শিশু মেলা

নাহিদের স্বপ্ন

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১০-২০১৮ ইং ০০:০৬:৫৯ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত

হতভম্ব নাহিদ চলছে রুদ্ধশ্বাসে হাসপাতালের দিকে। সরকারি হাসপাতাল। রোগী, ভিজিটার ডাক্তার, নার্সের প্রচন্ড ভিড়। নাহিদ ছুটে গেলো ৫ নম্বর ওয়ার্ডে। এদিক ওদিক তাকালো। অসংখ্য রোগী শুয়ে আছে বিভিন্ন বেডে। সে খুঁজছে ৩ নম্বর বেড। একে একে অনেকগুলো বেডের নম্বর দেখলো সে; কোন কোন বেডের নম্বরও মুছে গেছে। মিনিট কয়েক ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে ওয়ার্ডের কোণায় প্রত্যাশিত রোগীর সন্ধান পেলো সে। দেখে বিছানায় শুয়ে আছে রফিক। তার মাথার বা দিকে রক্ত ঝরছে অঝোরে। আর বা পায়ের হাঁটুর নীচে হাড় ভেঙ্গে গেছে। নাহিদ তাকালো একবার। আর যেন চাইতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তার পরেও সে রফিকের বেডের কাছে গেলো। সে অসচেতন। পাশে মানুষের উপস্থিতি অনুভব করে সে মাথা নাড়ানোর চেষ্টা করেও পারলো না।
সেদিন এমনিভাবেই দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল নাহিদ। কারণ সেদিন তাদের কলেজে অর্ধদিবস ক্লাস ছিলো। তাই ক্লাস বসবে কিছু আগে। সে এক ধ্যানে, একই মনে ছুটে চলেছে সোজা কলেজের পথ ধরে। শহরের কোলাহল পেরিয়ে যেতে পারেনি এখনও। শহরের উপকন্ঠে কিছুটা নিরিবিলি স্থানে তাদের কলেজ। প্রতিদিনই তাকে কোলাহল, ব্যস্ততা, আবর্জনা, ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে যেতে হয়। সেই সঙ্গে আছে পথের ধারে ভিক্ষুকের দল। মুখে তাদের মুখস্থ করা বুলি। আরও আছে ফেরীওয়ালা, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রচার মাইক। এতোসব বিরক্তিকর অনুসঙ্গগুলো মাথায় নিয়েই নাহিদের যাত্রা কলেজের দিকে।
এমন সময় নাহিদ টের পেলো পেছনে তার শার্টে ধরে কে যেন টান দিচ্ছে। দাঁড়ালো সে। দেখে এক যুবক বয়সী ভিক্ষুক; খালি গায়ে। পরনে একটি লুঙ্গি ছাড়া আর কিছু নেই। মাথায় উসকো খুসকো চুল। সে নাহিদের শার্টে ধরে ওকে দাঁড় করে শুধু তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। নাহিদ বিরক্ত হয়ে বললো-
: কী? হয়েছেটা কী শুনি?
: আমারে কিছু দিয়া যাওকা।
: কী দেবো? এভাবে ধরে-বেঁধে নাকি? বলেই সে চলে যেতে উদ্যত হলো। তাকে বাধা দিলো ভিক্ষুকটি। ওর দুটি চোখে যেন বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। তার উজ্জ্বল চেহারায় দারিদ্র্য-অপুষ্টির নির্মম আঘাত। তার ঠোঁট দু’টি কিছু বলতে চায় যেন। পারে না। নাহিদ এক দৃষ্টিতে ভিক্ষুকটির সমস্ত অবয়বটি দেখে নিলো। জিজ্ঞেস করলো-
: তোমার বাড়ি কোথায়?
: বাড়ি ঘরতো নাই রে বা সাব।
: তুমি থাকো কোথায়?
: আছিল রেবা সবওউ। সুরমার পারো এক গাউত আমরার বাড়ি আছিল। মা বাপ ভাই বইন হকলওউ আছিল আমরার পরিবারো। কিন্তু....
: কী, থেমে গেলে কেন?
তারপর কী হলো তাদের?
সে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো- ‘ওউ যেনে ৭৪ সালো বন্যা আইছিল, ওউ হেজা বন্যায় আমরার বাড়িঘর পরিবার হকলরে ভাসাইয়া নিলো। আর কেউ আইলো না ফিরিয়া...। ওউ থাকিওউ আমি একলা; ওলা খানি জানটা বাচাইয়া আছি।
: হুঁ! বুঝেছি; তো কোথাও কোন কাজ করো না কেন? এভাবে ভিক্ষে করে চলবে ক’দিন?
: কাজ কাম পাইলে কি আর আমি করি না নি? বউত ঘুরাইছি, অনেক মাইনষোর গেছে গেছি। কেউ কোন কাম দেয় না। আর এর লাগিওউতো ভিক্ষা করার পথ বাইচ্ছা নিছি।
: তোমার নাম কী?
: রফিক।
নাহিদ তখন তার পকেট থেকে একখানা দশ টাকার নোট বের করে রফিককে দিল। সে ডান হাতটি প্রসারিত করে অতি কাংখিত বস্তুটি অতি সযতনে হস্তগত করলো। বললো-‘আল্লায় আপনারে দীর্ঘদিন বাচাউক। আপনে আরও বড়লোক ওউকা।’
নাহিদ টাকা দিয়েই চলে যেতে লাগলো। কিন্তু দ্রুত পায়ে গিয়েও কলেজের ক্লাস ধরতে পারলো না। ফিরে এলো বাড়িতে। ঘরে এতো তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে নাহিদের বাবা জিজ্ঞেস করলেন-
: কীরে নাহিদ! আজ এতো তাড়াতাড়ি যে ফিরলে, কী হয়েছে?
- নাহিদ তার আসন্ন বিপদ থেকে বাঁচার জন্য একটি বুদ্ধি আঁটলো। বললো-
: না বাবা, আজকে না আমাদের কলেজে একটি নিরাপত্তা সভা ছিলো; তাই আজ ক্লাস বাতিল করা হয়েছে।
: কীসের নিরাপত্তা সভা?
: আর বলো না বাবা, সেই যে আট নয়দিন পূর্বে শুনোনি? আমাদের কলেজের আজাদ নামের এটা ছেলেকে কে বা কারা খুন করেছে।
: অহ হো! শুনেছিলাম বটে। তা এখন হবে কী?
: হবে আবার কী, এই ঘটনার রহস্য উদঘাটন করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
: আজকাল এই ধরনের অপরাধ প্রবণতা খুন খারাবি আমাদের সমাজে বেড়েই চলেছে। পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে-বন্দরে যেন হুট করেই অবলীলায় খুন করা হচ্ছে মানুষকে। সমাজের কেউ যেন কিছুই বলছে না। আর পুলিশ? তারাতো নির্বিকার।
: বাবা, এসব খুন-খারাবি আমাদের সমাজ থেকে দূর করতে হলে কী করতে হবে?
: কী করতে হবে, কী করা উচিত, সেটা সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দায়িত্ব। তারাই যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।
তবে আমার একটা পরামর্শ রয়েছে। যেমন- সরকার একটি অপরাধ দমন মন্ত্রণালয় করে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারে।
নাহিদ এইসব কথাবার্তায় খুব একটা মন বসাতে পারছে না। তার দেহটা বাড়িতে, আর মনটা ছিলো সেই রফিকের কাছে। তার মনে পড়ছে শুধু রফিকের দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেষিত অনিন্দ্য সুন্দর সেই মুখটির কথা। ভাবছে শুধু ওর নিরীহ অসহায় জীবনটার কথা। ভেবেছিলো একবার বিষয়টি তার পিতাকে জানাবে; কিন্তু সাহস পায়নি। দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয়। কিছ্্ুই ভালো লাগে না নাহিদের। ঘর থেকে বের হয়ে চলে গেলো সোজা রফিকের কাছে। সেখানে যেতেই একটি অনাকাংখিত ঘটনার মুখোমুখি হতে হলো তাকে। দেখলো একজন ভদ্রলোক রফিকের গালে জোরে চপেটাঘাত করে ‘দূর হ এখান থেকে’ বলে ধমক দিলেন। নাহিদ কাছে যেতে যেতেই ঘটে গেলো ঘটনাটি। রফিক সঙ্গে সঙ্গেই বসে পড়লো মাটিতে; মুখে দু’হাত চেপে কাঁদতে লাগলো সে। নাহিদ দ্রুত চলে যেতে উদ্যত লোকটিকে বললো- ‘সামান্য কিছুর জন্য হয়তো আবদার করেছিলো; একজন্য আপনিতো তাকে মারতে পারেন না। এটাতো মানুষের কাজ হলো না।’- লোকটি ভ্রু কুচকে বললো- ইসরে দয়াবান মহানুভব! আপনি থাকেন আপনারা মনুষ্যত্ব নিয়ে।’ বলেই দ্রুত চলে গেলো লোকটি।
নাহিদ রফিকের চোখের জল নিজের হাতে মুছে দিলো। প্রবোধ দিতে লাগলো রফিককে। নিজের অজান্তেই তখন তার চোখে জল এসে গেলো। বললো ‘কেদো না, কাল তোমাকে এখানে এই বিকেলে পাবো তো? অনেক কথা আছে।’
রফিক দু’হাতে চোখ মুছে বললো- ‘পাইবা সাব; পাইবা। আমরার তো আর যাইবার জাগা নাই।’ নাহিদ ধীরে ধীরে ফিরে গেলো বাড়িতে।
সন্ধ্যে ঘনিয়ে রাত হয়ে এলো। নাহিদের বাবা অফিস থেকে ফিরলেন। বিকেলের ঘটনা নিয়ে শুধু ভাবছে নাহিদ; ভাবছে রফিকের কথা।’ ‘এখন কী করছে সে? এখনও কি সে সেই স্থানে বসে আছে? রাত ন’টা হয়তো বা এখন সে সারাদিনের ক্ষুধায় জর্জরিত দেহটাকে এলিয়ে দিয়েছে মাটিতে। হয়তো ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে হাত পাতছে কারও কাছে। হয়তো বা কেউ কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিচ্ছে তাকে।’- নাহ আর ভাবতে পারছে না নাহিদ; যেন তার মজ্জা জড়িয়ে আসছে। ভেতরে একটু সাহস সঞ্চার করে সে ঢুকলো বাবার ঘরে। ভয়ে ভয়ে বললো ‘বাবা’!
: কী, কলেজের বেতন?
: না বাবা।
: তাহলে কি ফিস? কী, বলবি তো।
: বাবা, এই এ-ই একটা ভিক্ষুক।
: ভিক্ষুক, তা হয়েছে কী?
: ওকে আমি কিছু সাহায্য করতে চেয়েছিলাম বাবা; খুব অসহায় ও।
: তা তো কতো ভিক্ষুকই পথে ঘাটে, ফুটপাতে পাওয়া যায়। এমন কী পেলে যে তুই একটি ভিক্ষুককে সাহায্য করবি?
: তা জানি বাবা; হাজারো ভিক্ষুক আমাদের চোখের সামনেই দেখতে পাই সর্বদাই। কিন্তু তাদের কথা কি আমরা একবারও ভেবে দেখি? তাদের প্রতি কি আমরা সাহায্যের হাতটা প্রসারিত করছি? যদি একটিও অসহায়, নিঃস্ব ভিক্ষুককে কিছু সাহায্য করে ওর বাঁচার একটা পথ করে দিই তাহলে কি মন্দ হবে বাবা?
: তুই মন্দ বলিসনি নাহিদ। কীভাবে তুই সাহায্য করতে চাস বল।
: যদি কিছু টাকা পয়সা দিয়ে তাকে একটা কাজ করার ব্যবস্থা করে দিই তা হলে ভালো হবে।
নাহিদের বাবা নাহিদের হাতে পাঁচশ’ টাকার একখানা চেক তুলে দিলেন। পরদিন কলেজ থেকে এসে তাড়াহুড়ো করে খেয়ে দেয়ে ছুটে গেলো চেক ভাঙানোর জন্য ব্যাংকে। টাকাগুলো নিয়ে চলে গেলো রফিকের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে রফিককে পেলো না। আশেপাশে তাকালো সে; কোথাও পেলো না। সে অন্যান্যদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো যে, রফিক একটি ট্রাক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। সে যেতে চেয়েছিলো নাহিদদের বাড়িতে। হঠাৎ একটি আন্তঃজেলা ট্রাক এসে রফিককে মারাত্মকভাবে আঘাত করে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়; সাথে এলাকার লোকজনও ছিলো।
হাসপাতালের বেডে প্রায় অচেতন রফিক। নাহিদ বললো- ‘রফিক, এই তো আমি এসেছি তোমার জন্য টাকা নিয়ে, অনেক টাকা। একবার তুমি তাকাও, দেখো চোখ মেলো।’- চোখ মেলতে পারেনি সে। বরং তার দু’চোখ অশ্রুতে ভেসে গেল। সে চোখ মেলার চেষ্টা করলো আবারও। কিছু বলতে চাইলো; জীবন প্রদীপের সর্বশেষ আলোটুকু জ্বালানোর চেষ্টা করলো। বললো- ‘না... আর ট্যাকা লাগতো নায় সাব! আপনে আমারে মাফ কইরা দেওকা। আমি যাইরাম গি-হিখানো খুব আরামো থাকমু’... আর কিছুই বলতে পারেনি রফিক। নাহিদের ডানহাত শক্ত করে ধরা রফিকের হাতটি আস্তে আস্তে অবশ হয়ে পড়লো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT