শিশু মেলা

কুকুরের টেলিফোন

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১০-২০১৮ ইং ০০:০৮:০২ | সংবাদটি ১৬ বার পঠিত

রাস্তার মোড়ে বাস করত কতগুলো নেড়ী কুকুর। না খেয়ে না খেয়ে এদের স্বাস্থ্যটা এতই খারাপ হয়েছিল যে, একবার ছোখ পড়লে আরেকবার তাকানোর ইচ্ছাই জাগতো না। কোনটার গায়ের লোম প্রায় খসে পড়েছে, কোনটার বিস্তর জায়গা জুড়ে ছাল নেই, কোনটার লেজ কাটা আবার কোনটার গায়ে দগদগে ঘা। তেপথির মুখে যে ডাস্টবিন ছিল, ওটাই ওদের খোরাকের জায়গা। আশ-পাশের দামী লোকেরা যে উচ্ছিষ্ট ফেলে সেটার পুরোটা পেলে মন্দ হতো না। কিন্তু বাধ সাধলো সাহেবের পালা কুত্তা। সে একাই একশ’। ভোর হতে না হতেই পাশের তিন তলা ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে নাদুস নুদুস বিশাল দেহী পালা কুত্তা। ওর ঘেউ ঘেউ শুনলেই নেড়ীদের অন্তরে হাতুড়ে পেটানো শুরু হয়। কলজেটা কেঁপে উঠে। ওর গলায় এও আওয়াজ, সেই দূর বাজার হতেও স্পষ্ট শোনা যায়। নেড়ীদের কেউ কেউ ডাস্টবিনে খাবারের সন্ধানে থাকলেও পালা কুত্তার ঘেউ ঘেউ শোনামাত্র লেজ গুটিয়ে যে যেদিকে পারে পালায়। কাছে পেলে নিস্তার নেই। হুমড়িখেয়ে পড়ে পালা কুত্তাটি ওদের উপর। ধারালো দাঁতের কামড়েই তো ওদের গায়ের এই দশা। সবাই মিলে চেষ্টা করেও ওকে পরাস্ত করতে পারেনি। উল্টো সবাইকে আহত হয়ে ফিরতে হয়েছিল। সেই থেকে ওর রাজত্ব এখানে।
নেড়ীদের খাবার সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল। আশ-পাশের সবগুলো ডাস্টবিনই কোন না কোন ভাবে প্রভাবশালী কুত্তাদের দখলে থাকায় ওরা পড়ল বিপাকে। এদের মধ্যে একটি কুকুর মোটামুটি স্বাস্থ্যের অধিকারি। ওর ব্রেইনও চলে ভাল। একদিন নেড়ীদের সভায় সে ভাষণ দিল। ভাইসব; এভাবে কি জীবন চলে? আমরাতো অচিরেই মারা পড়ব। মরতে যখন হবেই তখন শেষ চেষ্টা করে দেখি না। হয় ডাস্টবিন উদ্ধার করবো আর না হয় মৃত্যুই বেছে নেব। উপস্থিত নেড়ীরা ওদের ছোট্ট হাত নেড়ে বলল হ হ সেটাই করতে হবে।
পরদিন সূর্য উঠার আগেই নেড়ী কুকুরগুলো ওৎ পেতে বসল পালা কুত্তার গেটে। মালিকের দেয়া খাবারের উপর মুফত পাওয়া আস্ত ডাস্টবিন হতে উচ্ছিষ্ট খেয়ে দিনে দিনে ঢোল হয়ে উঠছিল সে। চোখ, কান, নাক পেট, পা সমস্ত যেন ‘বড়’ আকার ধারণ করেছে। গায়ের রঙ চিক চিক করছে। নেড়ীদের মেরে মেরে সাহস গেছে বেড়ে। এখন কোন কিছুই ওর চোখে ভয় ধরায় না। বাঘকেও সামনে পেলে মনে হয় খেয়ে ফেলবে- এই ভাব। রোজকার মত খাবরের সময় লালা এসে যায় ওর মুখে। তড়িৎ তিনতলার লন হতে বেরিয়ে পড়ে ও। গেট ক্রস করার সময় ঘেউ ঘেউ শুরু করল সে। লাফ দিয়ে গেট পেরুতেই নেড়ীরা ওকে ঝাপটে ধরল দুটো ধরল গলায় আর বাকী ৫টি চতুর্দিকে বসাল ধারালো দাঁতের কামড়। অতর্কিত হামলায় ধরাশায়ী হল পালা কুত্তা। চোখ বুজে দিল ভো দৌড়। প্রায় অর্ধ কিলোমিটার এসে চোখ খুললো। আরে বাবা নেড়ীগুলোর এত শক্তি। সমস্ত শরীরে রক্তের দাগ। চামড়া ছিড়ে রক্ত ঝরছে। একটা গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিল সে।
আজ বিজয় সূচিত হল নেড়ীদের। পালা কুত্তা ভেগে যেতেই ওরা এক সাথে স্লোগান ধরে ঝাপিয়ে পড়ল ডাস্টবিনের উপর। গতকাল পাশের ফ্ল্যাটে একটা ভোজ হয়েছিল। গরুর হাড্ডি, মাংস সমেত ভাত-পোলাও। আহ! কী মজাই না পেল ওরা। পেট পুরে খেয়ে ঢোল হয়ে একটা অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় ওরা বিশ্রামে গেল। পালা কুত্তাটি পাশ দিয়ে হেঁট ওর ফ্ল্যাটে যাচ্ছিল তখন। ওকে দেখেই নেড়ীগুলো আবারও আক্রমণে এগিয়ে এল। পালা কুত্তার বুকে তখন সাহস নেই একেবারে। লেজ সোজা করে পালালো সে।
নেড়ীদের লিডার গাছের গোড়ায় কাত হয়ে বিশ্রামে গেলে ওর সঙ্গীরাও তাই করল। ও সবাইকে ডেকে বলল ‘আজ থেকে আমাকে বলবে ‘তুফান’। আর তোমাদেরও নাম দিচ্ছি- তোর নাম নিশান, পাশেরটা খোরাশান, এর পরে আলোয়ান, এর পরে পাহলোয়ান, এর পরে সারপান এবং সবশেষে হাইওয়ান। আমরা একজোট নেড়ী। যে আমাদের আক্রমণ করবে আমরা সবাই একসাথে পাল্টা আক্রমণে যাবো। মরা-বাঁচা আল্লাহর হাতে। নিজের অধিকার আদায়ে আমরা সোচ্চার থাকবো। এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
সুদিন এরো নেড়ীদের। ডাস্টবিন থেকে খেয়ে দেয়ে মোটা অংকের খাবার সংগ্রহ করতে লাগলো ওরা। এ খবর অন্য নেড়ীরাও পেল। খাবারের খোঁজে তুফানের কাছে আসলো ওরা। বশ্যতা স্বীকার করে খাবার চাইল। সেই সুযোগটা কাজে লাগালো তুফান। বলল-ঠিক আছে। তোমাদের আবদার শুনলাম। তবে শর্ত আছে। আগত নেড়ীগুলো বলল-কী সেই শর্ত গুরু?
-শর্ত এক-আমাদের উচ্ছিষ্ট তোদের খেতে হবে।
-শর্ত দুই-তোদের কুকুর বলা হবে না। তোদের বিলাই বলা হবে। বিলাই এর কাজ কী জানো?...
-না, হুজুর।
-বিলাইয়ের কাজ হল বিনয় ভাব পোষণ করা। কখনও আমাদের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না। যদি খেয়ে দেয়ে মোটা হয়ে কেউ প্রশ্ন উত্থাপন কর তাহলে এর শাস্তি ভয়াবহ।
-আমরা রাজী হুজুর।
-আরে এখনই আমরা বলে ফেললে? বল আমি রাজি। একজন একজন করে বল।
সবাই স্বীকারোক্তি দিলে শর্ত মত খাবার পেতে লাগলো বিলাই এর গোষ্ঠী।
তুফানের ব্রেইন চলতে লাগলো বেশ দ্রুত। দিনে দিনে নেড়ীর গোষ্ঠী বেড়েই চলেছে। ডাস্টবিনের পর ডাস্টবিন দখলে আসতে লাগলো। কারণ পরবর্তী সময়ে আরও একটি শর্ত জুড়ে দেয় সে। সেটি হল ডাস্টবিন দখলের সময় সব বিলাই কুকুর বনে যেন সঙ্গ দেয় তুফানদের। ওরা করলও তাই। কিন্তু ওদের র‌্যাঙ্ক বাড়ে না। সেই উচ্ছিষ্ট খেয়েই জীবন চালাতে হয়। বিলাই বনেই থাকতে হয়। ওরা যে জীবনপণ যুদ্ধ করে ডাস্টবিন দখল করল-এর ফুল এডভান্টেজ নেয় তুফানের গোষ্ঠী। এখন আর ওদের দেখলে চেনা যায় না। সেই পূর্বের নেড়ী ভাব নেই। গায়ে সুন্দর লোম গজিয়েছে। চেহারায়ও চিকচিক ভাব। ভাল ভাল খাবারের পর মাঝে মধ্যে কাঁঠালের খসখসে পাতার মত কী চিবুতে দেখা যায়। সেটির রঙ্গে ঠোঁট লাল হয়ে ওঠে।
বিলাই বানিয়ে রাখা গোষ্ঠীর কেউ কেউ মাঝে মধ্যে ঘেউ ঘেউ করলে হাইওয়ান সেটা ফলো করে। ইতোমধ্যে ঐ অভিজাত সাত নেড়ীয়ে মধ্যে টেলিফোন যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। সেটা ঐ তুফানেরই বদৌলতে। ডাস্টবিনে খাবার খুঁজতে গিয়ে কী একটা মুখের মধ্যে আটকা পড়েছিল সেদিন। টিপ দিতেই কার সাথে যেন লাইন লেগে যায়। ও ঘেউ ঘেউ করলে সাথে সাথে অন্য প্রান্ত হতে ঘেউ ঘেউ ভেসে আসে। তখনই আইডিয়া হয় তুফানের। কষ্ট করে ওরকম সাতটি জিনিস সংগ্রহ করে সাতজনকে দেয়। কারণ ইতোমধ্যে সাতটি ডাস্টবিনে সাতজনই দায়িত্বরত আছে। কোন অসুবিধা হলে দ্রুত যাতে যোগাযোগ করতে পারে।
সেদিন একটা বিলাই ঘেউ ঘেউ করলে হাইওয়ান বাকী সবাইকে বলে দেয় সে সংবাদটি। ওরা দ্রুত এক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সদ্য মুখ ফোটা জন্তুটিকে। কামড়াতে কামড়াতে একটা ঠ্যাং অবশ করে ফেলল ওরা। বাকী বিলাইগুলো ভয়ে মিউ মিউ করতে লাগলো। তুফান বলল- হ্যাঁ এইভাবে তোদের ভাষা ব্যবহার করবে সাবধান কখনও আমাদের অভিজাত ভাষা ব্যবহার করবে না।
সকল ডাস্টবিনেই কোন না কোন সময় ওরা ঘুরে বেড়ায়। যেখানে ওরা উপস্থিত হয়, এদের দেখে বিলাইগুলো তটস্থ থাকে। কী জানি কার উপর ওদের নখের থাবা বসে কে জানে? বিলাইগুলোর উপর ওদের শ্যানদৃষ্টিই তার প্রমাণ।
সাত নেড়ীর একটা হলো পাহলোয়ান। সব সময়ই ওর খাবার বেশি দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তুফানের যন্ত্রণায় সে খেতে পারে না। সব সময়ই তুফান সবার আগে ডাস্টবিনে গিয়ে ভালভাল খাবার খেয়ে ফেলে। এতে পাহলোয়ান যায় বিগড়ে। সে বিলাইয়ের সভায় ওদের উত্থানের ইতিহাস বলে দেয়। এতে বিলাইরা আদ্যোপান্ত অবগত হয়। ওদের দেয়া শর্ত ভঙ্গ করতে চায় ওরা। কিন্তু সাহসী হয়ে উঠে না। পাছে যদি আবার ভয়ানক শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। ওদের টেলিফোনের জোর প্রবল। কোন কিছু ঘটলেই চট করে সপ্ত নেড়ীর কানে চলে যায় সেটি আর ওরা জোট বেঁধে আক্রমণে আসে।
ইতোমধ্যে উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে বিলাই নামক নেড়ীদেরও কেউ কেউ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়েছে। ওরা গোপনে সপ্ত নেড়ীর ইতিবৃত্ত গোপনে গোপনে সবাইকে জানায়। ওদের মধ্যে অনেকেই সাহসী হয়ে ওঠে। সংখ্যায় এখন বিলাইরাই অধিক। ওরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করে ঠিক করল-আমাদের ন্যায্য কথাটা বলতে হবে। কাজেতো আমরা কম যাই না। আমরা উচ্ছিষ্ট কেন খাব। আর আমাদের বিলাই নাম দিয়ে দমিয়ে রাখবে কেন? আমরাও তো রং রূপে- আকারে-সাইজে ওদেরই মত। কাজেই ওরা (সপ্ত নেড়ী) যে সকল অধিকার ভোগ করে আমাদেরও সে সকল অধিকার দিতে হবে।
সবাই মিলে বিলাইদের নেতা ঠিক করল। ওরা ওদের ন্যায্য কথাটি সপ্ত নেড়ীর সভায় তুলতে অনুরোধ করল। সাহসী বিলাই সত্যি সত্যিই একদিন বলে ফেলল-
-হুজুর। আমার একটি কথা আছে। তুফান লাফ দিয়ে উঠে বলল- তোর আবার কি কথা?
-কথা হলো আমরা আপনাদের মত খেটে খুটে ডাস্টবিন দখল করি? সুতরাং আমাদেরও ফ্রি খাবারের সুযোগ দিতে হবে। আপনাদের উচ্ছিষ্ট খাবার খেতে পারবো না। আর আরও একটি কথা- আমাদের বিলাই বলা চলবে না। আমাদেরকে আপনাদের মত নেড়ির মর্যাদা দিতে হবে।
তুফান তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে বলল- শালা তোকে পুষে এই প্রতিদান পেলাম?
তুই ভয়াবহ শাস্তির জন্য তৈরি হ। সাহসী বিলাই পেছন ফিরে দেখে বিলাইদের একটিও নেই। সবাই অন্য একটা ছোট্ট কুঠরিতে মিউ মিউ করছে। ওরা যে কথা দিয়েছিল ঘেউ ঘেউ করবে- সেটা বেমালুম ভুলে গেল। ততক্ষণে সপ্ত নেড়ী জমায়েত হয়ে সাহসী বিলাইয়ের উপর চড়াও হলো। ওর সমস্ত শরীর কামড়ে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেললো। দাঁতও ভেঙ্গে দিল। সাহসী বিলাই- ভাবল আমাদের বিলাই নাম এমনিতে দেয়নি ওরা-আমাদের কাজেই আমাদের পরিচয়...।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT