোলিত করেনি।
অধিকাংশ মানুষ ও বালক তাদের নিজ নিজ ধনুক আনতে ছোটে গিয়েছিল। একসময় আকাশে নিক্ষিপ্ত তীরের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ দেখা গেল। কিন্তু একটি তীরও বিশাল পাখিটির ধারে-কাছে পর্যন্ত যেতে পারেনি। ফলে তার ধীরে অথচ দৃঢ় উড্ডয়নে বিরতি প্রয়োজন হয়নি।-‘স্টকোস কোথায়?’ কোন একজন জিজ্ঞেস করল, ‘তার কাছে সবচে শক্তিশালী ধনুক রয়েছে? তাকে তীর ছোড়তে ডেকে আন?’
তাকে অনুসরণ করল অন্য ক’জন, ‘স্টকোস’! তারা চিৎকার দিতে লাগল, ‘স্টকোস! স্টকোস!’
-‘সে ঘর থেকে বেরিয়ে নদীর ধারে গেছে’, তার স্ত্রী বলল, ‘এবং ধনুকটি সে সঙ্গে নিয়েছে।’
-‘দেখ, সে এদিকে আসছে, দৌড়ে আসছে, বলল একজন, ‘স্টকোস, তাড়াতাড়ি আস এবং তোমার ঐ শক্তিশালী ধনুকটি নিয়ে আস।’
-‘ব্যাপার কি?’ দৌড়াতে দৌড়াতে স্টকোস হাপাচ্ছিল, ‘তাকিয়ে তাকিয়ে তোমরা সবাই কি দেখছ?’
সাথে সাথে শ’খানেক লোক বিশাল ঈগল ও তার অদ্ভুত আচরণ সম্পর্কে বলতে শুরু করল, এবং সবাই তাকে পীড়াপীড়ি করল সে যেন তা বিবেচনা করে এবং তীর ছোড়ে। কারণ ইতিপূর্বে তীর ছোড়ে কেউই পাখিটিকে বিদ্ধ করতে পারেনি।
-‘আমি কি তীর ছোড়ব? অবশ্যই আমি একে তীর বিদ্ধ করতে সক্ষম হব। আমি কিভাবে ব্যর্থ হতে পারি? কারণ এটি এত নিচ দিয়ে উড়ে চলছে যে এর পালকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বাতাসের শিস ধ্বনি তোমরা শুনতে পাচ্ছ।’
পাখিটির প্রতি নজর রেখে স্টকোস তার ধনুক হাতে নিল এবং তাতে তীর স্থাপন করল।
-‘তীর ছোড় না, স্টকোস,’ জোরালো আহ্বান জানাল লোকোমা, ‘এটি সাধারণ ঈগল নয়। তুমি বোঝতে পারবে, কারণ এসব বিষয়ে তুমি অধিকাংশ মানুষের চেয়ে বেশি অবগত আছ। এটি হয়তবা কোন বিখ্যাত কবিরাজ আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছে, অথবা নিজেই সকল ঈগলের প্রধান।’
শুনে স্টকোস থামল, বৃদ্ধ কবিরাজের প্রতি এক মুহূর্ত তাকাল, তারপর হেসে উঠল; এবং বলল, ‘ভালো কথা, নিশ্চিতরূপে এটি যথেষ্ট বড় এবং ঈগলদের মধ্যে প্রধান হয়ে থাকবে, যদি আকার বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গণ্য হয়; কিন্তু আমি যখন একে বিদ্ধ করব, তখন প্রধান, সাধারণ বা ক্রীতদাস ইত্যাদি বিবেচ্য বিষয় হবে না।’
সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য কিছু লোক কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করল, কিন্তু তা যথোপযুক্ত ছিল না। বাস্তবে কেউই ফলপ্রসু কিছু করতে পারেনি। তাদের আচরণ ছিল বিশৃঙ্খল জনতার ন্যায়। স্টকোস তার ধনুকে একটি তীর স্থাপন করল এবং ঈগলের প্রতি ছোড়ল।
সেই মুহূর্তে চারদিকে পরিপূর্ণ নিঃস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। কারণ প্রতিটি ব্যক্তি এবং সবার চোখ স্টকোসের দিকে নিবন্ধ ছিল, অতঃপর তার তীরের দিকে। ভয়াবহ দিনটির পর যারা অনেক দিন বেঁচে ছিল, তারা ভুলতে পারেনি স্টকোসের ধনুকের রশির টুংটাং শব্দ এবং ঈগলের প্রতি নিক্ষিপ্ত বাতাসের মধ্য দিয়ে বাঁশির শব্দ তোলে দ্রুত ধাবমান তীরের শব্দ।
উপরে আরো উপরে তীর উঠল। দেখে মনে হল তীর ও পাখি বোঝি এক হয়ে গেল। একজন তরুণ চিৎকার দিয়ে বলল, ‘এটি তাকে পেয়ে গেছে! দেখ! তা ব্যর্থ হতে পারে না। এটি তাকে পেয়ে গেছে!’
-‘না, না। তীরটি কখনো তার কাছে পৌঁছতে পারবে না। দেখ, এটি ব্যর্থ! কেন? তাকাও! ঐদিকে তাকাও! তার প্রতি নিক্ষিপ্ত তীরটির দিকে ঈগল মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে রয়েছে।’
সম্পূর্ণ নিশ্চিত, মানুষগুলো দেখতে পেল বিশাল পাখিটি নিজের মাথা ঘুরিয়ে মনোযোগের সাথে তাকিয়ে দেখল যে, নিক্ষিপ্ত তীরটির উড্ডয়নের সর্বোচ্চ পৌঁছল এবং অলসভাবে ঘুরে গেল, এক মুহূর্ত যেন মধ্য আকাশে ঝুলে ছিল, অতঃপর দ্রুত ভূপৃষ্ঠে পতিত হলো।
-‘আহ! সে ব্যর্থ হলো। আবার চেষ্টা কর, স্টকোস, পাখিটি সবচে নিচে। আবার চেষ্টা কর!’
-‘থামো, তোমরা মূর্খের দল, থামো!’ বৃদ্ধ লোকোমা চিৎকার দিয়ে উঠল আরেক বার, ‘আমি তোমাদেরকে সাবধান করেছি, বার বার সাবধান করেছি। এটি সাধারণ পাখি নয়। থামো এখন, আমাদের উপর বড় রকমের কোন অনিষ্ট আসার আগে!’
এযাবৎ, যাদের হাতে ধনুক ছিল প্রত্যেকে তীর ছোড়েছিল এবং তীরগুলো নিশ্চিতরূপে যে উচ্চতায় ঈগল সে উচ্চতায় পৌঁছেচিল, এমনকি এরও উর্ধ্বে! কিন্তু এদের একটিও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তা খুবই বিস্ময়কর যে, এতগুলো তীর লক্ষভ্রষ্ট হলো।
তাহলে কি বৃদ্ধ কবিরাজের ধারণা সঠিক ছিল? বাস্তবে কি কোন বিখ্যাত জাদুকর মানুষগুলোর দর্শনার্থে এসেছিল? শুধুমাত্র এ ধরনের বিরুদ্ধ জনতার সাথে সাক্ষাৎ করতে? অথবা প্রকৃতপক্ষে এটি কি ঈগলদের প্রধান ছিল?
লোকগুলো একত্রে যথাসম্ভব নিবিড়ভাবে দাঁড়িয়েছিল। তবুও তারা ধনুক টানার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পেয়েছিল আকাশ থেকে ফিরে বৃষ্টির ন্যায় মাটিতে পতিত অসংখ্য তীরের আঘাতে একজনও মানুষ মারা গেল না কেন তা অনুধাবন করা খুবই কঠিন। চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে বিরাট পাখিটি ক্রমশ নিচের দিকে নেমে আসছিল, তখন লোকগুলো দেখতে পেল, তার উজ্জ্বল চোখ, নিষ্ঠুর নখর, এবং তারা গুণতে পারছিল প্রত্যেকটি চকচকে পালক যা সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।
-‘আমি নিশ্চিত এটি সোজাসুজি আমাদের মধ্যে নেমে আসছে। সতর্ক হও, সে কাউকে আঘাত করতে পারে!’ বলল একজন।
-‘এখন তীর ছোড়!’ চিৎকার দিয়ে আরেকজন, ‘এখন তীর ছোড়, আমাদের কোন ক্ষতি সাধনের আগে।’
এদিকে বৃদ্ধ লোকোমা তার জাদুকরী ঝুমঝুমিটি আনতে দ্রুত অথচ নীরবে তার ঘরে গেল। ঝুমঝুমিটি পাখির গঠনে খোদিত এবং পেছনের দিকে জাদুকরের ছোট্ট চিত্র মুদ্রিত। অতঃপর সে ছাগলের লোম দিয়ে গোপন বুননে তৈরি কম্বলনা গায়ে জড়িয়ে নিল। তারপর সে মাথায় পরে নিল আর্মিন নামক প্রাণীর উজ্জ্বল চামড়া দিয়ে তৈরি মস্তকাভরণ যা সী-লায়নের কম্পমান শক্ত লোম ও বর্ণাঢ্য এরালোন শামুক দ্বারা সজ্জিত ছিল।
ঝুমঝুমিটি ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে লোকোমা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো এবং জাদুকরী গান গাইতে শরু করল। গানের কথাগুলো অবশ্যই সে এইমাত্র রচনা করেছিল; কারণ এরকম ঘটনার উপযোগী গান পূর্ব থেকে প্রস্তুত থাকার কোন সুযোগ ছিল না। সে আশা করছিল বিশাল পাখিটি গানের কথাগুলো বোঝতে পারবে এবং উড়ে চলে যাবে-
‘হ্যাই, হ্যাই, হ্যাই। হাই-আহ, হাই-আহ, হাই-আহ
সকল ঈগলের প্রধান, স্বাগতম তোমাকে!
সকল ঈগলের প্রধান, তোমার উদ্দেশ্যে আমরা গান গাই!
আমাদের শান্তিতে রাখ, ও প্রধান, যখন আমরা তোমাকে ছেড়ে যাব!’
যখন লোকোমা গান গেয়ে চলছিল, জনতা নিশ্চুপ দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে তার ঝুমঝুমির শব্দ স্থির হয়ে এলো এবং তার কন্ঠস্বর ধীরে ধীরে দীর্ঘ লয়ে বিলীন হয়ে গেল। তখন কোন শব্দ শোনা গেল না, কেবল বিশাল পাখিটির ডানার পালকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বাতাসের মিষ্টি সুর ব্যতীত; সে তখন বাতাসে ভারসাম্য বজায় রেখে স্বাচ্ছন্দ্যে দোল খাচ্ছিল।
হঠাৎ চোখের পলকে ঈগলটি নেমে পড়ল। নেমে পড়ল একেবারে রেড ইন্ডিয়ানদের ভিড়ের মধ্যে, যা ছিল এতই গাদাগাদি ও টান টান যে কেউই প্রাণ রক্ষার্থে দৌড়াতে পারল না। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, কে তার কুনজরে পড়েছিল? অবশ্যই স্টকোস। কারণ, স্টকোসই সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল পাখিটিকে বধ করতে; সেই তার প্রতি ব্যঙ্গ করেছিল অধিক এবং সেই নিজকে তীরন্দাজ হিসেবে বিপুলভাবে জাহির করেছিল।
-‘দেখ, দেখ! ঈগলটি স্টকোসকে চুল ধরে পাকড়াও করেছে।’
-‘সে স্টকোসকে নিয়ে চলে যাচ্ছে!’ চিৎকার দিয়ে উঠল স্টকোসের স্ত্রী, ‘দেখ! তাকে নিয়ে সে দূরে আকাশে! শীঘ্র, শীঘ্র! তার পায়ের এ্যাঙ্কল আঁকড়ে ধর। তাকে আঁকড়ে ধর! তাকে আঁকড়ে ধর!’
অবশ্যই তারা তাকে ধরে রাখতে চেষ্টা করল। যখন স্টকোসকে তাদের আওতার বাইরে নিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, তখন তাদের মধ্যে সর্বাধিক দীর্ঘ একজন লোক তার এ্যাঙ্কল আঁকড়ে ধরল এবং শক্ত করে ধরে থাকল ক্ল্যাম নামক ঝিনুকের দু’টি অর্ধাংশ যেমন পরস্পর দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে। ধীরে ধীরে উপরের দিকে উড্ডিন স্টকোসের পা দৃঢ়ভাবে ধরে রাখা লোকটি ভীষণ ভয়ার্ত চিত্তে লক্ষ করল যে, স্টকোসের পা ধরে থাকা তার দু’হাতের আঙ্গুলগুলো পরস্পর কঠিনভাবে আটকে রয়েছে, চেষ্টা করেও সে নাড়াতে পারছে না।
বৃদ্ধি কবিরাজ লোকোমা সঠিক ছিল।
-‘যেতে দাও! যেতে দাও!’ তারা সবাই চিৎকার দিয়ে বলল।
-‘আমি পারি না! আমি যেতে দিতে পারি না!’ লোকোমার কন্ঠে ভয়ানক ভীতি ছিল।
স্বাভাবিকভাবেই সবাই লোকোমার কাছে এসে উপস্থিত হলো। সে কবিরাজ, জাদুকর। যা ঘটে চলছিল সবই তার বিষয়, এবং এখন সে-ই তাদেরকে বলবে কি করতে হবে।
-‘অবশ্যই এটি জাদু! আমি কি ডজন বার তোমাদের সবাইকে সাবধান করি নাই? এখন আমাকে চেষ্টা করার সুযোগ দাও। সম্ভবত আমি তাকে ধরতে পারব।’ বলল বৃদ্ধ লোকোমা।
সাহসী বৃদ্ধ বৃথাই আশা করেছিল যে দীর্ঘ দেহী রেড ইন্ডিয়ানের পায়ের এ্যাঙ্কল আঁকড়ে ধরে সে বিরাট ঈগলটিকে নিচের দিকে নামিয়ে আনতে পারবে, আপন মানুষগুলোর জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যা অনেক যোগ্য কবিরাজ করেছে পূর্বে এবং সেই থেকে। কিন্তু সে তা পারেনি।
বেশ সংগ্রাম করে, ঈগলটি খুব দ্রুত নয় মন্থর গতিতে উপরে আকাশের দিকে উঠছিল। এ মন্তরতার পেছনে এক গভীর ও ভয়ানক চতুরতা ছিল। যে বোঝা ঈগলটিকে বহন করতে হচ্ছিল সে দিকে নজর দিলে যে কেউ উপলব্ধি করতে পারত যে, বোঝাটি খুবই ভারী, এবং জাদুকর হোক বা না হোক, বহন করা সহজ ছিল না এবং তারা যদি এতে আরো একজন মানুষের ওজন যোগ করতে পারত, তাহলে দীর্ঘ বর্ধনশীল শৃঙ্খলটি তারা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পারত।
তারা একে একে শৃঙ্খলে যুক্ত হচ্ছিল, এবং ঈগলটি একে একে তাদেরকে ভূমি থেকে উপরে তোলে নিচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত গ্রামের প্রত্যেক পুরুষ, প্রত্যেক যুবক, ছেলে-ছোকরা, বালক ও বেটা শিশু, সবার নিচে সেই ছোট্ট বালকটি যে প্রথম ঈগলের প্রতি তীর ছোড়েছিল, উন্মত্ত দীর্ঘ শৃঙ্খলে, প্রত্যেকের হাত দুটো উপরের ব্যক্তির পায়ের এ্যাঙ্কলে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ, সবাই ঝুলছিল পাখির বিরাট নখর থেকে।
-ওঃ, দেখ! আমার ছোট বালক। আমার নিজের ছোট্ট, ছোট্ট বালক। চল যাই! চল এখনই যাই, অত্যধিক উপরে উঠার আগে! তাড়াতাড়ি চল।
বিশাল পাখিটি উপরে আরো উপরে উড়ে গেল, সোজা সূর্যের চোখের গভীরে। উপরে আরো উপরে উঠতে থাকল যখন তাকে দেখা একেবারেই দুষ্কর! তখন তাকে দেখাচ্ছিল সরু লম্বা লেজযুক্ত একটি মশার ন্যায় অথবা সুউচ্চে মেঘের মধ্যে এক সারি রাজহংসের মতো।
পেছনে পড়ে রইল গ্রামে কেবল মহিলা ও বালিকাগণ।
-‘এখন আমরা কি করব?’ তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা কি করব? সমগ্র গ্রামে একজনও পুরুষ নেই। শিকার ও মাছ ধরতে যাবার কেউ নেই। ক্রীতদাস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে হাইদা জনগোষ্ঠীর আক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য কেউ থাকল না। তীব্র শীতের দীর্ঘ রাতে আমাদের আরাম দেবার জন্য কেউ নেই।’
তাদের অশ্রুপূর্ণ চোখগুলো অনুসরণ করে চলছিল পৃথিবী থেকে উর্ধ্বে অনেক দূরে আকাশে উড্ডীন ঈগল পাখিটিকে।
-‘দেখ! দেখ! পুনরায় সে নিচের দিকে নেমে আসছে। প্রতিটি মুহূর্তে সে বড় থেকে বড় হচ্ছে। তার প্রতি তীর ছোড়ার কারণে সম্ভবত সে মানুষগুলোকে কেবল শাস্তি দিতে চেয়েছিল। অবশ্যই, ওটা তা-ই। সে কেবল তাদেরকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। শীঘ্রই সে আবার তাদের সবাইকে নিচে নামিয়ে রাখবে, নিরাপদ ও সুস্থ। ওঃ! কত মহৎ, কত দয়ালু!। আবার তারা সবাই হবে নিরাপদ এ পৃথিবীতে।’
মহিলাগণ চরম দুঃখের পর স্বস্তির অশ্রুধারায়, প্রায় রুদ্ধ নিঃশ্বাসে, দেখতে পেল আকাশে বিন্দুর ন্যায় পাখিটি আকাশের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি লাভ করছে। কিন্তু সে কাছে এসেও ভূমিতে অবতরণ করল না।
যখন দীর্ঘ শৃঙ্খলের সর্বনি¤œ মানুষটির অবস্থান ভূমির খুব কাছে চলে এল, তখনই ঈগলটি মুক্ত সাগরের দিকে অগ্রসর হলো। সে এত দ্রুত উড়ছিল যে, তার পশ্চাতে মানুষের শৃঙ্খলটি সোজা এক সরল রেখার মতো দেখাচ্ছিল। ঈগলটি দ্রুত গতিতে উড়ছিল ও বার বার গতি হ্রাস করছিল, এবং একবার এপাশে আরেকবার ওপাশে মোড় নিচ্ছিল যে পর্যন্ত না শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষগুলো সামনে-পেছনে দোল খেতে খেতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।
তারপর হঠাৎ সে তাদের যেতে ছিল; এবং যখনই যেতে দিল, প্রত্যেক ব্যক্তিকে যেতে দিল। কারণ এতক্ষণ জাদুর যে বন্ধনে সে লোকগুলোকে পরস্পর দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ রেখেছিল, তা মুক্ত করে দিয়েছিল।
বাতা

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT