উপ সম্পাদকীয়

বাল্য বিয়ে প্রয়োজন জনসচেতনতা

কাজী মাওলানা রিয়াজ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১০-২০১৮ ইং ০০:০৪:২০ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

সমস্যা সংকুল বাংলাদেশের অন্যতম একটি সমস্যা হল বাল্য বিয়ে। পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ বছরের কম এবং নারীর ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে দিলে তাকে আইন অনুযায়ী বাল্য বিয়ে বলে। এ সংক্রান্ত আইন, বাল্য বিয়ের কুফল ও পরিণতি, বাল্য বিয়ের কারণ ইত্যাদি সম্পর্কে বলার আগে আমি বাস্তব ৪টি ঘটনার উল্লেখ করছি, যা এক মাসের ভেতরেই সংঘটিত হয়েছে।
কেস স্টাডি-১ ঃ নিকট আত্মীয় একজন আমাকে ফোনে বললেন, মামা! আগামী শুক্রবার আমার বড় মেয়ের আকদ অনুষ্ঠান। আপনাদের সকলের দাওয়াত। অবশ্যই সকলকে আসতে হবে। আর সাথে করে কাজীগিরীর বই ও কাগজপত্রগুলো আনবেন। আপনার মামী বলছেন, আপনি কাবিন করবেন। বললাম, মামা! আমার জানামতে তো কলির (ছদ্মনাম) বয়স ১৮ হয়নি, তো আপনি বিয়ে দিবেন কিভাবে? চেয়ারম্যান, মেম্বার, প্রশাসন, পুলিশ জানলে বিয়ে আটকে দেবে। বিপরীতে আপনাকে-আমাকে জেল খাটতে হতে পারে। উত্তরে বললেন, চেয়ারম্যান-মেম্বার আমার সাথে আছেন। আর পুলিশ-প্রশাসন জানবেনা যে, বয়স কম। বয়স ওকে করে জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট বানিয়ে ফেলব। তো আর অসুবিধে হবে না। উনার সাথে আমার অনেক কথা হল। শেষমেষ আমি বললাম আমি কাবিন করতে পারব না। আমার জানামতে পরে লুকিয়ে মেয়েটির আকদ হয়েছে। আকদের কিছুদিন পর লুকিয়ে মেয়েটিকে স্বামীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। কাবিন হয়েছে বলে জানিনা।
কেস স্টাডি-২ ঃ পরিচিত একজন ফোন দিয়ে বললেন, কাজী সাহেব! মাগরিবের পর একটি বিয়ের কাবিন আপনাকে করতে হবে। মাগরিবের নামাজ শিববাড়ী মসজিদে পড়বেন প্লীজ। বললাম বয়স ঠিক আছে তো? হ্যাঁ ঠিক আছে। যাওয়ার পর দেখি ছেলের বয়স কুড়ি বছর। বললেন এই জন্ম সনদে ভুল হয়ে গেছে। এই নিন পাসপোর্ট। দেখি এখানেও বয়স কম। কাবিন করতে আমি অপারগতা পেশ করলাম। পাশের জনকে বললেন, আমাদের কাজী সাহেবের সাহস কম। অমুক কাজী সাহেবের কাছে ফোন দিন। ইনি সব কিছু পারেন। মহরের পরিমাণ ও বয়স শুনে সেই কাজী সাহেব বললেন, কাবিন হবে। ফি ও খরচ ১২ হাজার টাকা দিতে হবে। তারা বললেন, ফি তো বুঝলাম, খরচ কিসের? উত্তর দিলেন, একটি জন্ম সনদ বানাতে হবে যা অনলাইনে থাকবে। এর খরচ হবে পাঁচ হাজার টাকা। আমার শুনামতে পরে এভাবেই কাজটি সম্পাদিত হয়েছে।
কেস স্টাডি-৩ ঃ কাজী সাহেব! আগামীকাল আপনার ছাত্র (উনার ছেলে) অমুকের আকদ অনুষ্ঠান, আপনাকে কাবিন করতে হবে। গিয়ে বললাম পাসপোর্ট, জন্ম সনদ বা স্কুল সার্টিফিকেট দিন। মেয়ের পাসপোর্ট দিলেন। দেখলাম বয়স ঠিক আছে। ছেলের সার্টিফিকেট দিলেন, দেখলাম বয়স কম। বিষয়টি তাদের বুঝিয়ে বললাম। ছেলের পিতা বললেন, মেয়েটি আমেরিকান। কাবিন না হলে অন্য কারো নিকট বিয়ে দিয়ে দিবে। আইন, সরকার ও প্রশাসনের বাস্তবতা খুলে বললে বললেন তে অমুক উকিল আমার আপনজন। আপনিও আমার সাথে তার বাসায় চলুন। গিয়ে দেখি, উকিল সাহেব শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সবকিছু খুলে বলার পর তিনি অন্যান্য কয়েকজন উকিলের নিকট ফোন দিলেন। কেউই ফোন রিসিভ করলেন না।
অতঃপর তিনি বললেন, কাজী সাহেব! এর নাম বাংলাদেশ। এখানে হয়না এমন কিছু নেই। আগামীকাল আপনারা বারহলে আমার চেম্বারে আসবেন। নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে বয়স এফিডেভিড করিয়ে দেব। কাবিন করতে আর সমস্যা হবেনা। অবশ্য পরদিন আমি সাথে যাইনি বা কাবিনও করিনি। তবে সব কিছুই হয়েছে। বয়স এফিডেভিড, কাবিন, বিবাহ হয়েছে। মেয়ে ১৫ দিন পর আমেরিকা চলে গেছে। বরকে নেয়ার অ্যাপ্লাইও করে গেছে।
কেস স্টাডি-৪ ঃ জুমআর নামায পড়ে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ করে দেখি এক বাড়ীর উঠানে একটি প্যান্ডেল। এগিয়ে গিয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম এটি আশুরা দিবসের শিরনীর নাকি? বললেন না। এটি আজকের বিয়ের একটি প্যান্ডেল। আরো বললেন, মসজিদে এখন আকদ হবে, সেখানে চলে যান। গিয়ে দেখি কাজীর একজন মহরির কাজ করছেন। বাসায় ফিরে এলাম। পরদিন বড় মেয়ে মারিয়া রিয়াজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এসে বলল আব্বু! জান কি? আমার ক্লাসমিট অমুক কে গতকাল জোরে বিয়ে দেয়া হয়েছে। তার বয়স ১৬ হবে। সে বর্তমানে ১০ম শ্রেণিতে পড়ছে। স্থানীয় কাজীও বিবাহটি রেজিষ্ট্রি করেছেন। প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, কাজী কেউই কি বাল্য বিয়েটি ফেরাতে পারলেন না? আমি নিরুত্তর রইলাম।
উপর্যুক্ত ঘটনাগুলো হল শহরাঞ্চলের যার একটির কথাও কোন পত্রিকায় আসেনি। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা যে আরো খারাপ হবে তা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। বাল্য বিয়ের ক্ষেত্রে অতীতের অবস্থা আরো খারাপ ও করুণ ছিল। বাল্য বিয়ে রোধ করার জন্যে ১৯২৯ ইং সনে তৎকালীন সরকার ‘বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯’ (১৯২৯ সালের ১৯নং আইন) নামে একটি আইন পাস করে। সে আইনেই পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ বছর এবং নারীর ক্ষেত্রে ১৮ বছর বিয়ের বয়স ধার্য করা হয়। এ আইন অমান্যে এক মাস পর্যন্ত মেয়াদের বিনা শ্রম কারাদন্ড বা এক হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়বিধ দন্ডের বিধান ৫৩ নং ধারায় রাখা হয়। কিন্তু এ আইনের প্রয়োগ ছিলই না বলা চলে। দেদারছে বাল্য বিয়ে হচ্ছিল। পুরুষের তুলনায় এর হার নারীদের মধ্যে ছিল অনেক বেশী। ভরণ-পোষণের অসুবিধা, পুরুষ কর্তৃক নাবালিকা নির্যাতিত-অসম্মানিত হওয়া, বিদেশী বর পাওয়া, আশার চেয়ে ভাল বর পাওয়া এগুলো ছিল বাল্য বিয়ের প্রধান প্রধান কারণ। যে কারণেই হোক, বাল্য বিয়ে রোধ হচ্ছিল না। এতে ব্যক্তি ও পরিবারের চেয়ে দেশ ও জাতির ক্ষতি হচ্ছিল বেশি। অকালে গর্ভধারণ, অপুষ্টিতে ভোগা, অধিকহারে সন্তান জন্মদানসহ জাতি নানা অসুখ ব্যাধিতে ভুগছিল। তাই বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হলে বর্তমান সরকার এক্ষেত্রে যুগান্তকারী একটি আইন ০৮/১২/২০১৬ইং তারিখে সংসদে পাশ করায়। এতে ৬ মাস থেকে ২ বছরের কারাদন্ড, অনধিক ৫০ হাজার টাকার অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্তিতের বিধান রাখা হয়। বাল্য বিয়ে নিবন্ধন করলে নিবন্ধকের লাইসেন্স বাতিলের আইন করা হয়। বাল্য বিয়ে বন্ধের জন্যে সরকার ও প্রশাসন কর্তৃক সভা, সেমিনার ইত্যাদির আয়োজন করা হয়। তাই বাল্য বিয়ে রোধে অনেক সফলতা আসে। এ ক্ষেত্রে সফলতা স্বরূপ বাংলাদেশ গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড কিছুদিন আগে অর্জন করেছে।
তবে এত কিছুর পরও বাল্য বিয়ে পুরোপুরিভাবে বন্ধ হচ্ছে না। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০১৮ সালের জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ৮৪টি বাল্য বিয়ে সংঘটিত হয়েছে। ইউনিসেফ এর তথ্যানুযায়ী বিশ্বের যে সব দেশে বাল্য বিয়ের হার সব চেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার একটি।
অনেক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষনীয় হলেও এক্ষেত্রের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য নয়। বাল্য বিয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হলে শুধু আইনই যথেষ্ট নয়, এর পূর্ণ প্রয়োগও করতে হবে। জানাজানির ভয়ে বাল্য বিয়ের কোন কোনটির কাবিন হচ্ছে না সেটিও বন্ধ করতে হবে। বয়স বেশি দেখিয়ে জন্ম সনদ করা হচ্ছে। স্কুল সার্টিফিকেটে বয়স কম দেখলে কাজী বয়স বেশি দেখিয়ে জন্ম সনদ পরামর্শ দিয়ে তৈরী করাচ্ছে। গোপনে বাল্য বিয়ে হচ্ছে এগুলো বন্ধ করতে হবে। ভোটের আশায় বয়স কম হওয়ার বিষয়টি চেয়ারম্যান-মেম্বার জেনেও জন্ম সনদ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে, এটিও বন্ধ করতে হবে। সর্বোপরি জনসচেতনতা আরো তৈরী করতে হবে। বাল্য বিয়ে বন্ধের জন্যে সরকার ১০৯ নম্বরের হেল্পলাইন খুলেছেন। ৬ষ্ঠ থেকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্য বইতে এ নম্বরটি দেওয়া আছে, প্রয়োজনে এর হেল্প নিতে হবে।
লেখক : কাজী, ২নং বরইকান্দি ইউনিয়ন, দক্ষিণসুরমা, সিলেট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT