উপ সম্পাদকীয়

মূর্তিতেই দুর্গা : বিশ্বাসের বিষয় তর্কের নয়

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-১০-২০১৮ ইং ০০:৪১:১৫ | সংবাদটি ৫৮ বার পঠিত

মোবাইলটা বেজে উঠলো। বুঝতে অসুবিধে হলো না, কন্ঠটি বিশিষ্ট ব্যাংকার আর ধর্মপ্রাণ মানুষটি আমার বন্ধুবর শ্রীযুক্ত বাবু নৃপেশ তালুকদার মহাশয়ের। তিনি জানালেন আমাকে একটা লিখা পাঠাতে হবে। আসন্ন দুর্গা পূজা উপলক্ষে। কি সাংঘাতিক কথা! আমার মতো এক মূর্খের কাছে পান্ডিত্যের আশা! কথায় বলে, মূর্খপুত্র যম স্বরূপ। তারপরও নৃপেশ বাবুকে হ্যাঁ বোধক উত্তরই দিলাম। কারণ মায়ের ধর্ম বলে, পুত্র পুত্রই। মায়ের কাছে মূর্খ, পন্ডিত কখনো কোন অবস্থাতেই বিবেচ্য বিষয় নয়। জগতে মাতৃ¯েœহে সুর অসুর একই সুরে ধ্বনিত হয়। ‘মা’ শব্দটির আবেদন আবেগ-অনুভূতি সুর আর অসুরের কন্ঠে বিন্দুমাত্র প্রভেদ নেই। মায়ের কোলে পন্ডিত যেমন শান্তিতে ঘুমায় মূর্খও তাই। মাকে নিয়ে কথা বলার অধিকার যেমন আছে পন্ডিতদের তেমনি আমার মত মূর্খেরও সে অধিকার থেকে বঞ্চিত হবার কোন হেতু নেই। তাই বন্ধুবর নৃপেশ বাবুর কথা মতো দুর্গা দুর্গা নাম জপ করতে করতে কলম হাতে নিলাম।
ভাবছি আর ভাবছি। কি লিখবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ মনে পড়লো একটি স্মৃতির কথা। আর সেটি হলো কয়েক বছর আগে আমার গ্রামের বাড়ীতে আমরা দুর্গা পূজা করি। আমার চাকরী জীবনের সহকর্মী নীলমনি বাবু তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ সিলেট থেকে আমাদের বাড়ীতে যান। নৌকা থেকে নেমে তিনি সবাইকে নিয়ে পূজা মন্ডপে প্রণাম করলেন। তার পাঁচ বছরের ছেলে সৃজন। আমার মেয়ে সুমি সৃজনকে নিয়ে দুর্গা কাঠামোর সিংহ, অসুর ওদেরকে দেখাচ্ছিল। আমি পাশে দাঁড়িয়ে। সৃজনের শিশু মনের হাজারো প্রশ্ন। সৃজনের সিলেটি ভাষায় প্রশ্ন সিংহ দাঁত বের করে হা করে কেনে, অসুর মুখ ভেঙ্গচায় কেনে? পূজার পরে মাটির মূর্তি পানিতে ফালাইয়া দেয় কেনে? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন তার। সুমি তার নিজের মতো করে সৃজনকে বুঝাচ্ছে। আমি শুনছিলাম। আর ভাবছিলাম কি কঠিন কঠিন প্রশ্ন সৃজনের। তার প্রশ্নের মূল সুর ছিল মূর্তি পূজা। এই মূর্তি পূজা কি এবং কেন। তবে এগুলো শুধু শিশু সৃজনেরই প্রশ্ন নয়, যারা মূর্তি পূজায় বিশ্বাস করেন না তাদের অনেকেই এমন প্রশ্ন করেন যে, পূজার পরে মূর্তি নদীতে ফেলে দিলেন তাহলে এসব করে লাভ কি!
এই লাভ লোকসানের প্রশ্ন নিয়ে নানা জন নানা যুগে নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। আমি নীলমনিকে হাসতে হাসতে বলেছিলাম নীলমনি, তোমার সৃজন তো ‘কমরেড’ হতে চলেছে। এখানে ‘কমরেড’ শব্দটির অবতাড়না করলাম এ কারণে যে, এক সময় এ দেশে তথাকথিত কিছু ‘কমরেড’ নিজেদেরকে সমাজের অন্যদের চেয়ে আলাদা একটা কিছু ভেবে ভেবে গর্ববোধ করতেন এবং ধর্ম মানেন না বলে প্রচার করে সুখ পেতেন। এবং নিজেদের ঘরে বউজিদেরকে উদ্দেশ্য করে পূজা-পার্বণের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। কিন্তু প্রসাদ খাওয়ার সময় সকলের আগেই হাজির হতেন। অবশ্য বর্তমানে ঐসব তথাকথিত ‘কমরেড’ গণ এ নিয়ে কি চিন্তাভাবনা করেন তারাই জানেন। বাস্তবতার নিরিখে এরপর অনেকেই বলতে শুরু করলেন-ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র। আর মূর্তি পূজা! বেশ কয়েক বছর আগে নিজেকে আলট্রা প্রগতিশীল বলে প্রচার করতে গিয়ে বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলে বসলেন, মা সরস্বতীর মূর্তি দেখে নাকি তার কাম ভাবের উদয় হয়। পত্র পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হয়। তবে এটা বোধ হয় বেঠিক নয় যে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিবার সহ তার সকল বয়সের আত্মীয়-স্বজনই সরস্বতী মূর্তির সামনে গেলে মনে মনে ‘মা সরস্বতী’ বলেই সম্বোধন করেন। অর্থাৎ মায়ের ফটোগ্রাফ দেখলে কুপুুত্রেরও মায়ের কথাই মনে পড়ে। মনে তার মাতৃভাবেরই উদয় হয়। শেষ মুহূর্তে দুর্গা কাঠামোর অসুরের কন্ঠে ও আমরা তেমনটিই শুনতে পাই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা তার সমমনাদের কন্ঠেও যে এক সময় দুর্গা কাঠামোর অসুরের তেমনি সুর শুনতে পাব না সেটা কি কেউ হলফ করে বলতে পারেন। কারণ মায়ের কাছে কুপুত্র সুপুত্র এর মধ্যে প্রভেদ নেই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নিয়েও তো অনেক মূর্খ নানা ধরনের নোংরা কথা বলে থাকে। তাই বলে কৃষ্ণের কি কিছু যায় আসে!
যাক গে সেসব কথা। বলা হচ্ছিল মূর্তি পূজার কথা। মূর্তি পূজা ঠিক বা বেঠিক কিনা তা নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। এটা নিতান্তই ভাব বা বিশ্বাসের বিষয়। রাজনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে নানা বিতর্ক থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ধর্ম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ধর্মের নীতি নয়। ধর্মের কথা নয়। মূর্তি পূজা ও মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস। যে বা যারাই মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী নন মূর্তিপূজা নিয়ে অযথা তর্কাতর্কি করে পরিবেশ নষ্ট না করে অথবা অকারণে সময় নষ্ট না করে নিজের ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি কায়মনবাক্যে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেই চলাই বোধ হয় সত্যিকার ধর্ম। যে যেভাবেই ঈশ্বরকে ডাকেন সেভাবে ডাকলেই হলো। মূর্তিপূজা অর্থাৎ সাকারের আরাধনা করা নিয়ে নিরাকারের সাধকদের দুশ্চিন্তার কোন কারণ থাকতে পারেনা। এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা তাদের ধর্মের কোন নীতি আদর্শও নয়। শুধু শুধু সময় নষ্ট বৈ কিছু নয়। বরং সংঘাত অশান্তি সৃষ্টি মাত্র। ভবেশ রায় তাঁর ‘মূর্তিপূজা কি ও কেন’ গ্রন্থে বলেন, ‘যদি মূর্তিরই পূজা করা হতো তাহলে পূজকের ভেতর সেই পাথরের মূর্তির প্রতি এরূপ ভাব হোত যে, ‘তুমি কোন একটি পর্বত থেকে এসেছ কোন এক ব্যক্তি তোমায় তৈরী করেছে, কোন এক ব্যক্তি দ্বারা তুমি এখানে আনীত। অতএব হে প্রস্তরদেব! তুমি আমার কল্যাণ করো।’ কিন্তু এমন তো কেউ বলে না, তাহলে মূর্তি পূজা কিভাবে হল? ভক্তেরা মূর্তির পূজা করেন না, তাঁরা মূর্তিতে ভগবানেরই পূজা করেন; অর্থাৎ মূর্তিভাব দূর করে ভগবদভাবে পূজা করেন। এইভাবে মূর্তিতে ভগবানের পূজা করলে সমস্ত স্থান ভগবদভাবে পরিপূর্ণ হয়। এক কথায় বলা যায়, দেবতা কাঠেও থাকেন না বা পাথর বা মাটিতেও থাকেন না, ভাবেই দেবতার বাস, সেই জন্য ভাবকেই প্রধান রূপে মানা উচিত।
আবার সাকার নিরাকার নিয়েও অনেক কথা হয়। সাকারে বিশ্বাসীগণ নিরাকারে বিশ্বাসীদের যেমন অন্য চোখে দেখেন তেমনি নিরাকারে বিশ্বাসীগণও সাকারে বিশ্বাসীদেরকে ধার্মিক বলে মানতে নারাজ। অর্থাৎ ভাবখানা এমন যে, বিচার মানি তবে তালগাছটা আমার। সাকার নিরাকার প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেন, একটাতে বিশ্বাস থাকলেই হলো। নিরাকারে বিশ্বাস তাতো ভালই। তবে এ বুদ্ধি করো না যে, এইটি কেবল সত্য। আর সব মিথ্যা। এইটি জেনো যে, নিরাকারও সত্য আবার সাকারও সত্য। তোমার যেটি বিশ্বাস, সেইটিই ধরে রাখবে। কবীর বলতেন, সাকার আমার মা, নিরাকার আমার বাপ। কাকো নিন্দো, কাকো বন্দো, দোনো পাল্লা ভারী।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক জায়গায় লিখেছেন :
‘রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুমধাম
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম
রথভাবে আমি দেব পথভাবে আমি
মূর্তিভাবে আমি দেব হাসে অন্তর্যামী
এখানে ‘অন্তর্যামী’ অর্থে আমরা তো মা দুর্গাকেও ধরে নিতে পারি। তাই মা দুর্গাতো সবই দেখছেন। আমরা কে কিভাবে, কি উদ্দেশ্যে দুর্গা পূজার আয়োজন করছি তার সব কিছুইতো মা দেখছেন। আমাদের সবার অন্তরের ‘সুর’ আর ‘অসুরের’ দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখছেন। পূজোতে কোথাও কোথাও বলির ব্যবস্থাও করা হয়। বলি তো শুধু জীব হত্যা নয়। বলি তো ত্যাগের প্রতীক। শ্রীরামকৃষ্ণ এ প্রসঙ্গে একবার বলেন, একজনার বাড়ি দুর্গোৎসব হতো, উদয়াস্ত পাঠা বলি হতো। কয়েক বৎসর পরে আর বলির সে ধুমধাম নাই। একজন জিজ্ঞাসা করলে, মশাই আজকাল যে আপনার বাড়িতে বলির ধুমধাম নাই। সে বললে, আরে! এখন যে দাঁত পড়ে গেছে।
বাংলাদেশে আজ হাজার হাজার মন্ডপে মা দুর্গার আরাধনা হচ্ছে। এখানে লক্ষণীয় যে এর সিংহভাগই হচ্ছে শহর-বন্দর-নগরে। ঈদ এলে আমরা দেখি শহর ছেড়ে মানুষের ঢল গ্রামের দিকে। ফাঁকা হয় রাজধানী সহ অনেক জেলা আর বিভাগীয় শহর। শিকড়ের সন্ধানে মানুষ ছুটে আনন্দ আর মিলন মেলায় গ্রামে গ্রামে। কিন্তু হিন্দুদের দুর্গা পূজায় যেন এর উল্টো চিত্র। এর কারণ বা রহস্য খুঁজে বের করা বোধ হয় জরুরি। দুর্গা পূজা ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতিরও একটি অঙ্গ। শহর কেন্দ্রীকতার কারণ হিসেবে আর্থিক বৈষম্য তো রয়েছেই, এর ফলে সংস্কৃতিও শহর কেন্দ্রীক হয়েছে। এটা কোন শুভ লক্ষণ নয়! তাই দুর্গা পূজায় গ্রাম শহরের ভেদাভেদ খানিকটা কমলে শহর গ্রামের মানুষের মানসিক দূরত্বটা অবশ্যই কমে আসতো। আজকের দিনে সেটাই বোধ হয় কাম্য।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, সাবেক ব্যাংকার।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভর্তিযুদ্ধে লাঘব হোক ভোগান্তি
  • মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা
  • ভোটের মাঠে তারকার মেলা
  • আয় বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা
  • সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই
  • আলী হোসেন খান
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • Developed by: Sparkle IT