ধর্ম ও জীবন

ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার

মো. আব্দুল মালিক প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১০-২০১৮ ইং ০০:০৮:১৭ | সংবাদটি ১৩ বার পঠিত

স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে পাশাপাশি বসবাসকারী বা অবস্থানকারী চতুর্পাশের চল্লিশ পরিবার একে অপরের প্রতিবেশী। সাময়িকভাবে পাশাপাশি অবস্থানকারীরাও প্রতিবেশীর পর্যায়ভুক্ত। ইসলামে ব্যক্তিগত বা সামাজিক যে সকল অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে প্রতিবেশীর হক বা অধিকার চতুর্থ স্থানীয় হলেও উহার প্রতি বারবার কঠোর তাকীদ দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেশী একে অপরের নিকট আমানত সদৃশ এবং একে অপরের হেফাজতকারী। প্রতিবেশী একে অপরের উপকারে আসবে ইহাই ইসলামের সামাজিক বিধান। প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে কোনো জাতি-ধর্ম ভেদাভেদ নাই। জাতি-ধর্ম বা বর্ণ-নির্বিশেষে সকলেই প্রতিবেশী। সুতরাং প্রতিবেশী যেই হউক না কেন এবং যেমনই হউক না কেন মানবিক ব্যবহারের বিনিময়ে তার সহিত সদ্ভাব বজায় রাখতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই তাকে উৎপীড়ন করা যাবে না। কেননা এর কুফল ধীরে ধীরে সমগ্র সমাজে ছড়াইয়া পড়তে বাধ্য এবং এর ফলে সমাজে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে যখন সমাজ জীবন বিঘিœত হয়ে শান্তি শৃঙ্খলার অভাবে গোটা সমাজ বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে।
স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে পাশাপাশি বসবাসকারী, সাময়িকভাবে কোনো স্থানে বসবাসকারী এমন কি জাহাজ, রেলগাড়ি, বাস, উড়োজাহাজে সাময়িকভাবে অবস্থানকারীগণও পরস্পর প্রতিবেশী। সকল প্রকার প্রতিবেশী সম্পর্কে মহান আল্লাহ সুবহানাতালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁহার সহিত কোনো কিছুর শরীক করিবে না এবং মাতা-পিতা, নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী, ইয়াতীম ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব এবং পথিক প্রতিবেশীর প্রতি সদ্বব্যবহার করিবে।’ (সূরা : নিসা : ৩৬)
প্রতিবেশী তিন প্রকারের, যথাÑ(১) মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী (২) মুসলিম প্রতিবেশী এবং (৩) অমুসলিম প্রতিবেশী। এদের প্রত্যেকের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। তবে যে সকল মুসলিম প্রতিবেশী আত্মীয় তাদের তিনটি অধিকার রয়েছে। (১) মুসলমান হওয়ার দরুন একটি (২) আত্মীয় হওয়ার দরুন একটি এবং (৩) প্রতিবেশী হওয়ার দরুন একটি হক্ রয়েছে। অনুরূপভাবে যে সকল প্রতিবেশী আত্মীয় নয় কেবল মুসলমান তাদের হক দুইটি। একটি মুসলমান হওয়ার দরুন এবং একটি প্রতিবেশী হওয়ার দরুন। আর যে সকল প্রতিবেশী অমুসলিম তাদের শুধু প্রতিবেশী হওয়ার দরুণ একটি হক রয়েছে।
জাতি-ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবেশীর হক আদায় করতে হবে। নিজে কিংবা কোনো মানুষ বা জীব-জন্তু দ্বারা প্রতিবেশীর অনিষ্ট সাধন করা ঈমানের পরিপস্থী। মহানবী (সা.) বলেন ‘আল্লাহর শপথ সেই ব্যক্তি ঈমানদার নয়, আল্লাহর শপথ সেই ব্যক্তি ঈমানদার নয়, আল্লাহর শপথ সেই ব্যক্তি ঈমানদার নয়।’ জিজ্ঞাসা করা হলোÑহে আল্লাহর রাসূল কোন ব্যক্তি? ‘রাসূল (সা.) বললেন, ‘যাহার অত্যাচার হতে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।’ অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যাক্তি নিজে পেট ভরিয়া খায়, অথচ তার প্রতিবেশী তারই পাশে অভুক্ত থাকে, সে ব্যক্তি মুমিন নয়।’ মহানবী (সা.) প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে আরও বলেছেন, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই, সে তার প্রতি অত্যাচার করিবে না।’
মানুষ মাত্রই দোষ-ত্রুটি পূর্ণ। কোনো মানুষই নির্দোষ বা ত্রুটি মুক্ত নয়। সুতরাং প্রতিবেশী যদি এমন কোনো দোষ-ত্রুটি করে ফেলে যা তার ব্যক্তিগত কিংবা সমাজে উহার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা না দেয় তবে, অবশ্যই উহা গোপন রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে মহান আল্লাহ মানুষের বহু কবীরাহ গুনাহ গোপন রাখেন। ইচ্ছা করলে তিনি সকল দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে মানুষকে লজ্জিত করতে পারেন। কিন্তু তিনি তা করেন না বরং মানুষের সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুন্ন রাখেন। মানুষেরও উচিত অপর কোনো ব্যক্তির গোপন কোনো অন্যায় কাজ করতে দেখলে উহা প্রকাশ করে জনসমক্ষে তাকে লজ্জিত না করা। এ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অপর কোনো মুসলমানের ত্রুটি গোপন করে, আল্লাহ শেষ বিচারের দিন তার ত্রুটি গোপন করবেন।’ মহানবী (সা.) আরো বলেনÑ‘যে মুসলমান অপর কোনো মুসলমানের জাগতিক বিপদ সমূহের একটি বিপদ দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের বিপদসমূহের একটি বিপদ হতে তাকে মুক্ত করবেন।’
প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে মহানবী (সা.) সম্যক অবগত থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নিকট হতে হযরত জিব্রাঈল (আ.) বারবার এ ব্যাপারে তাকীদ করতে অবতীর্ণ হয়েছেন। এ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, ‘জিব্রাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে এত অধিক উপদেশ দিতে লাগলেন যে, আমার ধারণা হল সম্ভবতঃ প্রতিবেশীকে আমার ওয়ারিস করিয়া দেওয়া হবে।’ মহানবি (সা.) আরো বলেছেন, আল্লাহর নিকট সেই প্রতিবেশীই সর্বাপেক্ষা উত্তম যে তার প্রতিবেশীর নিকট উত্তম।
ইসলামের বিধান মোতাবেক প্রতিবেশীর প্রতি যে দায়িত্ব ও কর্তব্য ন্যস্ত আছে উহাদের মধ্যে নি¤œবর্ণিত কর্তব্যগুলি প্রধান। (১) প্রতিবেশীকে প্রথমে সালাম দিতে হবে। (২) বিনা কারণে বা তুচ্ছ কারণে তাকে যখন তখন বিরক্ত করা যাবে না। রোগাক্রান্ত হলে তাকে দেখতে যেতে হবে এবং কপালে হাত রেখে অন্ততঃ ‘কেমন আছেন’ বলে সহানুভূতি দেখাতে হবে। (৪) বিপদাপদে সাহায্য করতে হবে। (৫) তার দাওয়াত গ্রহণ করতে হবে এবং তার বাড়িতে আনন্দোৎসবে যোগ দিতে হবে। (৬) তার দোষ-ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখতে হবে। (৭) কোনো সৎকাজের জন্য সাহায্য চাইলে তাকে সাহায্য করতে হবে। (৮) অভাবগ্রস্ত হলে তার অভাব মোচনের চেষ্টা করতে হবে। (৯) কোনো কারণে তার বসবাসে অসুবিধা করা যাবে না। (১০) তাকে না দিয়া কিছু খাবে না। তবে যদি দেওয়ার সামর্থ না থাকে, তবে তাকে কিংবা তার ছেলে-মেয়েকে উহা দেখাবে না। (১১) প্রতিবেশির ছেলে মেয়েকে ¯েœহ করবে। (১২) নিজের বাড়ির দেওয়াল, ছাদ বা ড্রেন এমন করা চলবে না যাতে তার বাড়িতে বাতাস চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করে বা বাতাস বন্ধ হয়ে যায় বা পানিতে সমস্যা করে। (১৪) প্রতিবেশীর অনুপস্থিতিতে তার বাড়ির খোঁজ-খবর নিতে হবে।
উপরোক্ত কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা হলে মানুষে মানুষে হিংসা বিদ্বেষ থাকবে না, ফলে সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। প্রতিবেশীর হক বা অধিকার যথাযথভাবে পালন না করে ইবাদত বন্দেগী কতটুকু কাজে আসবে সে সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT