মহিলা সমাজ

প্রশান্তিময় সুর

শাহানারা বেগম ইমা প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১০-২০১৮ ইং ০০:১২:৫৮ | সংবাদটি ৩০২ বার পঠিত

সেনাপতি! এতো অস্থির লাগছে কেন আমার? কেন বারবার শিহরিত আর তৃষ্ণার্ত হচ্ছি আমি? ওই কয়েদি আমাকে কি শুনালো?
রাজা কথাগুলো বলছিলেন আর বারবার সেনাপতির হাত আঁকড়ে ধরছিলেন।
সেনাপতি তার হাত আরেকটু শক্ত করে ধরে বললেনÑমহারাজ! আপনি শান্ত হোন। অনুগ্রহ করে বলুন কী হয়েছে আপনার। কেন আপনি এমন করছেন? অস্থিরতার এ সময়ে হাতের ওপর সেনাপতির বিশ্বস্ত হাত পেয়ে রাজা প্রায় কেঁদেই দিলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন বহু বছর আগে শহরের শেষ প্রান্ত ভ্রমণের সময় কেউ একজন এই একই সুর শুনিয়েছিলো। আপনি বিশ্বাস করুন সেনাপতি, ওই সুর শুনে তখন ভেতরটা কেমন করছিলো আমার। কিছু সময়ের জন্য কী এক প্রশান্তির ¯্রােতে ভেসে গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু রাজ্যের ব্যস্ততা আমাকে এই প্রশান্তির ¯্রােত থেকে ঝাপটে ধরে নিয়ে এসেছিলো।
সেনাপতির হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ডান হাত কপাল বরাবর তুললেন রাজা। শাহাদত আঙুল খানিকটা দন্ডায়মান করে বললেন, আজ সেই সুর আবার কানে এলো আমার। ফের যখন এই সুর শুনছিলাম বারবার মনে হচ্ছিলো কতকাল ধরে যেন এই সুর শ্রবণের তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত ছিলাম আমি।
তারপর সেনাপতি রাজার এমন অস্থিরতা দেখে নিজেও স্থির থাকতে পারছিলেন না। রাজ্যের শাসক হলেও তিনি সেনাপতির ভালো একজন বন্ধু। রাজ্যের বিষয়াদি ছাড়াও তিনি সেনাপতির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে তত্ত্বাবধান করেন। দু’জনে একে অন্যের সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করেন। কিন্তু শরীর ভালো না থাকায় গত তিন দিন তিনি রাজাকে সঙ্গ দিতে পারেন নি।
আর কথা না বাড়িয়ে সেনাপতি চলে গেলেন কয়েদিখানায়। চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি এক যুবক গভীর মনোযোগে তেলাওয়াত করছে মহাগ্রন্থ আল কুরআন। তিনি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সেই সুমধুর তেলাওয়াত শুনলেন কিছুক্ষণ। তারপর ফিরলেন রাজার কাছে। রাজা সেই আগের মতোই পায়চারি করছেন আর বিড় বিড় করে কি যেন বলছেন। ধীর পায়ে কাছে এলেন সেনাপতি। আস্তে করে ডাক দিলেন মহারাজ বলে।
সেনাপতির ডাকে সম্বিত ফেরে রাজার। কিন্তু আবার বলতে লাগলেন, এ কোন সুর বাজলো আমার কানে!
সেনাপতি দু’হাত দিয়ে তাঁকে সিংহাসনে বসিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি শান্ত হোন মহারাজ। আমি বলছি আপনাকে সব।
সিংহাসনে বসতে বসতে রাজা বললেনÑহ্যাঁ, সেনাপতি। বলুন আপনি। সংগীতাঙ্গনে জন্ম আমার। কতো ওস্তাদের কাছে নজরুল সংগীত, রবীন্দ্র সংগীত সাধনা করলাম। কতো গায়কের সন্নিকটে গেলাম। কতো সুর ধরলাম নিজেও। কিন্তু কোনো সুরই তো আমায় এমন করে আকৃষ্ট করে নি। এতো পাগল করে নি। এ কোন সুর যা কোনো প্রকার বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই এতো মনকাড়া?
Ñমহারাজ! এটা রবীন্দ্র বা নজরুল সংগীতের কোনো অংশ নয়, নয় কোনো লোকগীতিও। এটা মহান রবের পাঠানো সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব আল কুরআন তেলাওয়াতের সুর!
Ñআল কুরআন তেলাওয়াতের সুর!
Ñজি মহারাজ! এই সুর শ্রুতিমধুর করতে কোনো বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। এই সুরের সম্পর্ক রব ও হৃৎপিন্ডের মধ্যে যা শুনলে হৃদয় রবের প্রতি আনুগত্য ও তাঁর ভয়ে কেঁদে ওঠে।
Ñতাই নাকি সেনাপতি?
Ñজি মহারাজ! শুধু তাই নয়, এটা এমন এক সংগীত যে সংগীতের প্রতিটা বর্ণ উচ্চারণে সওয়াব প্রদান করা হয়। একটা বর্ণ উচ্চারণ করলে বিনিময় হিসেবে আমলনামায় দশটা পুণ্য লিখা হয়। এটা মানুষের জন্য স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত উপহার।
Ñ(ছলছল চোখে) তাই যদি হয় তবে আমি কেন সেই সৌভাগ্যবানদের দলে নই?
Ñআপনি শান্ত হোন জাহাপনা! আমি বলছি আপনাকে সব। এই গ্রন্থ তেলাওয়াত করলে শুধু সওয়াবই হয় না বরং এখানে ¯্রষ্টার সমস্ত সৃষ্টি নিয়ে লিপিবদ্ধ আছে। কীসে মানুষের মঙ্গল হয়, কীসে অমঙ্গল হয় সব এখানে লেখা আছে। আমরা যদি আমাদের ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এই কুরআনের নীতি অবলম্বন করি তাহলে আমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবো না। বরং ¯্রষ্টার দ্বারা আমাদেরকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে।
Ñএই কিতাবের আদর্শে যদি আমাদের মঙ্গলই হয় তবে কেন আমার রাজ্যে কুরআনের শাসন অকেজো?
Ñআপনি চাইলেই এ রাজ্যে কুরআনের আইন চালু হবে মহারাজ।
Ñকৌতুহলি চোখে রাজা সেনাপতিকে প্রশ্ন করেনÑআমার প্রজারা দ্বিমত করবে না সেনাপতি?
মুখে মুচকি হাসির রেখা টেনে রাজাকে অভয় দিয়ে সেনাপতি বললেনÑমহারাজ! এ রাজ্যের প্রজাদের প্রাণের রাজা হলেন আপনি। প্রজারা খুব ভালোবাসে আপনাকে। তারা আপনার আদেশ পালন না করে কি পারে। আর যে আইন সত্য, সে আইন নিঃসন্দেহে সুন্দর। আপনার প্রজারা তো সুন্দর রাজ্যই চায়।
আপনি ঠিক বলেছেন। তবে আমি যে কুরআন তেলাওয়াত করতে জানি না। আমি কী করে এ রাজ্য পরিচালনা করবো।
গলার আওয়াজকে খানিকটা বাড়িয়ে ওঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সেনাপতি বললেনÑআল্লাহ পাক আপনার এই সদিচ্ছাকে কবুল করুন। আপনি চিন্তা করবেন না মহারাজ। আমি তো আছিই আপনার সাথে। কুরআন শিক্ষার আসর থেকে সবচেয়ে দক্ষ, গুণী ও সুললিত কণ্ঠের ওস্তাদকে আমরা আজই ডেকে পাঠাবো।
তার এ আশ্বাসমূলক কথা শুনে সিংহাসন থেকে ওঠে দাঁড়ান রাজা। কৃতজ্ঞতার অশ্রু ছেড়ে জড়িয়ে ধরেন সেনাপতিকে। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেনÑএ রাজ্যে আপনিই আমার পরিজন, প্রাণের সুজন। সেনাপতি রাজার পিঠে হালকা করে হাত বুলিয়ে বলেনÑআর আপনি আমাদের প্রাণের শাহানশাহ। দু’সেকেন্ড চুপ থেকে সেনাপতি রাজার কাছে ঐ বন্দি যুবকের অপরাধ জানতে চান। রাজা সেনাপতির বাহু থেকে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বললেনÑকাল আমি পাখি শিকার করতে বের হয়েছিলাম। বুকের সাথে ইয়া বড়ো একটা বই আগলে রেখে ওই যুবক পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ আমাকে দেখে বলে ওঠলো প্রাণি হত্যা মহাপাপ। আমার রাগ হয়েছিলো এই ভেবে যে সামান্য একজন প্রজার কী করে রাজার শখের বিরুদ্ধে কথা বলার স্পর্ধা হয়। তাই আদেশ করেছিলাম তাকে ধরে আনার। দু’হাত দিয়ে সেনাপতির কাধে ধরে আবার বললেনÑওকে আর ছাড়বো না আমি। সে এখন থেকে এখানেই থাকবে এবং প্রতিদিন তাকে তার সুললিত কণ্ঠে আমাকে কুরআন তেলাওয়াত শুনাতে হবে। এই সুরে আমার প্রাণ শীতল করার জন্য তাকে মজুরি দেওয়া হবে।
Ñআপনার সুন্দর সিদ্ধান্তে আমি মুগ্ধ মহারাজ। মুগ্ধ এই কয়েদিও বলে দু’পা ডানে সরলেন সেনাপতি। রাজা সামনে তাকাতেই দেখলেন কয়েদি দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে বাকি রইলো না সেনাপতির পূর্বেকার আদেশে কয়েদিকে এখানে আনা হয়েছে।
সেনাপতি কয়েদিকে জিজ্ঞেস করলেন সে মহারাজের আদেশ পালন করতে পারবে কি না। জবাবে কয়েদি বললো, জি পারবো। তবে কুরআন তেলাওয়াতের বদলে কোনো মাইনে নেবো না আমি। বরং মহারাজ যদি অনুগ্রহ করে একটা কাজ দিতেন আমাকে...।
তাকে থামিয়ে দিয়ে রাজা বললেন, কাজ তুমি পাবে যুবক। তোমার আর কোনো চাওয়া আছে?
কয়েদি বললোÑআপনি আমাদের শাহান শাহ। আপনাকে ওয়াদা করতে হবে আর কোনো প্রাণি হত্যা না করার। রাজা খুশিমনে বলে ওঠলেনÑবেশ! আমি ওয়াদা করছি এ রকম ঘৃণ্য কাজ আর করবো না আমি। আমি রাজ্যে কোনো প্রাণি হত্যা হতে দেবো না আর। এ কথা শুনে সেনাপতি ও কয়েদি উভয়ে বলে ওঠলেনÑমারহাবা মারহাবা মহারাজ।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT