সাহিত্য

অসংজ্ঞায়িত প্রেম

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-১০-২০১৮ ইং ০০:১৩:৩৭ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

ওর একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভাল লাগার মত। কথা বলতে বলতে হাসা। যখনই কিছু বলতে যায় আগে হাসি তারপর কথা। আর সে কী হাসি। তুলনাহীন। মুক্তো ঝরে যেন। ওর চেহারা সদ্য ফোটা কাঁচা গোলাপের মত। উজ্জ্বল ফর্সা নয় সে। তবে কেমন যেন মায়া ভরা মুখখানা। চেয়ে থাকতেই ভাল লাগে। ওর চুলগুচ্ছ নিতম্ব পেরিয়ে আরও চার ইঞ্চি লম্বা। খোলা থাকলেই আরও সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। বনলতা সেনকেও যেন হার মানায়। এলোকেশ যেন আকাশের বাউন্ডেলে মেঘ।
ওর নাম নিশু। স্বামী আছে। আছে একটি মেয়ে। নাম বৃষ্টি। ঘটা করে বিবাহ হয়েছিল তার। কিছুদিন ভালই কাটছিল। তখনও বাচ্চা হয়নি। ফুটফুটে চাঁদের মত বউ এনেছিল রবিন। বউয়ের প্রতি ভালবাসাও কম নয়। তবে মাতৃভক্তি তুলনাহীন। বায়েজীদ বোস্তামী যেন। মায়ের আদেশ শিরোধার্য। মা যা বলবেন ওর বাইরে এক পাও নয়। ও বউ থেকে মায়ের কাছাকাছিই থাকতে বেশি ভালোবাসে। এতে নিশু ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু প্রকাশ করার সাহস এখনও হয়নি। ওভাবে- আস্তে আস্তে হয়ত এগুলো ঠিক হয়ে যাবে। স্বামীকে পুরোপুরি সে পাবে। স্বামী স্ত্রীর প্রেম আরও গভীর থেকে গভীরতর হবে। দু’জনের একটা নীড় হবে। স্বপ্নের নীড়। সেখানে থাকবে দুই কপোত-কপোতী। থাকবে না কোন তৃতীয় শক্তি যে শক্তি দু’জনের স্বাধীনতাকে খর্ব করে।
দেখতে দেখতে আট বছর কেটে গেল। তথাপি রবিন একান্ত কাছের হয় না। সেই মাতৃভক্তিই চরমে। মা যদি বলেন ‘তোর বউয়ের জন্য এটা আনিস তাহলেই আনবে। মা যদি বলেন শ্বশুর বাড়ি যা, তাহলে যাবে। মা যদি ডাক দেন গভীর নিশিতে- হন্তদন্ত হয়ে ছুটবে রবিন। অদ্ভুত নাড়ির টান। বিস্ময়ে হতবাক হয় মেঘ। একান্তে দু’দন্ড থাকার জো নেই। মায়ের ভয়েই যেন তটস্থ থাকে সে। কখন মা ডাকেন সেই দিকেই যেন ওৎ পেতে থাকে ওর কান। প্রাণ উজাড় করে ভালবাসার কথাটাও কোন দিন বলল না রবিন। নিশুর হৃদয় অতৃপ্ত। ওর প্রাণটা খা খা করে। স্বামীর সাথে শুধুই রাত কাটানো? মনের খোরাক বলতে তো কিছু আছে। বৃষ্টি যখন পেটে তখনও সে আদর আহ্লাদ পায় না। এ নিয়ে শুধুই খিটিমিটি চলে। রাগে নিশুর চেহারা লাল হয়। গোস্বা করে স্বামীর সাথে। ও স্বামীকে বলে, ওগো ই বিপদে আমার কান্দাত একটু সময় থাকো না কেনে? শুধু রাইত ছাড়া দিনেতো আর তোমারে পাই না। সব সময় আমার ডর লাগে। আমি বাচমুনি রবিন?
রবিন মাথায় হাত দিয়ে বলে ই কিতা কও নিশু। ইতা কোনো ব্যাপার নায়? পৃথিবী শুরু অইছে থাকি ওউ বেটিন মা বনরা। তোমার ডরাইবার কোনতা নায়। আর আমিতো আছি তোমার কান্দাত। ডরাইওনা তুমি। কোনো অসুবিধা অইলে আসপাতাল লইয়া যাইমুগি। আসপাতালতো আর বেশি দূরই নায়। নিশু একটু ভরসা পায়, তথাপি সে বলে ইটাতো বুঝরাম। কিন্তু আস্তা দিন আমার একা একা থাকা লাগে। আমার তো কথা কইবার ওউ মানুষ নাই। তুমি তো তোমার মা’র লগে আছেন। কানাকানিত। ইবায়দি বউ একজন আছি না মরছি তোমার খিয়াল থাকে নি? ডাকতামও পারি না। ডাকলে যদি আবার মা’য় মাইন্ড করইন। এর লাগি ডাকিও না।
ঠিক দশ মাস দশদিন পর বৃষ্টির জন্ম হয়। ঘরে হুলস্থল কান্ড। রবিন বৃষ্টিকে নিয়ে মেতে উঠল। এদিকে নিশু যে বিছানায় পড়ে আছে- আর খবর নেই। অবশ্য নিশুর মা এক দূর সম্পর্কীয় তালতো বোনকে কিছুদিন আগে পাঠিয়ে ছিলেন এখানে। ওই ওর দেখাশোনা করছে। রবিন আতুড়ঘরে আগে কিন্তু বসে না। ওর ঘেন্না করে যেন। বৃষ্টিকে কোলে নিয়েই মায়ের ঘরে চলে যায়। ওকে নিয়ে আনন্দ ফূর্তি করে। বৃষ্টি কান্নাকাটি শুরু করলে আবার আতুড় ঘরে দিয়ে যায়। সিজার করা জায়গায় ব্যথা করে। নড়তে পারে না নিশু। ওর সাথী ‘তুলনা’ই এখন ভরসা। ওর নাওয়া খাওয়া থেকে শুরু করে কাপড় চোপড় ধোয়া, পাটি পাল্টান সবকিছুই করে সে। রবিন এখন অন্য ঘরে থাকে। রাতে খুব একটা আসে না। আসলেও দুই তিন মিনিটের ভিতর চলে যায়। দু’দন্ড কথা বলার সুযোগ দেয় না। নিশু ভিতরে ভিতরে ফোঁসে ওঠে। কিন্তু কোন কিছু বলে না। নিরবে সয়ে যায়। এদিকে রবিনের নাচা নাচিতে বিরক্ত রবিনের মা। মেয়ে হয়েছে এ নিয়ে এত খুশি। ছেলে হলে কি যে করত সে এরকম ভাবেন তিনি।
আজ বৃষ্টির বয়স ছ’বছর। জন্ম দিবস ওর ইতিপূর্বে পালিত হয়েছে। নিশু ধৈর্য্য ধরে স্বামীর ঘর করছে। ওর চাতকী মন বৃষ্টির খোঁজে থাকতে থাকতে অহর্নিশ হাঁপিত্যেশ করছে। মরিচিকার পেছনেই কি দৌড়াচ্ছে সে। রবিনের ক্রমাগত অবহেলা ওকে ক্ষুব্দ করে তুলে। মাঝে মধ্যে ঝাগড়াঝাটি হয়। রবিন ওকে বারবার বিদায় দেয়। বলে যাগি তোর বাপর বাড়ি। ইনো তুই আরাম পাইরে না।
নিশু বলে ‘বাপের বাড়ি যাইতামগি কেনে? যাইবার লাগি আইছিনি, বউ কিলা রাখইন জানো নি?
-আর কিলা রাখতাম? তোমার কোনতার অভাব আছেনি? যেতা লাগে হখলতাউতো দিরাম।
মেঘ বেশি কথা বলতে পারে না। ওর হেরান লাগে। রাগের বশে একটু বেশি কথা বলে ফেললে তুতলানো শুরু হয়। হার্টবিট বেড়ে যায়। অগত্যা নিজে থেকেই কথা বন্ধ করে দেয়।
বৃষ্টি স্কুলে ভর্তি হয়েছে। রবিনের সাথে ঝগড়া করে নিশু আলাদা বাসা নিয়েছে। দুই রুমের ছোট্ট একটি বাসা। মেঘের বাবাই দেখা শোনা করেন। টাকা পয়সা দেন। টাকার তো আর ওদের অভাব নেই। দুই ভাই স্পেন এক ভাই লন্ডনে। না চাইতেই মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা আসে। ওদের আদরের ছোট বোন কষ্ট করবে আর ওরা চেয়ে চেয়ে দেখবে? ওরা বলে দিয়েছে ‘রবিন আইলে আউক আর না আইলে নাই। তুই পুড়িরে লইয়া একলাউ থাক। ‘আমরা দেখাশুনা করমু তরে। দরকার অইলে তরে বিয়া দিমু অন্য জাগাত।’
নিশুর নতুন বাসার পাশেই থাকে অপু। তিন ভাই একবোন ওরা। ছিমছাম গোছালো পরিবার। অপু সবার বড়। মিষ্টি চেহারা। হ্যান্ডসাম বডি। লেখাপড়ায় পাশাপাশি চাকরি করে সে। নিশু পরখ করে অপুকে। কি শান্ত-সুবোধ চেহারা। বিশ্বাস করা যায় ওকে। মনের কথা বলা যায়। ইতোমধ্যে পরিচয় পর্ব সেরেছে। নিশুর রান্নাবান্নার পর আর কোন কাজ নেই। বৃষ্টিকে ঘুম পাড়িয়ে চলে যায় অপুদের ঘরে। অপুর বোনের সাথে গল্প করে। অপুর বোন একটা গাল্পিক বলা চলে। বি.এ তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। কলেজে ক্লাস নেই। মাঝে মধ্যে দরকার হলে কলেজে যায় আর না হয় বাসায়ই থাকে। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে জমিয়ে আড্ডা দেয় ওরা। ওর নাম এলিনা। নিশুও ইন্টার পর্যন্ত পড়েছিল। ওর স্বভাবই হচ্ছে হেসে হেসে কথা বলা। আর এলিনা। সেতো গল্পে উস্তাদ। কথা শুরু করলে থামার পাত্র নয় সে। টিভিতে যেভাবে সংবাদ পাঠ করে ও যেন সেরকম। একটা বিষয়কে এতই নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করবে যে না শুনে পারাই যায় না। তাই দু’জনে খুব ভাব।
অপুর বাবা মা উদার প্রকৃতির। নিশুর একাকীত্ব ওদের ব্যথিত করে। ওরা ভাগনি বলে ডাকেন। নিশুও খালা-খালু সম্বোধন করে। দু’পরিবারের সম্পর্ক গভীর হতে লাগলো। নিশু ওদের বাসায় না গেলে ভাতই হজম হয় না। কি যেন ওকে টানে। হ্যাঁ অপু। ওর শান্ত চাহনি, সহজ সরল কথাবার্তা নিত্য টানে ওকে।
সেদিন একটু ঠান্ডা অনুভূত হলে অপু জিন্স প্যান্টের সাথে ডিজাইন কোট পরেছে। চাকরি স্থলে যাওয়ার জন্য মোটর সাইকেল বের করবে। এমনি সময় নিশু ভেজা ক’টি কাপড় নিয়ে বেরিয়েছে। ওগুলো রৌদ্রে শুকাতে দেবে বলে। চোখে চোখ পড়তেই ভুবনমোহিনী হাসি। ফিসফিসিয়ে বলে- ‘অপু ভাই তোমারে খুব স্মার্ট লাগের আইজ। অপু মুচকি হাসি দিয়ে বলে- তাইলে গতকাইল স্মার্ট লাগছে না মনে হয়?
-না না, সবসময়ইতো আপনে স্মার্ট বয়। তবে আইজ একটু বেশি লাগের।
-হাছানি? হুনিয়া খুশি লাগের। আর পাম দিও না। বেলুন ফাটি যাইব।
-একেবারে সত্যি কইরাম, মন থাকি।
-আচ্ছা গো সোনা, যাইগি ওনে। রাইত দেখা অইবনে।
অপু মোটর সাইকেল স্টার্ট দিয়ে যাত্রা শুরু করে। নিশু অপলক চেয়ে থাকে ওর পানে। উদাস হয়। সব কিছু ওর থেকেও নেই। স্বামী সন্তান, আত্মীয়-স্বজন, টাকা-পয়সা সব আছে। স--ব। কিন্তু কী যেন নেই।
আপু। এলিনার কণ্ঠ শুনে চমকে উঠে নিশু। ‘কিতা অইল? একেবারে আ করি কিতা দেখরায়? তিনবার ডাকলাম, হুনরায় না। লজ্জা পেয়ে নিশু বলল- কই ডাকলায়? ডাকলে তো হুনলামওনে।
-তে এখন হুনলাম কিলা? আসলে রবিন ভাইর কথা মনো অই গেছে। এর লাগি কোনোবায়দি খেয়াল নাই।
-আইচ্ছা, মনো অইছে তউ কিতা অইছে? মনো তো অনেক কিছু উঠতো পারে। এলিনা- এখন ঘরো যাইগি। বৃষ্টি উঠি গেছে। ওরে ইস্কুলো লইয়া যাইতাম।
-আইচ্ছা যাও। পরে দেখা অইব...। এলিনা চলল কিচেনের দিকে।
রোজকার মত নিশু এলিনাদের ঘরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিল। তখন রাত সাড়ে ৯টা। দশটায় আসে অপু। আধা ঘন্টা তখনও বাকী। অপুর বাবা-মা আটটায় ডিনার সেরে দশটায় বেডে যান। অপুকে খাবার দেয় এলিনা। ওর ছোট ভাই দুটো ইতোমধ্যে ডিনার সেরে যার যার রুমে পাটে ব্যস্ত॥
অপু ঘরে ঢুকতেই মেঘের সাথে দেখা। চোখাচুখি হতেই সেই ভুবনমোহিনী হাসি। ওয়েলকাম অপু ভাই। সেই সন্ধ্যা থাকি ভই রইছি। আপনার পথ চাইয়া।
-ভালা ভালা। আমার পথর দিকে চাওরা মানুষও আছে দেখি।
-আমরারে কেউর চখুত লাগবোনি?
-লাগতো না কেনে? তুমি কিতা ল্যাংড়া না আতুড়? কত সুন্দর চেহারা। ইলা চেহারার মানুষ রবিন ভাইয়ে পাইয়াও দূরই পালাইয়া রাখছে। বেচারা বেয়াকল...।
এলিনা টেবিলে ভাত বেড়ে দিলে অপু খেতে বসল। মুখে বলল ‘আও খাইতায়নি? এলিনা খাইলিছতনি বে?
-অয়, আমরা খাইলিছি। নিশু বলে আর ডাকা লাগতো নায়। আধা খাইয়া বাদে ডাকিরায়?’
-নানা। খাইছি না, খাইছি না। আও চাইরটা খাইলাও আমরার ঘরো।
-না না খাউকা। আমরার খাওয়া দাওয়া শেষ। কিছুক্ষণ টিভি দেখে ঠিক এগারোটায় চলে আসে নিশু নিজের ঘরে।
আজ শুক্রবার। অপুর দুটি। বাবা, মা ও এলিনা ডাক্তারে গেছেন। ছোট ভাই দুটো খেলা পাগল। চারটার পর ওদের পাত্তাই পাওয়া যায় না। হয় ফুটবল না হয় ক্রিকেট নিয়ে সারাটা বিকাল মাতে ওরা। ফিরে সন্ধ্যার অনেক পর। নিশু ছোট্ট উঠোনে হাঁটা হাটি করছিল ওর মেয়েকে নিয়ে। পাশেই অপুর ঘর। ও কি যেন লিখছিল। চোখে চোখ পড়তেই ইশারায় ডাকলো নিশু। বাইরে আসতেই বলল, অপু ভাই তোমার লাগি চা বানাইছি। আমরার ঘরো আও। অপু না করল না। মেঘের গোছ গাছ করা ছোট্ট রুমে ঢুকল অপু।
-আরে... তোমার রুমতো খুব সুন্দর। বিছনা বালিশ পালং সোফা চক চক করের। অপু বলল।
-আমি মানুষ কিতা সুন্দর কমনি? রুম সুন্দর অইত না।
-না এর লাগি ওই তো কই; সুন্দর মাইনষর হকলতাউ সুন্দর থাকে।
চা নিয়ে আসল নিশু। ছোট্ট বৃষ্টি তখন অপুর কোলে উঠেছে। মামা... মামা এটা কি? ওটা কি কত প্রশ্ন করছে। অপু বলল- বৃষ্টিতো তোমার লাখান খুব মিষ্টি অইব দেখরাম। ও খুব ভাগ্যবতী মেয়ে। কপালটা দেখো কত বড়।
-আচ্ছা, আচ্ছা। মিষ্টি অউক। আর আমার কপাল থাকি ওর কপালটা ভালা অউক, ওকটাউ চাইরাম আল্লাহর গেছে।
-কেনে তোমার কপালো কিতা অইছে?
-আর কইও না ভাই। উপর দেখিয়াউতো আর ভিতরর খবর কওয়া যায় না। দেখো না আইজ তিন মাস অই গেছে অনো আইছি। পুড়ির বাপে কোন খবর লইলানি আমার কথা তো বাদ দিলাম। ওউ পুড়ি কত মায়ার আছিল। চকুর দেখা খান দেখল না আইয়া। তোমার রবিন ভাইর কথা কইরাম।
-ও আচ্ছা। আইবানে। মনে কয় গোছা এখনও মিটছে না মিটি গেলে দৌড়িয়া আইবা। না ভাই, না। তাইন যে কেমন মানুষ। আইজ আট বছর ধরি তানরে চিনি। আমি যদি মরি যাই- তারপরও ফিরিয়া দেখতা নায়। ওউ জ্বালায় তো আলাদা বাসা নিলাম। তান মা ওউ হকলতা। মায় যুদি কইন তাইলে আইবা। আর মায় যুদি কইন বাদ দে। ই বেটি ভালা নায়- ই বেটিরে ছাড়ি দে, তাইলে তাইন আর ঘুরাইয়া কইতা নায়, কিতা লাগি ইগুরে ছাড়ি দিতাম? এর দোষ কিতা? কইবা, আচ্ছা মায় যখন কইরা তাইলে ইগুরে আর রাখতাম নায়।
অপু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, নিশু তোমার ইতা হুনিয়া দুখ লাগের। তোমার মত একটা মেয়ে বউ হিসাবে পাওয়া ভাগ্যর ব্যাপার। রং, রূপ, বুদ্ধি-সুদ্ধি বিদ্যা-শিক্ষা সব মিলাইয়া তুমি কত স্মার্ট। তোমারে এখন অবহেলা করের। দেখবায়নে এক সময় আইয়া পাও পড়ব।’
-না ভাই আইতা নায়, দেখবায়নে। তারা পুড়িনতরে এমনেউ ভালা পায় না। আমার যে পুড়ি অইছে এর লাগি আরও মন খারাপ।
-পুড়ি পুয়া ইতা তো আল্লাহর ইচ্ছায় অয়। ইতা কেউ বানাইত পারবো নি?
-না তারার কথা অইল তুমি বানাইয়া আনিলাইতায়। তারারে পুয়া আনিয়া দিলাইতায়।
-ইতাতো মূর্খ অখলে কয়।-আর মাতিওনা অপু ভাই, ইতা মূর্খ থাকিও আরও বাদ।
-হুনিয়া খুব খারাপ লাগের নিশু।
ইতোমধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। অপু বলল যাইগি নিশু। তোমার চা খুব ভালা লাগছে। মাঝে মাঝে ওলা আমরারে খাবাইও। আচ্ছা অপু ভাই, তোমার মাত আমার খুব ভালা লাগে। জানো নি ইলা কান্দাত বইয়া আমার জামাইয়ে ওউ একদিন আমার লগে মাতছইন না।
অপু নিশুর ব্যথাটি বুঝে। ওর একাকীত্ব ওকে আড়ষ্ট করে রেখেছে। মন খুলে কথা বলার কাঙ্গাল সে। ওকে সুন্দর সুন্দর কথা বলার কেউ নেই। আদর ভালবাসা যার দেবার কথা সে দিয়েছে চরম অবহেলা। তাই নিশু সব সময় ওর বুকে এক রাশ জমাট মেঘ নিয়ে ঘুরছে। স্পষ্ট বুঝে অপু। তথাপি করার কিছুই নেই। ওর স্বামী আছে সন্তান আছে পরিবার আছে। ইচ্ছা করলেই তো কিছুই করার নেই। অপু ভাবে ওর সাথে ঘনিষ্ট হওয়া উচিত নয়। কারণ ও ভালবাসার কাঙ্গাল। মনের অজান্তে সে বারটা বাজিয়ে বসবে। আমি একটা অবিবাহিত যুবক। কতক্ষণ আর নিজেকে ধরে রাখবো? এর চেয়ে বরং ওকে এড়িয়ে যাওয়াই ভাল।
অপু নিজেকে একটু গুটিয়ে নিল। সেদিনের পর থেকেই ইচ্ছা করেই এড়িয়ে চলতে লাগলো। অফিসে যাওয়ার সময় ঘর থেকে খুব দ্রুত বের হয়, যেন কোথায় কোন জরুরি কাজ। আশেপাশে তাকাবার সময় নেই। মোটর সাইকেল স্টার্ট দিয়েই- দ্রুত পলায়ন করে সে। আগে রাত ১০ টায় ফিরত। আর এখন ফেরে এগারোটা সাড়ে এগারোটায়। ততক্ষণে নিশু বৃষ্টি সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। জেগে থাকে শুধু এলিনা। ও ভাইয়া না আসা পর্যন্ত বেডে যায় না। আগে সব মা-ই করতেন। এখন মা ডায়াবেটিস প্রেশারের রোগী। তাই তাড়াতাড়ি শুনে পড়েন। এদিকে নিশু বিষয়টি লক্ষ্য করল। অপু ভাই এত ব্যস্ত হয়ে গেল কেন? যে কয়দিনের পরিচয়- বেশ ভালই কথাবার্তা চলছিল। সময়টা বেশ দ্রুতই ফুড়িয়ে যেত। এলিনা, অপু, নিশু সবাই রাতে বেশ জমিয়েই আড্ডা দিত। এতে নিশুর মনটা বেশ ভালই ছিল। এক সপ্তাহ ধরে নিশুর বিষণœতা বেড়ে গেল। চরম একাকী বোধ করল সে। ওর ইচ্ছে হয় অপুকে জিজ্ঞেস করে- ওর কোন দোষ হলো কিনা? কেন সেও অবজ্ঞা করা শুরু করেছে? কিন্তু সে সুযোগ এখনও আসেনি। এলিনাই এখন ওর সঙ্গী। দুদন্ড ওর সাথেই কথা বলে। ও আছে বলেইতো এখনও পাগল হয়ে যায়নি। মাঝে মাঝে দুনিয়াটা অসারই মনে হয়। সব থেকেও ওর যেন কিছুই নেই...।
এলিনাকে নিশু খুব পছন্দ করে। ও যেভাবে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কথা বলে, নিশু সেটা অবাক হয়ে শুনে। ওর রহস্যময় কথাগুলো আঁচ করতে চেষ্টা করে। নিশু বলে তোমার মাথায় অনেক বুদ্ধি ইলিনা তোমাকে আমার ঘরে বউ করে নিয়ে যাবো। মেঝো ভাইয়া স্পেন থেকে আসুক। তারপর...
এলিনা মুখ খুলল- আহ! কইলেউ অইছে? কোন খানর কে? ধরিয়াউ বিয়া ভই যাইমু। তোমার লাখান আমি নায় গো সোনা। আমি যার বউ অইমু তারে আমি ভালা করি চিনা লাগবো। দেখি যুদি মনর লগে মিলে তাইলে বিয়া ভইমু। আর নাইলে ভইতাম নায়। হারা জীবন একলা একলা কাটাই দিমু।
-আহ! ওতো ডিমান্ড দেখাইও না। ইলা বউতেউ কইন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কয়জন টিকইন? দুই একজন ছাড়া বাকী হকলউ বিয়া বইন। বেটি মানুষ। বিয়া না করলে বাঁচবায় কিলা?
এলিনার বাবা ইতোমধ্যে ঘরে আসলে ওদের রসালাপে ছেদ পড়ে। মেঘ দ্রুত একটা সালাম টুকে নিজের ঘরের, দিকে পা বাড়ালো। এলিনার বাবা বললেন ‘ভাগনি ভও না গো। গেলায়গি কেনে?
-না খালু পরে আইমু। বলেই মেঘ ওর ঘরে ঢুকল।
এক শুক্রবার। এলিনারা সবাই যাবে মামার বাড়ি। ওরা সংখ্যায় ছয়জন। কিন্তু সিএনজিতে সিট পাঁচটি। সে কোন বিয়ে সাদীতে যেতে হলেই একজন অবশিষ্ট থাকে। আগে একজন ছোট ছিল। তাই এলিনার বাবা ওকে কোলে বসাতেন। এখন সবাই বড় হয়ে গেছে। তাই আর কোলে বসানোর সুযোগ নেই। সিএনজি এলে অপু বলল আমি মোটর সাইকেলে যাইমু। তোমরা যাওগি।
এলিনার বাবা বললেন ‘আচ্ছা সাবধানে আইছ ব্যাটা। আস্তে আস্তে চালাইছ।
-আচ্ছা।
সবাই চলে গেলে অপু রেডি হচ্ছিল। নিশু দ্রুতই ওর ঘরে ঢুকলো। অপু কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই পা জড়িয়ে ধরল নিশু। অপু অপ্রস্তুত হয়ে বলল ‘কিতা অইছে নিশু তুমি পাও ধরলায় কেনে, আর কান্দ কিতা লাগি?
-অ

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT