ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-১০-২০১৮ ইং ০১:১৬:১৮ | সংবাদটি ৮৮ বার পঠিত

 

[পূর্ব প্রকাশের পর]
(তাং- মঙ্গলবার, ৩ ভাদ্র ১৪০৬ বাংলা, ১৭ আগস্ট ১৯৯৯ খ্রি., দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙ্গামাটি)
পার্বত্য অঞ্চল শাসন বিধির বর্ণিত ধারা নং ৪ ও ৫২ সহ এর সংজ্ঞা জ্ঞাপক বর্ণনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই আইনে ব্যবহৃত সংজ্ঞা নাম উপজাতি পাহাড়ি ও আদিবাসীকে, চাকমা ও মগদের নৃতাত্বিক বিশেষণ রূপে ভাবার অবকাশ নেই। চাকমা ও মগ নামের পরে ‘ওর’ অর্থাৎ অথবা শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায়, পরবর্তী অংশটি বাক্যের সংযুক্ত বিবরণ, অভিন্ন বক্তব্য নয়। চাকমা মগ সহ অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপজাতি, আদিবাসী ও পাহাড়ি বুঝাতে, ‘ওর’ এর পরিবর্তে এন্ড বা এনি আধার বলার প্রয়োজন ছিলো। সুতরাং ১‘ওর’ শব্দ, চাকমা ও মগদের সুনির্দিষ্টভাবে উপজাতি আদিবাসী ও পাহাড়ি হওয়াকে দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দিয়েছে।
পার্বত্য শাসন আইন হলো, স্থানীয় মূল শাসন বিধি। তত্ত্বগত নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এর বক্তব্য এখনো অনুকরণীয়। ১৯৯৮ সালের সংসদীয় আইন নং ১৬ বলে এটি আংশিক রহিত হলেও এর প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে, আনুষ্ঠানিকভাবে রহিতকরণ আইনটি কার্যকর হয়নি। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৬ নং আইনটি স্থগিত ও পার্বত্য শাসন বিধি কার্যকর রাখা হয়েছে। যথা : আইন মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং- ২১৫, তাং- ০৩/০৫/১৯৮৯।
এই প্রচলিত মৌলিক পার্বত্য শাসন আইনের বর্ণিত ধারা নং ৪ এখনো চালু আছে এবং ধারা নং ৫২ স্থগিত হলেও তার সংজ্ঞা জ্ঞাপক বক্তব্যটির মূল্যমান এখনো মান্য। প্রথম আইনটি তিন শ্রেণির লোককে কোর্ট ফি প্রদান থেকে অব্যাহতি প্রদান করেছে। সে লোক হলোÑ
১) চাকমা সম্প্রদায়। ২) মগ সম্প্রদায়। ৩) উপজাতীয় আদিবাসী পাহাড়ি সম্প্রদায়। দ্বিতীয় আইনটি নি¤েœাক্ত লোকদের জন্য অবাধ অভিবাসন মঞ্জুর করেছে, যথাÑ ১) চাকমা, ২) মগ, ৩) পাহাড়ি উপজাতি যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা রাজা লুসাই ও আরাকান পর্বতাঞ্চলের আদিবাসী বাসিন্দা।
উপরোক্ত শ্রেণিকরণ ও সুবিধাদান বিবরণে একথা পরিষ্কার যে, চাকমা ও মগ সম্প্রদায়ের লোক উপজাতি তো নয়ই, পাহাড়ি আদিবাসীও নয়। তাদের বাদ বাকি সহযোগীরাও সে সংজ্ঞায় গ্রহণযোগ্য কিনা, তাও সন্দেহজনক। কোন লেখক, সাংবাদিক, প্রশাসক, রাজনীতিক বা অন্য সাধারণ কেউ যথেচ্ছ ভাবে, কারো প্রতি এই সংজ্ঞা আরোপ বা কারো থেকে এগুলোর প্রত্যাহার করার অধিকারী নন। আইনজ্ঞ ও তাত্বিক পন্ডিতজনদের বিশ্লেষণকে অবলম্বন করেই, সংজ্ঞা আরোপিত হয়। পার্বত্য অবাঙালিদের নৃতাত্বিক পরিচয় নির্ণয়ে, পথিকৃত পন্ডিত হলেন, প্রসেফর পিয়ের বেসানেত। তাঁর বক্তব্যটি এ ব্যাপারে চূড়ান্তে প্রতিপাদ্য রূপে গণ্য হতে পারে। তিনি বলেনÑ
ক) উপজাতিদের আদিম সমাজের মানুষ হিসাবেই গণ্য করে গবেষণা করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমি এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের অদিবাসীদের এই রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের অংশ হিসাবে বিবেচনা করেছি।
(সূত্র : ট্রাইবসম্যান অফ দি চিটাগং হিলট্রাক্টস, ভূমিকার শেষ অংশ)
খ) যদি কেউ আদিম অর্থে প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম ভাবধারা ধারণ করে আজও যারা টিকে আছে, তাদের বুঝায়, তবে এই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের আদিম বলে বর্ণনা করা সত্যের অপলাপ।
(সূত্র : ট্রাইবসম্যান অফ দি চিটাগাং হিলট্রাক্টস, ১ম পরিচ্ছেদের শুরু)
উপরে বর্ণিত পার্বত্য আইন দু’টিতে বর্ণনাগত বিভ্রান্তি হলো, তাতে উপজাতি আদিবাসী ও পাহাড়ি বলে বর্ণিত লোকদের কোন নাম পরিচয় ব্যক্ত হয়নি। নতুবা এ বলার অবকাশই থাকতো না যে, চাকমা ও মগেরা উপজাতি আদিবাসী ও পাহাড়ি নয়। এখন সন্দেহমুক্ত পরিষ্কার ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই যে, চাকমা ও মগ সম্প্রদায়ের লোকেরা আদৌ উপজাতি নয়। তাদের আদিবাসী পাহাড়ি হওয়াটা ও ভ্রান্ত দাবী। সুতরাং পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে তাদের উপজাতি সংজ্ঞায়িত করে গৃহিত আইনী সিদ্ধান্ত, একটি জাজ্বল্যমান ভুল, এটি পরিত্যজ্য। আইনে ব্যক্ত উপজাতীয় তালিকাটি তাই সঠিক নয়। আদৌ অনুরূপ পরিচিতি ও তালিকা প্রয়োজনীয় হয়, তা হলে, রাজনৈতিকভাবে নয়, একাডেমিক তত্ত্বীয় মূল্যায়নের মাধ্যমে, সে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। এটা বিশুদ্ধ তাত্ত্বিক বিষয়।
এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে, পার্বত্য শাসন বিধির ৫২ ধারায় যে ইমিগ্রেশন তথা অভিবাসন ও অভিবাসনের কথা বলা হয়েছে, তা কি দেশী বিদেশী মিশ্র বহিরাগমন? তাকে কি স্বদেশী বহিরাগমন অভিবাসন রূপে মান্য? তত্বে কেবল বিদেশী অনুপ্রবেশকেই ইমিগ্রেশন তথা অভিবাসন ও বহিরাগমন বলা হয়। স্থানীয় বাঙালি অবাঙালি পন্ডিত ও তাদের সমর্থকরা এর বিপরীতে একটানা বলে যাচ্ছেন স্বদেশী বহিরাগমনটিও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আইনের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা আসলে উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপব্যাখ্যা। ইমিগ্রেশন বা অভিবাসন হলো সরকার ব্যবহৃত পরিভাষিত শব্দ। এটা সরকারি দাপ্তরিক ভাষায় বিদেশী বহিরাগমন ব্যবহৃত হয়, সাধারণ শাব্দিক অর্থে নয়। সুতরাং সরকারি আইনের ভাষায় ব্যবহৃত ইমিগ্রেশন বা অভিবাসন, যা পার্বত্য শাসন বিধির ৫২ নং ধারায় ব্যবহৃত হয়েছে, তার অর্থ স্বদেশী বহিরাগমন নয়, বিদেশী বহিরাগমন। সংশ্লিষ্ট অভিবাসন স্বদেশের ভিতর স্থানান্তর গ্রহণ ও বসতি স্থাপন আগে ভারত শাসন আইনেও নিয়ন্ত্রণ যোগ্য ছিলো না, পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রীয় সংবিধানই তা নাকচ করে দিয়েছে। পার্বত্য শাসন বিধিতে ঘুণাক্ষরেও সুনির্দিষ্টভাবে স্বদেশী বাঙালিরা, এতদাঞ্চলে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ জনগোষ্ঠী বলে কোথাও উল্লেখিত নন। এই আইনে বহিরাগত বিদেশীদের কেউ অবাধ অভিবাসী, আর কেউ অনুমতিপ্রাপ্ত অভিবাসী। স্বদেশী বাঙালিদের বসতি বিস্তারের বিষয়টি একটি অধিকার। এই নাগরিক অধিকার নিষিদ্ধ বা কারো অনুমতি সাপেক্ষ নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে মূল চট্টগ্রাম ভূমিরই অংশ। আর এই বৃহত্তর অঞ্চলের মূল অধিবাসী হলো চট্টগ্রামী মূলের জনগোষ্ঠী। এই অঞ্চলের আদি মানুষ হতে হলে, চট্টগ্রামী লোক পরিচয় থাকাই প্রথম ও প্রধান শর্ত। এই শর্ত কেবল চট্টগ্রামী বাঙালিদের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব। মূল চট্টগ্রামী দাবিদার কোনো অবাঙালি লোকের এতদাঞ্চলে থাকা সন্দেহজনক। কোনো স্থানীয় অবাঙালি জনগোষ্ঠী আজ পর্যন্ত এ দাবিতে সোচ্চার হন। সুতরাং তাদের আদি স্থায়ী ও অগ্রাধিকারের দাবি যুক্তিহীন।
স্থানীয় অস্থানীয় আর স্থায়ী অস্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার ব্যাপারটি যুক্তিগতভাবে মূল চট্টগ্রামী ও বাংলাদেশী লোক হওয়া না হওয়ার উপর নির্ভরশীল। নীরবিচ্ছিন্ন দীর্ঘ বসবাস ও অবস্থানের পক্ষে মূল চট্টগ্রামী ও বাংলাদেশী হওয়ার শর্তযুক্ত করা হলে, অবাঙালি জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশ আটকে যাবেন। তখন বাঙালিদের বিরুদ্ধে তাদের পাতা ফাঁদ বহিরাগত হওয়ার ভ্রান্ত দাবি বলে গণ্য হবে।
স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দা ও সম্প্রদায়গত পরিচিতি সনদ দান হলো প্রশাসনিক কাজ। আগে যথাযথভাবেই এ কাজটি সম্পাদনের দায়িত্ব জেলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের উপর ন্যস্ত ছিলো। এই সরকারি প্রত্যয়ন ব্যবস্থা ছিলো যথার্থ ও নিরপেক্ষ।
বাঞ্ছিত না হলেও, স্থানীয়ভাবে বাঙালি অবাঙালির দুই প্রতিপক্ষ সমাজ। এই প্রতিপক্ষতাই পার্বত্য রাজনীতির জটিল গ্রন্থি। তাতেই এখানে সবাই দুই দলে বিভক্ত। উপজাতীয় চীফ, পরিষদীয় চেয়ারম্যান, মৌজা হেডম্যান, মন্ত্রী ও এমপিদের কেউ, এই গন্ডি থেকে মুক্ত নন। তাদের স্বজাতীয় পক্ষপাতিত্ব প্রশ্নাতীত সত্য। এমতাবস্থায় উপজাতীয় ক্ষমতাসীনদের কাছে বাঙালিদের নিরপেক্ষ আচরণ ও সুবিচার লাভ সন্দেহজনক বিষয়। এ বিষয়গুলোর বিবেচনায় উপজাতীয় চীফেরা, নির্বাহী ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও, প্রতিপক্ষ সমাজ বাঙালিদের স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সনদ নিরপেক্ষভাবে দিবেন এবং তা আইনতঃ বৈধ হবে, এটা উদ্ভট, আর অবাস্তব ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা বাঙালিদের বিরুদ্ধে একটি ফাঁদ। উগ্র উপজাতীয় বিরোধীতা ও এ কাজে বাঁধা।
আগে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন দরকার। যাদের দায়িত্ব হবে প্রকৃত উপজাতি, আদিবাসী ও পাহাড়িদের পরিচয় নির্ধারণ। তৎপর দরকার স্থানীয়, অস্থানীয়, স্থায়ী, অস্থায়ী, স্বদেশী, বিদেশী ও চট্টগ্রাম মূলের লোকদের পরিচয় ও সংখ্যা নিরূপণ। এই তত্ত্ব তথ্য, আর উপাত্তই হবে সনদ দানের ভিত্তি। নইলে ইচ্ছা খুশির সনদ ও প্রত্যয়ন, জন-শৃঙ্খলা, শান্তি ও সংহতি ভেঙে দিবে। জন্ম নিবে অরাজক উপজাতিতন্ত্রের এবং তাকে রোখতে জন্ম নিবে প্রতিপক্ষীয় জঙ্গি আন্দোলন, যা অবাঞ্ছিত।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • Developed by: Sparkle IT