মহিলা সমাজ

অতৃপ্ত হৃদয়

শেখ রিমঝিম দোলা প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১০-২০১৮ ইং ০০:১৮:২০ | সংবাদটি ২১ বার পঠিত

ভিন্ন ভিন্ন মানুষের হরেক রকম দুঃখ, কষ্ট। কারো কম আবার কারো বেশি। যত যাই হোক ব্যথা তো ব্যথাই। প্রত্যেকটি মানুষের জীবন একেক রকম গল্পে সাজানো। তেমনি সুইটি নামের একটি মেয়ের জীবন আর মৃত্যুর গল্প বেশ বেদনাদায়ক। কোনো এক জেলা শহরে সুইটির জন্ম। বাবা-মা, ভাই-বোন, নিয়ে ওদের মধ্যবিত্তের পরিবার। মোটের ওপর স্বচ্ছল ছিলো ওর পরিবার। তবে সুইটিকে ওরা খুব একটা আদর করতো না। ওর বাবা ওকে আদর করতো। ওর মা আর বোন ওকে নানানভাবে অনেক নির্যাতন করতো। শুধু যে শারীরিক নির্যাতন, তা নয়। মানসিকভাবেও নির্যাতন করতো। ও যতোটা পারত নিরবে সহ্য করতো। কখনো কখনো বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করতো। তখন নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যেতো। এসব ওর কখনো পছন্দ হতো না। সে প্রায়ই বিভিন্ন রকম রোগে অসুস্থ থাকত। যতো যা ঘটে যাক, ওকে সর্বক্ষণ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো।
পৃথিবীতে ওর বেঁচে থাকার ইচ্ছে ছিলো কম। পৃথিবীর কোনো কিছুর ওপর তার কোনো মায়া ছিলো না। একমাত্র ওর বাবা ছাড়া, সব কিছু ওর কাছে অসহ্য লাগত। ওর সব ব্যাপারে কেন জানি বাঁধা দেয়া হতো। আর ও কখনো এসব মেনে নিতো না। ওর চাওয়া পাওয়ার সীমা ছিলো খুব কম। অল্পতে তুষ্ট থাকত। মারধর, বাজে কথা পছন্দ করতো না। ওরা ছাড়া সুইটির যতো পরিচিত মানুষ ছিলো, সবাই ওকে ভালোবাসত খুব পছন্দ করতো। উৎসাহ দিতো। ওর কোনো অর্জনে কিছু মানুষ খুশি হতো না, বিশেষ করে পারিবারিক সদস্যরা। খুব অল্প চেষ্টায় ও ভালো কিছু অর্জন করতো। ওর দুঃখগুলো হয়তো ¯্রষ্টারও ভালো লাগতো না। সে জন্য হয়তো তিনি মেয়েটির মনের আক্ষেপ বুঝতে পেরে পৃথিবী থেকে তুলে নিয়েছিলেন। কেননা সুইটি মরে যেতে চাইত। ও ছোটবেলা থেকেই চুপচাপ আর একা থাকত। মৃত্যু পূর্ব পর্যন্ত একই রকম স্বভাব ছিলো ওর। কোন একদিন সে আলোর এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হয়। মৃত্যুর পূর্বে সে একটি হাসপাতালে মরনোত্তর দেহ দান করে যায়। যথারীতি মৃত্যুর পর ওর দেহের বিভিন্ন অংশ রেখে দেওয়া হয়। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য। এমনি করে একদিন, একজন হৃদযন্ত্র বিশেষজ্ঞ ওর দেহের একটি অংশ হার্ট নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। বিভিন্নভাবে নতুন ডাক্তার সাহেব হার্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। হঠাৎ উনার কাছে মনে হলো মৃত হৃদয় যেন কথা বলছে! উনি এটা নিজের ভাবনার ভুল ভেবে যথারীতি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সেদিনের মতো ডাক্তার সাহেব তাঁর গবেষণা অসমাপ্ত রেখে বাড়ি চলে গেলেন। পরের দিন আবার এসে অসমাপ্ত কাজ করছিলেন। গত দিনের মতো একই রকম হার্ট কথা বলছে! কি বলছে, সেটা শোনার জন্য তিনি মনযোগ দিলেন। একি! সত্যিই মৃত হার্ট কথা বলছে। নিষ্প্রাণ হার্ট বলতে থাকে ডক্টর দেখেছ ডক্টর দেখোনা এখানে কতো ক্ষত! ডাক্তার সাহেব ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। হার্ট বলেই চলেছে, দেখ ডক্টর ব্লেডে চিরে ফেলার মতো শত শত কাটা দাগ! জানো, কেউ দেখেনি, দেখেও না দেখতে চায়ও না। আগে রাত জেগে কতো কেঁদেছি, অনেক কষ্ট হতো, কেউ বুঝতো না আমাকে। এখনো খুব কষ্ট, তুমি জানো না আমি খুব দুঃখি। ডক্টর ওরা আমাকে আদর করতো না কেন? নতুন ডাক্তার সাহেব কোনো উত্তর দিতে না পেরে কাঁদতে লাগলেন। মেয়েটির প্রাণহীন হৃদয় থেকে ঝড়ে পরে কয়েক বিন্দু রক্ত। কাঁদতে কাঁদতে তিনি দেখতে চাইলেন। কেন রক্ত ঝরছে হৃদপিন্ড থেকে! গবেষণার জন্য ডাক্তার সাহেব হাতে যন্ত্র তুলে নেন। মেয়েটির প্রাণহীন হৃদয় চিৎকার করে বলতে থাকে, ডক্টর প্লিজ যন্ত্র স্পর্শ করবেন না। জায়গাটায় এমনিতেই অনেক যন্ত্রণা, বেদনা। তুমি যদি যন্ত্র স্পর্শ করো আমার কষ্ট হবে, আমি তো আবার মরে যাব ডক্টর। নিষ্প্রাণ হৃদয়টি হাতে নিয়ে ডাক্তার কাঁদছেন, সাথে ক্ষত হৃদয়টিও কাঁদছে। ডাক্তার মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। এক দৃষ্টিতে জলসিক্ত নয়নে হৃদয়ের ক্ষতগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ক্ষত হৃদয়টি বলে ওঠে ও ডক্টর, ডক্টর আমায় ফ্রিজে রেখে দাওনা, কষ্ট হচ্ছে তো আমার। আর পারছিনা প্লিজ আমায় ফ্রিজে রেখে দাও বলেই করুণ সুরে কাঁদতে থাকে। ডাক্তার সাহেব উহু উহু স্বরে কাঁদতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার সাহেব আলতো করে হার্টটি ধরে ফ্রিজে রেখে দেন। ফ্রিজ বন্ধ করার আগে, হৃদয়টি বলতে থাকে, ডক্টর আর কেঁদোনা তুমি। শোনো তোমার যদি একটা মেয়ে থাকে তবে কখনো কষ্ট দিও না। ডাক্তার শুধু বললেন, কখনো না। চারপাশের পরিবেশ যেন তখন নিরবে কাঁদছিলো। উনি বাড়ি এসেও কিছুক্ষণ খুব কাঁদলেন। যেহেতু পড়ালেখার জন্য গবেষণা করতে হয়, নানানভাবে হার্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়। তিনি আর কখনো সেই হার্টটি নিয়ে গবেষণা করেন নি। তবে অন্য সব হৃৎপিন্ড নিয়ে কাজ চালিয়ে গেছেন। কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি ফ্রিজটি খুলে সেই হার্টটি দেখতেন, আর ক্ষত হৃদয়টি বলতো, ডক্টর তুমি খুব ভালো। ডক্টর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতেন, তুমিও।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT