ধর্ম ও জীবন

ওলীগণের লাশ কবরে অক্ষত থাকে

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১০-২০১৮ ইং ০০:০৮:৪৭ | সংবাদটি ১৫০ বার পঠিত

আল্লাহর ওলীগণের সুমহান মর্যাদার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ জেনে রাখো, আল্লাহর ওলীগণের কোনো ভয় নেই, এবং তারা দুঃখিতও হবে না। যারা ঈমান আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে; আল্লাহর বাণীর কোনো পরিবর্তন নেই, এটাই মহাসাফল্য’। (সূরা : ইউনসু, আয়াত : ৬২-৬৪)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেস্তা এবং বলে, তোমরা ভীত হইওনা, চিন্তিত হইওনা এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে; সেথায় তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চাহে এবং সেথায় তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমরা ফরমায়েশ কর। ইহা হবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন’। (সূরা : হামীম আস-সেজদাহ, আয়াত : ৩০-৩২)
আল্লাহর ওলীগণের এতো উচ্চ মর্যাদা এ জন্য যে, তাঁরা আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) এর প্রেমে সিক্ত, আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) এর প্রেমে তাঁরা বিদগ্ধ। তাঁরা সর্বাবস্থায় আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) এর হুকুম পালন করেছেন। এজন্যই তাঁরা অতি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। তাঁরা মরেও অমর হয়ে থাকেন। কবরে তাঁদের দেহ পচে গলে যায় না। কবরের ভিতর তাঁদের পবিত্র দেহ অক্ষত থাকে। মাটি তাঁদের দেহকে গ্রাস করতে পারে না। আল্লাহর ওলীগণের পবিত্র দেহ মোবারক যে কবরে অক্ষত থাকে বা তাঁদের পবিত্র দেহ কবরের মাটি গ্রাস করতে পারে নাÑ এ বিষয়টি কুরআনের অগণিত আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত। আসহাবে কাহাফের ঘটনাটি পবিত্র কুরআনে বিধৃত হয়েছে এভাবেÑ ‘তারা তাদের গুহায় ছিলো তিন শত বছর, আরো নয় বছর অর্থাৎ তিনশত নয় বছর’। (সূরা : কাহাফ, আয়াত : ২৫)
আসহাবে কাহাফের সাতজন মুমিন এবং তাদের সঙ্গী সেই কুকুরটিকে তিনশত নয় বছর পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় গুহার মধ্যে ঘুমন্ত রেখে আবার জীবিত করলেন। এর দ্বারা দিবালোকের ন্যায় প্রমাণ হলোÑ আল্লাহর ওলী বা প্রকৃত মুমিনের লাশ মাটির মধ্যে শত শত বছর থাকলেও সেই লাশ অক্ষত থাকবে। আল্লাহর ওলী বা প্রকৃত মুমিনের লাশ বা দেহ মাটি গ্রাস করতে পারবেনা। আল্লাহর অগণিত ওলীর দেহ শত শত বছর পর কবর খুঁড়ে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে এমন অসংখ্য ঘটনাবলী ইতিহাসে রয়েছে। দুনিয়ার আগুনে পোড়া একটি ইটের টুকরা যদি শত শত বছর অক্ষত অবস্থায় মাটির নিচে থাকতে পারে তাহলে যাঁরা আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) এর প্রেমে দগ্ধ তাঁদের পবিত্র দেহ মোবারক মাটির নিচে শত শত বছর অক্ষত অবস্থায় থাকবে না কেন? দুনিয়ার আগুনে পোড়া ইটকে মাটির নিচে আল্লাহপাক শত শত বছর অক্ষত অবস্থায় রাখতে পারলে আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) এর প্রেমে দগ্ধ সেই আল্লাহর ওলীদের দেহ যে কবরে শত শত বছর অক্ষত অবস্থায় রাখতে পারবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহপাক তার ওলীগণের এতো উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন যে, যয়ারা আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রেমে জীবন বিসর্জন দেন, যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে শহীদ হন তাঁদেরকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন।
ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘আল্লাহর পথে যারা নিহত হয় তাদের তোমরা মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত। কিন্তু তোমরা তা উপলব্দি করতে পার না।’ (সূরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৪)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনও তোমরা মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদেরকে রিজিক প্রদান করা হয়’ (সূরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১৬৯)। উক্ত আয়াতের তাফসিরে জালালাইন শরীফের হাশিয়াতে বলা হয়েছেÑ‘তাদের এ জীবন দুনিয়ার জীবনের মতো নয়; বরং এর চেয়েও উন্নত ও সমৃদ্ধ। কারণ তাঁদের রূহ যেখানে ইচ্ছা সেখানেই বিচরণ করতে পারে’। (তাফসিরে জালালাইন : পৃষ্ঠা-৬৫)
উক্ত আয়াতগুলো দ্বারা দিবালোকের ন্যায় এটাই প্রমাণ হলো, যারা আল্লাহর পথে জীবন দান করেন অর্থাৎ আল্লাহর ওলীগণ জীবিত এবং কবরে তাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিক পেয়ে থাকেন। যেহেতু তাঁরা জীবিত এবং রিজিকপ্রাপ্ত সেহেতু কবরে তাঁদের দেহ মোবারক যে অক্ষত সে বিষয়টিও দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট। দীর্ঘ দিন পর কোনো কোনো আল্লাহর ওলীর পবিত্র লাশ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করায় সময় দেখা গেছে তাঁদের দেহ মোবারক তো অক্ষত আছেই; এমনকি তাঁদের গাঁয়ের কাফন পর্যন্তও মাটি স্পর্শ করে নি। মনে হয় এই মাত্র তাঁদেরকে দাফন করা হয়েছে।
হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনÑ ‘আমি সর্বদা রাসূল (সা.) এর রওজা মোবারকে হাজির হতাম। হযরত ওমর (রা.) কে দাফনের পূর্ব পর্যন্ত যখন আমি এখানে প্রবেশ করতাম তখন এ ধারণায় আমি আমার ওড়না খুলে দিতাম যে, এখানে আমার সম্মানিত স্বামী এবং আমার সম্মানিত পিতা শায়িত আছেন। কিন্তু যখন হযরত ওমর (রা.) কে তাঁদের পাশে দাফন করা হলো তখন আল্লাহর কসম! হযরত ওমর (রা.) এর প্রতি লজ্জার কারণে আমি ওড়না পরিহিত না হয়ে কখনও রওজা শরীফে প্রবেশ করতাম না’। (আল-জাউহারুল মুনাজ্জাম)
উক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণ হলো, হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) সর্বদা রওজা মোবারকে উপস্থিত হতেন। হযরত ওমর (রা.) কে দাফনের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ওড়না না পরেই নবী (সা.) ও হযরত আবু বকর (রা.) এর সম্মুখে হাজির হতেন। কিন্তু যখন হযরত ওমর (রা.) কে নবী (সা.) ও হযরত আবু বকর (রা.) এর পার্শ্বে দাফন করা হল তখন হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) হযরত ওমর (রা.) কে লজ্জা করে ওড়না পরেই রওজা মোবারকে হাজির হতেন। এর দ্বারা বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল যে, হযরত আয়শা (রা.) এর আক্বীদা মতো নবী (সা.) হযরত আবু বকর (রা.) এবং হযরত ওমর (রা.) তাঁদের কবর শরীফে জীবিত আছেন। আর একারণেই তিনি হযরত ওমর (রা.) এর কারণে পর্দা করে রওজা মোবারকে হাজির হতেন। আর এ ব্যাপারে উম্মতে মুহম্মদীর ইজমা হয়ে গেছে যে, নবী-রাসুল ও আল্লাহর ওলীগণ তাঁদের কবরে জীবিত এবং তাঁদের পবিত্র দেহ কবরে অক্ষত রয়েছে।
আল্লাহর ওলীগণের লাশ মাটি গ্রাস করতে পারে না। তাঁদের দেহ কবরে অক্ষত থাকে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) এর কোনো এক সাহাবী একটি কবরের উপর আপন তাঁবু খাটালেন। তিনি জানতেন না যে, ইহা একটি কবর। হঠাৎ তিনি দেখেন তাতে একটি লোক ‘সূরা মূলক’ তেলাওয়াত করছে, এমনকি তা শেষ করে ফেলেছে। অতঃপর তিনি রাসুল (সা.) এর দরবারে এসে এ সংবাদ দিলেন। রাসুল (সা.) বললেন, এটা হচ্ছে আজাব হতে মুক্তিদানকারী এবং বাধাদানকারী, যা পাঠকারীকে আল্লাহর আজাব হতে মুক্তি দিয়ে থাকে’ (তিরমিজী, মিশকাত : পৃষ্ঠ-১৮৭-১৮৮)
হযরত মুআবিয়া (রা.) এর খেলাফতকালে মদিনায় নদী খনন করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। নদী খনন করার সময় উহুদের কবর স্থান পড়ে গেল। তখন হযরত মুআবিয়া (রা.) ঘোষণা করলেনÑ ‘আপনারা আপনাদের প্রিয় সাথীদের লাশগুলোকে স্থানান্তর করে নেন। এ উদ্দেশ্যে যখন লাশগুলোকে বের করা হল তখন লাশগুলোকে সম্পূর্ণ অক্ষত ও তরতাজা পাওয়া গেল। এ সময় এ ঘটনাটিও ঘটে গেল যে, কবর খননকালে সাইয়্যিদুনা হযরত হামজা (রা.) এর কদম মোবারকের মধ্যে কোদাল লেগে গেল। এতে তাঁর কদম মোবারক থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। (তাফসিরে মাজহারী)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT