ইতিহাস ও ঐতিহ্য

হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি

মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১০-২০১৮ ইং ০৩:০২:৪৯ | সংবাদটি ২৭৭ বার পঠিত

বছর ছ’এক আগের কথা। গ্রামের এক মসজিদে জুম’আর নামাজ পড়তে যাই। মাঝারি আকৃতির পাকা মসজিদ। বালি, সিমেন্ট ও পাথর দ্বারা ঢালাইকৃত ছাদ। পূর্ব দিকে আঙ্গিনা। তারপর ১৫ ডেসিমেল ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট আয়তাকার পুকুর। চারি পার উঁচু। বন্যার পানি ঢুকতে পারে না। আরসিসি ঢালাইকৃত পুকুর ঘাট। ঘাটের উপর উভয় পাশে লোক বসার নিমিত্ত পাকা বেঞ্চ আকৃতির আসন। মুসল্লিগণ জামায়াতের আগে কিংবা পরে এখানে বসে বিশ্রাম নেন। মাথার ওপর নারিকেল গাছের প্রসারিত পল্লব। বিশ্রামকারীদের দেহ প্রখর রৌদ্রতাপ থেকে রক্ষা করে। পুকুরসহ দেয়াল ঘেরা মসজিদের ক্ষেত্রফল প্রায় ৭০ ডেসিমেল। দেয়ালের অভ্যন্তরে চতুর্দিকে গাছ-গাছালি। সবুজ পত্র-পল্লব, ফুল ও ফল যে কোনো দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। পুকুর পারে সারি সারি ফলের গাছ। নারিকেল, পেয়ারা, সুপারি, লেবু ইত্যাদি। বিভিন্ন ঋতুতে ফল বের হয়। ফল বিক্রি হতে প্রাপ্ত অর্থ মসজিদের তহবিল সমৃদ্ধ করে। পানি চক্ চক্ করছে। কচুরিপানার অস্থিত্ব নেই। শাপলা, কলমিলতা ও কতিপয় অতি সাধারণ জলজ উদ্ভিদ পুকুর জলে ভাসছে। জলে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মৎস প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠছে। খেতে সুস্বাদু। মলা, খাকিয়া ও কাচ্কি মাছগুলো জলের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে। দেখতে ভালো লাগে।
মৎস বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা মসজিদের তহবিলে জমা হয়। ওযু করতে মুসল্লিরা পুকুরের পানি ব্যবহার করেন। ইমাম, মোয়াজ্জিন ও খাদেমরা পুকুর জলে নিয়মিত গোসল করেন। ইহাতে কোনো অর্থ খরচ হয় না। মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণ ও চাকুরেদের বেতন প্রদানে টাকার প্রয়োজন। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ মসজিদের বৃক্ষ, ফল ও মৎস হতে অর্জন করা হয়। তাই একটি মসজিদ কিংবা আদর্শ বাড়ির জন্য পুকুর একটি অতি প্রয়োজনীয় উপকরণ।
ঠিক পরের বছর বিশেষ কার্যোপলক্ষে পুনরায় ঐ এলাকায় যাই। উক্ত মসজিদের আগেকার অবয়ব আর নেই। মসজিদ ঘর আগের মতোই রয়েছে। তবে গাছ-পালা, ফুল-ফল কমে গেছে। পুকুরটি খুঁজে পেলাম না। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মাটি চাপা দিয়ে জীবন্ত প্রাণ চঞ্চল পুকুরটাকে কবর দেওয়া হয়েছে। নেই পূর্বের শান বাঁধানো ঘাট। মৎসের কিল্-বিল শব্দ। জলই নেই। মৎস থাকবে কোথায়? মৃত পুকুরের বুকের উপর খুঁটি দাঁড় করে এর চূড়ায় ১০০০ লিটার আয়তনের পানির ট্যাংক বসানো হয়েছে। ভূমিতে স্থাপন করা হয়েছে পানির পাম্প। পাইপ সংযোজন করে টেপ লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে ওযু ও গোসলের স্থান। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে পুকুর ভরাট করে মসজিদ আঙিনায় এসব পরিবর্তন করা হয়েছে।
পানির পাম্প চালিয়ে পানি উত্তোলনে বিদ্যুৎ খরচা হয়। পাম্প, টেপ, নাট-বল্টু বিকল হলে তা মেরামতে টাকা খরচ হয়। নলকূপের পানিতে আয়রণ থাকে বেশি। পুকুরের পানিতে আয়রণ সহনীয় পর্যায়ে থাকে। কাপড়-চোপড় লালচে হয় না। পুকুরের পানি ব্যবহারে টাকা খরচের প্রয়োজন হয় না। উপরন্তু মৎস সম্পদ হয়ে টাকা আয় হয়। হিসেব নিকাশ করলে পুকুর ভরাট করে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই ঢের বেশি।
সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগাতে গ্রাম ও শহরের পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে তার উপর নির্মাণ করা হচ্ছে ঘর, বাড়ি ও বিপণী বিতান। গ্রাম ও শহরে অনুসন্ধান করলে এরূপ বহু পুকুর ও জলাশয় ভরাটের সংবাদ সংগ্রহ করা যাবে। অপর দিকে নতুন নতুন পুকুর খননের খবর পাওয়া যাবে যৎসামান্য।
সিলেট শহরে অতীতে ছোট বড় অনেকগুলো দীঘি ছিলো। তাদের মধ্যে লালদীঘি, রামের দীঘি, মাছুদীঘি, বেকাদীঘি, মজুমদার দীঘি, দস্তিদার বাড়ি দীঘি, সাগরদীঘি, চারাদীঘি, ধোপাদীঘি, মুরারীচাঁদ দীঘি, ইন্দ্রাণী দীঘি, কাজল দীঘি, কাস্টঘর দীঘি, কাজির দীঘি, ব্রাহ্মণশাসন দীঘি, লালাদীঘি উল্লেখযোগ্য। এগুলোর মধ্যে হাতেগোনা চার-পাঁচটি ছাড়া বাকিগুলো ভরাট করা হয়েছে।
রাজা জিসি হাইস্কুল ও পাইলট স্কুলের মধ্যবর্তী স্থানে লালদীঘির অবস্থান। এটা ভরাট করা হয়েছে। ঐ এলাকার নাম লালদীঘির পার। নগরীর মীর্জাজাঙ্গালস্থ ও তালতলার মধ্যবর্তী স্থানে মাছুদীঘি ছিলো, ইহা সম্পূর্ণ ভরাট করে আবাসিক এলাকায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। কিন ব্রিজের উত্তরে সুরমা নদীর পার ঘেঁষে বুকে জল ধারণ করে অবস্থান করছিলো বেকাদীঘি। ইহা ভরাট করে জালালাবাদ পার্ক তৈরি করা হয়েছে।
নগরীর সুবিদবাজারের অদূরে বনকলা পাড়ায় দস্তিদার বাড়ি দীঘি অবস্থিত। জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় এখনও ইহা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। মীরের ময়দানের পশ্চিমে সাগর দীঘির অবস্থান। ঐ এলাকাকে সাগর দীঘির পার বলে। বহু বছর পূর্বে ইহা ভরাট করা হয়। অনুরাগ হোটেলের উত্তর ও কুমার পাড়ার পশ্চিমে চারাদীঘি ছিলো। বহুদিন পূর্বে ইহা ভরাট করে বাসা-বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। নগরীর জেলখানার পূর্বে ও ওসমানী শিশু পার্কের উত্তরে ধোপাদীঘি অবস্থিত। ইহার অস্থিত্ব এখনো টিকে রয়েছে। তবে আগের চেহারা নেই। চতুর্দিক থেকে ভরাট করে এর আয়তন সংকুচিত করা হয়েছে।
নাইওরপুলে রামকৃষ্ণ মিশনের কাছে কাজলদীঘি অবস্থিত। রাস্তা বড় করতে এর কিছু অংশ ভরাট করা হয়। তবে এর অস্থিত্ব টিকে রয়েছে। নগরীর কাজিটুলার কাজিদীঘি এক সময় ঐ এলাকার সৌন্দর্য ছিলো। কাজিদীঘি পরিণত হয়েছে এলাকার ময়লা ও আবর্জনা ফেলার স্থান। কাস্টঘর এলাকার কাস্টঘর দীঘি এখন আর নেই। ভরাট করে আয়তন সংকুচিত করে ইহাকে ছোট ডোবায় পরিণত করা হয়েছে।
ইন্দ্রানী দীঘি শহরের তেররতনে অবস্থিত। ইহা এখনো বিদ্যমান। লালাদীঘি কুয়ারপার এলাকায় অবস্থিত। ইহার অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে। মুরারীচাঁদ দীঘি এমসি কলেজের ঐতিহ্য। ইহা পূর্বের আকার ও আয়তন ধরে রেখেছে। ব্রাহ্মণশাসন দীঘি আখালিয়ার ব্রাহ্মণশাসন এলাকায় অবস্থিত। ইহা এখনো বিদ্যমান।
নগরীর মজুমদারী এলাকায় মজুমদার দীঘি অবস্থিত। বর্তমানে ইহার অর্ধাংশ ভরাট করা হয়েছে। রামেরদীঘি, মাছুদীঘির পাশেই ছিলো। ইহার অস্থিত্ব এখন আর নেই।
এ ছাড়া সিলেট শহরে ছোট-বড় অনেক পুকুর ছিলো। এগুলোর বেশিরভাগ ভরাট করে ফেলা হয়েছে। নতুন করে দীঘি বা পুকুর খনন করা হচ্ছে না। খালি জায়গাই বা কই? দীঘি ও পুকুর ভরাট করা আমাদের জন্য আশির্বাদ নয়। অভিশাপ বটে। জলাশয় প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। বৃষ্টির সময় অতিরিক্ত জল ধারণ করে। নগরীর রাস্তাঘাটকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করে। আমাদেরকে পুকুর ও জলাশয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে হবে। পুরাতন পুকুর ও দীঘি পুণঃখনন করে এদের হৃদকম্পন ফিরিয়ে আনতে হবে। নতুন নতুন দীঘি ও পুকুর খনন করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানায় হউক আর সরকারি মালিকানায় হউক পুকুর-দীঘি কিংবা জলাশয় ভরাট না করার জন্য প্রয়োজনে বিধি নিষেধ আরোপ করতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT