উপ সম্পাদকীয়

কথা নিয়ে কথকতা

মাজেদা বেগম মাজু প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১০-২০১৮ ইং ০২:৫৭:৪২ | সংবাদটি ৭৩ বার পঠিত

স্বাধীনতার স্বাদ যেখানে সমগ্র প্রাণীকূলই উপভোগ করতে চায় সেখানে মানব জাতি তো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই এর রসাস্বাদনে আগ্রহী। স্বাধীনতা ছাড়া বেঁচে থাকা অর্থহীন। স্বাধীনতা বলতে জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে, ঘাসে-ঘাসে, নিঃশ্বাসে প্রতিটি ধূলিকণায় ব্যক্তি, জাতি ও সমষ্টিগতভাবে কারো মননে, চলনে বলনে সবকিছুর স্বাধীনতা বুঝায়। স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। আর মানুষ মাত্রই স্বাধীনতা প্রিয়। সেই দিক দিয়ে বাঙালি খুবই সৌভাগ্যবান একটি জাতি কারণ বাঙালিদের রয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম ভূখন্ড, রয়েছে নিজস্ব একটি গৌরবোজ্জল পতাকা সেই সাথে রয়েছে অবাধে বাংলায় বাক-স্বাধীনতা। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি এই স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন জাতি হিসেবে বাঙালির আত্মপ্রকাশ ঘটলেও বাঙালি জাতির মূল কাঠামো সৃষ্টির কাল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মুসলমান অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতিহাস থেকে জানা যায় উপমহাদেশে আগমনের অন্ততঃ চৌদ্দশত বছর পরে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে বঙ্গ ভূ-খন্ডে আর্যদের আগমন ঘটে। স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আর্যগণ সাফল্য লাভ করে এবং বঙ্গ ভূখন্ড দখল করে নেয়। পরবর্তীতে এরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যায়। কাজেই বর্তমান বাঙালি জাতি অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য, মঙ্গোলীয়, সেমীয়, নিগ্রো ইত্যাদি বিভিন্ন জাতির রক্তধারায় এক বিচিত্র জনগোষ্ঠী রূপে গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এর সাথে ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীও মিশে যায়।
বিভিন্ন সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতি অনেক সংগ্রাম ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বর্তমানে সগৌরবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখন্ডের মালিকানাধীন একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন জাতি হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্যে জীবন দিয়ে বাঙালি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমান প্রতি বছর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে সারাবিশ্বে পালিত হয়ে আসছে। তাৎপর্যময় এই দিনটিতে বাংলাকে মাতৃভাষারূপে স্বীকৃতি লাভের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বাংলায় বাক স্বাধীনতা লাভ করে।
একটি জাতির জন্য তার মাতৃভাষা অনেক গুরুত্ব বহন করে। সেই হিসেবে বাংলায় বাক স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে বাঙালির রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বর্তমানে বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ ঘোষিত হয়। রাষ্ট্রের সংবিধান রচনা থেকে শুরু করে বাংলায় রয়েছে আমাদের অনেক অর্জন। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের অন্যতম সরকারি ভাষা বাংলা যা ২০০২ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বীকৃতি লাভ করে।
বাংলা, বাঙালির এতোসব গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও পরিবার, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, রেডিও, সরকারি-বেসরকারি টিভি চ্যানেল সবকিছুতে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের অভাবে বাংলা, ইংলিশ, হিন্দির সংমিশ্রণে যেখানে বাংলা ভাষার দৈন্যদশা চলছে সেখানে বাক স্বাধীন বাঙালির বাক স্বাধীনতার যথেচ্ছাচার এবং ভাষার অপব্যবহার মাঝে মাঝে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছুকেই যেন ¤্রয়িমান করে তোলে। ভাষার শ্রুতিমধুর সঙ্গত ব্যবহার যখন অসংযত হয়ে ওঠে তখনই তা শ্রুতিকটু হয়ে ওঠে। আর ভাষার এই অপপ্রয়োগ নি¤œশ্রেণী থেকে শুরু করে উচ্চশ্রেণী আর সংসদ থেকে বস্তিবাসীর কথোপকথন কোন ক্ষেত্রেই এর ব্যতিক্রম নেই শুধু কম আর বেশি-ভদ্র ও ইতরসমাজ এই হলো পার্থক্য।
‘কথার শক্তিকে না জেনে মানুষকে জানা অসম্ভব’-চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস। আর প্রচলিত কথা আছে-‘কথার আছে শতেক বাণী, যদি কথা কইতে জানি’। কথার মাধুর্য্যে যেমন অন্যকে আকৃষ্ট করা যায় তেমনি রূঢ় বাক্যবাণে কাউকে শূলবিদ্ধও করা যায়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘ঞযব ঃড়হমঁব রং ধ গধহ’ং নবংঃ ভৎরবহফ, রঃ রং ধষংড় যরং ড়িৎংঃ বহবসু’-অর্থাৎ ‘জিহ্বা একজন মানুষের সর্বোত্তম বন্ধু আবার এটা তার সর্বনিকৃষ্ট শত্রুও।
কথা বলার ধরনেরও রয়েছে প্রকারভেদ-কেউ মিষ্টভাষী, কেউ রুষ্টভাষী, কেউ স্বল্পভাষী আবার কেউবা বাচাল। আর এই বাচালতার ক্ষেত্রে নাকি নারী (?) দেরই প্রাধান্য বেশি। এই নিয়ে একটি মজার কৌতুকও রয়েছে। একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে একজন মহিলাকে অনবরত কথা বলতে দেখে এক যুবক পাশে উপবিষ্ট স্বল্প পরিচিত ভদ্রলোককে ‘বাচাল ওই মহিলাটি কে’ জিজ্ঞেস করতেই ভদ্রলোক জবাব দিলেন, ‘আমার স্ত্রী’। যুবকটি ‘সরি আমার ভুল হয়েছে’ বলতেই এবার স্বামী বেচারা বলে ওঠলেন, ‘না, না আমারই ভুল হয়েছে’। অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, ওই বাচাল মহিলাকে বিয়ে করাটাই তার ভুল হয়েছে। স্বামী বাচাল হলে স্ত্রীকেও অনুরূপ কথা শুনতে হয় বৈকি।
কথায় কথা বাড়ে। তাইতো কারো সাথে মতবিরোধ দেখা দিলে সেই পরিস্থিতিতে অন্যপক্ষকে নিরবতা অবলম্বন করাই শ্রেয়। কারণ নীরবতা হিরন্ময় বলে একটা কথা আছে। তা-না হলে সেখানে কথায় কথা বেড়ে গিয়ে হাতাহাতি, মারামারি, ধস্তাধস্তি এমনকি খুনোখুনির মতো ঘটনা ঘটে যেতে পারে-যা এখন মোটামুটিভাবে বাঙালিদের প্রায় ঐতিহ্যেই পরিণত হতে চলেছে। শেখ সাদী তাই যথার্থই বলেছেন যে, ‘হয় মানুষের মতো হুশ করে কথা বলো না হয গবাদি পশুর মতো চুপ করে থাকো’। অর্থাৎ বাচালতার চেয়ে নীরবতাই বাঞ্চনীয়। আবার এমনও অনেক কথা আছে যা এক দেশের গালি আর আরেক দেশের বুলি বলে পরিচিত। এই ক্ষেত্রে ভুল বুঝাবুঝির কারণে অনেকে অনেক সময় অহেতুক কলহে লিপ্ত হয়ে পড়েন। কোন কোন কথায় রয়েছে হাজারো মারপ্যাঁচ, যার জট খুলতে মাঝে মাঝে রীতিমত হিমশিম খেতে হয়।
ভাল হোক, মন্দ হোক কথাবার্তা যার দ্বারা সংঘটিত হয় সেটি হচ্ছে মানব অঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ জিহ্বা। জিহ্বাকে আবার স্বাদগ্রন্থিও বলা হয়। স্বাদগ্রন্থি বলা হলেও মনুষ্য জিভ মূলত: অন্তরের দরজা। কারণ একমাত্র জিভই মানুষের অন্তরের গূঢ় রহস্যের বহি:প্রকাশ ঘটায়। সিলেট সহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত একটি কথা আছে, ‘মানুষ মরে মুখে আর মাছ মরে লেইঞ্জে’ অর্থাৎ অনেক সময় মানুষ তার জবানের কারণে বিপদে পতিত হয় আর মাছ লেজের কারণে। এই জিভ দ্বারা মানুষ যেমন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তেমনি আবার সাফল্যের স্বর্ণ চূড়ায়ও আরোহণ করতে পারে। এ জগতের তাবৎ পাপ-পূণ্যের কাজ এই জিভ দ্বারাই সংঘটিত হয়। ভাল কথার সাথে জিভ দ্বারা যেমন রসনা তৃপ্ত হয় তেমনি গিবত, পরনিন্দা, কূটনামি, মিথ্যা, অশ্লীল কথা, খোঁটা দেয়া চোগলখুরি গালমন্দ ইত্যাদিও জিভের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসে। তাইতো জিভকে সংগত রাখার জন্য কোরআন শরীফে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ধ্বংস নিশ্চিত এমন ব্যক্তির জন্য যে সামনাসামনি মানুষকে গালাগাল দেয় এবং পেছনে-নিন্দা রটাতে অভ্যস্ত’-সূরা হুমাজাহ : ১।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ভালমন্দ সবকিছুর মধ্য দিয়ে যেমন দিনাতিপাত করতে হয় তেমনি (বধির ছাড়া) শ্রুতিমধুর ও শ্রুতিকটু বাক্যও শ্রবণ করতে হয়। শব্দ দুষণ যেমন কর্ণকুহরে প্রবেশ করে সমগ্র ¯œায়ুতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করে ঠিক তেমিন শ্রুতিকটু বাক্যও কোন অংশে কম নয়। আর এই শ্রবণ কার্যক্রম মোটামুটিভাবে সকাল থেকে শুরু করে রাত অবধি চলতে থাকে। রাস্তাঘাট, ফেরিঘাট, যানজট, সভা-সমিতি, টকশো, কারখানা, সরাইখানা, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, খোলা প্রান্তর এক কথায় কোথাও এই শ্রুতি কটু বাক্য ব্যবহারের কোন কমতি নেই।
দিবসের প্রারম্ভেই শুরু হয় ছুটে চলা মানুষের কর্মব্যস্ততা। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে যার যার রুটিন মাফিক সবাই ছুটতে থাকে আপন গন্তব্যে। কেউবা নিজস্ব বাহনে আবার কেউবা ভাড়া করা রিক্সা বা সিএনজি চালিত অটোরিক্সা অথবা বাসকে অবলম্বন করে পৌঁছাতে চান নিজ নিজ গন্তব্যে, আর এখানেই ঘটতে থাকে যত বিপত্তি। তড়িঘড়ি, দৌড়ঝাঁপ, কেবা কারে ধায়, কার আগে কে যায়-চলতে থাকে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। একজনের সাথে আরেকজন দেয় টেক্কা, পাশ কাটাতে গিয়ে পাশাপাশি বা পেছন থেকে মারে ধাক্কা। ব্যস, এখানেই শুরু হয়ে গেল চালকদের মধ্যে বিশ্রী ভাষা প্রয়োগের আদান প্রদানের মাধ্যমে নোংরা বাক্য ছোঁড়াছুঁড়ি, এ যেন-‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’। নীরিহ প্রাণী থেকে শুরু করে নিকৃষ্ট প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত করে জন্মদাতা দাত্রী সহ চৌদ্দ গোষ্ঠীকে উদ্ধার করা, যা বাংলা ইংরেজি অভিধান বহির্ভূত! কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ এমনকি কুরুচিসম্পন্ন কোনও কোনও যাত্রী সাধারণও এই শিষ্টাচার বহির্ভুত কর্মকান্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করে পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে করে তোলেন অরুচিকর। যানজটে আটকে থাকা যাত্রীদের ভিক্ষুক সমস্যা থেকে শুরু করে এমনিতেই অধৈর্য্য অবস্থায় যাতনার প্রহর গুণতে হয়; তার উপর এনেহ অশ্রাব্য বাক্য বর্ষণে পতিত হয়ে সীমাহীন লজ্জা ও অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। এ যেন বলল বেটার লাজ নাই, শুনল বেটার লাজ-আর কি! আব্রাহাম লিংকন তাই যথার্থই বলেছেন যে-‘কথা বলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করার চেয়ে কথা না বলাই ভালো’। প্রত্যেক ভাষায়ই কিছু না কিছু ঝষধহম শব্দ রয়েছে, আর বাংলা ভাষায় সেটা কত প্রকার ও কি কি জানতে হলে যানজটে বসে থাকাই যথেষ্ট।
ইংরেজি চধৎষরধসবহঃ শব্দটা এসেছে ফরাসি চধৎষবৎ শব্দ থেকে যার অর্থ হচ্ছে কথা বলা। অতএব, একটি দেশের সংসদ বা পার্লামেন্ট হচ্ছে কথা বলা ও শোনার আসল জায়গা। আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রে পার্লামেন্টের প্রধান কাজ হলো দুটো আইন প্রণয়ন করা এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক করা। কিন্তু আমাদের পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে সভা-সমাবেশ, টক শো সেখানেও ব্যাঙ্গাত্মক ও শ্রুতিকটু বাক্যে সয়লাব। মাইক্রোফোন হাতে পেলে প্রতিপক্ষকে রূঢ় বাক্যবাণে জর্জরিত করা এটাই যেন বক্তার মূল উদ্দেশ্য। আপনা ঢোলের বাদ্যি আপনি বাজাতে গিয়ে তুই, তুকারি থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষকে নিয়ে চলতে থাকে যত ধরনের উস্কানিমূলক বাজে মন্তব্য। সেই বক্তব্যে নূন-মশলা ঢেলে আরো রসালো করে তোলেন উপস্থিত জনতার একাংশ। মাথা নেড়ে, টেবিল চাপড়িয়ে বা করতালির মধ্য দিয়ে মদদ দান করে উসকে দিয়ে সেই বক্তব্যকে দ্বিগুণ উৎসাহিত করে বক্তাকে চাঙ্গা করে তোলেন উপস্থিত চেলা-চামচারা। ইংরেজিতে ‘ুড়ঁ’ বলতে তুই, তুমি, আপনি সম্বোধন বুঝায়, যা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে অযৌক্তিক মনে হয় না। কিন্তু বাংলায় কোন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে তুই-তুকারি অর্থাৎ করছে, করেছে, গেছে, আসছে ইত্যাদি এমন সম্বোধন করা শুধু শিষ্ঠাচার, লঙ্ঘনীয়ই নয় যা শুনতে রীতিমত বেমানান ও অসহনীয় মনে হয়। সর্বোপরি এহেন আচরণের কারণে বক্তা নিজে জনগণের অসম্মান ও আস্থাহীনতার পাত্রে পরিণত হন। কারণ কারো কাছ থেকে সম্মান অর্জন করতে হলে অপরকে সম্মান প্রদান করতে হয় যা আমাদের চন্দ্রবিন্দু যুক্ত মাননীয় বক্তারা পরিস্থিতি ও মিথ্যা অহমিকার দাপটে পড়ে বেমালুম বিস্মৃত হয়ে যান।
কথায় আছে মুখের বাণী ও ছোঁড়া তীর ফেরৎ নিয়ে আসা যায় না। তাই এই দুটোই চিন্তা-ভাবনা করে ছুঁড়তে হয়। এই কথা বা মুখের বাণী যার তার মুখে যেমন তেমনভাবে মানায় না আর তিনি যদি হন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সম্মানিত কেউ তবে সেটাতো আরো মূল্যবান। সবাই এই ব্যক্তিত্বের বাণী থেকে শিক্ষণীয় অনেক কিছু আশা করেন যা বাণী চিরন্তনী হয়ে থাকে এবং সেটা যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। তিনি জ্ঞানী, গুণী, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, মনীষী, পন্ডিত, সাহিত্যিক, কবি, রাজনীতিবিদ যে কেউ হতে পারেন। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল থেকে শুরু করে যুগ যুগ ধরে উনাদের পূর্বাপর অনেকের বাণী অমর হয়ে আছে যা আমরা আমাদের জীবনযাত্রায় শিক্ষণীয় হিসেবে পেয়ে আসছি। গুণীজনদের বাণী এতটাই মূল্যবান যে সবকিছু মুছে গেলেও সেটা মুছে ফেলা যায় না। সেটা এখন আরও বেশি করে স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের মহান রাজনীতিবিদ ও নেতাদের অসংলগ্ন কথাবার্তা। মহান নেতা শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, ওসমানী এমন কি বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও উনারা অনুসরণ করেন বলে আদৌ মনে হয় না। উনাদের একেকজনের উদ্ধৃতি মনে করিয়ে দেয় ঐ মহান নেতাদের নীতি ও আদর্শের কথা। যেমন, বঙ্গবন্ধুর কথাই ধরা যাক সেই যে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ যা বাংলাদেশের ইতিহাসের মাইলফলক হয়ে আজ টঘঊঝঈঙ কর্তৃক বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত (ডিসেম্বর ২০১৭)। সেই ভাষণের ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’-সেই এক তেজোদ্দীপ্ত উদাত্ত আহবানে উদ্বুদ্ধ হয়েই আপামর জনসাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের জন্য।
এই যে আমাদের নেতৃবৃন্দ একেকজন একেক সময় উদ্ভট বক্তব্য দিয়ে আসছেন যার জন্য আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়, হতে হয় লজ্জিত। কি শিক্ষা গ্রহণ করছি আমরা? বিগত সরকারের সময় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সমস্যার কোন সমাধান করতে না পেরে ব্যর্থ মন্ত্রী বলতেন, ‘আল্লার মাল আল্লা নিয়ে গেছেন’। দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতিতে দেশবাসীর যখন হিমশিম অবস্থা তখন শুধুমাত্র আলু সস্তা ছিল বলে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী বলতেন ‘বেশি করে আলু খান’। বেগুনের দাম যখন ক্রয়সীমার ঊর্ধ্বে মন্ত্রী হয়ে একজন তো নতুন রেসিপিই শিখিয়ে গেছেন। আলু নিয়ে ‘আলুনি’ আর পেঁপে দিয়ে ‘পেপেনি’ যা প্রখ্যাত রন্ধন শিল্পীদের রেসিপিতে আছে কি-না কারো জানা নেই। আর এ ধরনের বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমান পরিস্থিতিতেও সব সময় চলছে উদ্ভট কথাবার্তা। নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্যে কেউ বলবেন কম খান, কেউ বলবেন একদিন বাজারে যাবেন না। যেখানে দেশে প্রতিদিন খুন, রাহাজানি, সন্ত্রাস, লুটপাট, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি, দখলবাজির মতো ঘটনা ঘটে চলেছে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত মন্ত্রী বলবেন, আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় এত মৃত্যুর বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেও মন্ত্রী বলেন অশিক্ষিত অদক্ষ চালকের হাতে লাইসেন্স তুলে দিতে শুধু গরু-ছাগলের পার্থক্য বা চিহ্ন বুঝলেই হবে। কিন্তু অদ্ভুত কথা! কিন্তু গাড়িতে যারা যাত্রী তারাতো আর গরু ছাগল না। যানবাহনের যাত্রীরা হলেন সৃষ্টির সেরা জীব-আশরাফুল মাখলুকাত। বিদ্যুতের ব্যাপারে কেউ বলবেন মাঝে মাঝে লোডশেডিং থাকা ভাল তাহলে বিদ্যুৎ যে আছে সেটা সকলের মনে থাকবে। বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দৃশ্যত: কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি ও সাপলুডু খেলার রাজনীতি বিদ্যমান। যেখানে ক্ষমতাসীন দল সব সময়ই মইয়ের উপরের ধাপে থাকেন আর ক্ষমতাচ্যুতরা দংশনপ্রাপ্ত হয়ে সাপের লেজে অবস্থান করেন। সুতরাং মইয়ের উপরের ধাপ থেকে নীচে দৃষ্টি দিয়ে সবকিছুই ক্ষুদ্র দেখায় তাইতো উনাদের সবকিছু ঠিকমত গোচরীভূত হয় না বা উপলব্ধি করতে পারেন না যার প্রতিফলন হিসেবে উনাদের মুখনিঃসৃত এইসব বেফাঁস বক্তব্য ভুক্তভোগী জনগণকে আরো অসহিষ্ণু করে তোলে।
অতি সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন ও বিক্ষোভে উত্তাল ছিল সারাদেশ। জাবালে নুর পরিবহনের দুটি গাড়ির বেপরোয়া বাস চালকদের দ্বারা সড়কে ঢাকার রমিজ উদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর হন্তাকান্ডকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত হলেও আসলে কিন্তু এই আন্দোলন ও বিক্ষোভের মূল হোতা ছিলেন সদা হাস্যোজ্জল আমাদের মাননীয় নৌ পরিবহন মন্ত্রী। খলনায়কের মতো অট্টহাসি না দিলেও মন্ত্রী মহোদয়ের ঔদ্ধত্যপূর্ণ হাসিও বেসামাল কথাবার্তা নিমেষ

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • মূর্তিতেই দুর্গা : বিশ্বাসের বিষয় তর্কের নয়
  • শিক্ষার্থীর মনোজগৎ বিকাশে কার কী ভূমিকা
  • দুর্গের কর্তা দেবী দুর্গা
  • রাশিয়ার কাছে কি যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে
  • দারিদ্র বিমোচনে সাফল্যের পথে বাংলাদেশ
  • বাংলাদেশ-সম্প্রীতি সমাবেশ ও কিছু কথা
  • পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন কত দূর
  • ওসমানীর দন্তরোগ বিভাগ
  • দুর্গার আগমন শুভ হোক
  • দেবী দুর্গার আবির্ভাব
  • দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধে উদ্যোগ নিতে হবে
  • প্রসঙ্গ : পানি ও বিদ্যুতের অপচয়
  • কওমি সনদের স্বীকৃতি
  • জয় মোবাইল অ্যাপ
  • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
  • মৃন্ময়ী
  • Developed by: Sparkle IT