উপ সম্পাদকীয়

পুতিনের ভারত সফরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

ফরিদুল আলম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১০-২০১৮ ইং ০৩:০০:০৬ | সংবাদটি ২৪ বার পঠিত

গত ৪-৫ অক্টোবর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং এককথায় বিশ্বের সবচেয়ে দাপুটে রাষ্ট্রনেতা ভদ্মাদিমির পুতিন ভারত সফর করে গেলেন। এই সফর নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের গভীর দৃষ্টি ছিল এই কারণে, এ ভারত কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার বিদ্যমান সখ্যকেই ধরে রাখছে নাকি রাশিয়ার সঙ্গে নতুন কোনো সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জাতীয় স্বার্থের খাতিরে সেখান থেকে বিচ্যুত হতে চলেছে। অবশ্য এ ধরনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সফরের সবসময়ই কিছু নেপথ্য উদ্দেশ্য থাকে। আর সে জন্যই সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত-রাশিয়ার সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে আগে থেকেই সতর্কবার্তা প্রচার করেছিল। এ বিষয়ে গত আগস্ট মাসেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে ভারতকে হুঁশিয়ার করে বলা হয়, এ ধরনের কোনো চুক্তিতে উপনীত হলে ভারতকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে হবে। দেখা গেল, পুতিনের সফরের দ্বিতীয় দিনেই দুই নেতার উপস্থিতিতে ভারত রাশিয়া থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয় চুক্তিতে উপনীত হয়। এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা ২০০৭ সালে রাশিয়া সামনে নিয়ে আসে, যা তখন এস-৩০০ নামে পরিচিত ছিল; পরবর্তীকালে এটিকে আরও উন্নত করে এস-৪০০ নামকরণ করা হয়। এটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য এবং এতটাই আধুনিক এক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একসঙ্গে ৪৮টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা যায়। বহির্বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে সর্বপ্রথম এই ব্যবস্থা গ্রহণ করে চীন ২০১৪ সালে। বর্তমান সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য সংক্রান্ত যে ঠা-া লড়াই চলছে, তার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ এটি। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার সঙ্গে এ ধরনের চুক্তিতে উপনীত হওয়ার মধ্য দিয়ে চীন-রাশিয়া দ্বৈরথ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা তার মিত্রদের জন্য যতটা উদ্বেগের কারণ ছিল, সর্বসম্প্রতি ভারত-রাশিয়ার মধ্যকার একই চুক্তি কি একই ধরনের উদ্বেগে নতুন মাত্রা যুক্ত করল নাকি এর ভিন্ন কোনো কারণ থাকতে পারে, সেটিও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
ভদ্মাদিমির পুতিনের ভারত সফর এবং এর ফলাফলকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করে আলোচনা করতে পারি। প্রথমত, আমরা দেখতে চেষ্টা করব দীর্ঘ সময় বিরতির পর ভারতের পুরনো মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে নতুন সম্পর্কোন্নয়ন কী ধরনের তাৎপর্য বহন করে; দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর প্রভাব এবং সব শেষে আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এটা কী বার্তা বহন করতে পারে। প্রথমেই আলোচনায় আসা যাক পুতিনের হঠাৎ করে ভারতমুখী হওয়া বা ভারতের রাশিয়ামুখী হওয়ার কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, সেই বিষয়ে। বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলে আসা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে ভারত যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে, অন্যদিকে সামরিক দিক দিয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে বলে মনে করা হয়। এই সময়ের মধ্যে ভারতের অন্যতম প্রতিবেশী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অনেকটাই উন্নতি ঘটেছে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়া নাকি চীন কোন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, এই নিয়ে যখন বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের মধ্যে ব্যাপক বিশ্লেষণ চলে, সেই সময়ে এই দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক তথা মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর কোরিয়া নীতিসহ অপরাপর বিষয়াবলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অস্তিত্বে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। এমন অবস্থায় এশিয়ায় ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাকিস্তানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের সমান্তরালে নতুন একটি সম্পর্ক সৃষ্টির তাগিদ দেয়। সেই তাগিদ থেকেই ভারতের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রশাসনকে এমনটাই বুঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, এই সম্পর্ক মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয়ের অভিন্ন শত্রু চীনের বিরুদ্ধে এক রক্ষাকবচ। একইভাবে ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়া রাশিয়ার জন্য চীনের পাশাপশি বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাকে নিজের পাশে পাওয়ার প্রণোদনা জোগাবে। এ ক্ষেত্রে চীন রাশিয়াকে সেই অর্থে দোষারোপ করতে পারে না। কারণ এটি রাশিয়ার তরফ থেকে নিছক একটি বাণিজ্য সম্পর্ক।
ভারতীয় সূত্র জানায়, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের স্থিতাবস্থা ধরে রাখাটা এখন একটা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশটিকে ইতিমধ্যে এ শঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। ভারত অথবা পাকিস্তানের মধ্য থেকে যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বলা হয়েছে তাদের। সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পর্যবেক্ষণে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনেক নীতির কারণেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই ওান্স আটলান্টিক চুক্তি থেকে সরে আসা, মধ্যপ্রাচ্য তথা সিরিয়া নীতি এবং সেই সঙ্গে সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র সংক্রান্ত ৬ জাতি আলোচনা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করার ফলে ইউরোপের মিত্ররাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের আঞ্চলিক সুরক্ষার নতুন কৌশল অবলম্বনে ব্যস্ত। এমতাবস্থায় ভারত এ ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অবলম্বনই শ্রেয় মনে করছে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীনের সঙ্গেও সম্পর্কের উন্নতি ঘটছে রাশিয়ার। তথ্যপ্রযুক্তি বিনিময়ের মতো স্পর্শকাতর সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে তাদের। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বৃদ্ধির কারণেই রাশিয়া এ উদ্যোগ নিয়েছে। এমনকি দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে সরাসরি চীনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে রাশিয়া। এখানে যৌথ সামরিক মহড়ায়ও চীনের সঙ্গে অংশ নেয় তারা। এখন চীনের মিত্র পাকিস্তানের প্রতি হৃদ্যতার হাত বাড়াচ্ছে রাশিয়া।
ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ক্রমবধর্মান কৌশলগত সম্পর্কের কারণেই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে ভুলে নতুন সম্পর্কের দিকে ঝুঁকছে রুশরা। এ অঞ্চলে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে রাশিয়ার বন্ধনে ভবিষ্যতে ভারতের সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা আছে বলে মনে করেন ভারতীয় কূটনীতিকরা। তাদের দাবি, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো রাশিয়া। আর তাই রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের নতুন চুক্তি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ায় ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এটিকে একান্তই ভারতের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ভারতের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে নাকি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। অবশ্য সাম্প্রতিককালে ওাম্প প্রশাসন মাথা গরম করে এমন অনেক সিদ্ধান্তই নিয়েছে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে চীন এবং রাশিয়ার অবস্থানকেই সুসংহত করেছে। ভারতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞার মতো কোনো ঝুঁকিতে যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন শক্তির লড়াইকে কঠিন করে তুলবে, অন্যদিকে না গেলে এ ধরনের অস্ত্রের বিস্তারকে অপরাপর দেশের জন্যও সহজলভ্য করে তুলবে। পরিস্থিতি বলছে, একে একে রাশিয়া কঠিন চ্যালেঞ্জের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
মোদি-পুতিনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নিরিখে এশিয়ার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী আকার ধারণ করতে যাচ্ছে, সেটাও একটি ভিন্নতর আলোচনার বিষয়। চীন ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘকালীন বৈরী সম্পর্ক নিরসনে এ ধরনের উদ্যোগ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখবে নাকি ভবিষ্যতে বৈরিতাকেই আরও উস্কে দেবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে ভারতে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আমরা লক্ষ্য করেছি, তিনি চীনের সঙ্গে নতুন করে সহযোগীদের সম্পর্কে উপনীত হতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই চীন সফর করেছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও ভারত সফরের শুরু করেছেন মোদির রাজ্য গুজরাট দিয়ে, যা সম্পর্কোন্নয়নে দুই দেশের অঙ্গীকারের স্মারক। ভারত ও চীন অনেক দিন ধরেই দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার আগ্রহ দেখিয়েছে। এশিয়ার এই দুই বৃহত্তম দেশই ব্রিকস এবং বিসিআইএমের মতো ফোরামের সদস্য, যারা নতুন একটি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নেতৃত্ব দিতে বদ্ধপরিকর। পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণে আমরা এটাই বলতে পারি যে, রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিকে চীন এক ধরনের শক্তির ভারসাম্য কিংবা নেহাতই ভারতের প্রতিরক্ষার অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে পারে, যেখানে চীন ছাড়াও ভারতের জন্য পাকিস্তানের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলার প্রয়োজনকেও অস্বীকার করা যায় না। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় পুতিনের সদ্য সমাপ্ত ভারত সফর এবং সদ্য গৃহীত প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারতের জন্য সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বহন করে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • মূর্তিতেই দুর্গা : বিশ্বাসের বিষয় তর্কের নয়
  • শিক্ষার্থীর মনোজগৎ বিকাশে কার কী ভূমিকা
  • দুর্গের কর্তা দেবী দুর্গা
  • রাশিয়ার কাছে কি যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে
  • দারিদ্র বিমোচনে সাফল্যের পথে বাংলাদেশ
  • বাংলাদেশ-সম্প্রীতি সমাবেশ ও কিছু কথা
  • পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন কত দূর
  • ওসমানীর দন্তরোগ বিভাগ
  • দুর্গার আগমন শুভ হোক
  • দেবী দুর্গার আবির্ভাব
  • দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধে উদ্যোগ নিতে হবে
  • প্রসঙ্গ : পানি ও বিদ্যুতের অপচয়
  • কওমি সনদের স্বীকৃতি
  • জয় মোবাইল অ্যাপ
  • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
  • মৃন্ময়ী
  • Developed by: Sparkle IT