স্বাস্থ্য কুশল

নীরব রোগ হৃদরোগ

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১০-২০১৮ ইং ০০:৫৩:১০ | সংবাদটি ১৪৮ বার পঠিত

হৃদয়ের একূর ওকূল/ দু’কূল ভেসে যায়/ হায়! সজনী/ উথলে নয়নও বারি ...। বিরহে কাতর অনেক প্রেমিক হৃদয় দিন রাত এই রকম হাহাকার করে। আবার হৃদয়ের অসুখ নিয়েও অনেক পাওয়ারফুল মানুষের নয়নের বারি অবিরাম উথলে ওঠে। তবু এই হৃদয়ের চোখ দিয়েই মানুষ বিশ্ব দেখে অবাক চোখে। তাই আমাদের হার্ট এক আজব জাদুঘর। হৃদয়ের যতœ নেওয়া অতীব জরুরি।
হৃৎপিন্ড, মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, হৃদয়ের প্রতি উদাসীনতা দেখাবার অর্থ হলো, জেনে শুনে বিষ পান করা। হৃৎপিন্ডের রক্তনালিতে রক্ত চলাচলের পথ অথবা ধমনির ভেতর রক্ত প্রবেশের পথ আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে হৃৎপিন্ডকে অক্সিজেন সরবরাহে ব্যর্থ হলেই সম্ভাবনা বাড়ে হার্ট অ্যাটাকের। নানাবিধ কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যাকে বলা হয় রিস্ক ফ্যাক্টর। কিন্তু এর অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। আর এই নিয়ন্ত্রণযোগ্য রিস্ক ফ্যাক্টরের মধ্যে রয়েছে ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, চর্বিজাতীয় খাদ্য বেশি গ্রহণ ও আঁশজাতীয় খাদ্য কম খাওয়া। যদি কারো মানসিক চাপ বেশি থাকে, তবে তা বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে যায়। আর এর চাপ সামলাতে না পেরে হৃৎপিন্ডই অকেজো হয়ে যায়।
হৃদরোগের এই চোখ রাঙানি যে আমাদের আধুনিক লাইফে বারবার সিগন্যাল দিচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা আমাদের বডির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্যের কথা জানিয়েছেন। আর তা হলো, বাংলাদেশের মানুষের রক্তনালী তুলনামূলকভাবে সরু। এর ফলে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেশি। এজন্য বাইপাস সার্জারি করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে দেখা দেয়। আবার অন্য দিকে, বর্তমানে বাংলাদেশের রোগীরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও মানসিকভাবে অন্য দেশের লোকের তুলনায় বেশি চাপে থাকেন। এটাও হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ দশ বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। লক্ষণীয় যে, হৃদরোগে আক্রান্তদের রক্তে আর্সেনিক, কপার ও লেডের মতো বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতিও পাওয়া যাচ্ছে কোনো কোনো সময়। এ থেকে হৃদরোগের ঝুঁকি আরো বাড়ছে বলে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তিন দশক আগেও বাংলাদেশে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ছিলো বেশি। কিন্তু এ সকল রোগের মৃত্যুর হার অনেকটা নি¤œমুখী। এর পরিবর্তে, খাদ্যাভ্যাস ও জীবন ধারা পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে দেশে হৃদরোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া, বর্তমানে জন্মগতভাবেও হৃৎপিন্ডে উইকনেসজনিত প্রবলেম নিয়েও অনেক শিশু জন্মগ্রহণ করছে। এই অবস্থায়, হৃদরোগ বর্তমানে দেশের রোগসৃষ্ট মৃত্যুর এক নম্বর কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
দেশে হৃদরোগীর প্রকৃত সংখ্যা কত? তার সঠিক পরিমাণ না থাকলেও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। আর মনে রাখতে হবে হৃদরোগের চিকিৎসা অনেকক্ষেত্রে ব্যয় বহুল। একবার হৃদরোগে আক্রান্ত হলে সারাজীবন অনেক নিয়মের মধ্যে পেশেন্টাকে চলতে হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা পেশেন্টাকে ঔষধের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। তাই কিছু নিয়মকানুন যদি আমরা হৃদরোগের পূর্বে মেনে চলি, তাহলে ভালো। আরেকটি কথা, আজকাল অল্প বয়সেও অনেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। অতএব, আমরা সবাই যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হয়ে হৃদরোগের ঝুঁকিগুলো জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি, কেবলমাত্র তখনই হৃদরোগ ও হৃদরোগের ঝুঁকিপূর্ণ অকাল মৃত্যু এড়ানো সম্ভব বলে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সুতরাং, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে ও শৃঙ্খলা মেনে চলে সুন্দর জীবন উপভোগ করে দিন শেষে লুকিং গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখেন এবং ঠিক একটু পর পাড়া, গ্রাম অথবা মহল্লার পথে হাঁটতে হাঁটতে একটু গুন গুন করেনÑবাওকুমটা বাতাস যেমন উইড়া উইড়া চলে/ ওকি ওরে! ঐ মতোন মোর গাড়ির চাকা পন্থে প-অন্তে ঘুরেরে/ ওকি গাড়িয়াল মুই চলুং রাজপন্থে/ ওকি গাড়িয়াল মুই চলুং রাজপন্থে...।
রাজ পথের রাজা হয়ে জীবন গাড়িখানা চালাতে হলে কম খান, বেশি হাঁটেন। লাইফস্টাইল বদলে ফেলেন। হৃদয়কে সুস্থ রাখেন। ওপারের ডাক এলে চলে যান, মোহ মায়ায়! মোহ মায়ায়! শুধু যাওয়া আসা শুধু ¯্রােতে ভাসা। শুধু আলো আঁধারে কাঁদা হাসা এইতো জীবন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT