উপ সম্পাদকীয়

বায়ুদূষণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর বিকাশ

সাধন সরকার প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১০-২০১৮ ইং ০০:১০:০৪ | সংবাদটি ৭৮ বার পঠিত

বাংলাদেশের বহু শিশু বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর বিভিন্ন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, দূষিত বাতাসে শ্বাস নিলে শিশুর সুনির্দিষ্টভাবে মস্তিষ্কের টিস্যু ও জ্ঞানের বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যার প্রভাব পড়তে পারে জীবনভর। অল্প বয়সের শিশুরা দ্রুত শ্বাস নেয়, ফলে বায়ুদূষণের কারণে এরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুর জন্য অপুষ্টি ও সহিংসতা যেমন মারাত্মক, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর বায়ুদূষণ। মারাত্মক দূষণের কারণে শিশুদের স্নায়ু প্রদাহ সৃষ্টি হয়ে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সম্প্রতি ‘ইউনিসেফের’ (জাতিসংঘের শিশু তহবিল) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে এক বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ শিশুকে বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে হয়। বলা হয়েছে, এসব শিশুর তিন-চতুর্থাংশের বেশি দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাস করে। তথ্য মতে, বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটির বেশি শিশু বায়ুদূষণের শিকার। ঢাকাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে সবমিলিয়ে প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটে বায়ুদূষণে। বায়ুদূষণের প্রধান কারণ মূলত মনুষ্যসৃষ্ট। তবে ধূলাঝড়সহ অন্য কিছু কারণের মতো প্রাকৃতিক কারণেও বায়ুদূষণ হয়ে থাকে। বায়ুদূষণ নীরব ঘাতক। শীতকালে অতিমাত্রায় বায়ুদূষণ হয়ে থাকে। নানা কারণে বায়ুতে কার্বন-মনোঅক্সাইড, সীসা, সালফার-ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরোকার্বনের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক গ্যাস ও পদার্থ বায়ুতে বেশি মিশে যায়। বায়ুদূষণে শিশুর হাঁচি, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ (হাঁপানি, ফুসফুসের প্রদাহসহ জটিল রোগ) দেখা দেয়। যেসব শিশুর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কম সেসব শিশুরা দূষণে বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।
অতিসম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, পরিবেশ দূষণের কারণে বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ। শুধু শহর অঞ্চলে দূষণের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দূষণের কারণে ২০১৫ সালেই শহরাঞ্চলে মারা গেছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। এর এক-তৃতীয়াংশই শিশু। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশের কারণ পরিবেশ দূষণজনিত অসুখ-বিসুখ। সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, দেশের শহরাঞ্চলে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ সীসা দূষণের ঝুঁকিতে বসবাস করছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। এ দূষণের কারণে শিশুর মেধা ও বুদ্ধিমত্তার ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় শিশুর মৃত্যুর হার বাড়ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে দূষণজনিত সমস্যা দিন দিন মারাত্মক আকার ধারণ করছে। শহরগুলোতে বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলো হলো আশপাশের ইটভাটার দূষণ (প্রায় ৫৮ ভাগ), রাস্তাঘাটের ধূলাদূষণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দূষণ, শিল্পকারখানার দূষিত ধোঁয়া, সীসার দূষণ, ময়লা-আবর্জনার দূষণ, বস্তিতে ব্যাটারিসহ শিল্পবর্জ্যের দূষণ ইত্যাদি। দূষিত বাতাসে ক্ষতিকারক গ্যাস ও ধূলার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে ফুসফুস ক্যান্সার, হূদরোগ ও স্ট্রোকসহ নানা রোগের ঝুঁকি। গৃহস্থালি বায়ুদূষণও শিশুর জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে রান্নাঘর (রান্নার জন্য লাকড়ি ও গোবরের ব্যবহার) থেকেও দূষণ ছড়াচ্ছে। শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক তিনটি দিকের জন্যই হুমকি বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে শিশুর যে রোগ হতে পারে অধিকাংশ অভিভাবক তা বিশ্বাসই করতে চান না! আবার ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তারও হয়তো বলছেন না যে রোগটি দূষণজনিত কারণে হয়েছে! কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীতে এখন দূষণজনিত রোগের সংখ্যাই বেশি। বায়ুদূষণসহ সব ধরনের দূষণ এখন জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। বায়ুদূষণের কারণে শিশুর স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ও বেড়ে ওঠা ব্যাহত হচ্ছে। বায়ুদূষণ থেকে শিশুসহ সবাই যদি সুরক্ষিত থাকে তাহলে শুধু উপকারই নয়, স্বাস্থ্যসেবার খরচও সাশ্রয় হবে। গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুরাই বেশি বায়ুদূষণের শিকার। শহরের বস্তি ও দরিদ্র এলাকার শিশুরা সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছে। জীবনের শুরুতে একটি শিশু দূষণের শিকার হলে তার ভবিষ্যত্ জীবন এলোমেলো হয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। দূষণ রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। দূষণের উত্সগুলো সবাইকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। বায়ুদূষণসহ সব ধরনের দূষণের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকা উচিত। জনস্বাস্থ্য ও মেধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি এই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে এখনই বিধিমালা বা নীতিমালা প্রণয়ন করার পাশাপাশি জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা উচিত। দূষণরোধে সরকারের সব সংস্থা, প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের প্রতিটি শিশুর জন্য ও সর্বোপরি সবার স্বার্থে বায়ুদূষণ রোধে পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT