উপ সম্পাদকীয় খোলা জানালা

সবুজ গাছে নগর গড়ি

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১০-২০১৮ ইং ০০:১১:০৬ | সংবাদটি ১১৯ বার পঠিত

দিনে দিনে আমাদের সিলেট নগরের পরিধি বাড়ছে। বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি, বাড়ি, দালান কোঠা। উঁচু উঁচু ফ্ল্যাট বাড়ীতে আকাশ ঢেকে যায়। আজ এই নগরে দেখিনা প্রভাতী মিষ্টি আলো, নেই বিশুদ্ধ বাতাস, নেই সবুজের হাতছানি। সব কিছুই বাড়ছে। শুধু বাড়ছেনা প্রকৃতির প্রাণ গাছ। একটি মেট্রোপলিটন নগর যতই চাকচিক্যের আলো ঝলমল করুক না কেন, যদি সেই নগরে গাছ-পালা না থাকে তবে সেই নগর মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যায়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে গাছ-পালা। তাই আসুন আমাদের এই সিলেট নগরকে সবুজে-সবুজে গাছে-গাছে একটি পরিবেশ বান্ধব, আলো-বাতাসে সবুজ গাছে সুন্দর নগর গড়ে তুলি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।
এক সময় আমাদের এই ছোট্ট শহরে প্রচুর গাছ-পালা ছিল। প্রতিটি বাসা-বাড়িতে-স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত, হাসপাতাল, রেল স্টেশন, বাজারে শোভা পেত পলাশ, শিমুল, কদম, বট, কৃষ্ণচূড়া, রাধাছুড়া, আম-জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, তাল, নারিকেল, সুপারি আরও কত ধরনের গাছ। ছিল গোলাপ, শিউলি, টগর, জুঁই, বেলি, হাসনাহেনা সহ কত শত ফুলের বাগান। গাছগুলি মানুষকে ছায়া দিত, বিশুদ্ধ বাতাস দিত, ফুলের সৌরভে ভরিয়ে দিত মন। সবাই গাছ-ফল-ফুল ভালোবাসতো। আজ নগর উন্নয়নের নামে, মার্কেট, ফ্ল্যাট বাড়ির প্রয়োজনে সেইসব পুরনো দিনের গাছ এখন আর নেই। সব কেটে ফেলা হয়েছে। প্রতিদিন নগরীতে যত গাছ কাটা হয় তার সিকি পরিমাণ গাছ লাগানো হয় না। নগরীতে জায়গার দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় কেউ আর গাছ লাগিয়ে জায়গার পরিমাণ কমাতে চায়না। সবাই এখন ভাবে তার লাভের কথা। অনেকেই মনে করে গাছ লাগালে জায়গার অপচয় হবে। তাই এখন বাসা-বাড়িতে গাছ দেখা যায় খুবই কম। যারা এখনো গাছ ভালোবাসেন শুধু তারাই বাসা-বাড়িতে গাছ লাগান। কিন্তু সংখ্যায় খুবই সামান্য। নগরীতে গাড়ির ধোঁয়া, কল কারখানার ধোঁয়া, ধুলি বাতাসে মানুষজন অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুরা শ্বাসকষ্ট সহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রতিদিন। তার একমাত্র কারণ হলো বিশুদ্ধ বাতাসের অভাব। পৃথিবীর বড় বড় শহরে রাস্তার মাঝখানে আইল্যান্ডে, রাস্তার দু’ধারে কত রকমের দৃষ্টিনন্দন নানা জাতের গাছ, ফুলের গাছ লাগিয়ে তাদের শহরকে পরিবেশ বান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
বাংলাদেশে কোথাও-কোথাও সবুজে ঘেরা গাছ-গাছালি পরিবেষ্টিত শহর আছে। তার মধ্যে অন্যতম রাজশাহী নগরী। রাজশাহী সিটির মেয়র ও নাগরিকবৃন্দ মিলে তারা তাদের নগরকে সবুজ গাছ পালায় ভরিয়ে দিয়েছেন। তারা যদি পারে তবে আমরা কেন পারবো না। আমরা ইচ্ছে করলে তা পারি। তার জন্য চাই গাছের প্রতি ভালোবাসা আর বাস্তব পরিকল্পনা। তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে সিটি কর্পোরেশনকে, এগিয়ে আসতে হবে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনকে, এগিয়ে আসতে হবে সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষাবিদ সহ সর্বস্তরের মানুষকে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।
যদি আমরা রাস্তার দু’পাশে, আইল্যান্ডে ছোট-ছোট নানা জাতের গাছ যেমন কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কদমগাছ, ফুলের গাছ লাগানো হয় তবে নগরবাসী নিঃশ্বাস নিতে পারবে বিশুদ্ধ বাতাস। ফুরফুরে হাওয়ায় মন হবে খুশিতে ঝলমল। গাছ-পালা ও ফুলের সুবাস সহজেই মানুষকে আকৃষ্ট করে, মনকে করে উৎফুল্ল। একটি নগর হবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গাছপালা সুশোভিত যেন দেখে মন গান গেয়ে ওঠে অন্তর থেকে আহা, কি আনন্দ আজ আকাশে বাতাসে।
নগরে গাছ-পালা থাকার মানে হলো নানা জাতের পাখিদের আনাগোনা কলরব। হয়তো পথ চলতে কোন পথচারী শুনতে পাবে ঘুঘুর ডাক। এখন নানা জাতের নানা বর্ণের, নানা রঙের গুল্মলতার ফুল পাওয়া যায়। তার মধ্যে আছে সোনালি লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি দিয়ে যদি সাজানো যায় তবে মানুষ দুচোখ ভরে সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। হয়তো আমার মতো কোন কবি রিক্সায় যেতে যেতে কবিতা লিখতে পারেন। হয়তো কোন মা সন্তানের হাত ধরে প্রকৃতির রূপ সুধা পান করে গুন গুনিয়ে গান গেয়ে আনন্দ চিত্তে পথে চলতে পারেন। এইসব কথাকে কল্পনা ভেবে যদি পরিকল্পিতভাবে বাস্তবতায় রূপ দেওয়া যায় তবে কল্পনা স্বপ্নে পরিণত হতে সময় লাগবে না। তার জন্য চাই সুন্দর নগর গড়ার প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তি, প্রাণ শক্তি। হতে হবে সুন্দরের পূজারী।
গাছপালা মানুষের মনে মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। মানুষের মনে জাগ্রত করে সুজনশীলতা-সৃষ্টিশীলতা, মানুষের মন হয় মুক্তমনা, কুসংস্কার মুক্ত, মানুষের মাঝে জাগিয়ে তোলে মানবিক মূল্যবোধ। জাগ্রত করে মানুষে মানুষে প্রেম, মায়া, মমতা, ভালোবাসা, গাছপালার কাছে মানুষের উপস্থিতি মানে প্রকৃতি মানুষের সান্নিধ্য রচনা করা। নিস্তরঙ্গ এই নগরে গাছ-পালা মানুষের মনে সুস্থ-সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন পূরণ করবে। গাছপালা শুধু মানুষের সান্নিধ্য আসেনা, সে সঙ্গে তার স্বপ্ন-ভালোবাসা, বিশ্বাস, মনোজটিলতা, শৃঙ্খলিত ভাবনা, দৃষ্টির উদারতা অনুষঙ্গ ও মানুষের অস্তিত্ব বহন করে নিয়ে আসে। ফলে গাছ-পালা ঘেরা প্রকৃতির মাঝে মানুষে-মানুষে প্রীতির সম্পর্ক তৈরি হয়। একজনের স্বপ্নের সঙ্গে অন্যের স্বপ্ন, একজনের সুখের সঙ্গে অন্যজনের সুখ কিংবা দুঃখ পরস্পরের উপলব্ধির সমন্বয়ে যে মানবিক পরিবেশ তৈরি করে দেয় একটি পরিবেশ বান্ধব সবুজ গাছে ঘেরা, ফুলে-ফুলে ভরা একটি সুন্দর নগর। লেখাটি শেষ করছি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার দুটি চরণ দিয়ে। ‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু, চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু’।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT