উপ সম্পাদকীয়

পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন কত দূর

ড. মুহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১০-২০১৮ ইং ০০:৪৯:৩১ | সংবাদটি ৫১ বার পঠিত


বাংলাদেশে বিদ্যমান আকর্ষণসমূহের বৈচিত্র্যতা সহজেই পর্যটকদের এদেশে ভিড় জমাতে উৎসাহিত করবে। বিশ্বের দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত- কক্সবাজার, পৃথিবীর একক বৃহত্তম জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল- সুন্দরবন, একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকনের স্থান সমুদ্রকন্যা- পটুয়াখালী, দুটি পাতা একটি কুড়ির সবুজ রঙের নয়নাভিরাম চারণভূমি- সিলেট, আদিবাসীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি ও কৃষ্টি আচার অনুষ্ঠানসমৃদ্ধ উচ্চ সবুজ বনভূমি ঘেরা- চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল ও সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তরাঞ্চলের প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরপূর্বক একটি আদর্শে পরিণত করতে পারে। এই জন্যই হয়ত কবি বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’।
যে-কোনো উন্নয়নধারাকে সচল রাখতে ও তাকে কাজে লাগিয়ে সামগ্রিক সমৃদ্ধি আনয়নে, নির্দিষ্ট শিল্পভিত্তিক সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সম্ভাবনাময় ও লাভজনক পর্যটন শিল্পকে এদেশের অর্থনীতির অন্যতম হাতিয়ার রূপে তৈরিতে এবং সেই সঙ্গে এই শিল্পকে কাজে লাগিয়ে আর্থ-সামাজিক উন্নতি সাধনে পর্যটনবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। সুষ্ঠু পর্যটন নীতিমালা হচ্ছে কতগুলো নিয়ম-নীতির সমন্বয় এবং সেই সঙ্গে উন্নয়ন লক্ষ্য ও প্রচার কৌশলসমূহের নির্দেশনা, যা ব্যক্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সঠিক কাঠামো সরবরাহ করে। ২০১০ মহাজোট সরকার বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প বিকাশে সুষ্ঠু নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা চিন্তা করে বাংলাদেশ পর্যটন নীতিমালা ২০১০ প্রণয়ন করে। কিন্তু জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০১০ সালে যুগোপযোগী করে হালনাগাদ করা হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বিশেষ করে নীতিমালার পঞ্চম অধ্যায়ে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পর্যটন আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ থাকলেও তা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। এছাড়া কক্সবাজার-টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও সোনা দ্বীপকে কেন্দ্র করে আদর্শ অবকাশ পর্যটন গন্তব্য গড়ে তোলার কথাও নীতিমালায় বলা আছে। এদিকে অবকাঠামো সংকটে প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো জনপ্রিয়তা হারাতে থাকলেও সেসব স্থানেই গড়ে উঠছে বাণিজ্যিক রিসোর্ট। কিন্তু পর্যটন আইন না থাকার কারণে রিসোর্ট, হোটেল, ট্যুর অপারেটরগুলোকে নিয়ম এবং জবাবদিহিতার মধ্যে আনা যাচ্ছে না। যথেচ্ছ হোটেল-রিসোর্ট করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পার্বত্যাঞ্চল। এছাড়া ২০১০ সালে পর্যটন শিল্প এবং সেবার মান উন্নয়ন, পরিচালনা ও বিকাশে প্রণীত পর্যটন বোর্ড আইনের বাস্তবায়নও চলছে ধীর গতিতে। বোর্ডের কার্যাবলীর ১৫ নম্বর ধারায় ‘পর্যটন-সংক্রান্ত ডাটাবেজ তৈরি’র কথা বলা আছে। অথচ দেশে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তাই পর্যটন নীতিমালাসমূহকে কার্যকরীরূপ দিতে বিভিন্ন বিষয়ের সংযুক্তি যেমন বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণবান্ধব স্থানসমূহ চিহ্নিতকরণ, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পর্যটনের সঙ্গে নিযুক্ত বিভিন্ন সংস্থা ও বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধন, সম্ভাব্য পর্যটক সৃষ্টিকারী দেশসমূহ চিহ্নিতপূর্বক তাদেরকে আকর্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তারই সঙ্গে দেশি বিদেশি সকল পর্যটকদের নিরাপত্তা বিধানকল্পে পরিকল্পনা প্রণয়ন একান্ত প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প ও সেবার সার্বিক উন্নয়ন, পরিচালনা ও বিকাশের লক্ষ্যে সুষ্ঠু পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন পারে এই শিল্পের মাধ্যমে এ দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটি রূপরেখা সৃষ্টি করতে। সঠিক নীতিমালা প্রণয়নপূর্বক গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা প্রদান; পর্যটন আকর্ষণ চিহ্নিতকরণ, সংরক্ষণ ও এর বিকাশ সাধন; দায়িত্বশীল পর্যটন বাস্তবায়নে সরকার, ব্যক্তিখাত ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং পর্যটন শিল্প সহায়ক সুবিধাদি সৃষ্টিতে দেশি-বিদেশি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া পর্যটন উন্নয়নের লক্ষ্যে পর্যটনভিত্তিক গবেষণা, ধারাবাহিক তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন সেবা বিপণনে প্রচার ও প্রসার কৌশল নির্ধারণ অতীব দরকারি।
পর্যটন এলাকা চিহ্নিত করে সে সকল আকর্ষণসমূহের পর্যটকদের শ্রেণিবিন্যাসকরণ, সংশ্লিষ্ট পর্যটন স্থানসমূহের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী স্থানগুলোর তালিকা প্রস্তুত করতে নীতিমালায় সম্ভাব্য ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হলেও এখনো দেশজুড়ে এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু ভবিষ্যত্ কর্মপরিকল্পনায় পর্যটন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই সকল তথ্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
পর্যটন খাতের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে উদ্যোগী দেশি ও বিদেশিদের প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদান, ট্যাক্স হলিডে, রেয়াতি হারে শুল্ক ও কর প্রদানসহ আনুষঙ্গিক সুবিধা দিতে নীতিমালায় যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা অনেকাংশে নথিভুক্ত হয়ে আছে। দেশের পর্যটন বিকাশে উদ্যোগ নেওয়া ব্যক্তিদেরকে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদান করা যেতে পারে। অন্যদিকে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মাঝে পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করতে একক সেবা কেন্দ্রের সুবিধা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজনীয়।
সঠিক ও সুষ্ঠু নীতিমালার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যেকোনো শিল্প ব্যবস্থা আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামগ্রিক পরিবেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। পর্যটনকে বিদেশি মুদ্রা আয়কারী একটি যুগোপযোগী শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিচালনার্থে নিয়ম নীতি নির্ধারণ ও এই শিল্পের মাধ্যমে ভালোমানের কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টি করতে কর্মী পরিবেশ সম্পর্কিত নীতিমালা গ্রহণ করতে পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ । সুষ্ঠু পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত স্থানসমূহের মর্যাদা, ঐতিহ্য, নির্ভেজাল সংস্কৃতি ও স্থানীয়দের সংস্কৃতির স্বকীয়তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে সবচেয়ে নিরেট বিষয়বস্তু হচ্ছে, আমাদের দেশের এই ক্ষুদ্র পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি সেক্ষেত্রে পর্যটন নীতির বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। পর্যটনের ফলে সংগঠিত বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সৃষ্ট পরিবেশের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রভাব কমাতে পর্যটন নীতিমালার বিধিবিধানসমূহ মানদ- হিসেবে কাজ করে।
আজকের পর্যটন শিল্পকে শুধু একটি মৌসুমভিত্তিক অর্থনৈতিকখাত হিসেবে চিহ্নিত না করে, বরং ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে এখনই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে অনেক প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করবে। আর তাই পর্যটনশিল্পের বিকাশে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, এই শিল্প বিস্তারে যুগোপযোগী আইন-নীতিমালা প্রণয়ন, হালনাগাদকরণ ও বাস্তবায়ন আবশ্যক। সঠিক নীতিমালার আলোকে পরিকল্পনা গ্রহণ ও নকশা প্রণয়ন করে অবকাঠামো তৈরি করা গেলে, তথ্য প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার হলে, বাংলাদেশের পর্যটন সমৃদ্ধ এলাকাসমূহকে চিহ্নিত করা এবং এই আকর্ষণ সম্ভবনাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটকদের আগমন ঘটানো গেলে ও সেই সঙ্গে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে, পর্যটন শিল্প বাংলাদেশকে তার ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্ন বিনির্মাণে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
লেখক : চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভর্তিযুদ্ধে লাঘব হোক ভোগান্তি
  • মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা
  • ভোটের মাঠে তারকার মেলা
  • আয় বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা
  • সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই
  • আলী হোসেন খান
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • Developed by: Sparkle IT