উপ সম্পাদকীয়

দুর্গার আগমন শুভ হোক

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১০-২০১৮ ইং ০০:৩২:৫০ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত

ভারতীয় উপমহাদেশে মাতৃরুপে দেবীর বন্দনা অতি প্রাচীন। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ২২.০০০ বছর পূর্বে ভারতে দেবী পূজা প্রচলিত ছিল। মাতৃপ্রধান পরিবারে মা-ই প্রধান শক্তি, আর মাকে সামনে রেখে দেবী বিশ্বাস গড়ে উঠেছে। মহাভারত অনুসারে, দুর্গা বিবেচিত হন কালী শক্তির আরেক রূপে। দুর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী তাই দেবী মাতা হিসাবে তাঁর পূজা হয়ে থাকে।
কৃত্তিবাসী রামায়ণে ব্রহ্মার পরামর্শে রামের দুর্গা পূজা করার কথা উল্লেখিত আছে। শক্তিশালী রাবনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিজয়ে শরৎকালে শ্রীরামচন্দ্র কালিদহ সাগর থেকে ১০৮টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে দুর্গা পূজার মাধ্যমে দুর্গার কৃপা লাভ করেন বলে বর্ণিত হয়েছে। সনাতন ধর্মের আর্য ঋষিরা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতীক হিসেবে দেবী দুর্গার আশীর্বাদ লাভের জন্য আরাধনা করতেন। আজো বাংলায় শ্রী শ্রী চন্ডী নামে সাতশো শ্লোক বিশিষ্ট দেবী মাহাত্ম পাঠ দুর্গা পূজার প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
দুর্গা পূজার প্রচলন নিয়ে বেশ কয়েকটি মতবাদ পাওয়া যায়। মার্কন্ডেয় পুরান মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরথ খ্রীস্টের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে উড়িষ্যা) দুর্গা পূজার প্রচলন করেছিলেন। ভিন্নমতে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে দিনাজপুরের জমিদার প্রথম দুর্গা পূজা করেন। আবার কারো মতে, ষোড়শ শতকে রাজশাহীর তাহেরপুর এলাকার রাজা কংসনারায়ণ প্রথম দুর্গা পূজা করেন।
১৬০৫ সালে নদীয়ার ভবানন্দ মজুমদার দুর্গা পূজার প্রবর্তক। উড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ শত বছর আগে থেকে দুর্গা পূজা হয়ে আসছে। জমিদার বাড়ি থেকেই এই পূজার প্রচলন হয়েছিল। ১৭১১ সালে অহম রাজ্যের রাজধানী রংপুরে শারদীয় পূজার নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের দূত রামেশ্বর ন্যায়লঙ্কার।
বর্তমানে দুর্গাপূজা দুইভাবে হয়ে থাকে ব্যক্তিভাবে পারিবারিক স্তরে ও সমষ্টিগতভাবে পাড়া স্তরে। ব্যক্তিগত পূজাগুলি নিয়মনিষ্ঠা ও শাস্ত্রীয় বিধান পালনে বেশি আগ্রহী হয়। এগুলির আয়োজন মূলত বিত্তশালী বাঙালি পরিবার গুলিতেই হয়ে থাকে। অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে যৌথ উদ্যোগেও দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন। এ গুলি বারোয়ারী বা সার্বজনীন পূজা নামে পরিচিত। ১৭৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়াতে বারোজন বন্ধুমিলে চাঁদা তুলে প্রথম বারোয়ারী বা সার্বজনীন দুর্গোৎসব পালন করেন, যা বারোইয়ার বা বারো বন্ধুর পূজা নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়।
কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ ১৮২৩ সালে বারোইয়ারের এই পূজা কলকাতায় পরিচিত করান। সম্ভবত সেই থেকে বারোয়ারী পূজা শুরু। ১৯১০ সালে সনাতন ধর্ম উৎসাহিনী সভা ভবানীপুরে বলরাম বসু ঘাট লেনে এবং একই জেলার অন্যান্যরা রামধন মিত্র লেন, সিকদার বাগানে একই বছরে ঘটা করে প্রথম বারোয়ারী পূজার আয়োজন করে। ব্রিটিশ বাংলায় এই পূজা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দুর্গা পূজা বারোয়ারী বা কমিউনিটি পূজা হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়।
সাধারণভাবে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিনে অর্থাৎ ষষ্ঠী থেকে দশম দিন পর্যন্ত অর্থাৎ দশমী পর্যন্ত পাঁচদিন দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচদিন দুর্গা ষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্ঠমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আর সমগ্র পক্ষটি দেবী নামে খ্যাত। পূর্ববর্তী অমাবস্যার দিন দেবী পক্ষের সূচনা হয়। দিনটি মহালয়া নামে পরিচিত। অন্যদিকে দেবী পক্ষের সমাপ্তি হয় পঞ্চদশ দিনে অর্থাৎ পূর্ণিমায়। এই পঞ্চদশ দিনটিতে বাৎসরিক লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। সার্বজনীন এই পূজা মূলত পাঁচদিনের অনুষ্ঠান হলেও বাস্তবে মহালয়া থেকে উৎসবের সূচনা এবং লক্ষ্মী পূজায় তার সমাপ্তি।
দুর্গাপূজার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জীবনে অশুভ অসুর শক্তির বিনাশ করে শুভ সুর শক্তির প্রতিষ্ঠা দুর্গাপূজার শাশ্বত দর্শন। দুর্গাপূজা জাতীয় মহা আলোড়ন সৃষ্টিকারী ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এতে জড়িত হয় সর্বস্তরের মানুষ। ব্রাহ্মণ, মালি, কুম্ভকার, নরসুন্দর, ডোম, মুচি, নরসুন্দর ঋষিদাস প্রভৃতি সর্ববর্ণের সর্বস্তরের মানুষের সহায়তা ও মিলন হয় দুর্গা পূজায়। বহুবিস্তৃত উদার ব্যাপক অনুভূতি জাগে এই দুর্গা পূজায়। বাস্তবিকই ধনী, দরিদ্র, উচ্চ-নীচু, ব্রাহ্মণ, শূদ্র এমনকি জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের মহামিলনের ক্ষেত্র এই দুর্গা পূজা। এর ফলে সামাজিক বন্ধন যেমন দৃঢ় হয়, তেমনি মানুষ অর্থনৈতিক দিক দিয়েও নানাভাবে উপকৃত হয় এই দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে।
দশভূজা দুর্গা মা-র কাঠামোতে দেশ ও জাতির সংহতি সাধনের স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। দুর্গা প্রতিমায় লক্ষ্মী ধনের, সরস্বতী জ্ঞানের, কার্তিক বীরত্বের, গণেশ সাফল্যের প্রতীক, আর দুর্গার দশটি হাত আর দশটি অস্ত্র অপরিমেয় বলবীর্যের প্রতীক। সিংহ বশ্যতার প্রতীক আর মহিষাসুর সমস্ত অশুভের প্রতীক। একটি বলিষ্ঠ জাতি সমস্ত অশুভকে দলিত করে পরিপূর্ণতা লাভ করে। দেবী দুর্গা মার আরাধনা কে কেন্দ্র করে আমাদের মনেও ধারণাই দৃঢ়ীভূত হয়।
দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় সামাজিক মিলন উৎসবও বটে। এই পূজার সময় সমাজের বিভিন্নস্তরের মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জনকল্যাণের জন্যই জাতির ঐহিক ও পারত্রিক তথা সামগ্রিক কল্যাণই দুর্গা পূজার মূল লক্ষ্য। মা দুর্গা সকলের প্রতি প্রসন্ন হোন এই প্রার্থনা করি। পরিশেষে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকলকে জানাই শারদীয় দুর্গা পূজার আন্তরিক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ডাক বিভাগ ফিরে পাচ্ছে প্রাণ
  • আমরা সবাই ভালো হলে দেশ ভালো হবে
  • ‘জাতীয় বীর’ কৃষকদের নিয়ে কিছু কথা
  • ভর্তিযুদ্ধে লাঘব হোক ভোগান্তি
  • মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা
  • ভোটের মাঠে তারকার মেলা
  • আয় বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা
  • সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই
  • আলী হোসেন খান
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • Developed by: Sparkle IT