সাহিত্য

ভুল যখন ভাঙলো

ডা. এম এ সালাম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-১০-২০১৮ ইং ০০:১২:৩২ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

আজ টিএসসি অডিটোরিয়ামে ছিল উদীয়মান কন্ঠ শিল্পী এনামুল হাবিব সাগর এর একক সঙ্গীতানুষ্ঠান। জমজমাট আয়োজন। দর্শক গ্যালারী ছিল কানায় কানায় ভর্তি। সাগর ইতিমধ্যে সেলিব্রেটি হয়ে উঠেছে। তার কয়েকটি এ্যলবাম বাজারে সাড়া জাগিয়েছে। শীতের পড়ন্ত বিকেল। অনুষ্ঠান শেষে টিএসসির বাইরে দক্ষিণ আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাগর তার বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। তার প্রতিবেশী ঘনিষ্ঠ বান্ধবী অসাধারণ সুন্দরী তানিয়া মুগ্ধ হয়ে সাগরের প্রশংসা করছিল এবং হেসে হেসে তার গুণগান করেই যাচ্ছিল।
তানিয়ার হাসি যেন চাঁদের হাসি। পরিপাটি মুক্তাদানার মতো চমৎকার দাঁতগুলোর ফাঁক দিয়ে মোহনীয় হাসি দেখে মনে হয় যেন শুভ্র তুষার কণা ঝরে ঝরে পড়ছে। এক স্বপ্নীল আবহ তৈরি হয়। তারা যখন সবাই আড্ডায় মগ্ন ঠিক সেই মুহূর্তে দারুণ হ্যান্ডসাম এক যুবক এসে সাগর এর দিকে হ্যান্ডশেক করার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াল। সাগর তড়িৎ হ্যান্ডশেক করল। যুবক বলল: সাগর, তোমার অসাধারণ পারফরম্যান্স-এর জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি মাহফুজ আনাম আকাশ। আমি একজন ব্যাংকার। এক্সটারন্যাল স্টুডেন্ট হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছি। তানিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল: হাই, আমি আকাশ। তানিয়া হেসে তাড়াতাড়ি হ্যান্ডশেক্ করে বলল: আমি মেহেরুন্নেসা তানিয়া। মাস্টার্স ফাইন্যাল।’ আকাশ বলল: ভেরী গুড। আজ থেকে আমিও তোমাদের বন্ধু হয়ে গেলাম। তা তানিয়া তোমার বাসা কোথায়? আমি ভার্সিটি ডরমেটরীতে থাকি। আমার ও সাগরের বাড়ি মধুপুর গ্রামে। আমরা পরস্পর বন্ধু এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী।’ আকাশ বলল: জেনে খুশী হলাম। আজ সবাই মিলে চ্যাংমাই এ চায়নীজ খাব। এসো আমার সাথে। সাগর বলল: আকাশ, ইনভাইটেশনের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমাকে এখনই মধুপুর গ্রামে ফিরতে হবে। জরুরী কাজ আছে। তুমি বরং এদেরকে নিয়ে যাও।
আকাশ বলল: জরুরী কাজ আছে, তো আর কি করা। আমি আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংকের এসিসটেন্ট ম্যানেজার। আমার কার্ড রাখো। ঢাকায় আসলে অবশ্যই দেখা করবে। কথা দাও।’ সাগর বলল: হ্যাঁ, কথা দিলাম। তোমরা যাও, আমি আসি। সাগর বেরিয়ে গেল। এবার তানিয়ার অন্যান্য বান্ধবীরাও ভিন্ন ভিন্ন অজুহাতে একে একে কেটে পড়ল। বাকী রইল আকাশ এবং তানিয়া। আকাশ বলল: তানিয়া, আমার মনে হচ্ছে তোমার আমার বন্ধুত্বকে দৃঢ় করার একটি চমৎকার সুযোগ করে দিয়ে এরা সবাই কেটে পড়েছে।
তানিয়া মুক্তাঝরা একটি হাসি দিয়ে বলল: অবস্থাদৃষ্টে তো তাই মনে হচ্ছে। তা আকাশ অনুমতি দিলে আমিও বিদেয় হই। আকাশ একটি উচ্ছল হাসি দিয়ে খপ করে তানিয়ার হাত ধরে বলল: মাই সুইট তানিয়া, বহু দিবস-রজনী পার করেছি তোমার অন্বেষণে। আজ বিধাতা সদয় হয়ে তোমাকে পাইয়ে দিলেন তখন তোমাকে ছেড়ে দেয়ার মতো বোকা আমি নই। তানিয়া, তুমি আমার, চিরকাল আমার। তুমি আমার স্বপ্নে দেখা সেই রাজকন্যা। সম্ভবত: তোমাকে খুঁজতেই সাগরের এই গানের অনুষ্ঠানে এসেছিলাম। তোমার ছবি আমার হৃদয়ে আঁকা। আর এই ছবি নিয়েই হন্যে হয়ে তোমাকে খুঁজছিলাম। সময়-কাল দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল, আমি পিছনে পড়েছিলাম তোমার খুঁজে। আমি হাল ছাড়িনি। আমার বিশ্বাস ছিল অসংখ্য মেয়েদের ভীড়ে একদিন না একদিন, কোথাও না কোথাও তোমাকে আবিষ্কার করব। মানুষের পবিত্র ইচ্ছা কল্পনা অপূরণ থাকে না। বলে তানিয়ার হাতখানি মুখের কাছে এনে সজুরে একটি চুমু খেল। তানিয়া মুগ্ধ নয়নে দৃশ্যটি দেখল এবং নিঃশব্দ একটি মায়াবী হাসি দিয়ে বলল: আকাশ, তুমি সত্যিই আকাশের মতো নির্মল, বিশাল এবং আকর্ষণীয়। তুমি যখন আমার হাত ধরেছ, তড়িৎ গতিতে আমার শরীরের প্রতিটি লুমে শিহরণ জেগেছে। মন বলল, তানিয়া তুমি তো ওকেই খুঁজছিলে। বাঁধা কিসের, যাও না ওর সাথে। একবার যখন পেয়ে গেছ, শক্ত করে ধর, স্বপ্ন পূরণ কর। আকাশ একটি ¯িœগ্ধ হাসি দিয়ে বলল: বাহ্, তানিয়া তোমার আমার চাহিদা এক এবং অভিন্ন। আমরা যখন একে অন্যকে পেয়ে গেছি তখন সত্বর-সম্ভব ঘরবাঁধা উচিত। তুমি কি বলো?
তানিয়া বলল: আকাশ আমিও তাই ভাবছি। শুভ কাজ শিঘ্রই সেরে নেয়া উচিত। সময় ও সুযোগ কারো জন্যে অপেক্ষা করে বসে থাকে না।’ আকাশ বলল: তানিয়া তুমি আমার মনের কথাটি বলে দিয়েছ। তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। চল, এবার যাই। তা, তানিয়া চ্যাংমাই-এ চায়নীজ খাবে, না কি বাসায় গিয়ে বাঙালি খাবার খাবে? তানিয়া বলল: দেশী খাবারই আমার প্রিয়। ঐ চায়নীজ টাইনিজ খাবার আমি খুব একটা পছন্দ করি না। তা, হঠাৎ তোমার বাসায় যাব, বাসার লোকজন কি ভাববে? বাসা কোথায়? আকাশ বলল: ঐ তো পাশেই, কলাবাগান। বাসায় কিছু ভাবার কেউ নেই। আমি একাই থাকি। ঝি রান্নাবান্না করে ইতিমধ্যে হয়ত চলেই গেছে। আমি নিজেও রাঁধতে জানি। দরকার মতো আরো দু’একটি আইটেম আমরা এড করে নেব। ফ্রিজে সবকিছু মওজুদ আছে। তানিয়া বাঁধা দিয়ে বলল: আকাশ তুমি কোন চিন্তা করো না। আমিও রাঁধতে জানি। তোমার পছন্দের আইটেমটি বলে দাও, আমি রেঁধে দেব।
আকাশ প্রফুল্লচিত্তে বলল: মাই সুইট তানিয়া, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। সবে সন্ধ্যা নেমেছে। চল যাই। দু’জন গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। বাসায় পৌঁছে আকাশ ও তানিয়া সামনা-সামনি সোফায় বসে কফি খেতে খেতে গল্প শুরু করল। এক সময় তানিয়া বলল: আকাশ, বিশ্বাস কর আমার মনে হচ্ছে যুগ যুগ ধরে তোমাকে চিনি-জানি, ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া জীবন চিন্তা করতে পারছি না। এক মুহূর্ত চোখের আঁড়াল হও, আমি মানতে রাজী নই। আকাশ ইতিমধ্যে তুমি আমার অস্থিত্বে মিশে গেছে। আমার চিন্তা-চেতনায়, নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে তোমার খুশবু? বলে উঠে এসে হাঁটু গেড়ে বসে আকাশের উরুর উপর মুখ রেখে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল: আকাশ তুমি আছ, আমি আছি, তুমি নেই আমি নেই। তুমি আমার জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। আমার প্রত্যাশা ষোলকলায় পূর্ণ। আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। তুমি আমার অহংকার, তুমি আমার স্বপ্নের সেই কাক্সিক্ষত পুরুষ। তানিয়ার ঘন কালো চুলগুলো শ্রাবণ মেঘের ধারার মতো সমস্ত পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। আকাশের মনে হল আবেগে তানিয়া কাঁদছে। আকাশ তানিয়ার দু’গালে হাত দিয়ে তার মুখখানি তুলে ধরল। ওহ্ মাই গড। তানিয়ার দু’চোখে জল গড়াচ্ছে। আকাশ উঠে দাঁড়িয়ে তানিয়াকে টেনে তুলে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে কপালে একের পর এক চুমু খেতে লাগল। তানিয়াও আকাশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল: আকাশ এই আলিঙ্গন যেন আমৃত্যু অটুট থাকে, আমাকে কথা দাও।’
আকাশ আবেগাপ্লুক কন্ঠে বলল: আমার লক্ষ্মী তানিয়া, এই বন্ধন কখনো ছিন্ন হবে না। আসলে আমি যে কথাগুলো তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম তা তুমি আগাম বলে দিয়েছ। তোমাকে পেয়েছি, আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। সারা জীবন তোমাকে নিয়ে বাঁচতে চাই। তুমি আমার অনেক সাধনার রতœ, বেঁচে থাকার অবলন্বন। বিধাতাকে অফুরন্ত কৃতজ্ঞতার ঢালি, আমার মনের মানুষটিকে পাইয়ে দিয়েছেন। এটা দুর্লব ঐশ্বর্য, বহু প্রতিক্ষিত আকাক্সক্ষার প্রাপ্তি। আমার পরম সৌভাগ্য, তোমাকে পেয়ে গেছি। তানিয়া বলল: আকাশ, তোমার হৃদয়ে লালিত কামনা-বাসনার কথাগুলো আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, আমি মুগ্ধ, বিমোহিত। যতটুকু প্রত্যাশা করেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়ে গেছি। পরিপূর্ণ তৃপ্তিতে আমার মন ভরে উঠেছে। এবার আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে তানিয়া বলল: আকাশ রাত গড়িয়ে চলেছে। চল কিচেনে যাই। রান্না করতে হবে না।’ ‘আকাশ বলল: তাই চল, পেটে ক্ষিধা সুড়সুড়ি দিচ্ছে। খাওয়া-দাওয়া শেষে ড্রইং রুমে এসে বসতে না বসতে শুরু হল তুফানীহাওয়া এবং সাথে সাথে প্রচন্ড ঝড়।
আকাশ বলল: ওমা এই আকাশে ঝড়-তুফান। ইতিমধ্যে রাতও হয়েছে অনেক। আমার মন বলছে, তানিয়া রাতটা এখানেই কাটিয়ে যাও। সকালে অফিসে যাওয়ার পথে তোমাকে ডরমেটরিতে পৌঁছে দিয়ে যাব। তানিয়া বলল: প্রস্তাবটি মন্দ নয়। সারারাত দু’জনে প্রাণ খুলে গল্প করব। বাধা দিয়ে আকাশ বলল: তানিয়া, রাত জাগলে আমাকে বারবার কফি খেতে হয়। বানিয়ে দিতে পারবে তো?
তানিয়া মুক্তাছড়ানো হাসি দিয়ে বলল: ওমা, এটা একটা আবদার হল। তুমি যতবার চাইবে ততবার বানিয়ে দেব। তোমার একটু সেবা করাই তো আমার আনন্দ, পরিপূর্ণ তৃপ্তি। আকাশ উঠে এসে আবারও তানিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল: তানিয়া, আমার জীবনসাথী, তোমাকে কি দিয়ে বুঝাবো, তুমি আমার কত প্রিয়, কত আপন।’ তানিয়া বাধা দিয়ে বলল আকাশ তুমি আর বুঝাতে চেষ্টা করো না, আমি ইতিমধ্যে বুঝে গেছি তুমি আমার কতটুকু, কত আপন। বলে, আকাশের বুকে তার সুন্দর মুখখানি ঘষতে লাগল। এমন সময় পাশে কোথাও রাতজাগা পাখির ডাক শোনা গেল। আকাশ বলল: তানিয়া ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। চল, এবার একটু ঘুমিয়ে নেই। তুমি আমার বিছানায় ঘুমাবে আর আমি ঐ আরামদায়ক সোফায়। তানিয়া বলল: নো প্রবলেম। তোমার যেমন মর্জি। তানিয়া বিছানায় উঠে বসল আর আকাশ ব্লাংকেট মুড়ি দিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ল। একটু পর তানিয়া বলল: আকাশ তোমার কোন কষ্ট হচ্ছে না তো?’ আকাশ বলল: আমার কোন কষ্ট হচ্ছে না। দিব্যি আরামে শুয়ে আছি। শুধু তুমি পাশে নেই, এই কষ্ট আর কি! তানিয়া শিউলী ঝরা হাসি দিয়ে বললঃ আকাশ বাতি নিভিয়ে দাও, শুধু ডীম লাইট জ্বালিয়ে রেখো। আর একটি কথা, বিয়ের আগে কোন মেয়ের পেটে বাচ্চা আসলে তাকে কি বলে? আকাশ তড়িৎ জবাব দিল: জারজ সন্তান।’ তানিয়া বলল: কথাটা মাথায় রেখো। আমি ঘুমুচ্ছি। গুড্ নাইট।’
উভয় পরিবারের সম্মতিতে শুক্রবার আকাশ তানিয়ার বিয়ে হল। কমিউনিটি সেন্টারে বর-কনে যখন পাশাপাশি বসে আশীর্বাদ নিচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে সাগর সম্প্রতি বলিউড ছায়াছবির একটি হিট গান তানিয়ার দিকে চেয়ে চেয়ে গাইতে লাগল: মোবারক-হঁ-ইয়ে, শাদী তোমহারী, সদা খুশ রহঁ ইয়ে দোয়া হ্যাঁয় হামারী, তুমহারী কদম চুমেগি দুনিয়া ছারী, সদা খুশ রহঁ ইয়ে দোয়া হ্যাঁয় হামারী।’ উৎসুক জনতা মুগ্ধ হয়ে সাগরের গানটি শোনল। আকাশের মনে হল সাগরের প্রতিটি শব্দে প্রচন্ড বিরহের কান্না ঝরে ঝরে পড়ছে। সদা হাসি খুশী মানুষটির বিষাদমাখা মুখখানি কি বলতে চায়? তবে কি সাগর তানিয়াকে ভালোবাসে? এই গানটি দিয়ে সে কি তানিয়াকে বিদায় জানাচ্ছে। আকাশ মনে মনে বলল, অব কোর্স, দেয়ার ইজ রঙ সামহয়ার। কিন্তু তাই যদি হয় তো তানিয়া আমাকে বিয়ে করল কেন? সন্দেহ থেকেই গেল। আকাশের নির্মল হৃদয়ে একটি ক্ষত তৈরি হয়ে গেল। জানি না এর শেষ কোথায়।
তানিয়া-আকাশের সংসার খুব ভালোই চলছিল। কিন্তু শুরু থেকে সাগরের আসা-যাওয়া লেগেই আছে। সময়-অসময়ে ফোনালাপ চলছে তো চলছেই। আকাশ অফিসে চলে গেলে সাগর এসে তানিয়ার সাথে আড্ডা দেয়। ক্রমে ব্যাপারটি আকাশের কাছে অসহ্য হয়ে এলো। এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখে সাগর তানিয়ার পাশে বসে চুটিয়ে গল্প করছে। আকাশকে ড্রইংরুমে ঢুকতে দেখে হাসিমুখে সাগর বলল: আকাশ এসো। তোমার অপেক্ষায় বসে আছি। তানিয়া এখনও আমাকে চা-কফি কিচ্ছু দেয়নি। বলে ও আসুক, একসাথে তিনজন বসে নাস্তা খাব। কেমন আছো আকাশ? আকাশ চটুল হেসে জবাব দিল: খুব ভালো ভাই, খুব ভালো। তা আজ রাতের বেলায় এখানে কি ভাবে? সাগর চট জবাব দিল: স্টুডিওতে দেরী হয়ে গেল। একটা গানের প্লেব্যাক রেকর্ডিং ছিল। অনেকদিন তোমাকে দেখি না, ভাবলাম আজ অবশ্যই তোমাকে দেখে যাব। আকাশ বিষণœমুখে বলল: সাগর তুমি অহরহ পকেটের পয়সা খরচ করে মধুপুর থেকে ঢাকায় আস তানিয়াকে দেখতে। আমি বলি-কি, তুমি বরং তানিয়াকে মধুপুর নিয়েই যাও। রোজ রোজ আসা-যাওয়ার কষ্টটুকু লাঘব হবে। এতে দিবানিশি একত্রে বসে রঙ-তামাশা করতে পারবে।’ সাগর ঝট সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কর্কশকন্ঠে বলল: আকাশ মাইন্ড ইওর ল্যাংগুয়েজ। তোমার মুখ দিয়ে ‘রঙ-তামাসা’ শব্দগুলো বেরুল কি করে?’ তুমি না জেনে, না বুঝে চট এত নীচে নামতে পারলে? আমি তো তোমাকে একজন রুচিশীল মানুষ, চমৎকার ভদ্রলোক বলেই জানতাম। কিন্তু আজ তুমি আমার বিশ্বাস নষ্ট করে দিলে।’
আকাশ বাঁধা দিয়ে বলল: চুপ কর সাগর। সুন্দর সুন্দর কথা বলে কুৎসিত কর্মকান্ড চেপে রাখা যায় না। একটা ছেলে ও একটা মেয়েতে বন্ধুত্ব থাকতেই পারে কিন্তু তোমার তানিয়ার বন্ধুত্ব লাগামহীন ঘোড়ার মতো একটা অঘটন যেকোন মুহূর্তে ঘটতেই পারে। সাগর আমি বোকা নই। বিয়ের পর থেকেই তোমরা দুজনের কর্মকান্ড থেকে শিক্ষা নিয়েই আমি কথাগুলো বলছি। আমাকে এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণা থেকে রেহাই দাও। তোমরা কেউই সন্দেহের উর্ধ্বে নও। ‘সাগর বলল: আকাশ তোমাকে ধিক্। তুমি আমাদের পবিত্র সম্পর্কের উপর কালিমা লেপন করেছ। আমি যাচ্ছি, আর কোনদিন এ-পথ মাড়াবো না। চিৎকার দিয়ে বলল: তানিয়া আমি চললাম।আর কোনদিন এ বাড়ি আসব না। তুমি মধুপুর গেলে দেখা হবে।
সাগর হন হন করে বেরিয়ে গেল। পিছন থেকে তানিয়া চিৎকার দিয়ে ডাকল : সাগর প্লিজ, এভাবে তুমি চলে যেও না। আমার কথাটুকু শোনে যাও। সাগর ততক্ষণে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে। এবার উগ্রমূর্তি ধারন করে তানিয়া বলল: আকাশ! ভালো করে কিছু না জেনে, না-বুঝে সাগরের মতো নিখুঁত পরিচ্ছন্ন চরিত্রের একজন মানুষকে আমার সামনে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তোমার ঘর থেকে বিদায় করে দিলে? ‘আকাশ চট জবাব দিল: হ্যাঁ দিলাম। কারণ, ওটাই তার প্রাপ্য ছিল।’
তানিয়া শক্ত কন্ঠে বলল: তুমি কি আমাকে সন্দেহ কর? আকাশ বলল: হ্যাঁ করি। আর করি বলেই সাগরকে তাড়িয়ে দিয়েছি। তোমাকেও চলে যেতে বলছি। আমি ডিভোর্স দেব। তুমি চলে যাও, আমি ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেব। এই কথা বলে বেড থেকে একটি বালিশ নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। তানিয়া রুঢ়কন্ঠে বলল: বালিশ নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?’ আকাশ বলল: গেস্ট রুমে। আমি ওখানেই ঘুমাব। তোমার সাথে এক বিছানায় আর একটি রাতও কাটাতে পারছি না বলে আমি দুঃখিত। বলে, গেস্টরুমে ঢুকেই ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে আকাশ দেখল ড্রইংরুমের দরজা ভেজানো। বেডরুমে গিয়ে দেখে বেড খালি। তানিয়া নেই। লম্বা সিটের উপর ছোট্ট কয়েক লাইনের একখানি চিঠি বেডের উপর পড়ে আছে। চিঠিতে লিখা: আকাশ আমি তোমাকে ভালোবাসি। ইহকাল পরকালে তুমি শুধু আমার। আমি আগাগোড়া পুত-পবিত্র। আমি কোন পাপ করিনি। কিন্তু মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আজ আমাকে তাড়িয়ে দিলে। আমি জানি একদিন তোমার ভুল ভাঙবে কিন্তু তখন হয়ত এই পৃথিবীতে আমি আর থাকব না। আমাকে ক্ষমা করে দিও- তানিয়া।
এই ঘটনার ঠিক দু’দিন পর খেলো বারান্দায় আকাশ পায়চারি করছিল। ছুটির দিন, বেলা দশটার মতো হবে। আকাশ দেখল একজন সুন্দরী যুবতী তার দিকে এগিয়ে আসছে। খুব দুঃখী চেহারা মনে হচ্ছে। মেয়েটি এগিয়ে এসে বলল: আমি আপনার সাথে দু’টি কথা বলতে এসেছি। আকাশ বলল: মাফ করবেন, আমি আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না।’ মেয়েটি বলল: আমি নীপা। তানিয়ার বান্ধবী। আমি আপনাকে সুশিক্ষিত একজন ভদ্রলোক বলেই জানতাম। আকাশ রাগত কন্ঠে বলল: এক্সকিউজমী, আপনি আমাকে কী বলতে এসেছেন? ইয়েস, আমি আপনাকে সেই কথাটিই বলতে এসেছি, আপনি একজন অমানুষ। তানিয়ার মতো স্বচ্ছ পবিত্র গোলাপকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছেন। সাগর-তানিয়া ওরা ভাই-বোনের মতো। এর বাইরে কোন সম্পর্ক নেই। আমরা মধুপুরে একসাথে বেড়ে উঠেছি। একসাথে খেলাধুলা, ঝগড়াঝাটি, মান-অভিমান, কথা বন্ধ ইত্যাদি লেগেই থাকত। দু’দিন তার পর সব একাকার। আমাদের ছেলেবেলা এক চিত্তহরণকারী মনোরম অধ্যায়। তাই বলছি আপনি বিজ্ঞ মানুষ নিরেট মূর্খের মতো কাজটি করেছেন, তার জন্য আপনাকে সারাজীবন এই ভুলের মাসুল দিতে হতে পারে। অধর্ম আর কাকে বলে। আমার হাতে সময় খুব কম, আমি এখনই মধুপুর ফিরব। আপনাকে জানিয়ে যাই, গতরাতে তানিয়ার হার্ট এ্যাটাক হয়ে এখন মধুপুর হেলথ কমপ্লেক্স এর বেডে কোমা অবস্থায় পড়ে আছে। ফিরে গিয়ে তাকে জীবিত পাব কি-না যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আকাশ হাউমাউ করে কেঁদে নীপার হাত ধরে বলল: নীপা প্লিজ, আমাকে সাথে নিয়ে যান। আসুন একসাথে যাই। আমার গাড়ী আছে। আকাশের অসহায় অবস্থা দেখে নীপার বড় মায়া হল। বলল: কি আর করা, চলুন যাই। হেলথ্ কমপ্ল্ক্সে-এ পৌঁছা মাত্র সাগর এগিয়ে এসে বলল: আকাশ বড় দেরী করে ফেললে, তানিয়া চলে গেছে নাগালের বাইরে, চিরদিন

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT