উপ সম্পাদকীয়

শিশু শ্রমিকদের দুঃখগাথা

আমীরুল হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১০-২০১৮ ইং ০০:০৬:৩৫ | সংবাদটি ১৭৮ বার পঠিত

ক্লান্ত ঘর্মাক্ত দেহ। ধীরে ধীরে ভ্যানটা টেনে নিচ্ছে। পেশীর শক্তি প্রায় নিঃশেষিত। উপর থেকে নীচ পর্যন্ত কাগজ-কার্টুন-চটের বস্তায় ঠাসা! বাবার জুতোজোড়া হাতে নিয়ে ভ্যানের উপর বসে আছে কালো মেয়ে! খুব বেশী হলে দশ বছর! মাথার উপরে গনগনে রোদ সাথে ভাদ্রের ভ্যাপসা গরম ছোট্ট হাতে রোদ আড়াল করার চেষ্টা। কিন্তু এই ছোট্ট হাতে কতটুকুই আটকাতে পারে। মাঝে মাঝে পিছন ফিরে করুণ চোখে মেয়েকে দেখছে পিতা..
তারচেয়েও করুণ দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে মেয়ে। কোথায় শেষ হবে এ যাত্রা, কেউ জানে না। কেন জানি দ্রুত হেঁটে সামনে যেতে ইচ্ছে হল না। একটু হাটি না ওদের সাথে।
কালো হলেও বেশ মিষ্টি চেহারা। চোখে মুখে অদ্ভুত সারল্য, বিষন্নতা কেড়ে নিতে পারে নি! কর্মচঞ্চল দিনের শুরু সুন্দর সুন্দর ইউনিফর্ম পরিপাটি বেশভূষায় বাচ্চারা দলে দলে স্কুলে যাচ্ছে! ওদের দেখে বিষন্নতা উবে যায় ক্ষণে ক্ষণে। হাসি হাসি মুখ দু’চোখের কোণে স্বপ্নের উঁকিঝুঁকি! ইশ যদি ওদের মত স্কুলে যেতে পারতাম!
স্কুল খেলার মাঠ হাসি আনন্দে মাখা শৈশব সব শিশুদের স্বপ্ন। এই মেয়েটি কেন তার স্বপ্ন থেকে দূরে? মেয়েটির এখন স্কুলে থাকার কথা। সে বাবার সাথে কাজে বেরিয়েছে কেন? প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা। আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা হয়তো এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। বিশাল জনগোষ্ঠীর যে চাপ তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি বাংলাদেশ। পরিসংখ্যান ভিত্তিক উন্নয়ন হচ্ছে সত্য, কিন্তু তা সমগ্র জনগোষ্ঠীতে প্রভাব ফেলতে পারছে না। দেশের মোট জনসংখ্যার নব্বই ভাগ দারিদ্র্যসীমার নীচে অবস্থান করছে। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। যতক্ষণ কাজ ততক্ষণ ক্ষুধা নিবারণ করতে পারবে নচেৎ নয়। ঘরে অভুক্ত অর্ধভুক্ত সদস্যদের রেখে আর যাই হোক শিক্ষার চিন্তা করা যায় না। বাধ্য হয়ে নিজের সন্তানদের কাজ করা ছাড়া অন্য কোন চিন্তা করতে পারে না।
সবার জন্য শিক্ষা কিংবা শিশুদের জন্য নিরাপদ বিশ্ব এগুলো অনেকটা শ্লোগান সর্বস্ব। একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতি না সাধন করে কাংখিত লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। কল কারখানা, হোটেল রেস্তোরাঁ গাড়ীচালানো ইটভাটার সব কষ্টসাধ্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে হাজার হাজার শিশু শ্রমিক নিয়োজিত। সমগ্র বিশ্বের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশে ভারতের পর আমাদের অবস্থান। শিশুশ্রম আমাদের জাতীয় জীবনের বোঝা। আইন করে কতটুকু রোধ করা সম্ভব। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো উদীয়মান জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশ শিক্ষা মেধাহীন হয়ে বড় হচ্ছে। অশিক্ষার সাথে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে ওরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে।
আপনার আমার শিশু গৃহকর্মীর প্রতি কতটুকু মানবিক! সামান্য ভুল ত্রুটি হলেই খড়গহস্ত। নেমে আসে মৃত্যুর ভয়াবহতা। এ সমাজ ভুলে যায় ওরা শিশু। কর্মক্ষেত্রের কোথাও নিরাপদ নয়। সবাই মনে করে এক আধটু পিটুনী না খেলে কি করে কাজ শিখবে! অথচ এ সামান্য শাসনে প্রায় প্রতি বছর অসংখ্য শিশু অবলীলায় মরে যায়। খবরের কাগজ বা সোশাল ইলেকট্রনিক মিডিয়া দেখে ক’দিন উহ আহ করে আবার যেই সেই! এরকম অত্যাচার অনাচারের স্বীকার হয়ে ওরা প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠে। কখনো কখনো ওদের ভয়াবহতা সব ধরণের হিংস্রতা ছাড়িয়ে যায়। এতে দায় কার? ওদের কতটুকু দোষ দেয়া যায়? নীতি নৈতিকতা শিক্ষার সুযোগটুকু তো ওরা পায় নি!
কাজের ফাকে ফাকে টুকটাক গল্প বাপ মেয়ের যার পুরোটাই পরিবার সংক্রান্ত। সন্ধ্যায় কী কী নিতে হবে। ইতিমধ্যে আরো ঢাউস হয়েছে ভ্যান! এই প্রচ- রোদে ছোট্ট মেয়েটি ভ্যানের উপর চড়ে জোরে জোরে পা দিয়ে চেপে আরো জায়গার সংকুলান করছে। কৃষ্ণ কালো রং পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে..। সে দিকে তাকাবার সময় কোথায়! পাশের অফিস থেকে ঢু মেরে বাবা এসে হাক দিল কৈরে মা চল! আজকে হয়তো আর পাব না। ক্লান্ত অবসন্ন দেহে ভ্যানের হে-েল ধরে টান দিল। পরিশ্রান্ত দেহের সর্বস্ব নিংড়ে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুততর পথ চলতে সাহায্য করছে বাবাকে। পদতলে রক্ত ঝরলেও দেখার সময় নাই। বেলা যে গড়িয়ে পড়ছে! বিক্রি বাট্টা শেষ করে ঘরে ফিরতে হবে। অনন্তকাল ধরে পথ চেয়ে আছে ক্ষুধার্ত মুখগুলো।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • অরিত্রী : অস্তমিত এক সূর্যের নাম
  • স্বপ্নহীন স্বপ্নের তরী
  • মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান
  • নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?
  • Developed by: Sparkle IT