পাঁচ মিশালী

হাওরাঞ্চলে গতি প্রকৃতি ও চালচিত্রে করণীয়

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-১০-২০১৮ ইং ০১:১৩:৪৮ | সংবাদটি ৩৭১ বার পঠিত

সাগর আকৃতির পানির বিস্তৃত প্রান্তরকে প্রচলিত অর্থে হাওর বলা হয়। সাগরের প্রতিরূপ হাওর। সাগরের সব রূপ বৈশিষ্ট্য হাওরের মধ্যে পাওয়া যায় বলে সাগর থেকে সায়র আবার সায়র থেকে হাওর হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত থাকলেও এর অন্যতম কারণ হলো পৃথিবীর মধ্যে বিরলতম বৃষ্টির পানির বিপুল ভান্ডার এই হাওর সাগরের রূপ ধারণ করে বলে স্থানীয় মানুষের মুখ থেকে এর নাম হাওর হয়েছে এটি অন্তত: নিশ্চিত করে বলা যায়।
বঙ্গোপসাগরের থেকে প্রবাহিত বিশেষ জাতের মৌসুমি জলবায়ু এবং উজানে হিমালয় পর্বতমালার উপস্থিতির কারণে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে। আর হাওরাঞ্চল হলো চেরাপুঞ্জি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ভাটি অঞ্চলে। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ১৮টি আন্ত সীমান্ত নদী দিয়ে ভারতের মেঘালয়, আসাম, মণিপুর, ত্রিপুরা ও মিজোরাম অঞ্চলের বৃষ্টির পানির একটি বড়ো অংশ এবং সিলেট সুনামগঞ্জ সহ হাওরাঞ্চলের মধ্যে সংগ্রহ করা বৃষ্টির পানির সবগুলো ভৈরবের ব্রীজের ঠিক নিচ দিয়ে প্রবাহিত মেঘনা নদী হয়ে সমুদ্রতে যায়। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে হাওরাঞ্চল অত্যন্ত দুর্বল এবং গ্রামগুলোও জনবিচ্ছিন্ন থাকে। পুরো সুনামগঞ্জ জেলা, হবিগঞ্জ জেলার বড়ো অংশ, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মৌলভীবাজার জেলার অংশ বিশেষসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল এবং কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার একটি বিরাট অংশ হাওর দিয়ে পরিবেষ্টিত। এসব এলাকার বক্ষ বিদীর্ণ করে শিরা উপশিরার মতো প্যাঁচিয়ে আছে অগুন্তি খাল-বিল, নদ কিংবা নদী ও হাওর বওর। এ জন্যই বর্ষাকালে সাগরের মতো দেখতে বিশাল বিশাল জলরাশি, বিস্তৃত গ্রামগুলোকে অনেকটা দ্বীপের মতো করে তোলে। শুধু তাই নয়, টলমল করতে থাকে এর ঝলমল পানি। ‘পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র থেকে জানা যায়- দেশে ছোট বড়ো ৪১৪টি হাওর, জলাশয় ও জলাভূমি রয়েছে। জলমহাল রয়েছে ২৮ হাজার। বিল রয়েছে ৬৩০০। তার মধ্যে হাওরের আয়তন ৮ লক্ষ ৫৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর। ভাটির দেশ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জে রয়েছে ১৩৩টি, সিলেটে ৪৩টি, হবিগঞ্জে ৩৮টি, মৌলভীবাজারে ৪টি, কিশোরগঞ্জে ১২২টি, নেত্রকোণায় ৮০টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার এসব হাওর, জলাভূমি ও জলাশয়ের অধিকাংশের অবস্থান। এর বাইরে সব জেলায়ই ছোট বড়ো জলাশয়, জলাভূমি ও বিল রয়েছে। আয়তনের দিক থেকে যা দেশের এক পঞ্চমাংশ।
ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় হাওরকে আবার ৩টি ভাগে ভাগ করা যায়-যেমন পাহাড় নিকটবর্তী হাওর, প্লাবন ভূমির হাওর ও গভীর পানিতে নিমজ্জিত হাওর।
পাহাড় নিকটবর্তী হাওর হলো-সিলেট, মৌলভীবাজার জেলার হাওর। প্লাবন ভূমির হাওর হলো নেত্রকোণা; কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওর এবং
গভীর পানিতে নিমজ্জিত হাওর হলো-সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা জেলার কয়েকটি হাওর। তার পরে রয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, মিটামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার সব হাওর, তাইতো হাওরাঞ্চলের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলাকে হাওরের মা বলা হয়।
উপজেলা ভিত্তিক হাওরগুলোর মধ্যে রয়েছে, সুনামগঞ্জ জেলার সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, ছাতক, দিরাই, ধর্মপাশা, দোয়ারা বাজার, জগন্নাথপুর, টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, শাল্লা এলাকার হাওরগুলো। এ জেলায় আবার হাওরের সংখ্যা ৯৫টি।
সিলেট জেলার সদর সিলেট, বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথ, কোম্পানীগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, কোতোয়ালি, জকিগঞ্জ, বালাগঞ্জ মিলিয়ে ১২টি উপজেলায় হাওর দাঁড়ায়- ১০৫টি।
হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জ, বাহুবল, বানিয়াচং, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ সদর, লাখাই, মাধবপুরের নবীগঞ্জ সহ ৮টি উপজেলায় ১৪টি।
মৌলভীবাজার জেলার ৭টি উপজেলায় ৩টি উল্লেখযোগ্য হাওরের মধ্যে রয়েছে বড়লেখা, জুড়ী, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল।
নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া, বারহাট্টা, দুর্গাপুর, খালিয়াজুরি, কমলাকান্দা, কেন্দুয়া, মদন, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোণা সদর, পূর্ব ধলায় মোট ১০টি উপজেলায় ৫২টি হাওরসহ কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় ৯৭টি হাওরের মধ্যে ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ভৈরব, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, কটিয়াদি, নিকলী, কিশোরগঞ্জ সদর, পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর, করিমগঞ্জ, তাড়াইলের হাওরগুলো উল্লেখযোগ্য। এরপর অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত হাওরগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া, আশুগঞ্জ, বাঞ্চারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, কসবা, নবীনগর, নাসিরনগর, সরাইল সহ মোট ৮টি উপজেলার ৭টি হাওর। এছাড়াও উপরে উল্লেখিত ৭০টি উপজেলার ৩৭০টি হাওর ব্যতিরেকে এশিয়ার বৃহত্তম কয়েকটি হাওরের কথা শুনাতেই হয়। যেমন: মৌলভীবাজার জেলার হাকালুকি হাওর, ধর্মশালা, রুইবিল, হাকালুকি, শনির হাওর, সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত এটি দ্বিতীয় বৃহত্তর হাওর। কিশোরগঞ্জ জেলায় বড়ো হাওর তৃতীয় বৃহত্তম হাওর। চলতি হাওর সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। তাছাড়া কিশোরগঞ্জে ধুপিবিল হাওর, নেত্রকোণার পুটিয়া হাওর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ও খোলা আকাশি বিল। ছাড়াও ছোট বড় আরও অসংখ্য হাওর রয়েছে। হাতিমারা হাওর, এলং জুরি, ছিলানী, শাপলা, নূরপুর, কাতিয়ার কোন, বাঘমারা, বনপুর, চিমনি, জয়সিন্ধি হাওর ইত্যাদি।
বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রায় ২৫% এলাকা জুড়ে রয়েছে হাওরের অবস্থান। উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি জেলা যেমন- অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ইটনা, খুলিয়াজুরির বড়ো হাওর। অষ্টগ্রামের সুমাই হাওর, বাজিতপুরের হুমাই, মিঠামইনের বাড়ির হাওর। বাজিতপুরের নিকলী, সুরমা হাওর, সুনামগঞ্জের শনির হাওর, সিলেট ও মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর, নেত্রকোণার জারিয়া হাওর, ছিলানীর শাপলা ও পাতলা বোড়া হাওর, নুরপুর ও কাতিয়ার কোনা হাওর, এলং জুরির চিমনীর হাওর, ইটনার বনপুর হাওরসহ এদেশে যে সকল ছোট বড়ো হাওর রয়েছে তা প্রায় ৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এক হাকালুকি হাওরের কথাই ধরা যাক- এই হাওরেই রয়েছে ছোট বড়ো মিলে ২৪০টির মতো বিল। আর নদীর অবস্থান ছোট বড়ো মিলে ১০টি। এই হাওরেই বর্ষাকালে ১৮ হাজার হেক্ট এলাকায় পরিণত হয়। হাওরের প্রশস্থতা এতো বেশি যে, মৌলভীবাজার জেলায় ৪০%, কুলাউড়া ৩০%, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ১৫%, গোলাপগঞ্জ ১০%, বিয়ানীবাজার ৫%, এলাকা জুড়ে এর গঠন। হাওরের উত্তরে ভারতের মেঘালয় পাহাড় এবং পূর্বে ত্রিপুরা পাহাড়ের পাদদেশে। হাওরটি ৫টি উপজেলা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে অবস্থিত। এ হাওরের মধ্যে উল্লেখ করার মতো প্রচুর বিলেরও অস্থিত্ব বিদ্যমান। যেমন চাতলা বিল, চৌকিয়া বিল, ডুলা বিল, পিংলার কোনা বিল, ফুটি বিল, তুরাল বিল, তেকুনি বিল, পাওল বিল, জুয়ালা বিল, কাইয়ার কোনা বিল, বালিজুরি বিল, কুকুর ডুবি বিল, কাটুয়া বিল, বিরাইবিল, রাহিয়া বিল, চিনাউরা বিল, দুধাল বিল, মায়া জুরি বিল, বারজ্বালা বিল, পারজালা বিল, মুছনা বিল, লাম্বা বিল ও দিয়াবিল উল্লেখযোগ্য। হাকালুকি শুধু দেশের নয় এশিয়ার বৃহত্তম হাওর এটি। হাকালুকি হাওরের আয়তন প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর। এটি আবার বর্ষা মৌসুমে ২৪ হাজার ৭০০ হেক্টরে উপনীত হয়। বর্ষাকালে এই হাওর এলাকা ৮ থেকে ১০ ফুট পানিতে ভরপুর থাকে। হাকালুকি হাওরকে মিঠাপানির অন্যতম প্রজনন কেন্দ্রও বলা হয়ে থাকে। হাওর তীরের ২ লক্ষেরও বেশি মানুষ জীবন জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ হাওরের উপর নির্ভর করে থাকে। মৌলভীবাজারের শুধু হাকালুকি হাওরই নয় জেলার আরেকটি হাওর বর্ষায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় তার নাম হাইল হাওর। হাইল হাওর মৌলভীবাজার জেলার সদর ও শ্রীমঙ্গল এবং হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত। এতে রয়েছে ১৪টি বিল এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য ১৩টি নালা। আয়তনের দিকেও ১০ হাজার হেক্টর যার ৪ হাজার হেক্টর প্লাবন ভূমি। ৪ হাজার ৫১৭ হেক্টর হাওর, ১ হাজার ৪০০ হেক্টর খাল এবং ৫০ হেক্টর নদী। এরপর বৃহত্তর হাওরের মধ্যে আরেকটি হাওরের কথা না বললেই নয় সেটি হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওর। এর আয়তন ৯ হাজার ৭ শত ২৭ হেক্টর। সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা উপজেলা ও তাহিরপুরের ১০টি মৌজা নিয়ে এই হাওরের অবস্থান। মৌজাগুলো হলো- জগদীশপুর, ভবানীপুর লামাগাঁও, রামসিংহপুর, মহজমপুর, মেইনদাগ, মায়াজুরি, ভাঙ্গাচর পূর্ব, নোয়াগাঁও, টাঙ্গুয়ার হাওর। এ হাওরে রয়েছে- ১২০টি বিল, ৩০টি ঝরনা ও নদী সুরমা সহ ৪৬টি গ্রাম, যার আয়তন ১০০ বর্গকিলোমিটার। স্থানীয় লোকজনের কাছে টাঙ্গুয়ার হাওরটি নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। বৃহত্তর সিলেটের বাইরে গেলে আরো উল্লেখযোগ্য হাওর পাওয়া যায় তার মধ্যে ময়মনসিংহের ডিঙ্গাপোতা, নাওটানা, চর হাইজদিয়া, লক্ষ্মীপাশা, কীর্তনখোলা, লক্ষ্মীপুর, গোবিন্দ ডোবা, চাকুয়ার হাওর, জোয়ান শাহী হাওরগুলো মিলিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল জলাভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়।
‘ভূগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাওরের উৎপত্তি এবং মধুপুর সোপান গঠনের সঙ্গে হাওরের যোগ রয়েছে বলেও মনে করা হয়। বিল অবনমিত হয় না। কিন্তু হাওর অববাহিকা অবনমিত হয়। একসময় মেঘনা ও এর শাখা নদীসমূহ দ্বারা গঠিত প্লাবন ভূমির স্থায়ী ও মৌসুমি হৃদ নিয়েই গঠিত হয়েছিল হাওর অববাহিকা। যেখানে প্রচুর বৈচিত্র্যপূর্ণ জলজ উদ্ভিদ থাকতো। কিন্তু ক্রমাহারে অবক্ষেপনের কারণে অববাহিকাগুলোর গভীরতা কমে গিয়ে চর জেগে সেখানে গোগলা, নলখাগড়ার ঝোঁপ গজিয়ে ওঠে। এর ফলে একদিকে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়ের আদর্শ স্থান হয়ে ওঠে হাওর অঞ্চলগুলি। বাংলাদেশের ভূখন্ডে বসবাসকারী মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে হাওর সমৃদ্ধ ভাটি অঞ্চলের ভূমিকা অপরিসীম। এ অঞ্চলেই ১৫৮০ সালে কোচ রাজাকে পরাজিত করে জঙ্গলবাড়ি দুর্গ দখলের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে চমক দিয়েছিলেন ঈশা খাঁ। তাঁর উত্থান হয়েছিলো মোগলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সিংহাসনে আসীন হয়ে। যার সূত্র ধরেই তৎপরবর্তী আরো ৪০০ বছর বাংলার মানুষ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য নিরন্তর প্রয়াস চালিয়েছে।
জীববিজ্ঞানীদের মতে হাওর হলো ফিশারিজের মা। হাওরে মিঠা পানির মাছ আছে প্রায় ১৫০ প্রজাতির। আছে ১২০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ। হাওর টেকসই উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ইকোটেরিজম শিল্প বিকাশের অসাধারণ স্থান। জীববৈচিত্র্যের এ যুগে হাওর হলো সবচেয়ে উর্বর। একটি গম ক্ষেতের চেয়ে প্রায় ৮ গুণ বেশি সবুজ উদ্ভিদ জন্মগ্রহণ করে এই হাওরে। বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ মাছের যোগানও আসে হাওর অঞ্চল থেকে। পানির দূষণ এবং দ্রবীভূত পানিকে মুক্ত করতে এর জুড়ি মেলা ভার। তাছাড়া উদ্ভিদ জন্মাতে মিঠাপানির জলাভূমির ভূমিকায় হাওর অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। হাওরের জলাভূমি আমাদের পানি পরিশোধন ও চাহিদা পূরণ, খাদ্য উৎপাদন, মৎস্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ ও ভূ-পৃষ্ঠের পানিকে সংরক্ষণ, নদী ভাঙ্গন রোধ, ভূমিক্ষয় রোধ, যে কোন দূষণ রোধ, জলবায়ু পরিবর্তন রোধসহ বহুমাত্রিক সুবিধা দিয়ে থাকে। হাওর অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৬০ প্রজাতির মাছ ও ২৪ প্রজাতির চিংড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। দেশের সংগৃহিত মাছের শতকরা ২৫ ভাগ মাছ হাওরাঞ্চল থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে। হাওর এলাকায় দেশের শতকরা ২২ ভাগ গবাদি পশু লালিত পালিত হয়। চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও হাওরের জুড়ি মেলা ভার। দেশের প্রায় ১৮ ভাগ চাল হাওর থেকে ওঠে আসে। আমাদের দেশ আমিষ পিপাসু জন্মগতভাবেই। তাইতো আমিষের ঘাটতিও হাওরই দেখ ভাল করে। প্রায় দেড় কোটি মানুষের জীবন মাছের ওপর নির্ভরশীল হওয়াতে এ হাওরাঞ্চলে প্রায় ১৩ লক্ষ মৎস্যজীবির সার্বক্ষণিক পেশা মাছ ধরা। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্য খাতের অবদান দ্বিতীয় এবং সর্বোচ্চ। কৃষিজ আয়ের শতকরা ২২ দশমিক ২৩ ভাগ আসে এই মৎস্যখাত থেকেই। আর আমিষের চাহিদা মেটায় ৬০ ভাগ। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশের জলজ উদ্ভিদ প্রজাতির অর্ধেকেরও বেশি হাকালুকি হাওরে জন্মে। এছাড়া হাওর এলাকার বিভিন্ন বিলে ১১২ প্রজাতির পারিয়ারী এবং ৩০৫ প্রজাতির স্থানীয় পাখি বিচরণ করে। হাওরে রয়েছে ১২ প্রজাতির উভচর। ৭০ প্রজাতির সরিসৃপ। ৫৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। ১২ প্রজাতির কচ্ছপ ও ১০৭ প্রজাতির মাছ। শুধু তাই নয় সৌন্দর্য বর্ধনেও হাওরের জুড়ি মেলা ভার। কার্তিক মাসের শেষের দিকে যখন হাওরাঞ্চল থেকে পানি নামতে শুরু করে তখন অত্র অঞ্চলে ভেসে ওঠে উঁচু ভূমি। বীজতলা আর পারিয়ারী পাখিদের একটি বড়ো অংশের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় হাওর। সারা দিগন্ত জুড়ে মাঠের পর মাঠ যেনো সবুজ আর সবুজের কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে কেউ। এখানে আবার ধানের ক্ষেত হাওয়ায় হাওয়ায় মাথা দোলায়। এ যেনো এক অপরূপ রূপের সাজন সাজে বাংলার প্রকৃতি। নববধূ হয়ে ওঠে হাওরের উপকূল। শীতের হাওরের দিগন্ত জুড়ে প্রাকৃতিক দৃশ্যও বিলের কান্দিগুলো দৃষ্টি জুরিয়ে দেয় ভ্রমণ পিপাসু মানুষের। চারিদিকে গজিয়ে ওঠা সবুজ ঘাস সৃষ্টি করে এক অপরূপ দৃশ্যাবলির। এছাড়াও সাইবেরিয়া থেকে শুরু করে পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে পাখি এসে পাখপাখালির মেলা জুড়ে দেয়। যেনো কতো মায়াবি পাখিগুলো। বড়ো আত্মীয়। বড়ো বন্ধু বৎসল। সেই প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে আনাগুনা তাদের। গবেষকরা বলেন, প্রায় ২ হাজার বছর থেকে চলে আসছে পাখিদের এই সাময়িক আসা যাওয়া। পাখিদের মধ্যে পৃথিবীর চৌম্বক শক্তিকে সূক্ষ্মভাবে উপলব্ধি করার বিস্ময়কর এক ক্ষমতা আছে। পথের নিশানা এদের কখনও ভুল হয় না। কোথায় কতো উচ্চতায় বাতাস মিলবে তাও অনুভব করার অসম্ভব এক শক্তি আছে পাখিদের মধে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাসও এরা আগে ভাগেই পেয়ে যায়। সে জন্য যখন শীতের তীব্রতা বাড়তে থাকে তখনই দেশ ত্যাগ করে এরা এসব হাওরে আবাসন গড়ে। অক্টোবর মাস থেকে আসতে শুরু করা পাখিরা শীতটা কাটিয়েই আবার পাড়ি জমায় নিজ নিজ দেশের আকাশে। পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বলেই আদর করে এখনও হাওরাঞ্চলকে পাখির দেশ বা ওড়া পক্কির দেশ বলে ডাকেন। ধরা যাক সিলেটের হাকালুকি হাওরের কথাই-সুদূর সাইবেরিয়া থেকেই প্রায় ২৫ প্রজাতির প্রায় লক্ষাধিক পাখি আসে আমাদের দেশে। সাথে আছে আরো ১০০ প্রজাতির পাখি। আবার সারা বছরের জন্য বাড়ি তৈরি করে থাকে চকাচকি, বক, শামুক খোল, রাজ সরালি, গবাদ মাথা, রাজ হাঁস, ধলা বেলে হাঁস, গাড়ওয়াল, ইউরেসীয়, সিঁথী হাঁস, টিকি হাঁস, পাতি হাঁস, ম্যাগেঞ্জার ছাড়াও দেশি প্রজাতির বেগুনি কালেম, পান মূরসী, পাতি কুট, ডাহুক, মুরগী চ্যাগা, ল্যাঞ্জা চ্যাগা, ভুবন চিল, শঙ্খ ছিল, কুড়াল ঈগল, রাঙা চ্যাগা, ধলা পিপি, ময়ূর লেজা পিপি, পাতি জিরিয়া, হাট্টিটি, বড়ো খোপা, ডুবুরী, পানকৌড়ি, শ্রাইক, লাল বুবা, কাইমা, গাঙ্গ কবুতর, বন হুর, হরিয়াল, নারুন্দিসহ নানান প্রজাতির পাখি। তাই হাওরে এলে কান পেতে দিতে হয়। প্রকৃতির কাছে পুঁতে দিতে হয় মন। এখানে এলে শোনা যায় রোজ সন্ধ্যাবেলা পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার কলকাকলি। এখানে এলে দেখা যায়- শীত সকাল আর শীতের বিকেলে আকাশের উদর ঢেকে দেওয়া পাখিদের নানা বর্ণা শরীর। হাওরের পানিহীন শরীরে, চোখ মেলে আরো দেখা যায়-পুঁটি মাছ ঠোঁকর দেবার আশায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অপেক্ষমান বকের সারি। প্রতি বছর মাঘ ফাল্গুন থেকেই ইরি ধান বপন শুরু হলে দেখা মেলে এই বকের সারির। যাদের প্রধান কাজ হলো ইরি মৌসুমে ফসলের জমিতে পানি দেওয়ার পর থেকে যে পোকামাকড় ভাসতে থাকে সকাল বিকেল এই বকগুলোর খুঁটে খুঁটে এসব খাওয়া। আরো দলছুট মাছ, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, মাজরা পোকা, ফড়িং, পামরি ও জলজ পোকামাকড় খেয়ে ফসলকে বাঁচিয়ে তোলা। এদের সকলের আবাসস্থল আবার হাওর-বিল। চোখ মেলে তাকালে দেখা মেলে মাছ নিয়ে কাড়াকাড়ি গাঙ্গ চিলের। পানকৌড়ির ডুব, জংলি পাখি

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT