সাহিত্য

মুক্তি

নূর কামরুন নাহার প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১০-২০১৮ ইং ০১:০৮:৪৪ | সংবাদটি ১৮ বার পঠিত

ঠিক সে সময়ই মনে হলো কাজটা অপ্রয়োজনীয়, একঘেয়ে, আনন্দহীন ও অশ্নীল। আশ্চর্য, এই এখন ঠিক এ সময়ই মনে হলো। অথচ গত সপ্তাহেই আমাদের হয়েছিল। তখনও মনে হয়েছিল আমি পূর্ণ, তৃপ্ত। গত সপ্তাহের পর আজ এই রবিবার দিনটার দূরত্ব এমন বেশি কিছু নয় যে বিষয়টা এত বিপরীত মনে হতে পারে। বিপরীতজনের আগ্রহ, মনোযোগে কোনো কমতি নেই। আমাকে তৃপ্ত করার চেষ্টাতে যথেষ্ট আন্তরিকতা। স্পর্শের শৈল্পিক সৌন্দর্য একই রকম। তবু, তবু মনে হলো কাজটা বিরক্তিকর, নিরানন্দ ও ক্লান্তিকর।
অরুণ বিষয়টা বুঝতে পেরেছিল এবং তাই প্রচেষ্টাটাও হয়ে পড়েছিল দ্বিগুণ এবং আমার বিরক্তির মাত্রা আরও অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিরক্তিটা অরুণও ধরতে পেরেছিল; তাই ক্লান্তিকর অনিচ্ছুক টেনে নেওয়া কাজটা শেষ হবার পর প্রশ্ন করেছিল- তুমি কি আজ কোনো কারণে আপসেট?
না তো?
তাহলে?
এই প্রশ্ন দু’জনের কাছেই জলের মতো পরিস্কার। তবু আমি একটু এড়িয়ে যাই-
তাহলে মানে?
তুমি জানো।
এবার আমি হাসি, রহস্যময়। এ হাসির বিভিন্ন অর্থ হতে পারে।
অরুণ আমাকে আর ঘাঁটায় না; তবে অদ্ভুত এক আচরণ করে। আমার কাছ ঘেঁষে বসে, তারপর আমার পা-হাত টিপে দিতে থাকে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকা আমি একটু নড়েচড়ে বসি- এই কী করছ?
তোমাকে মেসেজ করে দিচ্ছি।
অরুণ আদর জানে। আদরের অনেক ধরনের কৌশল জানে। সব সময়ই ও একটু বেশি বেশি যতœ, আদর আর ভালোবাসা দেখায়। আমার প্রতি ওর মুগ্ধতাকেও নানাভাবে প্রকাশ করে। ছোটখাটো নানা আচরণ আর আদরের অভিনবত্বে ও আমাকে একবারে মুগ্ধ আর বশ করে রাখে। ও পারে, সত্যি পারে। পুরুষের মধ্যে এত কেয়ার, ভালোবাসার এত উদ্ভাবনী বিষয়, এত খুঁটিনাটি প্রকাশ, সৃষ্টিশীলতা সত্যি আশা করা যায় না।
কিন্তু আজ অরুণ সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমাকে খুশি করতে ওর কী নিদারুণ প্রচেষ্টা! নারীকে তৃপ্ত করতে না পারার ব্যর্থতা কোনো পুরুষই বোধ হয় সহজে মেনে নিতে পারে না। এটাকে পৌরুষের পরাজয় হিসেবে দেখে।
তবে সত্যি, অরুণের কোনো দোষই নেই এখানে। ও আসলেই একটা নিখুঁত আর শক্তিশালী পুরুষ। সমস্যাটা আজ হয়েছে আমার। তারপরও ও আমাকে খুশি করার একটা বোকা চেষ্টা চালাচ্ছে। আমার হাসি পায়। আমি একটু বিরক্তি নিয়ে বলি- আহ ছেলেমানুষি করছ কেন?
ও বোধহয় আহত হয়, কিন্তু ও খুব ঝানু, এই আহত ভাব আমার কাছে প্রকাশ করে না। একটু হেসে আমার দিকে সুন্দর করে তাকিয়ে বলে- তোমাকে একটু যতœ করে দিচ্ছি।
সন্ধ্যা শেষের দিকে বের হই। অরুণ খুব গোঁ ধরেছিল আমাকে এগিয়ে দেবে। আনুগত্যে একবারে গদগদ। আমি কোনোভাবেই রাজি হইনি। ওর বাসা থেকে আমার বাসার দূরত্ব বেশ। আমাদের দু'জনেরই গাড়ি আছে। ভালো আরামদায়ক গাড়ি। তবে প্রায়দিনই আমি গাড়ি নেই না। ওর গাড়িও ব্যবহার করি না। এটা সতর্কতার জন্য করতে হয়। সাধারণত আমরা সিএনজি ব্যবহার করি। আজ সিএনজিও নেই না। একটা রিকশা করি। সময় নিয়ে রিকশাতে যাব। আমার একা থাকতে ভালো লাগছে, রিকশায় বেশ অনেকটা সময় একা থাকা যাবে।
আমাদের শুরু হয়েছিল ছয় বছর আগে। ছয় বছর দাম্পত্যের পাশাপাশি আরও একটা পুরুষের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক খুব সোজা একটা বিষয় না। নানা কারণে যেমন আমাদের এমন একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে নানা কারণে তা টিকেও আছে। এবং এখনও আর্কষণ আর ভালোবাসা নিয়ে টিকে আছে। আরও আশ্চর্য, আমার খুবই গড়পড়তা সৌন্দর্যের প্রতি অরুণ এখনও মুগ্ধতার দৃষ্টি রাখে। ছয় বছরে ওই বিষয়টা ভাতের মতো দৈনন্দিন এবং নিরাসক্তির হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ও ওটা এখনও মুখরোচক নাশতার মতো আগ্রহ নিয়ে খায়। অরুণ জানে, আর্ট জানে। ভালগারের মধ্যে শিল্পের জায়গাটাও জানে। স্পর্শের যে একটা আলাদা শিল্প, শিহরণ ও গলে যাওয়া ভালোলাগা আছে, সেটা অরুণ আমাকে চিনিয়েছে। অরুণ আমাকে দিয়েছে শরীর আর মনের পূর্ণতা। আমি পূর্ণতা থেকে আরও পূর্ণতার দিকে যাত্রা করেছি।
তারপরও কী অদ্ভুত! আজ আমার মনে হলো এটা একটা কুরুচিপূর্ণ অনাবশ্যক কাজ। আমাদের আপাত কোনো বিরোধ বা শূন্যতা নেই। সাধারণত যা হয়, নারী-পুরুষের অনৈতিক সম্পর্ক খুব দ্রুতই দু'জনের কাছে প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে পুরুষের চোখে নারী দ্বিচারিণী হয়ে ওঠে, বিশ্বাসহীন মাগী শ্রেণির নারীতে পরিণত হয়। পরস্পরের প্রতি অসম্মানবোধ হয় প্রকট, উভয় উভয়কে হেয় দৃষ্টিতে দেখে, যেন তারা চোর। তারপর যে ব্যাপারটা খুব ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তা হচ্ছে প্রবল সন্দেহ। দু'জনেই মনে করে এই লুকানো বিশ্বাসহীনতার কাজটা সে আরও কোথাও করছে। এই সন্দেহ ও বিশ্বাসহীনতা সংসারের চাইতেও জটিল হয়ে ওঠে। তারপর আরও কত ফ্যাসাদ, কাদা ছোড়াছুড়ি এরকম আরও কত কী। না সেরকম কিছু হয়নি আমাদের মধ্যে, কোনো সমস্যা নেই আমাদের। সম্মান এবং অনুরাগ দুটোই অটুট। দু'জনের শরীরের সাড়াও যথেষ্ট। আমরা আনন্দের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছি। উপভোগ করেছি প্রতিটি মুহূর্ত। সব উপভোগ করেছি- যেমন ফোনে কথা বলা, অকারণ আলাপে সময় কাটানো, বাইরে বেড়াতে যাওয়া, ঠিক তেমনি অন্তরঙ্গ সময়ের চরম মুহূর্তগুলো। এরকম বর্ণনাতীত ভালো এবং উপভোগ্য সম্পর্কের মধ্যে আজ হঠাৎ মনে হলো এটা অপ্রয়োজনীয়, অনাবশ্যক। আশ্চর্য!
বিষয়টা কি এমন- আমার বয়স হচ্ছে, শরীরের চাহিদায় টান ধরেছে? হতে পারে। কিন্তু গত রোববার, সেদিন তো এমন মনে হয়নি। এক সপ্তাহেই কি বয়স বেড়ে যাবে! অ্যাবসার্ড! অরুণের স্বাস্থ্য এখনও যথেষ্ট ভালো। ও যথেষ্ট সমর্থ পুরুষ। না, কোথাও কোনো টোল নেই। তবু মনে হলো বিষয়টার কোনো প্রয়োজন নেই, কাজটা জঘন্য। আর রিকশায় এতটা পথ ফিরতে ফিরতেও মনের কোনো পরিবর্তন এলো না। বারবার মনে হলো অরুণের ওখানে আর না গেলে হয়।
আমাদের এমন একটা সম্পর্কের খুব প্রয়োজন ছিল, ছিলই। আমার জন্য এবং অরুণের জন্য। আমরা দু'জন দু'জনকে খুঁজে নিয়েছি এটা শুধু ন্যাকা ভালোবাসার জন্য নয়, এখানে শরীর ছিল। আমি আমার এ শরীর নিয়ে বেকায়দায় ছিলাম। তবে অরুণের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু শরীরের জন্য শরীর এমন নয়; এখানে শিল্প মাখানো আছে, যেমন রাস্তার ধারে বিক্রির জন্য কাটা পেয়ারার মধ্যে কাসুন্দি মাখানো থাকে। অরুণের জন্যও একটা শরীর জরুরি ছিল কিন্তু ওই একইভাবে শরীরের সঙ্গে একটা হৃদয়। প্রয়োজন আমাদের কাছাকাছি করেছে। তবে যাকে বলে এটা ছিল স্বর্গীয় প্রাপ্তি। দেহ-মনে এত সুখ নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া।
আমার আর অরুণের সম্পকটা অনিবার্য ছিল। দু'েেজনর জন্য দু'জনের প্রয়োজনটা ছিল বেঁচে থাকার নিঃশ্বাসের মতো। নাজিমের সঙ্গে কখনই আমার দুয়ে দুয়ে চার মেলেনি। না শরীর, না মন- কোনোটাই না। বিয়েটা আমার খুব প্রয়োজন ছিল। তারপর বিয়ে আবার আমাকে মেরে ফেলেছিল। আমি অস্থির পাগল হয়ে উঠেছিলাম। একটা লোক দশ বছর ধরে শুধু উঠল আর নামল! অথচ কোনো বিকার নেই! সব লজ্জার মাথা খেয়ে আমি বলেছি- একটা ডাক্তার দেখাও, তারপরও কোনো গা নেই। এটা স্পষ্টতই আমাকে অগ্রাহ্য করা, আমার প্রতি অবহেলার চূড়ান্ত। এই রকম একটা ভালোবাসাহীনতা, প্রতি রাতের অথর্ব একটা লোক। আর আমি অতৃপ্ত, গরম মাথা, গরম শরীর নিয়ে অফিস করছি। আর আমার পাশে অরুণ প্রতিদিন আফসোস করছে- বউটা কাছে নেই, ফ্রিজে রাখা ঠা-া ভাত, কখনও পাউরুটিতে জেলি মাখিয়ে খাচ্ছে। একটা জওয়ান শরীরের জ্বালা নিয়ে দাপাদাপি করছে। আমাকে দেখাচ্ছে তার বইয়ের রেয়ার কালেকশন। ক্লাসিক সঙ্গীতের অনবদ্য জগৎ। মাঝে মাঝেই ডাকছে চা পানে। আর অর্চনা করছে আমার। দু'চোখে উপচে পড়ছে প্রশংসা, পূজা। তখন এটা কে রুখবে? রুখতে পারতাম আমি নিজেই, কিন্তু আমি তো চেয়েইছিলাম গরু পানিতে নামুক, সাঁতার কাটুক। অরুণ ছেলেমানুষ, সেটা বুঝবে না কেন? আশ্চর্য, এরকম একটা প্রকাশ্য প্রচ্ছন্ন বিষয়ের পরেও আমরা কখনই দু'জনের কাছে দু'জন খুব নগ্ন হয়ে পড়িনি, একটা সৌন্দর্য আর শালীনতা আমাদের সব কিছুতে ছিল এবং এখনও এটা আমরা ধরে রেখেছি। এটা যে একটা অশ্নীলতা না, শুধু মাংসের থলথলে চাহিদা না। নোংরা ইশারা ইঙ্গিতের ঠাট্টা মশকারা না। এটাও আমরা খুব ভালোভাবেই সংরক্ষণ করতে পেরেছি।
এই অবধারিত সঙ্গ আর সমর্পণ আমাকে মুক্তি দিয়েছিল। না হলে আমি মরেই যেতাম। আর অরুণ তো বলে, সে মৃতই ছিল; আমিই তাকে জীবন দিয়েছি। এসব সব সত্য। কিন্তু তারপরও কেন মনে হলো এটা একটা অশ্নীল কাজ। স্বাভাবিক রীতিতে যেটা হয় কিছুকাল চলার পর বিষয়টা মনে হয় পানসে, হঠাৎ খুব সাধু ভাব আর সততা এসে গ্রাস করে, মনে হয় কত অপরাধ! স্বামীর জন্য হঠাৎ মন প্রেমে ভেসে যায়। না, এসব কিছুই হয়নি আমার। আর এখন অরুণের প্রতিও কোনো ক্ষোভ, মায়া, মমতা কোনো বন্ধন অনুভূত হচ্ছে না। অরুণ আর আমার সম্পর্কটা রুটি আর মাখনের মতো পরিপূরক, গাছে নতুন পাতা আসার মতো স্বতঃস্ম্ফূর্ত। কিন্তু তবু বলতেই হবে, এই একটা স্বতঃস্ম্ফূর্ত সম্পর্ক ছয় বছর এত র্নিবিঘ্নে চালিয়ে যাবার জন্য আমাকে অনেক ছাড় দিতে হয়েছে। আমি বহুদিন কোনো পুরনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় যাই না। টেলিফোনে কারও সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা বলি না। সবসময় অরুণের ফোনের জন্য তৈরি থাকি। অনেক অনুষ্ঠানে যাই না। সময় বের করতে পারি না যাবার জন্য। তখন হয়তো অরুণের জন্য সময় দেই। সপ্তাহে সপ্তাহে সব চোখ ফাঁকি দিয়ে অরুণের কাছে যাই। অরুণের বউ দেশে নেই তাই সুযোগ বুঝে ভালো তরকারিটা বাটিতে তুলে নিয়ে আসি। ওর চাহিদা অনুযায়ী সঙ্গ দেই, কখনও কেনাকাটা করে দেই। এসব আরও অনেক কিছু, ছোটখাটো বহু বিষয়, যা বলা যায় না কিন্তু অনেক শ্রম, অনেক মনোযোগের ব্যাপার, অনেক সময় ব্যয় করার বিষয়- এসব সব করেছি, সব করি।
আমার দুটো মেয়ে, হ্যাঁ ওদের আমি ভালোবাসি, সময় দেবার চেষ্টা করি। কিন্তু না, ওদেরও অনেক সময় আমি বঞ্চিত করি। আমি ভুলেই গিয়েছি ওই অরুণ ছাড়া আমার আর কোনো জগৎ আছে। আমি আমার জগৎকে কত সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি অরুণের মধ্যে। আমার ভালো লাগা, আনন্দ, ভালো থাকা সব সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি অরুণের মধ্যে। ছয় বছর ধরে আমি যেন একটা খোপের মধ্যে পড়ে আছি। এই একটা মানুষ আর ওই একটা বিষয়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। আর এই একটা সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য কত সত্য মিথ্যা, কত কৌশল আমাকে করতে হয়েছে। কতভাবে প্ল্যান প্রোগ্রাম সাজাতে হয়েছে। আমার কত কাজকে অরুণের প্রোগ্রামের সঙ্গে ঢেলে সাজাতে হয়েছে। কত সতর্কতা, কত মুখোশ আমাকে পরে থাকতে হয়েছে। অনেক সময় ইচ্ছে করেনি তারপরও এগুলো করেছি। অরুণকে খুশি রাখার জন্য কখনও কখনও নিজের ইচ্ছের রিরুদ্ধেও গিয়েছি। মাথায় সারাক্ষণ এই একটা চিন্তাকে ধরে রাখতে হয়েছে। নানাভাবে নিজেকে অন্য কাজের সঙ্গে সমন্বয় করে নিতে হয়েছে। আমি আসলে সারাক্ষণ এই একটা বিষয়ে নিজেকে এনগেজ করে রেখেছি। হ্যাঁ, বিনিময়ে আমিও কম পাইনি; পেয়েছি ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা, শরীরী সুখ। আমার ওই দমবন্ধ সময়টাকে সুন্দরভাবে অতিক্রম করতে পেরেছি। নাজিমের প্রতি আমার ক্ষোভ, তিক্ততা কমে গেছে। একটা স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন পার করতে পেরেছি। অরুণ না হলে কি ওই দাম্পত্য সম্পর্কটা এত ভালো থাকত? নাজিমের সঙ্গে আমি আরও তিক্ততায় জড়িয়ে যেতাম না?
কিন্তু তারপরও? কেন? কেন আমার ভালো থাকার জন্য ওই একটা কাজ আর ওই একটা সম্পর্কই এত জরুরি হবে। আমার সমস্ত জগৎকে ছেঁটে ফেলে দিয়ে কেন আমাকে একটা খোপের মধ্যে পড়ে থাকতে হবে। আমাকে এরকমভাবে ভালো থাকতে হবে? কেন? ভালো থাকাটার মানে কি তাই? আমি কি ওই একটা সম্পর্ক ছাড়া ভালো থাকতে পারি না? আর এরকম ভালো আমাকে থাকতে হবেই বা কেন? ভালো না থাকলে কী হয়? আমি কেন নিজেকে মুক্ত করে নেবো না এই ভালো লাগার ঘোর থেকে। কেন এই ঘেরাটোপ মেনে নেব? আমার ভালো থাকার জন্য আর একজন মানুষ এত অবধারিত কেন? কেন আমাকে ভালো থাকার জন্য অন্য একজনের ওপর নির্ভর করতেই হবে। আমি কি নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারি না? পারি তো। এই তো আজ, এই এখনই আমার মনে হচ্ছে কাজটা অপ্রয়োজনীয়, কুৎসিত। এই কাজটার কোনো প্রয়োজন নেই। এটা ফালতু একটা বিষয়; না, এর কোনো ভূমিকা নেই আমার ভালো থাকায়।
আমি আমার ছয় বছর থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিচ্ছি। আজ থেকে, এই মুহূর্ত থেকে। আমার এই ছয় বছর আমার জন্য প্রয়োজন ছিল, আমাকে অনেক দিয়েছে। কিন্তু তবু শুধু ভালো থাকার জন্য আমি আর কোথাও যাব না। কোনো কৌশল, কোনো ফাঁকি, কোনো সত্য-মিথ্যার কাছে আমি আর নিজেকে সর্মপণ করব না। আমার নিজের ভুবনকে জলাঞ্জলি দেবো না। অন্যের ইচ্ছের মূল্য দিতে গিয়ে, অন্যকে খুশি করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছেকে গলাটিপে আর হত্যা করব না। না, এই আমার ছয় বছরের জন্য কোনো বেদনা, অনুতাপ বোধ করছি না। মনের কোথাও কিছু জমে নেই। ছয় বছর যেন মুহূর্তে মিলিয়ে গেছে কর্পূরের মতো। দাগহীন ঝরে পড়েছে। আশ্চর্য! না, আমার আর কাউকে প্রয়োজন নেই। না নাজিম, না অরুণ, না অন্য কেউ। কাউকে না। আমি মুক্ত স্বাধীন থাকতে চাই। আমি আমাকে নিয়ে ভালো থাকব। আমার মতো করে ভালো থাকতে চাই। আমার ইচ্ছেকে আমি জয়ী করব। আমার ভেতর আমি আনন্দ খুঁজে নেবো। অন্যের জন্য জীবনে অনেক ভাবতে হয়েছে। অনেক সমঝোতা করতে হয়েছে। নিজেকে নিয়ে অনেক খেলতে হয়েছে। অনেক অনেক কৌশলে নিজেকে বেঁধে রাখতে হয়েছে। জীবন থেকে আমার অনেক কিছু বাদ পড়ে গেছে। অনেক কিছু থেকে আনন্দ নেওয়া হয়নি আমার। আমাকেই দেখা হয়নি আমার। আমি আমাকে দেখতে চাই। আমার নিজস্ব ভুবন আমি দেখিনি। আমার ভুবনটাকে দেখতে চাই। নিজেকে আমার খুঁড়ে দেখা হয়নি। আমি আমাকে দেখতে চাই। খুঁড়ে খুঁড়ে দেখতে চাই নিজেকে। আমার ছয় বছরের অবরুদ্ধতা থেকে আমাকে আজ মুক্তি দেব আমি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT