মহিলা সমাজ

আমাদের মৃৎশিল্প

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১০-২০১৮ ইং ০০:৩৫:৫৪ | সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত

বাংলাদেশের ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস। হয়তো আরও বেশি সময়ের। এই ইতিহাসের সবটা আজও ভালো করে জানা নেই আমাদের। আলো-আঁধারের খেলায় অনেক পুরানো কথা ঢাকা পড়েছে। ইতিহাসে সব রকমের মানুষের জীবনযাত্রার পরিচয় থাকে। দেশ ও জাতির ইতিহাস এবং জীবনযাত্রার ধারাবাহিক পরিবর্তন সম্পর্কে আমাদের জানা উচিত বলেই আমার ধারণা।
বাংলাদেশে বিচিত্র শ্রেণি পেশার মানুষ বসবাস করে আসছে অনাদিকাল থেকে। এদের কেউ জেলে, কেউ কুমোর, কেউ কৃষক, কেউ আবার কাজ করছে অফিস আদালতে। এই পেশাজীবির মধ্যে যারা মাটির তৈরি শিল্পকর্মের সাথে জড়িত তারাই হচ্ছেন কুমোর। এদেশের কুমোর সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে তৈরি করে আসছে মাটির শিল্পকর্ম। যখনই কোনো কিছু সুন্দর করে আঁকি, বানাই অথবা গাই তখন তা শিল্প হয়ে ওঠে। আর এই শিল্প যারা তৈরি করেন তারাও এক একজন শিল্পি। তারা অনেক যতœ আর শ্রম দিয়ে তৈরি করেন মাটির এসব দ্রব্যসামগ্রী। যার জন্য দরকার হয় হাতের নৈপূণ্য ও কারিগরী জ্ঞান। তবে আমাদের দেশের কুমোরদের কাছে এসব খুব সহজ। কারণ তারা বংশ পরম্পরায় এ কাজ করে আসছেন। অনেক দিন আগে সাধারণ লোকেরা মাটির পাত্রেই রান্না করত। ‘জালা, হাড়ি, তেলনি’ সচরাচর এসব পাত্রেরই ব্যবহার করা হতো।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন লোকশিল্প ও লোকসংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। প্রাচীনকাল থেকেই এদেশের গ্রামে গ্রামে বিচিত্র লোকশিল্পের চর্চা হয়ে এসেছে। বাঙালি জাতির ঐতিহ্য ও গর্বের একটি অন্যতম অংশ হলো মাটির শিল্প বা মৃৎশিল্প। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশে এই শিল্প গড়ে ওঠেছে। কুমোরেরা মাটি দিয়ে সুনিপুণভাবে দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করে দেশের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে নিজেদের জীবিকার্জন করেন।
এ শিল্পের প্রধান উপকরণ হলো মাটি। তবে সব মাটি দিয়ে এ কাজ হয় না। প্রয়োজন হয় পরিষ্কার এঁটেল মাটি। এঁটেল মাটি নরম করে বিভিন্ন আকৃতির বিভিন্ন জিনিস বানানো হয়। যেমনÑ হাড়ি, পাতিল, সরা, সানকি ইত্যাদি তৈজসপত্র বানানো হয়।
এছাড়াও তৈরি করা হয়, মাটির পাটায় ফুলের নকশা, রবীন্দ্রনাথ, বেণীবন্ধনরত যুবতির চিত্র, জয়নুলের আঁকা গরুর গাড়ির চাকা ঠেলে তোলার প্রতিলিপি, উড়ন্ত পরী, ময়ুরপক্সক্ষী নৌকোর চিত্র, চোখ বুজে নজরুল যে বাঁশি বাজাচ্ছেন এইসব ফটোগ্রাফের নকল। একেকটা চিত্রের জন্য কাঠের ওপর খোদাই করা নকশা আছে। তার ওপর কাদার তাল টিপে টিপে পাটা তৈরি করেন তারা। কাদার তালে ফুটে ওঠে নকশা। বাঁশের কলম দিয়ে সংশোধন করে পাটাগুলো ভাটিতে পোড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়। আর এভাবেই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মাটির জিনিসপত্র তৈরি করেন মৃৎশিল্পের কারিগররা।
একটা সময় ছিলো তখন শুধু মাটির তৈজসপত্র তৈরি করতেন কুমোরগণ। কিন্তু সেদিন আর নেই। এখন তাঁরা মাটি দিয়ে নির্মাণ করেন খ্যাতিমানদের অবয়ব, মূর্তি। আজকাল এগুলোর বিক্রি ভালো। সস্তায় ঘরের দেয়াল সাজানোর জন্য অনেকেই কেনেন।
বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের এক গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। প্রাচীনকালে মৃৎশিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কুমোর সম্প্রদায়ের লোকেরা মাটির নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরি করে মানুষের চাহিদা মেটাতো। ফলে একে কেন্দ্র করে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে ওঠেছিলো।
আমাদের মৃৎশিল্পের অবস্থা বর্তমানে দুর্দশাগ্রস্ত। সময়ের সাথে সাথে মানুষ কাঁচ, চীনামাটি, মেলামাইন, স্টীল, পিতল, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি দিয়ে তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় তথা শৌখিন দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহার করছে। ফলে মৃৎশিল্প প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না।
মৃৎশিল্প আমাদের দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন শিল্প। কুমোর সম্প্রদায়ের লোকেরা অনেক পরিশ্রম করে যতেœর সাথে তাদের নিপুণ হাতের কারুকার্যে তৈরি করে থাকে বিভিন্ন শিল্পকর্ম। বর্তমানে মৃৎশিল্প কুটিরশিল্প হিসেবে গুরুত্ব লাভ করেছে। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং উপযুক্ত মূল্যায়ন পেলে মৃৎশিল্পও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারবে।
আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন মাটির নানারকম খেলনা পাওয়া যেত। তার মধ্যে রয়েছেÑ ছোট হাড়ি, পাতিল, ছোট কলসি, মাটির ঘোড়া, গরু, টেপা পুতুল ইত্যাদি। আমার এসব খেলনা ছিলো খুবই প্রিয়। এখনকার দিনে এসব খেলনা তেমন একটা দেখা যায় না। তাই এগুলোর প্রচার ও প্রসারে সরকারের পাশাপাশি আমাদেরও কিছু করণীয় রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রাচীন শিল্পকলার পরিচয় পাওয়া যায় মৃৎশিল্পে। তারা শুধু যে খ্যাতিমানের প্রতিমূর্তি গড়েন তাই নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত বিষয়ও তারা শিল্পকর্মের বিষয় হিসেবে বেছে নেন। এদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক বিকাশে অবদান রাখার জন্য এ শিল্পের আধুনিকায়ন খুবই প্রয়োজন। এজন্য সরকারসহ সকল স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
বগুড়ায় মহাস্থানগড়ের খননকালে মৃৎশিল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। মৃৎপাত্রের উৎপত্তিটি হরপ্প সভ্যতায়। ধামরাইয়ের মৃৎশিল্প বাংলাদেশের মধ্যে মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত গ্রাম। ধামরাইয়ের কুমারপাড়া, শিমুলিয়া, পালপারা, নুনুন দাস ইত্যাদি বিভিন্ন মৃৎপাত্রী গ্রাম রয়েছে। এই গ্রামগুলি অত্যন্ত মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে, তাদের মৃৎপাত্রের দক্ষতার জন্য তাদের দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং প্রজন্মের জন্য পাল পরিবারের বাসস্থান। বেশিরভাগ কারিগরই এখানে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেন। তারা পণ্যটি তৈরি করেন এবং স্থানীয় বাজারে এটি বিক্রি করেন।
তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, মৃৎশিল্প বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT