উপ সম্পাদকীয়

ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা

মোঃ মোস্তফা মিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১০-২০১৮ ইং ০০:৪৭:১২ | সংবাদটি ৪৪ বার পঠিত

স্বাক্ষর, সাক্ষর এবং সাক্ষরতা শব্দ গুলো নিয়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজেও দ্বিধা, দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়। অনেক শিক্ষিত জনের মধ্যেও এই শব্দগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই। অনেকে আবার এই শব্দ গুলোর অর্থের মধ্যে যে ভিন্নতা রয়েছে তা মানতে নারাজ। এই শব্দ গুলোর অর্থ সম্পর্কে আমাদের সচেতন হওয়া আবশ্যক। শিক্ষা বিজ্ঞানীরা এই শব্দগুলোর যে সু¯পষ্ট অর্থ ও সংজ্ঞা প্রদান করেছেন সেগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হলে আমরা শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের উন্নয়ন করতে সক্ষম হবো। সমাজে দুই শ্রেণির মানুষ বাস করে। যথা-অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ও নিরক্ষর। কেউ অক্ষরের মাধ্যমে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন আর কেউ পারেন না, তাই বলে নিরক্ষর ব্যক্তিকে অশিক্ষিত বলার কোন অবকাশ নাই। জন্মগত ভাবে প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো কাজ করার সক্ষমতা নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। ব্যতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় না।
‘স্বাক্ষর’ শব্দের অর্থ দস্তখত। ‘স্বাক্ষর’ করার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি শুধুমাত্র নাম দস্তখত করতে পারেন। তার সাক্ষর হওয়ার যোগ্যতা নাও থাকতে পারে। অন্যদিকে সাক্ষর বলতে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিকে বুঝায়। অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন বলতে বুঝায় পড়া, লেখা ও হিসাব নিকাশ করতে পারা। সুতরাং ‘সাক্ষর’ মানে সেই ব্যক্তি যিনি একাধারে পড়তে, লিখতে ও হিসাব নিকাশ করতে পারেন। অর্থাৎ অক্ষর ব্যবহারের সক্ষমতা। বিষয়টিকে এই ভাবেও উপাস্থাপন করা যেতে পারে, যেমন-স্বাক্ষর = স্ব + অক্ষর : নিজ নামের অক্ষর বা শুধু নাম সই করতে পারা। সাক্ষর = স + অক্ষর : অক্ষরের সাথে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি। সাক্ষরতা = পড়া + লেখা + হিসাব নিকাশ : পড়তে পারা, লিখতে পারা ও হিসাব নিকাশ করতে পারার দক্ষতা।
সাক্ষরতার সংজ্ঞা-‘সাক্ষরতা হলো এমন একটি সক্ষমতা যার মাধ্যমে ব্যক্তি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে যে-কোনো প্রকার লিখিত অথবা ছাপাকৃত উপকরণ চিনতে, বুঝতে, ব্যাখ্যা করতে, যোগাযোগ করতে, হিসাব করতে ও সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়। সাক্ষরতা ব্যক্তিকে একটি শিখন-পরস্পরায় সংযুক্ত করে,তাকে তার লক্ষ্য অর্জনে, তার জ্ঞান ও সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশে এবং জনপদে ও বৃহত্তর সমাজে অংশগ্রহণে পারঙ্গম করে তোলে।’ (ইউনেস্কো ২০০৫)। সাক্ষর ব্যক্তির অত্যাবশ্যক দক্ষতা গুলো হলো-কথা শুনে বুঝা, নির্দেশনা বুঝা, শোনা বা পঠিত বিষয়ে মূলভাব প্রকাশ করতে পারা, মনের ভাব লিখিতভাবে প্রকাশ করতে পারা, হিসাবনিকাশ করতে পারা ও তা সংরক্ষণ করতে পারা। সাক্ষরতার উদ্দেশ্য হলো মানুষের কিছু দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো, যে দক্ষতাগুলো না থাকলে মানুষকে সাক্ষর বলা যাবে না।
ব্যবহারিক সাক্ষরতা-যে সাক্ষরতা ব্যবহার উপযোগী বা ব্যবহার করা যায় অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে সাধারণ অর্থে তাই ব্যবহারিক সাক্ষরতা। একজন মানুষ এক থেকে দশের নামতা মুখস্থ জানে, কিন্তু সে তার বাজার খরচের হিসাব করতে পারে না। এক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির নামতা মুখস্থ জানাকে ব্যবহারিক সাক্ষরতা বলা যাবে না। তাই যে সাক্ষরতা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার উপযোগী ও প্রয়োগযোগ্য তাই হচ্ছে ব্যবহারিক সাক্ষরতা। বাস্তবে ব্যবহারিক সাক্ষরতার পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। ব্যবহারিক সাক্ষরতা মানুষকে সাক্ষরতা ছাড়াও আরো অনেক বিষয়ে অধিক সচেতন করে তোলে। ব্যবহারিক সাক্ষরতা মানুষকে শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মুখর করে তোলে। অধিকার হারা মানুষকে অধিকার আদয়ে সাক্ষরতা সংঘবদ্ধ করে ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই ব্যবহারিক সাক্ষরতার আধুনিক সংজ্ঞানুসারে বলা যায়-“ যে সাক্ষরতা মানুষকে সাক্ষরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা প্রদান করে তাই ব্যবহারিক সাক্ষরতা।”
১৯৬৫ সনে তেহরানে শিক্ষামন্ত্রীবর্গের সমাবেশে গৃহিত ব্যবহারিক সাক্ষরতা সংজ্ঞা: উন্নয়ন কর্মকান্ডের অন্তর্ভুক্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে সাক্ষরতা শিক্ষাক্রম। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে যে সাক্ষরতা কার্যক্রম গৃহিত হয় তাকেই ব্যবহারিক সাক্ষরতা বলা উচিত (ইউনেস্কো)। সাক্ষরতা দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি পাশাপাশি জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় তথ্য বা বিষয় সমূহ জানা এবং ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে তা প্রয়োগে উদ্যোগী হওয়াকে ব্যবহারিক সাক্ষরতা বলা হয়। অর্থাৎ ব্যবহারিক সাক্ষরতায় সাক্ষরতার পাশাপাশি জীবন দক্ষতা অর্জনের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ব্যবহারিক সাক্ষরতার মাধ্যমে মানুষ সাক্ষরতা ও জীবন দক্ষতার প্রয়োগ কুশলতা অর্জন করে। বর্তমানে আমাদের দেশে মৌলিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কারিগরি দক্ষতা শিক্ষা দেয়ার যে দাবি উঠেছে তা ব্যবহারিক শিক্ষারই নামান্তর। তাই আমাদের দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে এ শিক্ষা সকলের জন্য অপরিহার্য।
প্রচলিত আনুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের নির্দিষ্ট বয়স যারা অতিক্রম করেছে সেই সব বয়স্ক নিরক্ষর ব্যক্তিদের ব্যবহারিক শিক্ষা অর্জনের উপযোগী শিক্ষা কার্যক্রমকে বয়স্ক শিক্ষা বলা হয়। বয়স্ক শিক্ষা মূলত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা। এ শিক্ষা ব্যবস্থা নমনীয়। শিক্ষা লাভের সময়, স্থান, বিষয়বস্তু, পদ্ধতি-কৌশল, উপকরণ পূর্ব নির্ধারিত হলেও শিক্ষার্থীদের সুবিধা অনুসারে পরিবর্তন করা হয়। এ শিক্ষা নির্দিষ্ট যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করার জন্য পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা হয়। বয়স্ক শিক্ষার মাধ্যমে একাধিক লক্ষ্য অর্জন করা যায়, যেমন- ব্যবহারিক সাক্ষরতা অর্জন, জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং সচেতনতা বৃদ্ধি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা অর্জন। তাছাড়া মাতৃভাষায় ধর্মীয় বিধানের গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব হয়।
যেহেতু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম সেহেতু স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রাতিষ্ঠানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে টেকসই করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ কর্মী বাহিনী এবং বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রেইনার গড়ে তোলা উচিত। খন্ডকালীন সংশ্লিষ্ট সকল ষ্টাফের সম্মানী ও মাসিক সম্মানী বৃদ্ধি করা এবং শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষা অর্জনে আগ্রহী করার জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা, প্রশিক্ষণ বান্ধব পরিবেশে প্রশিক্ষণ প্রদান করা ইত্যাদি। বর্তমানে বলা হচ্ছে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৩%। বাস্তবে সাক্ষরতার যোগ্যতা অনুযায়ী এই পরিসংখ্যান প্রশ্নবিদ্ধ। অতীতের ন্যায় বর্তমানেও দ্রুতগতিতে কর্মসূচী বাস্তবায়নের নামে সাক্ষরতা প্রকল্পে জড়িত খন্ডকালীন সংশ্লিষ্ট ষ্টাফদের সময় সংক্ষেপ করে যে নগন্য আর্থিক সম্মানী দেয়া হচ্ছে তা দিয়ে সাক্ষরতার প্রকৃত যোগ্যতা (পড়তে পাড়া, লিখতে পারা এবং হিসাব-নিকাশ করতে পারার দক্ষতা) অর্জন করা সম্ভব নহে। এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সচেতন হওয়ার অবকাশ রয়েছে।
প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যান মোতাবেক বাংলাদেশে নিরক্ষর জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭%। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী যদি ২৭% নিরক্ষর জনসংখ্যাকে সাক্ষরতার আওতাভুক্ত করা হয় এবং দেশের সমগ্র অঞ্চলের শতভাগ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করা সম্ভব হয় তাহলে অচিরেই বাংলাদেশকে নিরক্ষরমুক্ত দেশ ঘোষণা করা সম্ভব হবে। সমাজের তৃণমূল থেকে সর্ব পর্যায়ে বিভিন্ন পেশাভিত্তিক জনসমষ্টিকে সাক্ষরতার আওতাভূক্ত করা সম্ভব না হলে টেকসই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নহে। এই অবস্থায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নাই। ক্ষুধা, দারিদ্র ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বার্থে সাক্ষরতা কার্যক্রমকে টেকসই করার জন্য রাজনৈতিক নীতিপ্রনয়ন কর্তৃপক্ষের আরো বেশি তৎপর হওয়া আবশ্যক।
লেখক : অধ্যক্ষ, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ডাক বিভাগ ফিরে পাচ্ছে প্রাণ
  • আমরা সবাই ভালো হলে দেশ ভালো হবে
  • ‘জাতীয় বীর’ কৃষকদের নিয়ে কিছু কথা
  • ভর্তিযুদ্ধে লাঘব হোক ভোগান্তি
  • মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা
  • ভোটের মাঠে তারকার মেলা
  • আয় বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা
  • সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই
  • আলী হোসেন খান
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • Developed by: Sparkle IT