ধর্ম ও জীবন জুমার বয়ান

রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়

মাওলানা মোশতাক আহমদ খান প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১০-২০১৮ ইং ০০:১০:১৩ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত

খতিব, বন্দরবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট
বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, আমাদের প্রিয়নবী, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, আকায়ে নামদার, সারওয়ারে কায়েনাত, সারকারে দো আলম, তাজদারে মদিনা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।মানুষের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবনের চিন্তা ও মানসিকতা কেমন হওয়া উচিত, উপলব্ধি ও অনুভূতি প্রকাশ কেমন হওয়া উচিত, বাহ্যিক আচার ও তৎপরতা কেমন হওয়া উচিত, নিজের ও অন্যের ক্ষেত্রে পছন্দ ও সিদ্ধান্তগত সমন্বয় বিধানের দিকটি কেমন হওয়া উচিত, এ সবকিছুর সুবিন্যস্ত সুসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি ও বাস্তব উদাহরণ হিসেবে যাঁর জীবনের প্রতিটি উপদেশ, নির্দেশ, কর্ম ও কাহিনি আমাদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট অনুসরণীয় আদর্শ তিনিই। তিনিই আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
রসুল (সা.) এর চরম শত্রুরা ও রসুলকে আল-আমিন হিসাবে বিশ্বাস করতেন। তারা তার উপাধি দিয়েছিলো আল আমিন।মক্কার কাফিরগণ তার কাছে আমানত রাখতো।রাসূল (সা.) ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী। সকলের অনুকরণীয় স্বামী। রাতের বেলা আয়েশা (রা.) কে নিয়ে ঘুরতে বের হতেন।গল্প করতেন। দু’জন একসাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। হেরে গেলে পরেরবার আয়েশা (রা.) কে হারিয়ে তার প্রতিশোধ নিতেন।আয়েশা (রা.) পাত্রের যে দিক থেকে পান করতেন, উনিও সেখান থেকে পান করতেন। আয়েশা (রা.) হাড্ডির যে স্থানে থেকে কামড় দিয়ে খেতেন, উনি সেই স্থানেই কামড় দিয়ে খেতেন।
একবার হাবশিরা যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে খেলছিল। রাসূল (সা.) আয়েশা (রা.) কে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। তারপর আয়েশা (রা.) সে খেলা দেখতে থাকেন রাসূল (সা.) এর কাঁধ ও কানের মধ্যে দিয়ে। আয়েশা (রা.) যে খেলা দেখা খুব উপভোগ করছিলেন, তা কিন্তু না। তিনি দেখতে চাইলেন রাসূল (সা.) কতক্ষণ তার জন্য এভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। একসময় আয়েশাই ধৈর্য হারিয়ে চলে গেলেন।
স্ত্রীরা অসুস্থ হলে মহানবী নিজে তাঁদের কাজ করে দিতেন জীবনসঙ্গিনীদের কাজের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে কষ্ট দিতেন না। নিজের কাজ নিজেই করতেন। নিজের জুতো নিজ হাতেই ঠিক করতেন। নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, নিজেই নিজের কাপড় ধুতেন। ছাগলের দুধ দোয়াতেন। স্ত্রীদেরকে ঘরের কাজে সাহায্য করতেন। ঘন ঘন মিসওয়াক করতেন। সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। শরীরে যাতে কোন দুর্গন্ধ না থাকে সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। কখনোই কোন নারীকে তিনি প্রহার করেননি। মানুষদেরকে স্ত্রীদের প্রতি সদয় হবার নির্দেশ দিতেন। বলতেন, ‘নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে পাজরের বাঁকা হাড় থেকে। যদি একেবারে সোজা করতে চাও, তাহলে কিন্তু ভেঙ্গে ফেলবে।’
বিদায় হজ্জের ভাষণে তিনি পুরুষদেরকে নারীদের প্রতি সদাচারণের নির্দেশ দিয়ে গেছেন। মক্কার কুরাইশ নারীরা ছিল স্বামীর প্রতি অনুগত। অপরদিকে, মদিনার নারীরা ছিল কিছুটা বিপ্লবী মনোভাবের। হিজরতের পর কুরাইশ নারীরা আনসার নারীদের সাথে মেলামেশা করেন। ফলে তাঁদের মধ্যেও প্রবল আত্মসম্মানবোধের উদয় হয়। এ অবস্থা দেখে রাসূল (সা.) তাঁর স্ত্রীদের সাথে কুরাইশ পুরুষদের মতো আচরণ করেননি, বরং একজন আনসার যেভাবে তার স্ত্রীদের সাথে আচরণ করতেন, তিনিও সেরকম আচরণ করতেন।
মহানবী সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখিয়েছেন তিনি তার স্ত্রীদের সাথে।যয়নাব (রা.) একবার আয়েশা (রা.) কে কড়া কথা শোনালে আয়েশা তার যথাযথ জবাব দেন। রাসূল (সা.) তখন আয়েশা (রা.) এর পক্ষ নেন। আবার আয়েশা যখন সাফিয়া (রা.) এর খাটো অবয়ব নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করেছিলেন, তখন তিনি ঠিকই সাফিয়া (রা.) এর পক্ষ নিয়েছিলেন। আয়েশা (রা.) কে সাবধান করে বলেছিলেন, ‘তুমি এমন কথা বলেছো, যেটা সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে গোটা সমুদ্রের পানি দূষিত হয়ে যেতো।’
রাসুলুল্লাহ স্ত্রীদের হাতে কলমে ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। রমজানের শেষ দশকে রাতে সব স্ত্রীদের ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন। আল্লাহর ইবাদত করতে বলতেন। আয়েশা (রা.) কে বলতেন, ‘একটি খেজুর দিয়ে হলেও আগুন থেকে বাঁচো।’ আয়েশা (রা.) কে ছোট ছোট গুনাহের ব্যাপারে সাবধান করে দিতেন। আবার তাঁর স্ত্রীরা যাতে ইবাদতে উগ্রপন্থায় চলে না যান, সেদিকেও খেয়াল করতেন। সুযোগ পেলেই স্ত্রীদের সাথে হাসি-তামাশা করতেন।
ছোটবেলায় আয়েশা (রা.) পুতুল নিয়ে খেলতেন। রাসূল (সা.) তাঁর একটি পুতুল দেখিয়ে বললেন, ‘এটা কী?’ আয়েশা (রা.) জবাব দিলেন, ‘ঘোড়া।’ রাসূল সাঃ আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘোড়ার মধ্যে এ দুটি কী?’ আয়েশা রাঃ বললেন, ‘এটা হচ্ছে ঘোড়ার ডানা।’ রাসূল (সা.) কৌতুক করে বললেন, ‘ঘোড়ার আবার দুইটা ডানাও রয়েছে?’ আয়েশা (রা.) কম যান কীসে? সেই বয়সেই তিনি জবাব দিলেন, ‘বারে! আপনি কি জানেন না যে, সুলাইমান (আঃ) এর ঘোড়ার দুইটা পাখা ছিল।’ আয়েশা (রা.) এর জবাব শুনে রাসূল (সা.) এমনভাবে হাসলেন যে, তাঁর দাঁতের মাড়ি প্রকাশ পেয়ে গেলো।
আরেকদিন ঘরে এসে দেখলেন আয়েশা (রা.) মাথা ব্যাথায় অতিষ্ঠ হয়ে বলছেন, ‘হায়! মাথা ব্যাথা।’ রাসূল (সা.) মজা করে বললেন, ‘আয়েশা! বরং আমার মাথায় ব্যথা হয়েছে। তোমার কোন সমস্যা নেই। তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যাও তবে আমি তোমার পাশে থাকব, তোমাকে গোসল দিব, তোমাকে কাফন পরাব এবং তোমার জানাযার সলাত আদায় করব।’ আয়েশা (রা.) বললেন, ‘হু! আমি মারা যাই (আর সে রাতেই আপনি আমার ঘরে অন্য বিবিকে নিয়ে থাকেন।)’ জবাব শুনে রাসূল (সা.) হেসে ফেললেন।
রাসূল (সা.) এর জীবনাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই উমার (রা.) এর মতো কঠোর স্বভাবের মানুষ পর্যন্ত বলেছিলেন, ‘একজন মানুষের উচিত তার স্ত্রীর সাথে শিশুর মতো খেলা করা। আর যখন প্রয়োজন তখন বাইরে আসল পুরুষের মতো আচরণ করা।’
রাসূল (সা.) ছিলেন স্বামী হিসেবে পৃথিবীর সকল স্বামীর রোল-মডেল। তাঁর স্ত্রীরাই সে কথার সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। আয়েশা (রা.) তাই তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, ‘কেন আমার মতো একজন নারী আপনার মতো একজন পুরুষকে নিয়ে সম্মানবোধ করবে না?’ সাফিয়া (রা.) নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন,‘আমি আল্লাহর রাসূলের চেয়ে উত্তম আচরণের কোন ব্যক্তিকে দেখিনি।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসা ও করেছেন সমস্ত ব্যাবসায়ীদের জন্য রেখেগেছেন উত্তম ব্যাবসার বিধান। যুদ্ধের ময়দানে রাসুলুল্লাহ ছিলেন অনন্য। তিনি নিজে সশরিরে সতেরোটি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।খন্দকের যুদ্ধের সময় সব সাহাবিদের ১০জন করে দল ভাগ করে দিয়ে দিয়ে এক দলে একজন কম থাকায় নিজে যোগদান করেন সেইদলে। ক্ষুদার্থ এক সাহাবি পেটে পাথর বাধা অবস্থায় রাসুলকে দেখান। রাসুল নিজের পেঠ দেখান সেখানে ২টি পাথর বাধা ছিলো। রাষ্টপ্রধান হিসেবে রাসুলের জীবনব্যবস্থাও আমদের জন্য অনুকরণীয়। আল্লাহপাক যেন আমাদের তৌফিক দান করেন রসুলের আদর্শকে 'আদর্শ মডেল' হিসাবে গ্রহণ করার।
অনুলিখন : মাহমুদুর রহমান

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT