উপ সম্পাদকীয়

পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি ও গ্রাহক হয়রানি

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১০-২০১৮ ইং ০২:৫৮:৩৩ | সংবাদটি ২৩ বার পঠিত


আমাদের দেশে বিভিন্ন জ্বালা’র মধ্যে ‘বিদ্যুতের জ্বালা’ সবচেয়ে শীর্ষে। গ্রাহকদের হাতে কখনো কখনো ভূতুড়ে বিল ধরিয়ে দেয়া হয়। আবার বকেয়া বিল থাকলে লাইন কেটে দেওয়া হয়। অনেক বাবা-মা তাঁদের সন্তানের পরীক্ষার কথা বলেও পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থামাতে পারেন না। তাঁরা দায়িত্ববান, তাঁদের চোখ চতুর্দিকে থাকে। হৃদয় তাঁদের বড্ড পাষাণ, তাই গভীর রাতে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেন। বৃদ্ধ, অসুস্থ, মৃত্যুপথযাত্রী অনেক মানুষ কষ্ট পায়। তাঁদের সেদিকে খেয়াল রাখার টাইম নাই। কেবল মাস পেরোলে গ্রাহকদের হাতে পল্লী বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিলের রশিদটা তুল দিতে পারলেই তাঁরা রিলাক্স মুডে থাকেন। কেউ কেউ মেদ বহুল বডি’র ওয়াইফকে নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে যান। স্ফূর্তি আর তামাশায় টাইম পাস করে ছুটি শেষে অফিসে আসেন। কার গলা কেমনে কাটা যায় চা-টা পান করে, খেয়ে ধান্দায় থাকেন। ঠিক, এ রকম কর্মকর্তাও আছেন অনেকে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে। আছেন না? লাভ তা গো। গ্রাহকদেরই শুধু লস আর লস। তবু গ্রাহকরা ‘বিদ্যুৎ’ চায়। আলো’র নেশায় গ্রাহকরা পড়ে গেছেন, এখন আর অন্ধকার ভাল্লাগে না! মেজাজ খারাপ থাকে। তাই বেশি হিসাব-নিকাশ করেন না। এই তো চলছে বেশ। হায়রে দেশ!
বাংলাদেশে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) ৮০টি সমিতি রয়েছে। আর এসব সমিতিতে বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের নানা অভিযোগ ও দুর্ভোগের কথা মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়। তার মধ্যে একটি পুরোনো অথচ গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, ট্রান্সফরমার বা বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি চুরি। এ ধরনের চুরির ঘটনা যখন ঘটে, তখন সংশ্লিষ্ট এলাকায় কয়েকদিন বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে থাকে না মানুষের ভোগান্তির আকার আয়তন, সীমা-পরিসীমা। পরে প্রত্যেক গ্রাহক চাঁদা তুলে টাকা জমা দিলে ব্যবস্থা নেয়া হয়। কোনো কোনো এলাকায় কয়েকদিন পরপরই এ রকম চুরির ঘটনা ঘটে। এবং গ্রাহকদের চাঁদার টাকা দিতে দিতে সর্বস্বান্ত হতে হয়।
গত ৩১ আগস্ট ঝালকাঠির রাজাপুর থানার পশ্চিম ফুলহার এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ লাইনের খুঁটির ট্রান্সফরমারটি চুরি হয়ে যায়। পরে ৩৪ জন গ্রাহক প্রায় ১০০০/- টাকা করে চাঁদা তুলে দিলে ট্রান্সফরমারটি পুনরায় স্থাপিত হয়। আমাদের সমাজে এখন এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু তার কোনো স্থায়ী সমাধান নাই। শুধু গ্রাহকরা খেসারত দিয়েই চলেছেন।
এ ব্যাপারে, বিআরইবি চেয়ারম্যানের বক্তব্য হলো, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি দেশের প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে থাকে। আর এ সংস্থাটির যে পরিমাণ বিতরণ লাইন রয়েছে, তা সমিতির লোকবল দিয়ে সিকিউরিটি দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য সব সময় টান্সফরমার নিজেদের পাহারায় রাখার কথা বলা হয়। গ্রাহকরা নানাভাবে ট্রান্সফরমারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নিয়ে থাকেন। তারপরও চুরির ঘটনা ঘটে। প্রথমবারের মতো ট্রান্সফরমার চুরি হলে তার অর্ধেক আর্থিক ব্যয় বহন করে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানী। এর পর যতবার চুরি হয়, পুরো টাকাটাই দিতে হয় গ্রাহকদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সর্ষের মধ্যে ভূত লুকিয়ে আছে বলে ট্রান্সফরমার চুরির পুনরাবৃত্তি বন্ধ হচ্ছে না। এটা রহস্যময় বটে! তাছাড়া ট্রান্সফরমারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তা চুরি করা সকল চোরের পক্ষে সম্ভবও নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারটিই আবার বিভিন্ন হাত ঘুরে প্রতিস্থাপিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ, এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র আছে।
বিদ্যুৎ আইনের ১৯(১) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হলে সেই ক্ষয়ক্ষতি লাইসেন্সি বা বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকেই বহন করতে হবে। ক্ষতিটি সংস্থার কারণে হোক অথবা সংস্থা নিয়োগকৃত কোনো কর্মকর্তার মাধ্যমে হোক’। আর মানুষের সাধারণ যুক্তিও বলে, গ্রাহক হিসেবে পণ্য ক্রয় করা ভোক্তার কাজ। যিনি বিক্রেতা বা ব্যবস্থাপক, তাঁর সম্পদ দেখে রাখার দায়িত্ব তাঁরই। গ্রাহকরা বিদ্যুৎ ক্রয় করে ব্যবহার করেন এবং আরোপিত কর ও চার্জ পরিশোধ করে থাকেন। গ্রাহকরা কেন চুরির মাশুল দিবেন? আসলে এটা এক প্রকার জুলুম ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া ‘পাবলিক ফাইন’-এর প্রভাবে এমন চল থাকাটাকেও অস্বাভাবিক বলা যাবে না। তবে এ ধরনের চুরি ও গ্রাহক ভোগান্তি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আর এজন্য প্রতিটি ট্রান্সফরমার চুরির তদন্ত ও চোরদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অতএব, দেশের অন্যান্য সকল সমস্যার মতো, এই সমস্যাটিকেও গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। পল্লী বিদ্যুতের সকল কর্মকর্তা, কর্মচারীকে বিষয়টি অবহেলার চোখে না দেখে, গ্রাহকদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে-এ রকম সমস্যা মোকাবেলার পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। সর্ষের ভেতর ভূত আছে কি-না, তাও দেখতে হবে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের। শুভ দৃষ্টিতে তাকান, নিশ্চয়ই দেখবেন সর্ষে ক্ষেতে ভূত আছে। আশপাশে তাকিয়ে দেখেন অসৎ মানুষের চোখ। তবেই বন্ধ হবে, বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি। আর গ্রাহকরাও নির্মল বাতাস গ্রহণ করবে দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে। গ্রাহকদের সেবা দেওয়াই তো আপনাদের কাজ। তাহলে সেই কাজ কেউ কেই ঠিকঠাক মতো করছেন না কেন? কখনো কখনো গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছে কেন? সর্বোপরি, কোনো কোনো গ্রাহকের নিকট ভূতোড়ে বিল আসছে কেন? বিষয়টি ভেবে দেখার এখনই সময়।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • মূর্তিতেই দুর্গা : বিশ্বাসের বিষয় তর্কের নয়
  • শিক্ষার্থীর মনোজগৎ বিকাশে কার কী ভূমিকা
  • দুর্গের কর্তা দেবী দুর্গা
  • রাশিয়ার কাছে কি যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে
  • দারিদ্র বিমোচনে সাফল্যের পথে বাংলাদেশ
  • বাংলাদেশ-সম্প্রীতি সমাবেশ ও কিছু কথা
  • পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন কত দূর
  • ওসমানীর দন্তরোগ বিভাগ
  • দুর্গার আগমন শুভ হোক
  • দেবী দুর্গার আবির্ভাব
  • দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধে উদ্যোগ নিতে হবে
  • প্রসঙ্গ : পানি ও বিদ্যুতের অপচয়
  • কওমি সনদের স্বীকৃতি
  • জয় মোবাইল অ্যাপ
  • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
  • মৃন্ময়ী
  • Developed by: Sparkle IT