ধর্ম ও জীবন [পূর্ব প্রকাশের পর]

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১০-২০১৮ ইং ০০:০৯:১১ | সংবাদটি ১৫ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
সপ্তম কারণ : কুরআন শরীফ শ্রবণ করলে মুমিন, কাফির, সাধারণ-অসাধারণ নির্বিশেষে সবার উপর দু’ধরণের প্রভাব সৃষ্টি হতে দেখা যায়। যেমন, হযরত জুবাইর ইবনে মোতআম (রা.) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে একদিন হুযুর (সা.) যখন শেষ আয়াতে পৌঁছলেন, তখন হযরত জুবাইর (রা.) বলেন যে, মনে হলো, যেন আমার অন্তর উড়ে যাচ্ছে। তাঁর কুরআন পাঠ শ্রবণের এটাই ছিলো প্রথম ঘটনা। তিনি বলেন, সেদিনই কুরআন আমার উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছিলো। আয়াতটি হচ্ছেÑ
অর্থাৎÑ তারা কি নিজেরাই সৃষ্ট হয়েছে, না তারাই আকাশ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? কোনো কিছুতেই ওরা ইয়াকীন করছে না। তাদের নিকট কি তোমার পালনকর্তার ভা-ারসমূহ গচ্ছিত রয়েছে, না তারাই রক্ষক?
অষ্টম কারণ : অষ্টম কারণ হচ্ছে, কুরআনকে বারংবার পাঠ করলেও মনে বিরক্তি আসে না। বরং যতোই বেশি পাঠ করা যায়, ততোই তাতে আগ্রহ বাড়তে থাকে। দুনিয়ার যতো ভালো ও আকর্ষণীয় পুস্তকই হোক না কেন, বড়জোড় দু’চারবার পাঠ করার পর তা আর পড়তে মন চায় না, অন্যে পাঠ করলেও তা শুনতে ইচ্ছে হয় না। কিন্তু কুরআনের এ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, যতো বেশি পাঠ করা হয়, ততোই মনের আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে। অন্যের পাঠ শুনতেও আগ্রহ জন্মে।
নবম কারণ : নবম কারণ হচ্ছে, কুরআন ঘোষণা করেছে যে, কুরআনের সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ গ্রহণ করেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত এর মধ্যে বিন্দুবিসর্গ পরিমাণ পরিবর্তন-পরিবর্ধন না হয়ে তা সংরক্ষিত থাকবে। আল্লাহ তা’আলা এ ওয়াদা এভাবে পূরণ করছেন যে, প্রত্যেক যুগে লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিলেন এবং রয়েছেন, যারা কুরআনকে এমনভাবে স্বীয় স্মৃতিপটে ধারণ করেছেন যে, এর প্রতিটি যের-যবর তথা স্বরচিহ্ন পর্যন্ত অবিকৃত রয়েছে। নাযিলের সময় থেকে চৌদ্ধ শতাধিক বছর অতিবাহিত হয়েছে। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও এ কিতাবে কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন পরিলক্ষিত হয়নি। প্রতি যুগেই স্ত্রী-পুুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে কুরআনের হাফেয ছিলেন ও রয়েছেন। বড় বড় আলেম যদি একটি যের-যরব-পেশ কম করেন, তবে ছোট বাচ্চারাও তাঁর ভুল ধরে ফেলে। পৃথিবীর কোনো ধর্মীয় কিতাবের এমন সংরক্ষণ ব্যবস্থা সে ধর্মের লোকেরা এক দশমাংশও পেশ করতে পারবে না। আর কুরআনের মতো নির্ভুল দৃষ্টান্ত বা নযীর স্থাপন করা তো অন্য কোনো গ্রন্থ সম্পর্কে কল্পনাও করা যায় না। অনেক ধর্মীয় গ্রন্থ সম্বন্ধে এটা স্থির করাও মুশকিল যে, এ কিতাব কোন ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিলো এবং তাতে কয়টি অধ্যায় ছিলো।
গ্রন্থাকারে প্রতি যুগে কুরআনের যতো প্রচার ও প্রকাশ হয়েছে, অন্য কোনো ধর্ম-গ্রন্থের ক্ষেত্রে তা হয়নি। অথচ ইতিহাস স্বাক্ষী যে, প্রতি যুগেই মুসলমানদের সংখ্যা কাফের-মুশরিকদের তুলনায় কম ছিলো এবং প্রচার মাধ্যমও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী লোকেদের তুলনায় কম ছিলো। এতদসত্ত্বেও কুরআনের প্রচার ও প্রকাশের তুলনায় অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থের প্রচার ও প্রকাশনা সম্ভব হয়নি। তারপরেও কুরআনের সংরক্ষণ আল্লাহ তা’আলা শুধু গ্রন্থ ও পুস্তকেই সীমাবদ্ধ রাখেন নি যা জ্বলে গেলে বা অন্য কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গেলে আর সংগ্রহ করার সম্ভাবনা থাকে না। তাই স্বীয় বান্দাগণের স্মৃতিপটেও সংরক্ষিত করে দিয়েছেন। খোদানাখাস্তা সমগ্র বিশ্বের কুরআনও যদি কোনো কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, তবু এ গ্রন্থ পূর্বের ন্যায়ই সংরক্ষিত থাকবে। কয়েকজন হাফেয একত্রে বসে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লিখে দিতে পারবেন। এ অদ্ভুত সংরক্ষণও আল কুরআনেরই বিশেষত্ব এবং এ যে আল্লাহরই কালাম তার অন্যতম উজ্জ্বল প্রমাণ। যেভাবে আল্লাহর সত্তা সর্বযুগে বিদ্যমান থাকবে, তাতে কোনো সৃষ্টির হস্তক্ষেপের কোনো ক্ষমতা নেই, অনুরূপভাবে তাঁর কালাম সকল সৃষ্টির রদ-বদলের উর্ধ্বে এবং সর্বযুগে বিদ্যমান থাকবে। কুরআনের এই ভবিষ্যদ্বানীর সত্যতা বিগত চৌদ্দশত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। এ প্রকাশ্য মু’জেযার পর কুরআন আল্লাহর কালাম হওয়াতে কোনো প্রকার সন্দেহ সংশয় থাকতে পারে না।
দশম কারণ : কুরআনে এলম ও জ্ঞানের যে সাগর পুঞ্জীভুত করা হয়েছে, অন্য কোনো কিতাবে আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। ভবিষ্যতেও তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই সংক্ষিপ্ত ও সীমিত শব্দসম্ভারের মধ্যে এতো জ্ঞান ও বিষয়বস্তুর সমাবেশ ঘটেছে যে, তাতে সমগ্র সৃষ্টির সর্বকালের প্রয়োজন এবং মানবজীবনের প্রত্যেক দিক পরিপূর্ণভাবে আলোচিত হয়েছে। আর বিশ্ব পরিচালনার সুন্দরতম নিয়ম এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবন থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নির্ভুল বিধান বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া মাথার উপরে ও নিচে যতো সম্পদ রয়েছে সে সবের প্রসঙ্গ ছাড়াও জীব-বিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান এমনকি রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতির সকল দিকের পথনির্দেশ সম্বলিত এমন সমাহার বিশ্বের অন্য কোনো আসমানী কিতাবে দেখা যায় না।
শুধু আপাতঃ দৃষ্টিতে পথনির্দেশই নয়, এর নমুনা পাওয়া এবং যে সব নির্দেশ একটা জাতির বাস্তব জীবনে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়ে তাদের জীবনধারা এমনকি ধ্যান-ধারণা, অভ্যাস এবং রুচিরও এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন দুনিয়ার অন্য কোনো গ্রন্থের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে এমন নজীর আর একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা নিরক্ষর উষ্মী জাতিকে জ্ঞান, রুচিতে, সভ্যতায় ও সংস্কৃতিতে এতো অল্পকালের মধ্যে এমন পরিবর্তিত করে দেয়ার নযীরও আর দ্বিতীয়টি নেই।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT