সম্পাদকীয়

সড়ক পরিবহন আইন

প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১০-২০১৮ ইং ০০:০৯:০২ | সংবাদটি ১৮ বার পঠিত

অতি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে সড়ক পরিবহন আইন। এর প্রতিবাদ করছে মালিক-শ্রমিকদের সমন্বয়ে গঠিত ঐক্য পরিষদ। সারাদেশে তারা পালন করছে প্রতিবাদ কর্মসূচি। তারা আরও বৃহত্তর কর্মসূচির ডাক দেবে বলে ‘হুশিয়ারী’ উচ্চারণ করেছে। তারা সময় বেধে দিয়ে বলেছে এর মধ্যে আইন সংশোধন করা না হলে পরিবহন ধর্মঘটসহ বৃহত্তর কর্মসূচির ডাক দেয়া হবে। ইতোমধ্যে রাজধানীতে পালিত হয়েছে পরিবহন ধর্মঘট। গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস করা হয় সড়ক পরিবহন আইন। এই আইনে সড়ক দুর্ঘটনার অপরাধ প্রমাণ হওয়া সাপেক্ষে দোষী চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া, আইনে ফৌজদারী কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও বিধান রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহারী হত্যাকান্ড প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড। গত জুলাই মাসের ২৯ তারিখ রাজধানীতে বাসচাপায় দুই স্কুল ছাত্রের মৃত্যু হওয়ার পর থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে পড়ে। সড়ক পথে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তারা বেশ কিছুদিন রাস্তায় ছিলো। এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।
সড়ক পথে শৃঙ্খলা আসেনি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে মাত্র কয়েকদিনের জন্য কিছুটা হলেও যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ছিলো। সেটা স্থায়ী রূপ নেয়নি। এটা স্থায়ী হবেও না। কারণ পরিবহন খাতে সব পর্যায়েই অনিয়ম-দুর্নীতি। যানবাহনের বৈধ কাগজপত্র থাকে না, থাকে না চালকের লাইসেন্স। অদক্ষ চালক বৈধ কাগজপত্রবিহীন যানবাহনগুলো যে রাস্তায় চালায়, সেই রাস্তারও কোন ‘অভিভাবক’ নেই। চুরি-লুটপাটের মাধ্যমে রাস্তাগুলো নির্মিত হয়, সংস্কার হয়। সেগুলো বছরের বেশিরভাগ সময়ই থাকে ভাঙ্গাচুরা। সুতরাং এতোসব অনিয়ম-দুর্নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সড়কপথের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আপাতত দুঃস্বপ্নই বলতে হবে। তারপরেও আমরা আশাবাদী। সরকার যদি যথাযথ উদ্যোগ নেয়, তবে সড়কপথ নিরাপদ করা সম্ভব। কিন্তু আমরা সেই ধরনের কোন উদ্যোগ দেখছি না। মাঝে মধ্যে যে কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না, তা নয়, কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই। দেখা যায়, অনাকাংখিত চাপের মুখে অনেক পদক্ষেপই মাঝপথে আটকে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এ দেশে যতোসব দুর্ঘটনা ঘটছে, তার বেশির ভাগের জন্যই চালক-হেলপার দায়ী। অথচ তাদেরকে এর সাজা ভোগ করতে হয়না। বর্তমানে যে আইন প্রচলিত হয়েছে তাতে সাজার মাত্রা খুবই সামান্য। তা-ও চালকদের ভোগ করতে হয় না। নতুন আইনেও যে সাজার কথা বলা হয়েছে, তা সড়কের দীর্ঘদিনের নৈরাজ্য বন্ধে পর্যাপ্ত নয় বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত। অথচ এই আইনও কার্যকর হতে দিচ্ছেনা পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা।
দেশে সড়কপথের পরিমাণ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। নির্মিত হচ্ছে সড়ক-মহাসড়ক। বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। যাত্রীর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি দেশের কোথাও, এমন দিন হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। সম্ভবত বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার এই মুহূর্তে বিশ্বে সর্বোচ্চ। এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারীতে যতো মানুষের মৃত্যু হয়, তার চেয়ে বেশি মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। এই ধারা অব্যাহত থাকলে, আগামীতে কোন এক সময় দেখা যাবে দেশের সব পরিবারেরই কেউ না কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা ‘মানবসৃষ্ট’ দুর্যোগ। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং মালিক, চালক, হেলপারগণ সজাগ হলে, তাদের বিবেক জাগ্রত হলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসবে, এতে সন্দেহ নেই।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT